স্ট্যাম্প


রাত সাড়ে দশ টা। ব্রিফকেস হাতে আগন্তক বেল বাজাল দরজায়।

"আসুন, অল সেট। পেমেন্ট এনেছেন তো? পরের বার থেকে রেট টা বাড়াবেন।"

"আগে একটু বসি। আমার জিনিসটা প্লিজ।"

ব্যাগটা এগিয়ে দেয়, সন্তর্পনে দেখে নেয় আগন্তুক। 

"এক্সিলেন্ট ওয়ার্ক, নাউ ইওর হার্ড ওয়র্ক উইল পে ইউ ব্যাক। ক্যান আই হ্যাব এ গ্লাস অফ ওয়াটার?"

"সিউর! নন্দিনী, প্লিজ হেল্প হিম।" নন্দিনী ভিতরে যায় জল আনতে।

আগন্তুক ব্রিফকেস এর ডালা খুলে সাইলেন্সার লাগানো বন্দুকের পর পর দুটো শর্ট করলো। এগিয়ে গেলো ভিতরের দিকে। নন্দিনী জল নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতেই আবার দুটো শর্ট। দেখে নিল দুজনেরই শ্বাস, অল ক্লিয়ার। ব্যাগটা তুলে দরজাটা ইন্টারলক করে বেরিয়ে গেল সে।


চার দিন পর, সকাল ১০ টা। সৌমিলি সেন এসে নিজের টেবিলে বসতেই দেখলো সুভাষ ফোনে কথা বলতে বলতে ওর কাছে আসছে। ফোন টা রেখে বললো, সাঁতরাগাছি পুলিশ স্টেশন থেকে কল এসেছিল, দম্পতির দেহ উদ্ধার। লোকাল অন ডিউটি অফিসার বললো কদিনের আগের মনে হচ্ছে দেখে। 

"চলো গাড়ি বের করো।"

স্টেশন থেকে বেশ খানিকটা দূরে একটা সরু গলির মধ্যে ফ্ল্যাট টা। যা জানা গেল, আজ সকালে একজন প্রতিবেশী লক্ষ্য করে ২-৩ দিনের নিউজপেপার দরজায় পড়ে আছে, কোলাপ্সিবল গেট টা খোলা। ডাকাডাকি করে না সাড়া পেতে তিনিই পুলিশে খবর দেন। ঘটনাস্থলে এসে দরজা ভাঙ্গে পুলিশ। ড্রইং রুম আর কিচেনের সামনে দুটো ডেড বডি। তারপরই লালবাজার মারফৎ ডাক পড়ে করিৎকর্মা ইন্সপেক্টর সৌমিলী সেন ওরফে সুমির। এই দম্পতি সম্প্রতি মাস ছয়েক এখানে থাকছিল, যদিও মিশতো না তেমন কারোর সাথেই। কি করত জানত না কেউ।

ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সজাগ রেখে রুমের ভিতরে পা রাখে সুমি আর সুভাষ। ঘরের কোনো জিনিস তেমন নড়াচড়া করে নি বলেই মনে হচ্ছে। ড্রইং রুমের সোফাতে পুরুষের ডেডবডি। দুটো বুলেট, কোনো প্রত্যাঘাত এর সাইন নেই। অন্য দিকে মহিলার মুখ কিচেন থেকে ড্রইং রুমের দিকে ফেরা, উপুড় করে, যদিও বুলেট এখানেও দুটো বুকের ওপরে। মাটিতে কাঁচ ছড়ানো, গ্লাসের টুকরো পরে রয়েছে।

সুভাষ কে বলে, কি বুঝতে পারলে? 

ম্যাডাম, দেখে মনে হচ্ছে আততায়ী পূর্ব পরিচিত, নাহলে ঘরের মধ্যে সোফায় বসে খুন হত না।

সুমি বলে, "যদি বাইরের কোথাও থেকে গুলি চালায়? সোফার উল্টোদিকে জানলা টা কি খোলা ছিল?"

"না, ওটা আমরা এসে খুলেছি ", বলে ওঠে লোকাল থানার ওসি।

ঘর সার্চ করে পাওয়া যায় প্রায় ২০ লাখ টাকা। কিছু আর্ট এর সার্টিফিকেট, সবচেয়ে আশ্চর্যজনক রাশি রাশি একই বই, এক অজানা ভিনদেশী লেখকের প্রায় ২০০-৩০০ পিস বই। একটা বই তুলে নেয় সুমি। নাড়াচাড়া করে বুঝতে চেষ্টা করে বই এর বিষয়বস্তু। তেমন কিছু নয়, আঠেরোশো শতাব্দীর রোমান ইতিহাস, বই এর প্রথম পাতার রং টা ওই সময়ের মতই হলদেটে, বাকি সব নতুনের মত সাদা। লোকটা কি বুক সেলার বা ছদ্ম নামে লেখে? কিন্তু ক্যাশ ২০ লাখ টাকার অর্থ কি? কোনো আর্ট পিস জালিয়াতির কেস নয়তো? সুভাষ কে বই এর ডিটেইলস জানতে বলে কলেজ স্ট্রীট থেকে। আর শহরের আশপাশের সব রিসেন্ট আর্ট সামিট এর খোঁজ নিতে বলে। বডি পোস্টমর্টেম এ যায়, ফরেনসিক এর লোকেরা নমুনা সংগ্রহ করে।


বিকেলের দিকে সুভাষ খবর নিয়ে আসে যে ওই বই সারা বই পাড়াতে নেই। জনৈক প্রবীণ বই বিক্রেতা জানিয়েছে, এই বই এর লেখক থাইল্যান্ডের বাসিন্দা। ওখানেই প্রকাশিত হয় এই বই। ভারতের কোথাও এর মুদ্রণ হয় না। 

তবে একটা সুখবর হলো, মৃত ব্যক্তির পরিচয় পাওয়া গেছে। সুভাষ অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসে গিয়ে ছবি দেখাতে একজন আর্ট কলেজের প্রফেসর চিনতে পারে, যদিও নাম মনে করতে পারেন না। কথা প্রসঙ্গে জানান অদ্ভুত কায়দায় অজানা আর্টও আসলের মত সুন্দর করতে পারতো সে। আর জাদুঘরে গিয়ে জানতে পারে এই লোক সম্প্রতি দুবার এসেছিল এখানে। প্রথম এসেছিল মাস ছয়েক আগে, আর শেষ এসেছিল চারদিন আগে। 

"মানে মৃত্যুর দিন! কোন বিশেষ বিভাগে গেছেন দুবার ই?" 

সুভাষ বলে, "হ্যাঁ, স্ট্যাম্প সংগ্রহশালাতেই গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু কোনো সিসিটিভির ফুটেজ পাওয়া যায়নি। কারণ একমাসের বেশি পুরনো ফুটেজ রাখা হয় না, আর শেষ দিন যখন এসেছিল, তখন রেনোভেশনের জন্য স্ট্যাম্প বিভাগ বন্ধ ছিল। কিন্তু আগের পরিচিতির জন্য ওকে যেতে দেওয়া হয়, বাহাদুর গিয়ে দরজা খুলে দেয়। মিনিট খানেক পরেই বেরিয়ে যায় লোকটা। রেজিস্টারে নাম লিখেছিল সত্যেন বসু, অ্যাড্রেস টা যদিও ভুল ই দিয়েছিল। আর্ট কলেজের ছাত্র রাজনীতির সাথে যুক্ত আমার এক লোক আছে, তাকে নাম টা কলেজের রেজিস্টারে দেখতে বলেছি।"

"চলো কাল জাদুঘর। কিছু তো গড়বড় লাগছে।"

সকালেই পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এসে গেছে। কোনো অস্বাভাবিক কিছু পাওয়া যায়নি। ৯ এম এম পিস্তল ইউজ করা হয়েছে। 


ঠিক সাড়ে দশ টার সময় সৌমীলি সেনের গাড়ি এসে থামে জাদুঘরে। সুভাষ আগের দিনের অফিসারের সাথে কথা বলে আগে থেকেই ব্যবস্থা করে রাখে। কিন্তু বাহাদুর বলে, লোকটাকে ঘরে ঢুকিয়ে ও চলে আসে। কোন দিকে লোকটা গিয়েছিল সে দেখেনি। সৌমীলী স্ট্যাম্প সংগ্রহ শালার দিকে যায়। কোনো কিছুই মিল খুঁজে পায়না লোকটার ঘরের বাজেয়াপ্ত জিনিসগুলোর মধ্যে। অফিসারের নম্বর টা নিয়ে বলে আসে কিছু মনে পড়লে জানাতে। সুভাষ এর সোর্স খবর দেয় যে সত্যেন বসু আর্ট কলেজে থেকে পাশ করে ২০০০ সালে। যেখানেই চাকরি করতো বেশিদিন টিকে থাকতে পারেনি।


থানায় ফিরে সুমি ভাবতে থাকে লোকটা যে কিছু একটা জাল করছিল সেটা ঠিক, হয়তো স্ট্যাম্প ই। কিন্তু কিভাবে, কেনই বা এত বই বাড়িতে। হঠাৎই মনে পড়ে একটা স্ট্যাম্পের কথা, হলদেটে কাগজে রোমান সম্রাট এর ছবি। তখনই ফোন করে জাদুঘরের অফিসারকে।

"এত রাতে ফোন করার জন্য দুঃখিত। আপনাদের সংগ্রহশালার হলদেটে কাগজের রোমান সম্রাটের একটা স্ট্যাম্প দেখেছিলাম, তার আনুমানিক মূল্য কেমন?"

"ঠিক মত বলতে গেলে কাল ডকুমেন্টস দেখে বলতে হবে, কিন্তু আপনি যেটা বলছেন আর আমি যেটা ভাবছি সেটা ঠিক হলে মোটামুটি ১০ লক্ষ টাকার বেশি বই কম হবে না।"

সুমি: "এর মধ্যে ওই স্ট্যাম্প কখনো বাইরে এক্সিবিশনে গিয়েছিল।" 

"গিয়েছিল তো সপ্তাহ খানেক আগে, কাল সকালে আপনি আসুন একবার অফিসে, আমি ৭ টার মধ্যে চলে আসবো।" সুমি চলে যায় আরেকবার ওই বন্ধ ফ্ল্যাটে। খুঁজতে থাকে ওর ধাঁধার শেষ ভাগ। খুঁজে পায় না সেটা।


সারারাত চোখের পাতা এক করতে পারেনা সুমি। ভোর হতে না হতেই চলে আসে জাদুঘরে। অফিসার জানায়, ওই স্ট্যাম্পের আনুমানিক মূল্য ১৫ লাখ, ওই স্ট্যাম্পের অকশনের জন্য এক কোম্পানি প্রাইস ভেরিফাই করে গেছে দিন তিনেক আগে। আসলে কোনো অকশন কোম্পানি ভেরিফাই করে রাখলে অকশনে তার দাম বেশি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

"আপনার কাছে থাকা ওই স্ট্যাম্প টা এখন জাল, আপনি চাইলে ভেরিফাই করান।" 

অফিসার বলে, "বলছেন কি? আমার তো চাকরি চলে যাবে। বাঁচান আমায়। আমাদের ভ্যালুয়ার কে দিয়ে যাচাই করিয়ে আপনাকে জানাচ্ছি যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি।"

সুমি ওখান থেকে অকশন কোম্পানির অ্যাড্রেস ডিটেইলস নিয়ে চলে আসে। 

ফোন করে জেনে নেয় অকশন টাইম আর লোকেশন। লালবাজারে ফোন করে অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট এর প্রিপারেশন করতে থাকে, কিন্তু ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্ট হেড বলেন, "সৌমীলি, আমার পুরো আস্থা আছে তোমার ওপর, কিন্তু তোমার কাছে কোনো সলিড এভিডেন্স নেই, না আছে মার্ডার উইপন। কোনো ইস্যু হলে লালবাজার রেসপনসিবিলিটি নেবে না।"

"ডোন্ট ওরি স্যার, আই উড লাভ টু টেক রেসপনসিবিলিটি।"

সুভাষ কে বলে ফোর্স নিয়ে অপেক্ষা করতে ওই অভিজাত হোটেলের লবিতে, ৯টা নাগাদ।

একটা নাটক সাজিয়ে নিয়ে ঠিক ৭ টায় হোটেলের হলে হাজির হয়।


ওপেনিং স্পীচ দেন অকশন কোম্পানির মালিক বিনোদ মালহোত্রা। বেশ কিছু অকশন আইটেমের পর আসে সেই স্ট্যাম্প। প্রতিটি পাতায় প্রায় ২০টি করে স্ট্যাম্প। শুরুর মূল্য ৩ কোটি। দাম ওঠে ৫ কোটি প্রতি পাতার ভ্যালু। প্রায় ১০০ পাতা। অকশন শেষ হয়, এবার শুরু হবে সুমির মঞ্চ। সুভাষ কে এসএমএস করে অ্যালার্ট করে দেয়। সেই সময় জাদুঘরের অফিসার ফোন করে জানায় সত্যি ওই স্ট্যাম্প টা নকল। সুমি ওনাকে ভ্যালুয়ারকে নিয়ে  হোটেলে চলে আসতে বলে। মঞ্চ থেকে নামতে উদ্যত হয় বিনোদ মালহোত্রা।

হঠাৎ ই স্টেজে উঠে মাইক্রোফোন নেয় সুমি।

"গুড ইভনিং, আমি বিনোদ মালহোত্রার বিশাল ফ্যান। ওনার মত বিচক্ষণ লোক খুব কম ই আছেন, কিন্তু এই মুহূর্তে উনি যে স্ট্যাম্প গুলি অকশন করেছেন সেগুলো জাল।"

হলে যেন পিন পড়লেও শব্দ হবে।

"কি বলছেন আপনি, সিকিউরিটি, প্লিজ হেল্প ম্যাডাম।"

"জাস্ট এ মিনিট, মি: মালহোত্রা। এই হল থেকে বেরোতে পারবেন না, চারপাশ ঘিরে রেখেছে পুলিশ। প্লিজ সি মাই আইডেন্টিটি। ইন্সপেক্টর সৌমীলি সেন, হোমিসাইড। এবার আপনি বলবেন এখানে, না আমি বলবো। আপনার ফিঙ্গার প্রিন্ট ম্যাচ করে গেছে।" মোক্ষম চাল টা ফেলে সুমি।

"লেটস গো আউটসাইড।"


ওই হোটেলের রুমেই বসে আছে সবাই। সুমি, বিনোদ মালহোত্রা আর ওনার সেক্রেটারি ও সুভাষ, জাদুঘরের অফিসার আর ওনার ভ্যালুয়ার। 

সুমি: "আমি শুরু করি, মি: মালহোত্রা, কিছু এদিক ওদিক হলে ঠিক করে দেবেন। আমার প্রথম নজর পরে ডেডবডি মানে সত্যেন বসুর বাড়িতে ২০ লাখ টাকা দেখে, ওটা খুঁজে আপনি নিয়ে নিলে হয়তো আর একটু বেগ পেতে হতো। তারপর যখন শুনলাম সত্যেন দুবার প্রায় মাস ছয়েকের ব্যবধানে জাদুঘরে গেছে একই স্ট্যাম্প সংগ্রহ শালায়, তখন বোঝাই যায় প্রথমে নমুনা সংগ্রহে, আর দ্বিতীয়বার সেটার হাত সাফাই করতে। কিন্তু জাদুঘরের মধ্যে সেটা করা মুশকিল। তাই এক্সিবিশন এর সময় যাতায়াতের মধ্যেই পাল্টে যায় আসল স্ট্যাম্প। ইতিমধ্যে সত্যেন এর সাহায্যে বিনোদবাবুর কাছে আসে স্ট্যাম্প বানানোর নকল রেপ্লিকা এবং আসল স্ট্যাম্প ও। হয়তো বেশি দাবি করেছিল সত্যেন, তাই ওকে সরিয়ে দেওয়া হয়। খটকা লাগে যদি আসল জিনিস পাল্টে যায়, তাহলে ভেরিফাই করে অকশন কোম্পানির সার্টিফিকেট কিভাবে এলো? কিন্তু একটু ভাবলেই দেখবেন, যখন সার্টিফিকেট নেওয়া হয়, অলরেডী নকল স্ট্যাম্প দখল করেছে জাদুঘরের জায়গা। কিন্তু এই স্ট্যাম্প টাই যে নকল করা হচ্ছে, সেটা আমি নিশ্চিত ছিলাম না। এখানে আমাকে হেল্প করেন আমার ফরেনসিক এক্সপার্ট। ওই বই গুলোর হলদে প্রথম পাতাটা ইউজ করেই যে তৈরি করা যেতে পারে স্ট্যাম্প টা, নিশ্চিত করেছিল সে। সেই জন্যই অত বই, এটাতে আমার মতে সত্যেনবাবুরই কৃতিত্ব ছিল। আর্ট কলেজের ছাত্র হিসাবে সুচারু ছিল সে। সম্ভবত আরো কিছু সেট নকল করার জন্যই বইগুলোর অর্ডার দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু আপনি যখন দেখলেন, সত্যেন বাবুর খিদে বেড়ে যাচ্ছে, আর আপনিও পেয়ে গেছেন প্রিন্টিং এর পেপার ও নকল স্ট্যাম্পের ছাপ। ওকে সরিয়ে দিলেন রাস্তা থেকে,  যদিও ওনার স্ত্রীর এতে কোনো অবদান ছিল না। আশা করি এবার আপনি আসল স্ট্যাম্প টা আর মার্ডার উইপন টা আমাদের দেবেন, আমি চেষ্টা করবো সেই প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানাতে। 

মাথা নত করে সেক্রেটারি কে লকার থেকে ফাইল টা এনে দিতে বললেন। সুভাষ এগিয়ে গেলো হাতকড়া নিয়ে। সুমি রুম থেকে বেরিয়ে পড়ল। 


ঘরে ফিরে ঠান্ডা জলে স্নান করল সুমি। মোবাইলে একটা  এসএমএস ফ্রম ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্ট হেডের। "প্রাউড অফ ইউ"


রাকেশ ঘোষাল

Comments