ট্রেন ও ঝগড়া



যিনি ট্রেনের সিট বানিয়েছেন , তিনি অদ্ভূত একটা মাপ নিয়েছেন । তিনজনের নয় , আবার চারজনেরও নয় । বলা উচিত সাড়ে তিনজনের একটা সিট । মানুষ তো আদ্ধেক হয় না । কিন্তু, ভগবান ( যদি থেকে থাকেন ) মানুষ বানাবার সময় বুঝতে পেরেছিলেন এই মানুষের মাথায় একদিন এমন বুদ্ধি হবে যে তাঁরা লোকাল ট্রেন বানাবে যেখানে সিটে সাড়ে তিনজন বসবার মতন জায়গা থাকবে । খেয়াল করে দেখুন মানুষের হাত , পা , চোখ , মাথা , কান ইত্যাদি সব কিছুই গোটা গোটা , শুধুমাত্র পোঁদটাই দু-আধখানা । কারণ , এই  আদ্ধেক পোঁদ দিয়েই সাড়েতিন নম্বর ব্যাক্তি হয়ে লোকাল ট্রেনের সিটে বসতে হবে । এই আদ্ধেক পাছাও অনেকসময় সিটে ধরে না । এই আদ্ধেক ঝুলে থাকা প্যাসেঞ্জারের পাছাই হল পাক অধিকৃত কাশ্মীর , যা ছায়াযুদ্ধের জন্ম দেয় । এই সাড়ে তিন নম্বর অভাগার মনে হয় , নিশ্চয় জায়গা আছে । সিটে বাকি তিনজন তাঁকে দিচ্ছে না । নিশ্চয় ওঁরা দলবাজি করছে ডেলি প্যাসেঞ্জার বলে । তাই বলতে হয় - 'দাদা , একটু সরে বসবেন' । সিটে তিনজন বসে ছিলেন । জানলার ধারের লোকটি মুখ হাঁ করে ঘুমিয়ে আছে । বাকি দুজন কানে ইয়ারফোন গুঁজে স্মার্টফোনে মগ্ন । তিনজন চেষ্টা করলেন চেপে বসার , মানে দেখালেন যে তাঁরা চেষ্টা করছেন । সাড়ে তিন নম্বর ব্যাক্তিটি দেখলেন তাঁর জায়গার ক্ষেত্রফল একটুও বাড়েনি । তাই তিনি গলার জোর বাড়িয়ে বললেন  - 'দাদা , আর একটু চাপা যাবে না' ।  বাকি তিনজন নিজের নিজের জায়গায় একটু দুলে উঠলেন । যেন মনে হবে , তাঁরা প্রাণপণ চেষ্টা করছেন সরে যাবার , আসলে তাঁরা নিজের জায়গায় বসে গা টা নাড়িয়ে দিলেন । ট্রেনে ঝাঁকুনি এই গা নাড়িয়ে দেবার কাজটা করে দেয় সুনিপুণভাবে । সাড়ে তিন নম্বর ব্যাক্তিটি এবার রেগে যাবেন - 'আরে এতো জায়গা রয়েছে , আর একটু সরা যায় না !' কান থেকে ইয়ারফোন খুলে কেউ উত্তর দেবেন -  'অতো জায়গা যখন দেখছেন , ফ্ল্যাট বানিয়ে ফেলুন' । সাড়ে তিন নম্বর ব্যাক্তি মুখটা বাংলার পাঁচের মতন করে চাপ দিতে থাকেন , যদি কোনোভাবে নিজের জায়গাটা একটু বাড়ে ! তিন নম্বর লোক খচে যান এই অপ্রত্যাশিত চাপে । তিনিও চাপ দিতে থাকেন । এভাবেই লেগে যায় ঝগড়া । মুশকিলটা হল সবাই জানে , যেদিন যার কপালে এই সাড়ে তিন নম্বর হওয়া লেখা আছে , সেদিন তাঁকে ভুগতেই হবে । এতো চাপাচাপিতে কেউই নিজের জায়গা একটুও বাড়িয়ে উঠতে পারে না , শুধুমাত্র নিজেদের ঘামের গন্ধ বিনিময় করে নেয় ।  

ট্রেনে সবাই রাগী । সবাই মস্তান । একটু পায়ে পা লেগে গেলেই  এমন ভাব করে যেন তাঁর বউ নিয়ে পালাচ্ছেন ! কেউ কেউ ঝগড়ায়  ফোড়ন দেয় । কেউ হয়তো একমুখ পান নিয়ে বসে ছিলেন । ঝগড়া জমে উঠেছে দেখে নিজেও কিছু ইনপুট দেবেন ভাবলেন । তাই জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে পিচকারির মতন পিক ফেললেন । ঝগড়ার সময় কেউ একটা বড় বাতেলা মেরেই চারিদিকটা একবার ঘুরে তাকিয়ে নেয় । মানে কে কে ওঁর সঙ্গে আছে , দলটা ভারি কিনা । বরাহ এবং ডেলি প্যাসেঞ্জার দুজনের গর্ব একটাই , তাঁরা দল বেঁধে আসেন ।  উলটো দিকে যে দলহীন বেচারি ঝগড়ায় ফেঁসে গেছে সে প্রথমে প্রচুর তেল নেবে । কারণ , ট্রেনে উঠলেই বাঙালির ভেতরের উত্তম কুমার সত্ত্বার মৃত্যু ঘটে , অ্যাংরি ম্যান জেগে ওঠে । তাই , সে প্রথমে খুব উড়লেও , ডেলি প্যাসেঞ্জার গ্যাং এর সামনে পড়ে তাঁর ফুয়েল ফু হয়ে যায় । ফলে , সকলের কাছে প্রভূত চাট খেয়ে গেটে ঝুলতে ঝুলতে গন্তব্যে পৌছায় । এ প্রসঙ্গে বলতে হয় , ট্যালেন্টেড , সুশিক্ষিত লোকজন কখনোই দল বেঁধে আসেন না । ফলে , বরাহকূল থুড়ি ডেলিপ্যাসেঞ্জারকূল , যাদের জীবনের মূল অহংকার 'দল বেঁধে ট্রেনে আসাযাওয়া' তাঁদের মধ্যে ট্যালেন্টেড , সুশিক্ষিত মানুষ পাওয়া বেশ কঠিন । শুধু তাই নয় দীর্ঘদিন ট্রেনে যাত্রা করাও এই ঝগড়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ । এই যেমন কিছু কিছু চাকরীর ক্ষেত্রে ওয়ার্ক এক্সপিরিয়েন্স খুবই জরুরি । তেমনি ট্রেনে ঝগড়ার ক্ষেত্রেও আপনার কদিন ট্রেনে যাতায়াতের অভিজ্ঞতা আছে সেটা ম্যাটার করে । অনেকেই ঝগড়ার মাঝখানে জিজ্ঞাসা করে বসেন - 'কদিন যাতায়াত করছেন ট্রেনে ?’ কারণ, ওই মুহূর্তে সেই ব্যাক্তি বড় অসহায় । ঝগড়া চালিয়ে যাবার মতন উপযুক্ত অপযুক্তি নেই তাঁর ভাঁড়ারে । তাই , এবার ব্রম্ভাস্ত্র - 'কদিন যাতায়াত করছেন ট্রেনে ?’ যদিও গোটা ঝগড়ায় চলা সবরকম বাজে ভাঁটের মধ্যে এটিই একমাত্র যুক্তিপূর্ণ কথা । সত্যিই , কেউ যদি দীর্ঘদিন লোকাল ট্রেনে যাতায়াত করে থাকেন তাহলে ট্রেনের নানান প্রাণী এবং তাঁদের নানান বাঁদরামো সম্পর্কে তাঁর অবগত হয়ে যাওয়া উচিত । যদিও কেউ কেউ  বোধিলাভ করেও ধোবিলাভ করেন । আসলে ধোবি নয় ধোবির গাধাটিকে লাভ করেন তিনি , কারণ সেই গাধার মেধা এবং নিজের টকে যাওয়া মেধার মধ্যে তিনি সাদৃশ্য খুঁজে পান । তবে স্মার্ট ফোন এসে ট্রেনে ঝগড়া একটু কমেছে । লোকে সারাক্ষণ ফোন খুঁটে চলেছেন । এমনকি ট্রেনে যেতে যেতে যাদের নাক খোঁটার , পোঁটা গোল পাকাবার , পায়ের দাদ চুলকানোর দীর্ঘদিনের অভ্যাস তাঁরাও সেই অভ্যাস ছেড়ে স্মার্টফোন খুঁটছেন । তাঁরা একসময় ট্রেনের দাগী ঝগড়ুটে ডেলিপ্যাসেঞ্জার ছিলেন । এখন স্মার্টফোন হাতে পেয়ে সৎপথে ফিরেছেন । কিন্তু, যারা বসার
 জায়গা পায়নি , এমনকি দাঁড়িয়ে স্মার্টফোন খোঁটার উপযুক্ত জায়গা পাননি , তাঁদের তো একটু ঝগড়া করতেই.....l

রাকেশ ঘোষাল

Comments