দেখা



দেখা যে কত রকমের হয়, নিজেই দেখি আর নিজেই অবাক হয়ে ভাবি। সকাল বেলা, বাইরে অঝোরে বৃষ্টি হচ্ছে, মর্ণিং ওয়াকে বেরোনো যাবে না কোনোমতেই। কিচেন থেকে প্রেসার কুকারের সিটির শব্দ কানে এসে পৌঁছাল, বুঝলাম ও আমার অফিসের লাঞ্চবক্স রেডি করছে, কখন যে চুপিচুপি উঠে গেছে বুঝতেই পারিনি। আমি বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে শুয়ে ভাবছি, আজ কিছু একটা লিখবো। কিন্তু কি লিখবো!


                               চোখের সামনে সিলিং ফ‍্যানটা বনবন করে ঘুরছে। ঐ দিকেই তাকিয়েছিলাম। মনে হলো একটা নরম হাওয়া আমার কানের কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বলছে -- বন্ধু, আজ আমার প্রিয় বন্ধু ঐ ফ‍্যানটাকে নিয়ে কিছু একটু লিখবে? ওর খুব কষ্ট! সবাই ওকে যন্ত্রভাবে। দেখিতো তুমি কেমন লেখক! তোমার লেখায় আমার বন্ধুকে জীবন দিতে পারো কিনা! 


                           আমার স্থূল মন বললো -- যন্ত্রকে আবার যন্ত্র ছাড়া কি বলবে! যত্তসব আদিক্ষ‍্যেতা।


                       সুক্ষ্ম মনটা বলল -- সেরকম ভাবলে আমরা সবাইতো এক একটা যন্ত্র। দেখি না একটু ভালো করে, ওর মধ‍্যে কোনো প্রাণের হদিস পাওয়া যায় কিনা!

                          একটার পেছনে আর একটা, তার পেছনে আরো একটা -- তিনটে ব্লেড ছুটে চলেছে। একটা আর একটাকে ধাওয়া করে চলেছে অবিরাম। মনে হয় কেউ কাউকে ছুঁতে পারবে না কোনোদিন, তবু ছুটে চলা। কিন্তু অন‍্যভাবে দেখলে, তারা প্রত‍্যেকেই প্রত‍্যেকের সাথে একজায়গায় জুড়ে রয়েছে। তাহলে একে অন‍্যের পেছনে ছুটছে কিসের নেশায়? হয়তো কোনো নেশাই নয়, নেহাত খেলা। ঠিক ছোটোবেলায় আমরা যেমন খেলতাম -- একটা খুঁটিকে একহাত দিয়ে ধরে, দু'তিন জন মিলে একসাথে খুঁটিটার চতুর্দিকে গোলগোল ঘোরা। তেমন নির্দিষ্ট কোনো কারন নেই, শুধুই খেলাচ্ছলে ঘুরে চলা। তফাৎ শুধু একটাই -- বিভিন্ন জনের বিভিন্ন গতির জন‍্য আমরা মাঝে মাঝে একে অপরকে ধাক্কা মেরে ফেলতাম। আর ব্লেডগুলোর ক্ষেত্রে কখনো সেটা হয় না, ওরা একেবারে সিস্টেমেটিক, সমান গতিতে ছুটে চলে। কত বাধ‍্য ওরা, আঙুলের এক ইশারাতে ঘুরতে শুরু করে, আবার আর এক ইশারাতেই থামার প্রচেষ্টা শুরু করে।

                                ঘরের হাওয়াটার সাথে গভীর বন্ধুত্ব ফ‍্যানটার। আপন মনে ছুটতে ছুটতেই হাওয়ার সাথে ছোঁয়াছুঁয়ি খেলা চলে ওর। হাওয়া অনেকটা উচ্ছ্বল দুষ্টুমিষ্টি প্রেমিকার মতো। কখনো ব্লেডের সঙ্গে গায়ে গা লাগিয়ে ঘুরে বেড়ায়, তো কখনো ধরা না দিয়ে দুই ব্লেডের মধ‍্যে দিয়ে ফাঁক কেটে দৌড়ে বেরিয়ে যায়। ফ‍্যান বেচারা সতৃষ্ণ নয়নে চেয়ে থাকে হাওয়ার দিকে -- কখন আবার সে আসবে ফিরে তার কাছে, বাঁধবে তাকে অদৃশ‍্য, নরম, মোলায়েম বাহুডোরে। সারা ব্লেড জুড়ে তারই ঠোঁটের আলতো চুম্বনের চিহ্ন বয়ে নিয়ে বেড়ায় ফ‍্যানটা।


আমার স্থূল দৃষ্টি বলল -- ঐ কালোকালো ছোপগুলো, চুম্বনের দাগ না ছাই। যত ধূলো বসে নোংরা হয়েছে। কালই পরিস্কার করতে হবে ওটাকে।


আমার সুক্ষ্ম মন বলল -- সে তোমার চোখে ওগুলো ধুলো হতে পারে। আমার চোখে তো প্রেমের নিশান। জানো, সব কিছুর একটা আলাদা গন্ধ আছে -- প্রেম, ভক্তি, রাগ, অভিমান, দুঃখ, আনন্দ স-বা-র আলাদা আলাদা গন্ধ হয়। তুমি পাও কিনা জানি না, আমি তো পাই। ফ‍্যানের ঐ কালো ছোপ গুলোয় আমি প্রেমের গন্ধ পাই। আচ্ছা! তুমিই বলো, বাতাস হীন ঘরে কি ব্লেডের গায়ে ঐ ছোপ পড়তো? কক্ষনো না। প্রেমহীন জগৎ কখনো হয় নাকি!

ভালবেসে কাছে আসা, সারা শরীর আলতো চুম্বনে ভরিয়ে দেওয়া, আবার অভিমানে দূরে সরে যাওয়া -- হাওয়ার এই প্রেম প্রেম খেলা নিয়েই তো বেঁচে আছে ফ‍্যানটা। না হলে সঙ্গী ছাড়া, একা একা কি এতোদিন বেঁচে থাকা যায়?


                             একটা মিষ্টি হাওয়া এসে আমার গালে একটা মিষ্টি চুম্বন দিয়ে বলল -- লেখক বন্ধু, তুমি খুব ভালো। আজ থেকে তুমি আমাদের দুজনেরই বন্ধু। আমাদের প্রেমের একমাত্র সাক্ষী তুমি। আচ্ছা বন্ধু, তুমি প্রেমের গন্ধ যখন পাও, তখন নিশ্চয় আমাদের প্রেমের রংও বলতে পারবে!


-- অবশ‍্যই। তোমাদের প্রেমের রং কালো। ঐ কালো ছোপগুলোইতো তোমাদের প্রেমের রং। শুধু বর্ণ আর গন্ধই নয়, তোমাদের প্রেমের শব্দ ও আমি চিনি। তোমাদের মিলন মুহুর্তের গান আমি শুনেছি। কি সুন্দর ছন্দ তার। ওটা না শুনতে পেলে আমার ঘুমই আসে না -- শন্-শন্-শন্-শন্......


রাকেশ ঘোষাল

Comments