গ্রীষ্মের_ছুটিতে ছাত্রের লেখা খোলা চিঠি



পুজনীয় স্যার ;

 


        পত্রের প্রথমে আমার বিনম্র শ্রদ্ধা ও প্রণাম নেবেন ।আমি আপনার স্কুলেরই শেষের বেঞ্চে বসে থাকা একজন ছাত্র ।যাকে হয়তো আপনি দেখেছেন কিন্তু নাম জানেননি ।না জানারই কথা আমি তো আর পড়াশুনোয় তেমন ভালো না; তাই  কোনোদিন ফাষ্টবেঞ্চে বসার সাহস কুলিয়ে উঠতে পারিনি ।আর আপনাদের  দৃষ্টিও হয়তো ব্ঞ্চে এর  শেষ অবধি পৌছানোর আগেই ঝাপসা হয়ে 

আসে ।

তাহলে  কী করে চিনবেন বলুন ! 

যাক সেকথা   ! তবে আপনার হয়তো খেয়াল হয়নি , আমি  কিন্তু বেশ মনোযোগ দিয়ে শেষ বেঞ্চ থেকে মাথা উঁচু করে আপনাকে  দেখতাম  ক্লাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ।  এমনো দিন গিয়েছে যে আপনার অঙ্কের ক্লাস  করার জন্য বাড়িতে শতকাজ ফেলে রেখেও  ক্লাসে এসেছি । 

      

       মনে আছে স্যার ; গত ৬‍ ই মে যেদিন  আপনার ক্লাস চলাকালীন সুভাষবাবু ক্লাসে ঢুকে গ্রীষ্মের ছুটির নোটিস শুনিয়ে দিল, যে -আজ থেকে ৩০ শে জুলাই অবধী স্কুল ছুটি অর্থাৎ পঠন পাঠন সমস্ত বন্ধ থাকবে সেদিন থেকেই  আপনাকে  চিঠি লিখবো ভাবছি  !,কিন্ত লিখবো বললেই তো আর লেখা হয় না ; তার ওপর আবার আমার হাতলেখার যা ছিরি ;তবুও লিখছি, না হয় একটু কষ্ট করে পড়ে নেবেন ।


    আমি শ্রী সনাতন কৈবর্ত ,শ্রেণি -দশম ,রোল-৬৪, বিভাগ( খ)।আমার ।স্কুলের পরিচয়পত্রে আমাকে আপনার মনে পড়বে না এও আমি জানি ।আমার বাবার পরিচয় টানলে হয়তো আপনি সহজেই চিনতে পারবেন  ।কারন আপনি স্টেশন থেকে নেমে আমার বাবার রিক্সাতে করেই  প্রতিদিন  স্কুলে আসেন ! নিশ্চয় বাবার কাছ থেকে আমার নাম শুনে থাকবেন ।আর সব বাবারই তো ছেলেকে নিয়ে অহংকারের সীমা থাকে না ।আমার বাবার ক্ষেত্রেও নিশ্চয় অন্যথা হয়নি ।তাই  নিশ্চয় আপনি আমার কথা শুনে থাকবেন বাবার মুখ থেকে  ।


     স্যার; জন্মের পর আমার মাকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি ;বাবাই আমার সব !বাড়িতে বাবা ছাড়া আমার আর কেউ নেই ।  নিয়ম মেনে প্রতিদিন কাকভোরে রান্না করে সেই যে  রিক্সা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে  ,আর সারা দিন এই ঝলসানো রোদে টোঁ -টোঁ করে ঘুরে, সন্ধ্যার সময় বাড়ি ফেরে।জানেন স্যার ;-আমাকে নিয়ে বাবার স্বপ্নের শেষ নেই ।সবসময় বাবা আমার কানের কাছে আওড়ায়।


     -" সনাতন তোকে আমি অনেক দূর পড়াব ।লোকের কাছে যেন তুই দৃষ্টান্ত হয়ে থাকিস  সারাজীবন । রিক্সাওয়ালার জীবনের  পরম্পরায়  তারা যে  শুধু রিক্সার ঘানি টেনে জীবন কালি করে তা নয় !  এই তকমা আমি তোর হাত দিয়ে দূর করতে চাই বাবা  !"


  সত্যি স্যার; বাবার জন্যই কষ্ট হয় । 

আমারও ইচ্ছা বাবার সমস্ত ইচ্ছে পূরণ করবো ।কিন্তু স্যার অভাবের বজ্র যখন আছড়ে পড়ে  তখন ইচ্ছে গুলো কেন জানিনা বুকের মধ্যে ছটপট করে আর্তনাদ করে ধড়পে মরে ।


জানেন স্যার ;বাবা প্রায় বলে -  "টিউশনের দরকার হলে বলবি আমি ব্যবস্থা করে দেবো !"কিন্তু   আমি তো বুঝতে পারি টেউশন নিলে বাবাকে কতটা পীড়ণ করা  হবে !তাছাড়া এমনিতেই পরিবারের যা অবস্থা ! তাই বাবাকে হাসি মুখেই কতবার  মিথ্যে কথা বলেছি হিসেব নেই -


       " বাবা টিউশন আমার একদম লাগবে না ! ওসব ফাল্তু টাকা লোকসান ।যারা  বাড়িতে পড়াশুনো করেনা তারা টিউশন নেয় ।আমি তো পড়াশুনো করি ।" 


       বাবার হাসিতে আমার বুক চড়চড় করে ওঠে ।কিন্তু স্যার আমি তো নিজেও বুঝতে পারি আমার কোথায় দূর্বলতা ।আর সেই দূর্বলতা কাটাতেই আমি প্রতিদিন স্কুলে যেতাম ।যেমন করে শত কাজ ফেলে রেখে এমনকি  অসুস্থ শরীর বয়ে নিয়ে যেমন যেতাম আপনার ক্লাসে । তা আপনি হয়তো বুঝতে পারেননি !ও হো; ভুলেই গিয়েছিলাম ।আমি তো একেবারে শেষের বেঞ্চে থাকি! চোখে না পড়ারই কথা । 


      জানেন স্যার ; -"স্কুলের শিক্ষাই আমার জীবনের পথপ্রদর্শক ।আমার প্রতিদিনের বেঁচে থাকার স্বপ্ন। আমার বাবার আপনার হাতে পোতা  বিশ্বাসের চারাগাছ ।তাই স্যার ;যেদিন ক্লাসে এই টানা দুই মাসের দীর্ঘমেয়াদী ছুটির ঘোষনাটি শেষ বেঞ্চ থেকে  সুভাষ বাবুর মুখ থেকে শুনতে পেলুম ।সঙ্গে সঙ্গে ভেতর থাকা চাপা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো  ।মনে হলো - এই  দীর্ঘমেয়াদী স্কুলের ছুটিই  যেন ,আমার বুকের মধ্যে তিলেতিলে  বেড়ে ওঠা স্বপ্ন গুলিতে হাতুড়ির শক্ত বাড়ি বসিয়ে দিল ।


          স্যার ; আমার স্বপ্ন নিয়ে আমি চিন্তিত নই ।আমার মতো কত  শত  স্বপ্নই তো ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই চুরমার হয়ে যায় ;কিন্ত এ স্বপ্ন তো আমার একার নয় জড়িয়ে আছে একজন   হতদরিদ্র পিতার সীমাহীন স্বপ্ন ।

          তাই স্যার আপনার নীকট একান্ত অনুরোধ আপনি এক জন পিতার তিলেতিলে বেড়ে ওঠা স্বপ্নকে অপঘাতে মরতে দিবেন না  বাঁচিয়ে রাখুন ।


                                              ইতি

                      আপনার  ক্লাসের শেষ ব্ঞ্চেএর ছাত্র

                                    সনাতন -কৈবর্ত 

                                        শ্রেণি - দশম 

                                        রোল - ( ৬৪) 

                                        বিভাগ - (খ


রাকেশ ঘোষাল

Comments