হাউস_হ্যাজব্যাণ্ড


কথাটা শুনে মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম কিছুক্ষণ।কারণ এমন কথা আগে কখনো কারও মুখেই শুনিনি।তারপর মুখে একটু হাসি রেখে বলেছিলাম,"ও আচ্ছা।" সমাজের স্রোতে ভাসতে ভাসতে সচরাচর যা দেখে আমরা অভ্যস্ত হই, ভেবে নিই এটাই বোধহয় নিয়ম।এ নিয়মের ব্যতিক্রম হলেই মন মানতে চায় না।তখন সেটা ভুল বা অনাচার বলেই গণ্য হয়।•


আমারই বন্ধু মনোময় মজুমদার।আজ থেকে বছর তিনেক আগে পরিচয় শ্রীরামপুর স্টেশনে।শ্রীরামপুর থেকে একই ট্রেনে উঠতাম।দুজনেরই গন্তব্য চন্দননগর।আমার অফিস চন্দননগর আর উনি চন্দননগর যেতেন ওনার ছেলেকে নিয়ে স্কুলে।সেদিন ট্রেন লেট থাকার জন্য ওনাকে একটু উদ্বিগ্নই দেখাচ্ছিল।নিজে থেকেই আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন... 


"ট্রেনের কি গণ্ডোগোল আছে আজ?".


"না সেরকম তো কিছু শুনিনি।" 


"আজ ছেলের পরীক্ষা আছে। টাইমে পৌঁছতে না পারলে কি যে হবে সেটাই ভাবছি।" 


"চিন্তা করবেন না। টাইমেই পৌঁছে যাবেন। আসলে ছেলের এক্সাম বলেই এই টেনশনটা হচ্ছে।ট্রেন লেট তো নিত্য দিনের ব্যাপার।এ আর নতুন কি?"

 

"তা যা বলেছেন। প্রতিদিন আপনাকে এই ট্রেনেই যেতে দেখি। তা আপনার কি শ্রীরামপুরেই বাড়ি?"


"আমার বাড়ি শ্রীরামপুরেই।আপনাকেও তো প্রতিদিনই দেখি।ছেলেকে নিয়ে স্কুলে যান।"


"হ্যাঁ ছেলেকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া আসা আমাকেই করতে হয়।আপনি তো সার্ভিস ম্যান?


"আমি গভমেন্ট সেক্টরে আছি।" 


নানা কথোপকথনে মনোময়ের সাথে পরিচয়ের সূচনাটা সেদিনই।এই ভাবেই আস্তে আস্তে পরিচয় থেকে একপ্রকার বন্ধুত্বই তৈরি হয়ে গেল আমাদের।


মনোময় আর আমি সমবয়সীই হব।আপনি সম্বোধন থেকে "তুমি" হয়ে গেলাম।সব থেকে বড়ো কথা মনোময় ভীষণ মিশুকে মানুষ।খুব তাড়াতাড়ি মানুষকে আপন করে নিতে পারে।মুখে হাসিটুকু সর্বদাই লেগে আছে।পরিচয় হবার বেশ কয়েকদিন  পর মোটামুটি মাস খানেক কেটে গেছে।মনোময়ের সাথে দেখা বলতে ওই সকালে অফিস যাবার পথে।ট্রেনের একটা বিশেষ কামরা যেন আমাদের জন্য নির্দিষ্ট।আমরা এক সঙ্গে  বেশ কয়েকজন থাকতাম।ইতিমধ্যে মনোময়ের সাথে মোটামুটি সবারই পরিচয় হয়ে গেছে।তবে আমার সঙ্গে বন্ধুত্বটা একটু বেশি অন্যদের তুলনায়।তো সেদিন ট্রেনে যেতে যেতে মনোময়কে জিজ্ঞাসা করে বসলাম...


"মনোময় তুমি কি করো সেটাই তো জানা হয়নি।" 


"আমি হাউস হ্যাজব্যাণ্ড।" মুখে হাসি রেখেই দ্বিধাহীন ভাবেই মনোময় বলে ওঠে।তারপর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে মনোময় বলতে শুরু করে...


"অবাক হলে তাই না?এরকম উত্তর আসবে এটা ভাব নি নিশ্চয়ই?".


"আসলে তা না... এরকম উত্তর আগে কারো কাছ থেকে পাইনি।"


যাইহোক,সেদিন মনোময়ের এই সাহসী প্রত্যুত্তর আমাকে একটু অবাক করেছিল বটে।"হাউস ওয়াইফ" শব্দটার সঙ্গে আমরা বোধহয় সকলেই পরিচিত।কিন্তু "হাউস হ্যাজব্যাণ্ড" কখনো কাউকে বলতে শুনিনি। নিজ মুখে এই অকপট স্বীকারোক্তি  মানুষটার প্রতি অন্যরকম ভালো লাগা তৈরি হয়ে যায়।এরপর থেকে মনোময়ের সাথে বন্ধুত্বটা বেশ জমে ওঠে।যাতায়াতের পথে হাসি ইয়ার্কি ঠাট্টা বেশ চলতে থাকে।বন্ধুদের সঙ্গে যেমন কথা বার্তা হয় আর কি।¤


মনোময়ের বাড়ি শ্রীরামপুর মাহেশে।মাহেশের রথ মানে বিখ্যাত রথ।রথের দু তিন দিন আগে মনোময়কে বললাম...


"তোমার তো বাড়ির পাশেই রথ।রথ উপলক্ষে কিছু খাওয়া দাওয়া হলে তো মন্দ হয় না।তা কি খাওয়াবে বলো?.


"নিশ্চয়ই।রথের দিন তাহলে বাড়িতে এসো।"


"বাড়িতে গেলে কি স্পেশাল মেনু?" 


"আরে এসে তো দেখো।তারপর না হয় দেখা যাবে।" 


"আচ্ছা মনোময়, বৌদিও কি জব করেন?" 


"আরে সব কথা কি এখনই জেনে নেবে?বাড়িতে এসো।তখন না হয় সবটুকু জানবে।"


"বেশ ঠিক আছে, তোমার বাড়ি যাব" বলে মনোময়কে জানালাম।একজন হাউস হ্যাজব্যাণ্ড সংসার কীভাবে সামলাচ্ছে তা দেখার ইচ্ছা প্রবল হয়ে উঠল।আমি তো এক কাপ চা করে খেতে গেলেই হিমসিম খাই।আর মনোময়...


যথারীতি রথের দিন মনোময়ের বাড়িতে হাজির।বাড়িতে গিয়ে দেখলাম বেশ সুন্দর সাজানো গোছানো বাড়ি।তবে বাড়িখানা দারুণ বানিয়েছে।আমাকে দেখে মনোময় তো আপ্লুত। বাড়িতে তখন মনোময় আর মনোময়ের ছেলে।বসার সঙ্গে সঙ্গেই সরবৎ,চা,মিষ্টি একেবারে অতিথি আপ্যায়ন।


"বৌদিকে দেখছি না?" চা খেতে খেতে মনোময়কে জিজ্ঞাসা করলাম।


"এখনো ফেরেনি। তবে আজ অবশ্য একটু তাড়াতাড়ি ফেরার কথা বলেছি।তোমার আসার কথা আছে ও জানে।"


"বৌদি তাহলে জব করেন তো?"


"হ্যাঁ জব করে বলেই তো আমাকে সামলাতে হয়।আর বুঝতেই তো পারো ব্যাঙ্কের জব মানে কতোটা  প্রেসার থাকে।"


"বড়ো ব্রাঞ্চ হলে তো দেখতেই নেই।"


"সত্যিই তাই।দেবাশিস,তোমার জন্য কিন্তু আমি নিজে বিরিয়ানি বানিয়েছি।খেয়ে বলো, আমার তৈরি বিরিয়ানি কেমন হয়েছে।"

 

মনোময় আমার সাথে কথা বলে যাচ্ছে, আর ওদিকে ডাইনিং এ খাবার সাজিয়ে যাচ্ছে।আমি তো অবাক।ছেলেরাও যে সমান তালে ঘরটাও সামলাতে পারে সেটা মনোময়কে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। 


মনোময়ের বানানো বিরিয়ানি খাচ্ছি। সত্যিই খুব ভালো বানিয়েছে।বিরিয়ানি খেতে খেতে মনোময় কে বললাম...


"তুমি এতো কিছু পারো কি করে? তোমার হাউস হ্যাজব্যাণ্ড হয়ে ওঠার পিছনে গল্পটা জানতে ইচ্ছে করছে।"


"দেবাশিস, আর একটু বিরিয়ানি দিই?"


"আমাকে খাইয়ে মারবে নাকি?"


"না, না তা কেন। যাইহোক, তো কি যেন বলছিলে গল্পটা জানতে ইচ্ছে করছে তাই তো?আসলে কি জান তো দেবাশিস, আমি আর চন্দনা বিয়েটা করেছি নিজের পছন্দে। স্কুলে পড়তে পড়তে প্রেম। প্রথম প্রথম আমরা ভালো বন্ধু ছিলাম। কিন্তু কখন যে নিজেদের মধ্যে ভালোলাগা তৈরি হয়ে যায় বুঝতেই পারিনি।তবে আমরা কেউ কাউকেই প্রেমের প্রস্তাব দিইনি। ভালো লাগা থেকে ভালোবাসা তৈরি হয়ে গিয়েছিল।যখন কলেজ এ গেলাম তখন বুঝলাম আমরা একে অপরকে ভালবাসি।একদিন চন্দনা বলল, "তোমার কথা বাড়িতে জানিয়েছি।আর আমি তোমাকে বিয়েও করতে চাই।" ওর বাবা বলেছিল,"নিজে প্রতিষ্ঠিত  হয়ে তবেই বিয়ে করো।" কলেজ, ইউনিভার্সিটি কমপ্লিট করলাম দুজনেই। ঠিক করলাম দুজনের একজন চাকরি পেলেই বিয়ে করব।ইতিমধ্যে, চন্দনা জবটা পেয়ে গেল আগেই।তারপর ও নিজেই  বলল,"বিয়েটা এবার সেরে নিই।"


প্রথম প্রথম আমার একটু কি রকম লাগছিল। তারপর চন্দনা নিজেই জানালো...


"দুজনের একজন তো চাকরি করছি।জীবনে ভালো থাকার জন্য দুজনকেই চাকরি করতে হবে এমন টা তো কোথাও লেখা নেই ।স্বামী যখন চাকরি করে, তার স্ত্রী সংসার সামলেও স্বামীর উপার্জিত অর্থে যদি তার অধিকার থাকে, তাহলে স্ত্রীর উপার্জনেও স্বামীরও সমান অধিকার। একজন পুরুষ যদি চাকরি করেও একজন চাকরি না করা মেয়েকে বিয়ে করতে পারে, একজন মেয়ে কেন সেটা পারে না?আর আমরা তো দেখেশুনে এরেঞ্জড ম্যারেজ করছি না।আমরা যে একে অপরকে ভালোবাসি। ভালোবাসা কখনো চাকরির মানদণ্ডে বিচার চলে না।তাছাড়া যখন আমরা ভালোবেসে ছিলাম তখন তো এমন শর্ত ছিল না।ইগোকে দূরে সরিয়ে সম্পর্ক টাকে মূল্য দিতে হবে মনোময়।আমরা মেয়েরাও যে পারি নিজেদের উপার্জিত অর্থে সংসার চালাতে,সংসারের মানুষজনকে ভালো রাখতে।তুমি না হয় সংসারটা সামলিও আর আমি বাইরেটা।তবেই যে ভালোবাসাটা চিরকাল বাঁচবে।শুধুমাত্র তুমি চাকরি পেলে না বলেই আমরা ছন্নছাড়া হতে পারব না।


তারপর আমরা বিয়েটা করি। চন্দনার মতো মেয়ে যখন আমার পাশে থেকে এতো উদার মনের পরিচয় দিতে পারে, আমি কেন গর্ব করে বলতে পারব না "আমি হাউস হাজব্যাণ্ড।" রান্না করা থেকে ঘরের যাবতীয় কাজ কর্ম আমিই করি।না এতে আমার লজ্জা নেই, বরং হাসি মুখে চিৎকার করে বলতে পারি‌।তাতে কে কি ভাবল তাতে আমাদের কিছু  যায় আসে না।আমাদের ভালো থাকার দায়িত্ব কেউ তো নেবে না।আর খারাপ থাকলেও সে খোঁজ  নেওয়ারও কেউ নেই। তাই নিজেরাই নিজেদের দায়িত্ব নিতে হবে।আজ সাত বছর বিয়ে হয়ে গেল।আমাদের ছেলের বয়স পাঁচ বছর।কোনো ইগো নেই, সম্পর্কের মধ্যে ছোট বড়ো নেই। বেশ আছি, দিব্যি ভালো আছি। অনেকেই অনেক কথা বলে, মাঝে মধ্যে কানেও আসে।আমি তাতে কান দিই না।


মনোময়ের কথা গুলো বেশ মন দিয়ে শুনছিলাম।আর ভাব ছিলাম কথাগুলো যে বড়ো সত্যি বলছে মনোময়।মনোময়ের প্রতি ভালোবাসার পারদ টা আরো একটু ওপরে উঠে গেল।কথাগুলো শুনতে শুনতে বিরিয়ানির প্লেটটাও ফাঁকা করে ফেলেছি। ইতিমধ্যে দেওযালে টাঙানো একটা ছবির দিকে চোখ পড়ে। হাতে আঁকা ছবি যে এত  সুন্দর হতে পারে তা নিজে চোখে  না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। জিজ্ঞাসা করলাম...


"মনোময় এই ছবিটা কার?" 


"চন্দনার।আমার হাতের আঁকা ছবি।"


"তুমি এতো সুন্দর ছবি আঁকো কই আগে বলনি তো?" 


"আসলে সেই রকম বলার সুযোগ হয়নি বলেই বলা হয়ে ওঠেনি।আমার নিজের একটা ড্রয়িং স্কুলও আছে। সপ্তাহে একদিন ড্রয়িং শেখাই।" 


মুগ্ধ না হয়ে পারলাম না মনোময়ের প্রতিভায়। কলিংবেলের আওয়াজ হতেই মনোময় বলে ওঠে.. "চন্দনা এল বুঝি।" মনোময় পরিচয় করিয়ে দেয় চন্দনা বৌদির সাথে।অনর্গল কথা বলতে পারেন উনি।


"আপনার কথা প্রায়ই শুনি।আপনি এসেছেন দেখে ভালো লাগলো।যাইহোক, ছুটির দিনে আর একদিন আসুন।অনেক গল্প করা যাবে।" 


মনোময় তিনকাপ চা নিয়ে চলে আসে।চায়ের কাপটা ওয়াইফের হাতে ধরিয়ে দেয়।আর একটা কাপ আমার হাতে।


"তোমরা বেশ আনন্দে আছো, সুখে আছো।বৌদি আপনার কর্তা মানুষটিও বেশ ভালো।" 


"তা বলতে পারেন।আমরা আনন্দেই থাকি। কোনো ইগো আমাদের মধ্যে কাজ করে না।পরস্পর পরস্পরের প্রতি রয়েছে আমাদের ভালোবাসা।"


সত্যিই তাই।সম্পর্কের মধ্যে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা না থাকে সে সম্পর্ক কখনো চিরস্থায়ী হয় না।একটা ভালো চাকরি করেও একটা মানুষ যে কত সাধারণ  হতে পারে তা চন্দনা বৌদিকে না দেখলে বোঝা যায় না। বর্তমান দিনে তো চন্দনা বৌদির মতো মেয়েও খুব কম আছে।আজকাল প্রায়ই তো দেখি, দীর্ঘদিন প্রেম করেও ছেলেটি শুধুমাত্র ভালো চাকরি পায়নি বলেই বিয়ে করতে রাজী হয়নি মেয়েটি। অনেক প্রেমের বিনাশ ঘটেছে ছেলেটির চাকরি না পাওয়ার জন্যই।প্রেম করার সময় কোনো শর্ত আরোপ হয় না, বিয়ে করতে গেলেই ছেলেটিকে ভালো চাকরি করতে হবে। নইলে বাবা মায়ের পছন্দ করা ছেলেকে বিয়ে করবে। আর সেটাই কেন হয় তা বুঝি না।মেয়েরাও তো পারে কোনো ভালো জব পেয়ে ভালোবাসার সম্পর্কগুলোকে পরিণতি দিতে।মেয়েদের জায়গাটা শুধুমাত্র সংসার ক্ষেত্রে আবদ্ধ নয় এটা যতদিন না মেয়েরা বুঝতে পারছে ততদিন এই পরনির্ভর হয়ে থাকার মতো একটা ব্যাধি মনের মধ্যে লালন করে যাবে।বিয়ে মানেই যে ছেলেটির দায়িত্ব, এই বোধ থেকে প্রত্যেকটা মেয়েকেই সরে আসতে হবে।দায়িত্ব দুজনেরই।একে অপরের।তবেই না ভালো থাকা যায়। চা এ চুমুক দিতে দিতে কথা গুলো ভাবছি। ঘড়ির কাঁটা যে থেমে নেই হঠাৎ দেওয়াল ঘড়িটার দিকে চোখ পড়ে...


"মনোময় এবার উঠতে হবে।অনেকটা টাইম তোমাদের সঙ্গে কাটালাম।" বলে উঠে আসব, তৎক্ষণাৎ মনোময় একটা বই নিয়ে এসে আমার হাতে ধরিয়ে দেয়। বলে "আমার তরফ থেকে তোমাকে দেওয়া একখানা উপহার।"


এতো সুন্দর একটা উপহারে মনটা ভরে ওঠে। ভাবিনি মনোময় কে নতুন রূপে চিনব।বইটির নাম  "হাউস হ্যাজব্যাণ্ড"।লেখক মনোময় মজুমদার। সকাল দশটা পাঁচটা ডিউটির চাকরিটাই যে বড়ো কথা নয়,সেটা আরো একবার প্রমাণ হয়ে যায় মনোময়কে দেখে। মনে মনে অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করতে করতে বাড়ি ফিরি। প্রার্থনা করি,ভালো থাকুক মনোময়।



রাকেশ ঘোষাল

Comments

Popular posts from this blog

গ্রীষ্মের_ছুটিতে ছাত্রের লেখা খোলা চিঠি