ভাইফোঁটা

 


মর্নিংওয়াক করে ফিরছি। আজ যেতেও একটু দেরিই হয়েছিল। ফেরার পথে দেখলাম, আমার পরিচিত এক জেঠু বেশ সেজেগুজে পাঞ্জাবি পরে, হাতে মিষ্টির প্যাকেট আর একটা শাড়ির দোকানের ব্যাগ নিয়ে হনহন করে হাঁটছেন। জেঠু ব্যাংকে চাকরি করতেন, এখন অবসর নিয়েছেন। আমি বললাম, কি জেঠু এত সকালে সেজেগুজে কোথায় চললেন?

জেঠু একমুখ হেসে বললেন, ওই যে ভাইফোঁটা নিতে যাচ্ছি। আমি বললাম, বোনের বাড়ি? কাছেই বুঝি?

জেঠু একটু উদাস হয়ে বললেন, বোন নয় দিদি ছিলেন, প্রতিবার যেতাম ফোঁটা নিতে। বছর চারেক আগে মারা গেছেন। 

আজ যাচ্ছি আমার পুচকে বোনের কাছে। সে আমায় দাদাভাই বলে ডাকে। 

আমি বললাম, নাতনি নাকি? 

জেঠু বললেন, না না, নাতনি কোথায়? আমার একটাই নাতি সে কলেজে পড়ে। 

আর বলো না, বছর দুয়েক আগে স্ত্রী বিয়োগের পর মনমরা হয়ে কালীমন্দিরে এসে বসে থাকতাম। মেয়ে-জামাই কলকাতায় থাকে। ওদের ফ্ল্যাটে নিয়ে যেতে চেয়েছিল বুঝলে মা। কিন্তু নিজের হাতে গড়া  বাড়িটা ছেড়ে যেতে মন চায়নি। তাই যতদিন পারি থাকি। 

যখন মনমরা হয়ে কালীমন্দিরের দাওয়ায় বসে থাকতাম তখন এক বছর ছয়েকের মেয়ে এসে আমায় রোজ দাদাভাই দাদাভাই করে জ্বালিয়ে খেত। তার মা ওই সামনের মাঠে বসে পাড়ার বান্ধবীদের সঙ্গে গল্প করতো। আর সে এসে আমাকে ধরতো। বকবক করে কানের মাথা খেতো। কালীঠাকুর জিভ বের করে আছে কেন? হাতে খাড়া কেন? দুষ্টুমি করলে কি কালীঠাকুর তাকে মারে? 

ও তো একেবারে বকবক করে না, তাহলে কি ওর জিভ কেটে নেবে? এমন হাজারও প্রশ্ন করে করে আমায় মনখারাপ করার সুযোগই দিতো না। 

তারপর থেকে আমি ঈশ্বরের সাহচর্য পাবো বলে নয়, ওই বিচ্চুটার সঙ্গে গল্প করবো বলে নিয়ম করে বিকেল পাঁচটার সময় এসে মন্দিরে বসতাম। আস্তে আস্তে কবে যেন আমি ওর দাদাভাই হয়ে গেলাম। 

গতবছর সে মেয়ে সকলের ভাইফোঁটা দেওয়া দেখে কেঁদে সারা। তার মা যত বোঝায় তোর দাদা, ভাই কেউ নেই, তুই কাকে ফোঁটা দিবি? ততো সে জেদ ধরে কাঁদে ওর দাদা আর ভাই একসঙ্গে আছে। আমি সবে জলখাবার খেতে যাব এমন সময় বেল বাজলো আমার বাড়িতে। দরজা খুলে দেখি আমার পাকারানীর বাবা কাঁচুমাচু মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। হাত জোড় করে বললো, জেঠু কিছু মনে করবেন না, আমার মেয়ে খুব বায়না করছে, আপনি নাকি ওর দাদাভাই, তাই ও আপনাকে ফোঁটা দিতে চায়। ওর মামাকে মা ফোঁটা দিয়েছে, আমাকে আমার বোন দিয়েছে দেখেই কান্না জুড়েছে। আপনাকে বিরক্ত করছি, কিছু মনে করবেন না। 

আমি তো অবাক। একি সৌভাগ্য আমার! গতবছর তাকে একটা পুতুল দিয়েছিলাম। সে রেগে বলেছে, আমি কি ছোট যে তুমি পুতুল দিলে? পরেরবার শাড়ি দেবে, মাকেও মামা শাড়ি দেয়। দোকানে দোকানে খুঁজে ছোট শাড়ি জোগাড় করেছি। 

তার মামা যেহেতু পাঞ্জাবি পরে ফোঁটা নেয়, তাই আমার ওপরেও কড়া নির্দেশ, পাঞ্জাবি না পরে গেলে সে ফোঁটা দেবে না। 

সে তো পাকাদের রানী, মায়ের মতোই হয়তো উপোশ করে থাকবে। বেশি বেলা অবধি না খেয়ে থাকলে তার যদি পেটে ব্যথা করে, তাই সকাল সকাল স্নান করে সেজেগুজে ছুটছি। আর বলো না, অন্যদিন সে চকলেট খেলেও আজ সে বিশাল বড় বুড়ি। চকলেট নিয়ে গেলে হয়তো প্রেস্টিজ যাবে, তাই মিষ্টির প্যাকেট নিয়েছি। 

জেঠুর মুখে প্রাপ্তির হাসি। মনটা ভালো হয়ে গেল সকাল সকাল। হারিয়ে ফেলার পরেও ফিরে পাওয়া আছে বলেই গল্পগুলো এমন রঙিন হয়। জীবন প্রতিমুহূর্তে কেড়ে নিচ্ছে আবার ফিরিয়েও দিচ্ছে। সম্পর্কগুলো হয়তো রয়ে গেছে  দিনের আলোর গভীরে। শুধু খুঁজে নেওয়ার অপেক্ষা।


রাকেশ ঘোষাল

Comments

Popular posts from this blog

গ্রীষ্মের_ছুটিতে ছাত্রের লেখা খোলা চিঠি