ত্যাগ
বড্ড ব্যস্ত আজ সুজাতা। দিদির বিয়ের সব আয়োজন তাকেই তদারকি করতে হচ্ছে কিনা! দুই বোনের মধ্যে, ছোট থেকেই সংসারের সব ব্যাপারে দিদির চেয়ে অনেক বেশি দায়িত্বশীলা সে। এবারেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।এতদিন ধরে বিয়ের সব বাজারহাট, কেনাকাটা বাবার সাথে, তাকেই করতে হয়েছে। আজ বরকে বরণ করার দায়িতও্ব ছিলো তার। বরযাত্রী ও অতিথি অভ্যাগতদের আপ্যায়ন সবকিছুই সামলাতে হচ্ছে একা হাতে ।
গাঢ় নীলরঙের বেনারসী ও মুক্তালঙ্কারে সেজেছে সে। মাথায় গুঁজেছে বেলফুলের মালা। একেই সুন্দরী। তার উপর আজ যেন আরো মোহময়ী দেখাচ্ছে তাকে! কিছুতেই যেন চোখ ফেরানো যাচ্ছে না তার থেকে!
আসলে এমন মনোহারী সেজেছে সে ঠিক দিদির বিয়ের জন্য যতটা না, ততটা --সেই মানুষটার জন্য। সে যে প্রথম আসবে আজ তাদের বাড়িতে। খুব লাজুক স্বভাবের কিনা! কিছুতেই রাজি হচ্ছিলো না। অনেক পটিয়ে পাটিয়ে শেষ অবধি রাজি করাতে পেরেছে তাকে। তারই জন্য মনের মাধুরী মিশিয়ে এত যত্ন করে সেজেছে আজ সুজাতা , তারই দেয়া মুক্তাহারটি গলায় দিয়ে। যেটি সে তাকে জন্মদিনে প্রেজেন্ট করেছে এবার, চাকরির প্রথম মাইনা পেয়ে। ঠিক করেছে সুজাতা দিদির বিদায়পর্ব সমাধা হয়ে গেলেই বাবা মায়ের সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দিয়ে , এবারে তুলবে সে কথাটা। অরূপের সঙ্গে তার সম্পর্কের কথা। আজ দুবছর হতে চললো তাদের পরিচিতি। অরূপের চাকরিটা পাওয়ার পর থেকেই তার বাবা মা খুব তাগাদা দিচ্ছেন তাকে বৌ ক'রে ঘরে নিয়ে আসার জন্য। শুধু দিদির বিয়েটার জন্যই অপেক্ষা করছিলো এতদিন ।
বিয়ের লগ্ন হয়ে এলো। পুরুতমশাই তাড়া দিচ্ছেন। দিদিকে নিশ্চয় এতক্ষণে সাজানো হয়ে গেছে। তবু একবার সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা দেখে নিতে হবে শেষবারের মত। হন্তদন্ত হয়ে দিদির ঘরের দিকে পা বাড়ালো সুজাতা। হঠাৎ বাবা-মায়ের ঘর থেকে ভীষণ তর্কাতর্কির আওয়াজ ভেসে এলো কানে। উঁকি মেরে দেখে -- মা নিজের মনে গজগজ করছেন আর বাবা মাথায় হাত দিয়ে ঘাড় নীচু করে স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন।
"কী হয়েছে বাবা? " সুজাতা কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করতেই হাপুস নয়নে কাঁদতে কাঁদতে বাবা বলে উঠলেন - "তোর মাকে জিজ্ঞাসা কর! "
মা'র দিকে সুজাতা জিজ্ঞাসু চোখে তাকাতেই তিনি তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে বললেন,
" দ্যাখ না! তোর বাবাকে পইপই ক'রে বললাম, বিয়েটা ফাইনাল করার আগে মেয়েটার মতটা জেনে নাও। আজকালকার মেয়ে! মনে তার কী আছে কিছুই বলা যায় না! বিয়ে ঠিক হওয়া অবধি মেয়েটা কেমন যেন গুম্ মেরে আছে!বরাবরই চাপা স্বভাবের মেয়ে । ঠিক ক'রে কথাও বলে না কারোর সঙ্গে! আমার কেমন যেন সুবিধার ঠেকছে না!
তা-কিছুতেই শুনলো না! বললো, আমি এক কথার মানুষ। যেই কথা, সেই কাজ।আমি যা বলবো, সেটাই হবে!
নাও! এখন ঠেলা সামলাও! শ্রীজাতাকে অনেক্ষন থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। সারা বাড়ি তন্নতন্ন ক'রে খোঁজা হয়েছে। কোথ্থাও নেই! মেয়েটা শেষ পর্যন্ত যে এমন সর্বনাশা কান্ড করবে কে জানে? পাপিষ্ঠা! এই ছিলো তোর মনে? পরিবারের মান মর্যাদার কথা একবারও ভাবলি না! এদিকে বর কতক্ষন হলো--- এসে বসে আছে! লগ্ন বয়ে যাচ্ছে! কি হবে এখন?"
মা'র কথাটা শেষ হতেই বাবা হঠাৎ উঠে এসে সুজাতার হাতদুটো ধরে কাঁদতে কাঁদতে মিনতি ক'রে বলে উঠলেন, " মা! এই দুঃসময়ে একমাত্র তুইই পারিস আমাদের মান বাঁচাতে! তুইই পারিস মা!"
সুজাতা যারপরনাই বিস্মিত হয়ে বললো," মানে? "
বাবা তখন কাঁদতে কাঁদতে বললেন, "মা! তোকেই বসতে হবে বিয়ের পিঁড়িতে! দোহাই মা আমার ! অমত করিস না! বাঁচা আমাদের এ যাত্রা! নইলে আমার মানসম্মান সব চলে যাবে! ধুলোয় মিশে যাবো আমি!"
সুজাতার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়লো! কি হবে তবে তার ভালোবাসার? কি হবে অরূপের?এতদিন ধরে এতো আশা! এতো স্বপ্ন! কি হবে তার! এক- লহমায় একটা দুর্ঘটনায় সব শেষ হয়ে যাবে? সে শুনলে নির্ঘাৎ আত্মঘাতী হবে! বড্ড নরম মনের মানুষ ও! সুজাতা আর ভাবতে পারছে না! মাথাটা কেমন যেন অসার হয়ে আসছে! চোখে ঘনিয়ে আসছে অন্ধকার!
এর পর ঘন্টা তিনেক গড়িয়ে গেছে।
নিমন্ত্রিত অরূপ বিয়েবাড়িতে এসে অবধি এ বাড়ির কাউকেও দেখতে না পেয়ে বেশ বিব্রত বোধ করছিলো। অবশেষে একজনের পীড়া পীড়িতে প্যান্ডেলে খেতে বসে উসখুস করছে। ।এদিকে পাতের উপর একটার পর একটা আইটেম পড়ে চলেছে। কতক্ষণ আর না খেয়ে থাকবে সে? কোনক্রমে দমবন্ধ ক'রে খাওয়াদাওয়া সেরে ছাদনাতলার দিকে ভিড় ঠেলে এগিয়ে গেলো অরূপ । কন্যাসম্প্রদান হচ্ছে সেখানে। নাঃ! ভিড়ের মধ্যে সেখানেও তো দেখা যাচ্ছে না তাকে! দেখা যাক ফোনটা লাগিয়ে! মোবাইলটা সুইচ-অন করতেই পরপর কয়েকটা মেসেজ আছড়ে পড়লো তাতে।আর স্ক্রীনটা তুলতেই তাতে ভেসে উঠলো সুজাতার মুখখানা। চটপট খুলে দেখলো, তাতে লেখা আছে বেশ কয়েকটা লাইন
--ক্ষমা কোরো আমায়! আমি নিরুপায়!
--বাবার মানসম্মান রক্ষা করতে আমার এ ছাড়া আর কোন উপায় ছিলো না!
---দিদি না ব'লে কোথায় চলে গেছে! তাই তীব্র মনোকষ্ট ও অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাধ্য হয়েই আমায় বসতে হলো বিয়ের পিঁড়িতে!
----তোমার অনুমতি নেওয়ার কোনো সুযোগ , উপায় বা সাহস কোনটাই ছিলো না আমার !
----পারলে ক্ষমা কোরো আমায়! ক্ষমা কোরো!!
----ভালো থেকো!
----বিদায়!
শেষের কথাটায় বুকটা ছ্যাঁৎ ক'রে উঠে, অরূপ কেমন যেন হতভম্ব হয়ে গেলো ! কিছুই তার মাথায় ঢুকতে চাইছে না! কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো খানিকক্ষণ।সুজাতার কথাগুলো প্রতিধ্বনিত হয়ে তার কানে বেজে চলেছে এক- নাগাড়ে ! এবারে ভালো ক'রে চোখ তুলে মঞ্চের দিকে তাকাতেই দেখতে পেলো,মাথা নীচু ক'রে বলির পাঁঠার মত বসে আছে সুজাতা সেখানে, কনের সাজে। আর পিতার হাত দিয়ে বরসাজে বসে থাকা পাত্রের হাতে তার সম্প্রদান হচ্ছে!
সে দৃশ্যে অরূপ যেন মুষড়ে পড়লো একেবারে! অব্যক্ত ও অসহ্য এক যন্ত্রণায় মুচড়ে উঠলো তার বুকের ভিতরটা! ঝাপসা হয়ে এলো দুচোখ! একটানা সানাইয়ের করুণ সুর যেন আর্তস্বরে কেঁদে কেঁদে উঠছে --তার ব্যথায় সমব্যথী হয়ে!
ধীর পায়ে মাথা নীচু করে সেখান থেকে ফিরে যেতে যেতে ভাবলো অরূপ---দুর্বিষহ হলেও বৃহত্তর প্রেক্ষিতে জীবনে কখনো কখনো বিসর্জন দিতে হয় ---নিজস্ব এই স্বার্থ!
মেনে নিতে হয় , মহৎ এই ত্যাগ!
রাকেশ ঘোষাল
Comments
Post a Comment