ফিরোজা
আজ দ্বাদশ শ্রেণির ব্যাচটার শেষ পড়ানোর দিন। পড়াচ্ছিলাম অন্য দিনের মতই। সময় যত ফুরিয়ে আসছে বারবার মনে হচ্ছে এদের সাথে হাসি ভাগ করার আজই শেষ দিন। কাল থেকে এই সময়ে ওরা আর আমায় জ্বালাতে আসবে না, প্রশ্নের পর প্রশ্ন ছুঁড়ে আর আমায় ঘায়েল করার চেষ্টা করবে না। সেই ক্লাস ফাইভ থেকে এদের সাথে সম্পর্ক। দেখতে দেখতে চোখের ওপর দিয়ে কখন যে আটটা বছর কেটে গেল বুঝতেই পারিনি। সেদিনের সেই ছোটো ছোটো কুঁড়ি গুলো আজ ফুটন্ত গোলাপ হয়ে ফুটে উঠেছে, আমার পড়াশোনা মাখা জীবন, কালি লাগা হাত ছাড়া ওদের ভিজে চুলের গন্ধ আমার একাকিত্বের বাগানে পাইন্যাপল ধুপ জ্বালিয়ে দিয়েছে। ওদের সাথে আমি আমার সবটুকু শেয়ার করে নিয়েছি। শিক্ষক -ছাত্র ছাত্রীর সম্পর্কের চেয়ে বন্ধু হয়ে উঠতে চেষ্টা করেছি। আর কয়েক মিনিট পরেই মহাজাগতিক কোনো এক অদৃশ্য তরঙ্গ শক্তির জোয়ারে আমরা সবাই একে অন্যের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাব। স্কুলের বন্ধু কলেজে থাকেনা, স্কুলের মাস্টারও কলেজে না...।
ব্যক্তিগত আবেগকে কোনোদিনই আমি গুরুত্ব দিইনা, যাতে ওরা এটা নিয়ে বেশি আলোচনা না করে আমি ডুবে গেলাম একবার রবীন্দ্রনাথ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তো একবার পুলওয়ামা বিস্ফোরণ কান্ডের ঘটনা নিয়ে... ছেলেদের কাছ থেকে দু একটা প্রশ্ন উড়ে এল,স্বাভাবিক অভ্যাসেই জবাব দিলাম।
শেষ দিনেও ইচ্ছে হল একটু মজা করার... জিজ্ঞাসা করলাম "বল তো, রবীন্দ্রনাথ কেনো শেষ জীবনে পিছন তুলে সামনে ঝুঁকে লিখতেন?" কেউ কেউ হেসে ফেলল, কেউ বললে "স্যার ওনার বোধহয় কোমরে ব্যাথা করত"। আমি হেসে বল্লাম না রে পাগল... এর উত্তর রবিঠাকুর স্বয়ং দিয়ে গেছেন " কলসির জল ফুরিয়ে এলে কলসিকে যেমন জলপাত্রের সামনে নুইয়ে দি যাতে শেষটুকু জলও আসে, কবিও তেমন ভাবে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এভাবেই লেখাকে নুইয়ে বার করছেন নিজের ভেতর থেকে।.."
অরিত্র বললে "অসাধারণ উত্তর দিলেন স্যার, সত্যি আপনি কতকিছু জানেন। স্যার আমরা কি আর আপনার মত স্যার পাবো?" আমি হেসে বল্লাম "ধুর বোকা, কেনো পাবিনা। নিশ্চয় পাবি। দেখবি তাদের পড়ানো শুনতে শুনতে আমার কথা ভুলে যাবি..."
আমি জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি। একটা বক জাতীয় পাখি একা একা উড়ে যাচ্ছে, ওভাবেই একা উড়তে হয় সবাইকে। কেউ কাউকে মনে রাখে না।
ছুটির সময় ওদের প্রত্যেককে মিষ্টি মুখ করিয়ে একটা পেন আর একটা বই হাতে দিলাম। ওরা চৌকাঠ পেরিয়ে যাওয়ার আগে বল্লাম "তোদের আমি খুব ভালোবাসি, স্নেহ করি, তোরা আমার ছাত্রছাত্রী হিসাবেও আমি গর্ব বোধ করি। তোদের মধ্যে আগামী দিনে কেউ যদি শিক্ষক হোস তাহলে এটুকু মনে রাখিস আর যাই করিস অন্তত সাজেশন দিস না, তোদের ছাত্রছাত্রীদের অন্তত জলের সমস্ত গভীরতায় সাঁতার কাটতে শেখাস। আর একটা কথা সর্বদা মনে রাখিস First boy বা first girl বছর বছর প্রথম স্থান পাওয়ানোর চেয়ে একজন শেষ বেঞ্চের ছাত্রকে প্রথম স্থানে নিয়ে আসাই শিক্ষক জীবনের কঠিনতম চ্যালেঞ্জ।
এর পরবর্তী জীবনে কেউ ভালো থাকবি, কেউ বিপথে চালিত হবি.. কেউ মোহে পড়বি,কেউ মোহ জয় করে বেড়িয়ে আসবি। আমি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করবো উনি যেন তোদের মুহুর্তের জন্যও মানুষের মত মানুষ হওয়ার শিক্ষাটা না ভোলান।.."
ওরা প্রণাম করে ধীরে ধীরে দরজা দিয়ে বেড়িয়ে গেল। কি চুপচাপ... কি শান্ত আজ ওরা... আকস্মিক বিচ্ছেদ ওদের নিয়মশৃঙ্খলা শিখিয়ে দিয়ে গেছে। চোখের জলটা আড়াল করার জন্য শূন্য ঘরেই আমি একটা বইয়ে মুখ গুঁজে দিলাম।
"স্যার আসবো?..."
চমকে মুখ তুলতেই দেখলাম চোখ দুটো শিশিরের মত করে ফিরোজা সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ব্যাচের এই মেয়েটা বরাবরই অন্যদের তুলনায় বেশি ছটফটে, বরাবরই দিদিগিরিতে ওস্তাদ... এতক্ষণ ওকে ঠিক খেয়াল করিনি, মনে হয়েছিল ও আজ পড়তেই আসেনি। সত্যিই তো, আজ সবচেয়ে চুপচাপ আর শান্ত হয়ে বসেছিল ফিরোজাই।
বললাম "বল কি বলবি..., শোন উত্তর গুলো খুব ভালো করে বুঝে মুখস্থ করবি, তোর বুদ্ধি আছে, কিন্তু মহা ফাঁকিবাজ তুই। ভালো করে মন দিয়ে পড়িস। ভালো পরীক্ষা দিস। রেজাল্ট দেখাতে আসিস.... "
যা কোনোদিন করেনি ফিরোজা সেটাই করলো, অকস্মাৎ আমাকে হতভম্ব করে দিয়ে আমার বুকে মাথা রেখে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল... স্পষ্ট -অস্পষ্ট কিছু শব্দ মিশিয়ে যা বলতে চাইলো তা হল ও আমায় খুব ভালোবাসে, ও জানে বিধর্মী বলে এই ভালোবাসা আমি গ্রহণ করবো না। ওর বাড়ি থেকে এইবছরই শেষ পড়াবে, তারপর বিয়ে দিয়ে দেবে।
নিজের থেকে ফিরোজাকে আলাদা করে বললাম "কি সব বলছিস তুই পাগলের মত?" বললাম বটে, কিন্তু আমার প্রতি ওর দুর্বলতা এর আগেও টের পেয়েছি।, পেন দিতে গিয়ে ইচ্ছা করেই আমার হাত ছুঁতো, শিক্ষক দিবস থেকে আমার জন্মদিন যে কোনো অনুষ্ঠানে সে নিজে হাতে আমার প্লেট সাজাতো। ডাকসাইটে সুন্দরী হিসাবে ব্যাচে রঙ্গ রসিকতা করার সময় দেখতাম আমার দিকে কপট কটাক্ষ হানতো...
সেই ফিরোজা যে একদিন নিজের মনের অবরুদ্ধ লাভাকে চাপা রাখতে পারবে না আমি জানতাম। কিন্তু এটা আমি কি করলাম, একজন বিধর্মীকে নিজের জীবনে আশ্রয় দিতে পারবো না জেনেও প্রতি নিয়ত ওর ছেলে মানুষীকে প্রশ্রয় দিয়েছি, ওর অনুভূতি গুলোকে একটু একটু করে জাগিয়ে তুলেছি। তবে কি আমিও...........।
"ফিরোজা, এখন বাড়ি যা। মন শান্ত কর। পৃথিবীতে সবাইকে ভালোবাসা যায় না রে। তুই তোর উপযুক্ত সঙ্গী নিশ্চয় পাবি। আর আমি না থাকলেও, জানবি আমার আশীর্বাদ, স্নেহ ভালোবাসা এগুলো তোর জন্য সবর্দাই থাকবে। আমার বন্ধুত্বের হাত বাড়ানোই আছে। দরকার পড়লে কখনো জানাস...এখন আয়।"
ফিরোজা মাথা নিচু করে ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেড়িয়ে গেল। কতদিন ওকে তাড়ানোর জন্য সেই সাইকেল স্ট্যান্ড পর্যন্ত আমাকে এগিয়ে দিয়ে আসতে হয়েছে, মাঝে মাঝে টেনেই নিয়ে গেছে,আজ তার মুখে একটা শব্দও ফুটলো না "স্যার চলুন.." আমার প্রত্যাখ্যান যে তার নরম বুক দুটোর ওপর রোলার চালিয়ে দিয়েছে সে ওর যাওয়া দেখেই বুঝেছি। সেই কবে কলেজ জীবনে প্রেমের কাছে আমি হেরে গিয়েছিলাম। আজ ফিরোজাকে হারিয়ে দিলাম। অথচ আমি জানি ফিরোজার চেয়ে এ দুনিয়ায় আমায় আর কেউ এত ভালো বাসতে পারে না। এক অনাথ, চালচুলোহীন, ভবঘুরের মত বই পাগল মাস্টার মশাইয়ের হাত ধরে যে পরম নিশ্চিন্তে, নির্ভানায় দিন কাটাতে পারে সেটা ফিরোজা'ই।
ফিরোজাকে যে কথা গুলো বল্লাম এখন এই ফাঁকা ঘরে সেই কথা গুলোই কত ফাঁপা মনে হচ্ছে। আমি মাস্টারমশাই। আমি উপদেশদি জাত পাতের সংকীর্ণ বেড়া ভেঙে মানুষ হয়ে ওঠার। আর আমিই কি না ফিরোজার গোলাপ কে রক্তাক্ত করলাম ও'র অপরাধ ও বিধর্মী বলে। হায় ঈশ্বর এর চেয়ে বিড়ম্বনা জীবনে আর কি আছে?
ফোঁটা ফোঁটা করে চোখের জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল.. দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে বললাম
"পারলে আমায় ক্ষমা করিস, আমার সমাজকে উপেক্ষা করে যাওয়ার ক্ষমতা আমার নেই, আমি এই উপেক্ষার কথা লিখতে পারি, বলতে পারি কিন্তু নিজের জীবনে গ্রহণ করার সাহস পাইনা। এ জন্মে তোর সাথে ঘর বাঁধা হল না। দেখিস আগামী একশো বছর পর আর জাত-পাত বলে কিছু থাকবে না, জাত পাত বর্ণ বিদ্বেষের প্রাচীর বিরাট ভূমিকম্পে আছড়ে পড়বে। সেই ভাঙা প্রাচীরের ওপর দিয়েই নূতন পথ তৈরি হবে। আর তখন দেখবি সেই পথে হাত ধরাধরি করে হেঁটে যাচ্ছে একটা শুভম একটা ফিরোজা... কেউ তাদের নিয়ে আলোচনা করবে না, কেউ তাদের খেয়ালই করবে না.."
মেঝের দিকে তাকিয়ে দেখলাম ফিরোজা তার সেই লাল মলাটের ডায়রিটা ফেলে গেছে। কত দিন কত কাড়াকাড়ির মাঝেও যেটা সে এক মুহুর্ত আমার হাতে তুলে দেয়নি সেটা আজ এভাবে মেঝেয় পড়ে আছে? নাকি ইচ্ছা করেই সে ফেলে রেখে গেছে? চশমাটা পরে ডায়রির প্রথম পাতাটা খুললাম....
বহুদিন আগের একটা লেখা। একেবারে ঝাপসা হয়ে যায়নি যদিও। পড়তে অসুবিধা হচ্ছে না...
"স্যার আপনি আজ বলেছেন পৃথিবীতে সবচেয়ে কষ্টের কি জানো? ছুঁড়ে দেওয়া প্রেম ফিরিয়ে নেওয়া.. স্যার আমার ভাগ্যে এমন কিছু লেখা নেই তো?
ডায়রিটা বন্ধ করে দিলাম৷ আমার ভিষণ চোখ জ্বালা করছে l
রাকেশ ঘোষাল
Comments
Post a Comment