হ্যাপি রোজ ডে
"পঞ্চাশ টা দিয়ে দিলাম গুনে গুনে, শেষ হলে আরো পঞ্চাশ নিয়ে যাবি, তারপর আরো , কি ভাবে বিক্রি করবি জানিনা , মোট কথা এই দুশো গোলাপ আজ তোকে শেষ করতেই হবে...তবেই আজ টাকা পাবি নয়তো সেই পয়লা তারিখ.." ফুলের দোকানের মালিক জানিয়ে দিল পল্টু কে। পল্টু সঙ্গে সঙ্গে গোছা টা নিয়ে এক দৌড়। ব্যারাকপুর স্টেশন লাগোয়া ফুলের দোকান সেখান থেকে ছুটে ছুটে সুকান্ত সদনের সামনে দিয়ে চিড়িয়ামোড়ের দিকে যাচ্ছে আবার উল্টো পথে ফিরে আসছে। আবার কখনও চিড়িয়ামোড় ছাড়িয়ে কলেজের দিক পর্যন্তও চলে যাচ্ছে ছুটে ছুটে। কলেজ যাওয়া ছেলে মেয়েদের ধরতেই হবে তাহলেই কেল্লা ফতে। সেই রকম ই কাস্টমার খুঁজে খুঁজে তাদের কাছে এগিয়ে যাচ্ছে পল্টন "দিদি ভালো গোলাপ আছে, দেখুন পুরো টাটকা তাজা, লাল রং টা দেখুন একদম পুরো টকটকে...ও দাদাভাই নিয়ে নিন দিদিভাই কে গিফট করবেন, একদম দিল খুশ হয়ে যাবে..."। হুরহুর করে বিক্রি হয়ে যেতে লাগলো গোলাপ গুলো। আর হবে নাই বা কেন মানুষের জীবনে এই দিন গুলো আছে বলেই তো একঘেঁয়েমি একটু হলেও প্রশমিত হয়। সম্পর্কে যতই টানাপোড়েন থাকুক, একটা লোক দেখানো গোলাপ হাতে তুলে দিলে সেখানে একটু দমবন্ধ ভাব কাটবে এ অস্বীকার করার জায়গা নেই মোটেও। আর এই সুযোগে ফুল বিক্রেতা দেরও কিছু আয় হয়ে যায়। সব দিকেই লাভ, ক্ষতি কোনো দিকেই নেই, আর নেকামি? তা জীবনে একটু আকটু নেকামি থাকাও ভালো।
তা যে কথা বলছিলাম । পল্টু এখন গোলাপ বিক্রিতে সম্পূর্ণ মনোনিবেশ করেছে।দুশো গোলাপ , দুশো গোলাপ শেষ করতেই হবে খুব তাড়াতাড়ি, আর কতটা জোরে জোরে ছুটলে শেষ হবে? এটাই মাথায় ঘুরতে লাগলো তেরো বছরের কিশোর পল্টনের। একটা নোংরা হাফ প্যান্ট , কোনো জায়গা ছাই রঙা কোনো জায়গা ব্রাউন আদতে কি রং বোঝার উপায় নেই , ওপরে একটা ঢলঢলে টি শার্ট। মাথার চুল রুক্ষ এলোমেলো , কিন্তু অদ্ভুত মুখশ্রী টা! এত মলিনতার মধ্যেও চোখ দুটো কি মায়াবী যেন কত স্বপ্ন এঁকে দিয়েছে কেও ওই চোখে, ধুলো মাখা মুখমন্ডল থেকে জ্বলজ্বল করছে ওই দুটো চোখ , সেই দেখেই হয়তো কেও ফেরাতে পারছে না। চোখের পাশাপাশি আর একটা জিনিস ও আছে পল্টনের , শক্ত চোয়াল, এত মায়াবী করুন মুখেও একটা অদ্ভুত দৃঢ়তা। কিসের জন্য যেন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
শুধু কলেজের ছেলে মেয়েই নয়, যত গাড়ি যাচ্ছে তার জানলার কাছেও ছুটে ছুটে যাচ্ছে ছেলেটা , "ও বাবু গোলাপ নিয়ে যান, খুব ভালো গোলাপ আছে...নিন না ও দিদিমণি..."
শেষ একশো টা শেষ। আর একটু সময় আর একটু দৌড়, ব্যাস। তারপরেই পুরো টার্গেট শেষ করে ফেলবে। সামান্য গোলাপ বিক্রী তো কোন ছাড় , বড় বড় মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানি ও সেলস ম্যান দের টার্গেট দেয়। অমুক টার্গেট ফুল করো, তুমি রাজা, নয়তো তুমি শেষ। পল্টন যদিও এতো কিছু বোঝেনা। সে বোঝে আজকে টাকা পেতে গেলে তাকে দুশো গোলাপ বেচে ফেলতে হবে ই। আর তার জন্য যত ছুটতে হয় সে ছুটবে। চেঁচাতে চেঁচাতে মুখে গেঁজলা উঠে গেলেও থামা যাবে না। এক একটা গোলাপ যেন তার লক্ষ্য পূরণের পথে এক একটা সিঁড়ি।
একশোর পরের গোছায় দেড়শো। দুপুর হয়ে আসছে, এখন ভিড়টা বেশ কম। বিক্রি ও কম হচ্ছে। তাও সিনেমা হল গুলোর সামনে ছুটে ছুটে গিয়ে চেষ্টা করছে, সেখানে যদি কিছুটা শেষ করা যায়। পথ চলতি গাড়ি গুলোর জানলায় যেমন যাচ্ছে সেতো যাচ্ছেই। কোনো রকমে দেড়শো শেষ হলো। এর পর লাস্ট গোছা। এবার সে ছুটলো স্টেশনে। ট্রেন যাত্রী বেশ কিছু মানুষের কাছে গিয়ে গিয়ে গোলাপ বিক্রি করতে লাগলো। স্টেশনের এ প্রান্ত থেকে অপ্রান্ত। এই প্লাটফর্ম থেকে ওই প্লাটফর্ম যেন পায়ে কেও যন্ত্র লাগিয়ে দিয়েছে, নয়তো কোনো অদৃশ্য শক্তির জাদু লেগেছে তার পায়ে। শেষ... দুশো গোলাপ শেষ। ঘড়িতে বিকেল চারটে। দোকানের মালিক হাসি মুখে বললো, "সাবাশ পল্টু, জানতাম তুই পারবি, এই নে তোর আজকের টাকা...যা চেয়েছিলি, বাকিটা যেমন মাইনে তে পাস পেয়ে যাবি... আর হ্যাঁ শোন কাল তাড়াতাড়ি আসিস কিন্তু এই হপ্তা চাপ আছে।"
পল্টুর হাতে তখন টাকা। হাতে সময় খুব কম।আবার ছুটতে হবে। ছুটতে ছুটতে চলে গেল হসপিটাল। ডাক্তার লাহিড়ী এখন তাকে ভালো চিনে গেছে, দেখেই বললো , "এসেছিস? নে শুয়ে পড়" । আর একটু দেরি হলেই হাত পা বেঁকে যেতে পারতো পল্টনের।সিরিঞ্জ রেডি করে হাতে পুশ করতে করতে বললেন, "পরের টা তিন মাস পর কেমন? আর বেশি না , পাঁচটা দিতে পারলেই তুই মোটামুটি সুস্থ হয়ে যাবি।"
আজকের উপার্জনের পুরো টাকা টা তুলে দিল সে ডাক্তার বাবুর হাতে। নার্ভের ডিসঅর্ডার ধরা পড়ার পর তার বাবা বলেই দিয়েছিল এর চিকিৎসা করার সাধ্য তার নেই, পল্টুর পরেও তো আরো চার সন্তান আছে তার। সামান্য চা এর দোকানে ফাইফরমাশ খাটেন তিনি , কতই বা রোজগার।
সেদিনও জ্বলজ্বল করে উঠেছিল পল্টুর চোখ। সে বাঁচবে, নিজের দায়িত্বে বাঁচবে। আজ গোলাপ তার আয়ু আর একটু বাড়িয়ে দিল। গোলাপের কাঁটায় রক্তাক্ত হয়ে গেছে পল্টুর হাত, তাও তার কোনো যন্ত্রনা নেই। পুরো জীবনের বিনিময়ে এই সামান্য ক্ষতই তো দিয়েছে গোলাপ গুলো, এই টুকু সয়ে নেওয়া কোনো ব্যপার নাকি! হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে দেখতে পেলো পথ চলতি বহু ছেলে মেয়ের হাতে গোলাপ, তারা হাসছে। পল্টুরও মুখে নিজের অজান্তে হাসির রেখা ফুটে উঠলো, জীবন টা অনেকটা গোলাপের মতোই বোধ হয়...যতই কাঁটা থাকুক তাও কত আদরের।
ও ভালো কথা যারা গল্প পড়ছেন সবাই কে "হ্যাপি রোজ ডে"।
রাকেশ ঘোষাল
Comments
Post a Comment