নীপা


স্কুল থেকে ফিরে ক্লান্ত শরীরটাকে নিজের বিছানায় এলিয়ে দিল নীপা। হন্তদন্ত হয়ে মেয়ের ঘরে ঢুকলেন শেফালী বসু। উৎকন্ঠা নিয়ে মেয়ের কপালে হাত ছোঁয়ালেন― কি রে জ্বর-টর এসেছে নাকি? এভাবে স্কুল থেকে ফিরেই শুয়ে পড়লি যে?

নীপা ম্লান হাসলো―না মা জ্বর-টর আসেনি।জানোই তো, রোগ বালাই আমার ধারেকাছে ঘেঁষতে সাহস পায়না। ওরা জানে ওদের জন‍্যে নষ্ট করার মতো সময় এই নীপা বসুর হাতে নেই। তবে আমি একটা ব‍্যাপারে নিশ্চিত যে যদি তারা আসেও, আমাকে ওপরে নিয়ে যেতে পারবে না সহজে। তোমার মেয়েকে যমেও ছোঁবেনা মা। তুমি নিশ্চিন্তে থাকতে পারো।

শেফালী হাতদুটো তুলে নিজের কপালে ছোঁয়ালেন

― দূর্গা, দূর্গা।ঠাকুর রক্ষা কর। এ মেয়ের মুখে যে কিছুই আটকায় না ঠাকুর। জানিনা আমাকে কষ্ট দিয়ে, কি সুখ পায় ও।

মায়ের হাতটা নিজের বুকের ওপর টেনে নিল নীপা―সরি মা। তোমাকে কষ্ট দিতে আমি একদমই  চাইনা।কিন্তু.....

মেয়ের কপালে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে শেফালী বললেন― সব বুঝি রে মা। এই দমবন্ধ হয়ে আসা পরিবেশে কি মানুষ বাঁচতে পারে? নিজেকে বড় অসহায় মনে হয় মাঝে মাঝে। তোর জন্যে কিছু করা তো পরের কথা, নিজেই তো তোর একটা বোঝা হয়ে গেলাম।

শেফালী বসুর চোখ থেকে দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল নীপার শরীরের ওপর।

বিছানা থেকে তাড়াতাড়ি উঠে পড়ল নীপা। দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল মাকে। নীপার গলাটা ভারী হয়ে এল―এমন কথা আর কক্ষনো বলবে না। জীবনে এমন কোনদিন যেন না আসে, যেদিন তোমাকে আমি আমার বোঝা মনে করবো। তুমি তো জানো গো মা, তুমি ছাড়া আমার জন্যে ভাববার আজকে আর কেউ নেই।

তাড়াতাড়ি চোখের জল মুছে মেয়ের কপালে চুমু খেলেন শেফালী।

     শেফালী বুঝতে পারছেন, ভাইদের আচরণ কতটা কষ্ট দিচ্ছে নীপাকে। কিন্তু উনি অসহায়। নিজেকে এই স্বার্থপর ছেলেদুটোর মা ভাবতেও ঘেন্না হয় আজকাল। বেশ চলছিল জীবনটা। কেন যে আবার পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে স্বেচ্ছায় গর্ভধারণের সাধ জেগেছিল তাঁর, কে জানে? শাশুড়ি, ননদদের কথায় অত গুরুত্ব দেওয়ার সত্যিই কি খুব দরকার ছিল? উঠতে বসতে কথা শোনাতেন শাশুড়িমা। পুত্রসন্তানের জন্ম দিতে না পারার সব দায়টাই শেফালীর ঘাড়ে চাপাতেন তিনি। ননদরাও এসে স্বপন বসুর বংশ লোপ পেতে বসেছে, ভেবে খুব দুঃখ করতো। দু-দুটো মেয়ের জন্মদাত্রী হিসেবে নাহয় একটু খোঁটাই শুনতে হত। সেটুকু সহ‍্য করতে পারলে, আবার যমজ পুত্রসন্তানের জন্ম দিতে তো হতোনা‌ তাঁকে। বিষয়টা নিয়ে ভাবলে, এখন খুব আফশোষ হয় শেফালীর। কেন যে ভুলটা করে বসলেন? অবশ্য ভুলতো আরো একটা করেছিলেন শেফালী। ছেলেদের মানুষ করার চিন্তায় এতটাই মশগুল থেকেছেন যে নীপার বিয়ে নিয়ে ভাবেননি কখনো। রূপার বিয়ে দিয়েছিল নীপা নিজের উদ্যোগে। খুব সুখে আছে রূপা। স্বামীর সঙ্গে বাঙ্গালোরে থাকে। দেড়-দু,বছর পর পর আসে। আটবছরে মাত্র পাঁচ-ছ'বার আসতে পেরেছে। কিন্তু তারপরও নীপার বিয়েটা জোর করে দিয়ে দেওয়াও তো উচিত ছিল তাঁরই। কিন্তু সেটা করেননি। স্বার্থপরের মতো শুধু সংসারটাকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সত্যিই কি বাঁচাতে পারলেন তাঁর সাধের সংসার? পারলেন না।

       হঠাৎ সম্বিত ফিরে পেতেই রান্নাঘরে ঢুকলেন শেফালী। মেয়েটা স্কুল থেকে ফিরে এখনো কিছু খায়নি। আজ রোজকার মতো মুড়িমাখা আর চা দিতে ইচ্ছে করলনা ওকে। তাড়াতাড়ি করে একটু সুজির উপমা তৈরী করতে লাগলেন। মনেপড়ে গেল সুমিতের কথাটা। ভাইয়েরা যা তা খেতে পারেনা বলে যে দিদি দিনের পর দিন ভাল খাবারটুকু ভাইয়েদের মুখে তুলে দিয়ে নিজে মুড়ি চিবিয়েছে, সেই দিদিকেই অতবড় কথাটা বলতে পারলো কি করে সুমিত? আর সুজিতই বা ওকে সমর্থন করল কি করে? ছিঃ ছিঃ, এমন অমানুষ হল পড়াশোনা শিখে? আর নয়।আজ থেকে শক্ত হতে হবে তাঁকেই। চাউমিন, এগটোস্ট কিচ্ছু হবেনা আজ কারো জন্যে। এতদিন নীপা মুড়ি চিবিয়েছে। আজ সন্ধ‍্যেয় বাড়ি ফিরে ওরাও তাই খাবে।

       *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *

      মা ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই জানালার ধারে গিয়ে দাঁড়ালো নীপা।গত তিনদিন ধরে মনটা যেন বিদ্ধস্ত হয়ে আছে। সবসময় সুজিত আর সুমিতের কথাগুলো কানের কাছে বাজছে। ওরা পরিস্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে মায়ের দায়িত্ব নিতে রাজি নয় দুই ভাইয়ের কেউই। সেটা না নিক, তাবলে দায় এড়াতে একটা মিথ্যা যুক্তি খাড়া করবে?এতটা অমানবিক হল কি করে ওরা? বড্ড অচেনা লাগছে নিজের খুব কাছের মানুষ দুজনকে। এদের জন্যে এতদিন গর্ববোধ করেছে নীপা। ভেবেছিল–তার এতদিনের পরিশ্রম, এত আত্মত্যাগ বুঝি সার্থক হল। সেই ধারাণাটা যে এতটা ভুল ছিল, সেটা একমাস আগেও বুঝতে পারেনি নীপা। 

      ভাইয়েদের কথা ভাবতে ভাবতে, হঠাৎই নীপার মনটা পোঁছে গেল আজ থেকে বাইশ বছর আগের একটা বিকেলে। কাঁধে ঝোলানো স্কুলের ব‍্যাগগুলো কোনরকমে বারান্দায় নামিয়ে রেখে, ঠাকমার ঘরের দিকে ছুটলো নীপা আর রূপা। খবরটা শোনার জন্যে দুই বোনই মনে মনে অস্থির হয়ে উঠেছে। নাতনিদের ডাক শুনে একগাল হেসে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন সরলাবালা ―তোদের ভাই হয়েছে এবার। তবে একটা নয়।যমজ ছেলে এসেছে তোর মায়ের কোল আলো করে। তোর বাবা এখনো নার্সিংহোমেই আছে। খবরটা পেলাম তোদের রমেশকাকার মুখে। ভগবান আমার ডাক শুনেছেন রে এতদিনে।  বংশে বাতি দেওয়ার কেউ ছিলনা, এই দুঃখে আমার গলা দিয়ে ভাল করে ভাত নামতোনা। এতদিনে আমার আশা পুরণ করল ঠাকুর। বাড়িতে যেখানে দু-দুটো মেয়ে, সেখানে দুটো ছেলে না থাকলে হয়?

রূপা দিদির কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল―এই দিদি! ঠাকমা তো অনেকগুলো ভাত খায়। তাহলে বলছে কেন গলা দিয়ে....

বোনের মুখে হাতটা চেপে ধরল নীপা―চুপ।ওসব কথা বলতে নেই। ঠাকমার দুঃখ হত আমাদের ভাই ছিলনা বলে। তাই অমন করে বলছে।

ক্লাস ফাইভে পড়া রূপা অস্থির গলায় বলল―মা কখন বাড়ি আসবে ঠাকমা?

নিজের মনের উচ্ছ্বাসকে যেন কোনভাবেই চেপে রাখতে পারছেননা সরলাবালা। পানের খিলিটা মুখে ভরে, লালচে দাঁতগুলো বের করলেন ― ছুটি দিলেই আসবে। এত চিন্তা কিসের তোর? তবে মা তো এবার তোকে দেখতে সময় পাবেনা।ভাইদের দেখতে হবে মাকে। নে, এখন হাতমুখ ধুয়ে খেয়ে নে। সে পরের কথা পরে হবে।

কথাটা শুনে বিবর্ণ হয়ে গেল দশবছরের রূপার মুখটা।বোনকে কাছে টেনে নিল নীপা―এবার তুই আর আমি ছোটঘরে থাকবো। বেশ ভালো হবে। অনেক গল্প করবো পড়া হয়ে গেলে। তোকে আর মা বকতে পারবেনা রাত্রে পুতুল নিয়ে খেললে।

দিদির কথা শুনে আনন্দে চকচক করে উঠলো রূপার চোখদুটো― ঠিক বলেছিস দিদি।খুব মজা হবে তাহলে।

       বাড়ির কর্তা,সঞ্জয় বসুই পরিবারের একমাত্র উপার্জনশীল মানুষ। সঞ্জয় বসু একটা প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করেন। তবে বিশাল বড় কোন চাকরি নয়। ক্ল‍্যারিক‍্যাল জব। এছাড়া বিঘেতিনেক ধানি জমি আছে। সংসারটা যে তাঁকে যথেষ্ট হিসেব করে চালাতে হয়, সেটা ভালকরেই বোঝে বাড়ির বড় মেয়ে নীপা। তাই কখনো বায়না করেনা কোনকিছুর জন্যে। বাজে খরচও কখনো করেনা। দুই মেয়ের পর আবার দুই ছেলের জন্ম হওয়ায় বাবা-মা কতটা খুশী হয়েছেন, সেটা বুঝতে পারছেনা দশমশ্রেনীর ছাত্রী নীপা। তবে বাবার যে টাকাপয়সার টানাটানি আরো বাড়বে, সেটা বুঝতে পারছে ভালকরেই। অবশ্য এসব নিয়ে যতনা ভাবছে, তার থেকে বেশি ভাবছে বন্ধুদের নিয়ে। এত বড় হয়ে যাওয়ার পর ভাই হওয়ার খবরটা বন্ধুরা জেনে যাবে ভেবে বেশ অস্বস্তি হচ্ছে নীপার। তেমনি আবার অন‍্য একটা কথা ভেবে ভাললাগছে। মা এবার অন্তত ঠাকমার আর পিসিদের খোঁটার হাত থেকে বাঁচবে। ঠাকমা আর পিসিরা যখন শুধু কন্যাসন্তানের জন্ম দেওয়ার জন্য মাকে দোষারোপ করতো, তখন নীপার গায়ে যেন জ্বালা ধরতো। মনে হতো বড় হয়ে এর শোধ নেবে। অবশ‍্য এবার আর সেসব চিন্তা রইলনা? কারণ মাকে এরপর থেকে কেউ দোষারোপ করবে না। পিসতুতো ভাইয়েদের অপেক্ষায় আর ভাইফোঁটার দিন বসে থাকতে হবে না তাদের দুই বোনকে। একটা নয়। একেবারে দু-দুটো নিজের ভাই তো ওদের বাড়িতেই থাকবে। পুত্রসন্তানের মা হিসেবে পিসিদের দেমাকটা এবার হয়তো কমবে। বরং এবার ছেলেদের নিয়ে গর্ব করার পালা ওর মায়েরই। 

     গর্ব নীপারও কিছু কম হচ্ছেনা। সব বন্ধুদেরই একজন করে অন্তত ভাই, কি দাদা আছে। ছিলনা নীপার। তাই বন্ধুদের কাছে আগামীকাল ভাই হওয়ার খবরটা দেওয়া যাবে, এই কথা ভেবে লজ্জার থেকে গর্বই এখন বেশি হচ্ছে। বেশ উত্তেজনা অনুভব করছে নীপা। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। তার পরেই দেখা যাবে ভাইদের মুখগুলো।

       *  *  *  * *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  * *

      সেদিন যে সদ‍্যজাত ভাইদের কোলে নিয়ে আনন্দে বুক ভরে উঠেছিল নীপার, আজ তারাই আঘাতে আঘাতে জর্জরিত করে দিয়েছে ওর  মনটাকে। হায় রে! সংসার কি বিচিত্র জায়গা। স্বার্থে সামান‍্য হানি ঘটলেই কেমন অদ্ভূতভাবে বদলে যায় মানুষগুলো। কি সহজে পাল্টে যায় তাদের আচার ব‍্যবহার।সবকিছু দেখতে দেখতে চরম বিতৃষ্ণা এসে গেছে জগৎসংসারের প্রতি। বড় বিস্বাদ লাগে এই জীবনটা। 

      দেখতে দেখতে বাইশটা বছর পেরিয়ে গেছে।সংসারের হালচাল বদলে দিয়েছে ভাইয়েরা।পাল্টে গেছে ওদের মানসিকতাও। শুধু নিজেকে পাল্টাতে পারেনি নীপা। কর্তব‍্যপালন করতে করতে নিজের দিকে তাকায়নি কখনো। যৌবনের শুরুতেই কাঁধে এসে পড়েছিল পুরো পরিবারের ভার। তখনই নিজের ভাললাগাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়েছে মন থেকে। উপেক্ষা করেছে ভাললাগার মানুষটাকেও। আজ পুরোনো ভাবনাগুলো নতুন করে চাড়া দিচ্ছে মনের মধ্যে। একটা প্রশ্ন বারবার মনের মধ্যে উঁকি দিচ্ছে– সবকিছুর বিনিময়ে কি পেল ও জীবনে? কিছু মিথ্যা অপবাদ ছাড়া আর কিছু কি জুটলো?

        মাধ‍্যমিকের সময় থেকে শুরু হয়েছিল নীপার জীবনসংগ্ৰাম।সংসারের কাজ সামলে মা আর ঠাকমা হিমসিম খেতো ভাইদের নিয়ে। তাই মাধ‍্যমিক পরীক্ষার আগের দিন পর্যন্ত নীপাকেও সমানে হাত লাগাতে হত সংসারের কাজে। রাত জেগে পড়তে হত ওকে। মাধ‍্যমিক পরীক্ষা শেষ হতেই ঠাকমা জানিয়েছিলেন কথাটা। নীপাকে আর পড়াশোনা করার মতো সাধ‍্য ওর বাবার নেই। মুখ ফুটে মেয়েকে হয়তো কথাটা বলতে পারছেনা। তাই নীপা যেন নিজেই জানায় যে আর পড়তে চায়না ও।

      কথাটা শুনে খুব কষ্ট হয়েছিল নীপার।তবু দমেনি। শুরু করেছিল বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছোটদের টিউশন দেওয়া। মাধ‍্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক দুটো পরীক্ষাতেই ফার্স্ট ডিভিশন পেয়েছিল নীপা। কলেজে ভর্তি হওয়ার কথা হতেই রে রে করে উঠেছিল ঠাকমা। বাবা ভালো ভীষণভাবে সাপোর্ট করেছিলেন নীপাকে। বলেছিলেন―বাবার অক্ষমতার কথা ভেবে যে মেয়ে মাধ‍্যমিকের পর থেকে টিউশনি করে নিজের পড়ার খরচ চালাচ্ছে, তার পড়াশোনার ব‍্যাপারে কেউ যেন দ্বিতীয় দিন কথা না বলে। ও নিজের চেষ্টায় যতদূর পড়তে চায়, পড়বে। ওকে বাধা দেবো আমরা কোন লজ্জায় মা?

আর কিছু বলতে সাহস পায়নি ঠাকমা।

      কলেজে ভর্তি হয়েই বাড়ি বাড়ি পড়াতে না গিয়ে, নিজেদের বাড়ির দরদালানে সকাল ও সন্ধ‍্যেয় টিউশনি করতে শুরু করেছিল নীপা। ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছিল প্রতিবছর। ম‍্যাথমেটিক্স অনার্স নিয়ে গ্ৰাজুয়েশন করেই ক্ষান্ত হয়নি নীপা। এম.এসসি, বি এড করে তবে থেমেছিল। নীপা যখন ইউনিভার্সিটি যাওয়া শুরু করল, তখনই ওর ভাইয়েরা ভর্তি হল গ্ৰামের প্রাইমারী স্কুলে। সেদিনের কথা আজও মনে আছে নীপার। সকাল থেকে আনন্দে লাফালাফি করছিল সুমিত আর সুজিত। আগের দিনই নিজের টিউশনির উপার্জন থেকে ওদের জন্যে স্কুলব‍্যাগ, পেনসিলবক্স, জুতো–সব কিনে এনেছিল নীপা। ওদের স্কুলে ভর্তি করে, তারপর কিছুটা দেরিতেই ইউনিভার্সিটি গিয়েছিল সেদিন।

      হাতে খাবারের থালা নিয়ে ঘরে ঢুকলেন শেফালী। বললেন― নে,খেয়ে নে গরম গরম।“গরম গরম” শব্দটা কানে যেতে খাবারের প্লেটটার দিকে

তাকালো নীপা― তুমি এখন আমার জন্যে সুজির উপমা বানিয়েছো? কেন মা?এ সময় তো আমি চা-মুড়ি খাই।

―আজ এটাই খাবি?

―ওরা ফিরলেই তো করতে পারতে।ওরা যখন খাবে,ঠান্ডা হয়ে যাবে তো।

―না ঠান্ডা হবে না কিছু। ওদের জন্যে করিনি। আজ ওরা মুড়ি-চানাচুর খাবে চায়ের সঙ্গে।

নীপা অবাক হয়ে তাকালো শেফালীর মুখের দিকে

― এসব কি বলছো তুমি মা?

―এতদিন পর বোধহয় ঠিক সিদ্ধান্তটা নিলাম। তুই খেতে শুরু কর। না খেলে কিন্তু আমি মাথার দিব‍্যি দেবো। লজ্জা করেনা তোর। এখনো তুই ওই স্বার্থপর ভাইদের কথা ভাবছিস? তোর উপার্জনের টাকায় এখনো খাচ্ছে যারা, তাদের অত বড় বড় কথা আসে কোথা থেকে?

―ওরা তো সেটা ভাবেনা মা। ওরা তো ভাবে বাবার রেখে যাওয়া টাকাপয়সা আমি সব নিজের নামে জমিয়েছি। তার সুদ থেকেই সংসার চলেছে। সেদিন সুমিত বলল তো তাই।

শেফালী আঁচলের খুঁটে চোখের জল মুছলেন।

―আজ তোর কোন বারণ শুনবোনা আমি।ওদের মুখোমুখি হতেই হবে আমাকে। সেদিন কথাটা সুমিতের মুখে শুনে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। এসব কথা যে ও ভাবতে পারে,সেটা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি কখনো। সেদিনই প্রতিবাদ করতাম। পারলাম না শুধু তোর জন্যে। তুই বললি―ওর চাকরির প্রথমদিন কোন অশান্তি না করতে। তাই চুপ করে গেলাম। কিন্তু আর নয়।

নীপা বলল―ওসব ছাড়োতো। সুজির উপমাটা কিন্তু খুব সুন্দর হয়েছে মা।একটু খেয়ে দেখো।

মায়ের মুখে একচামচ উপমা ভরে দিলো নীপা।

সেটুকু চিবুতে চিবুতে চা করতে চলে গেলেন শেফালী।

       *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  * 

     রাতের রান্না চাপিয়েছেন শেফালী। মেয়েটার কথা ভেবে মনটা ভীষণ খারাপ লাগছে আজ। রান্না করতে ভাললাগছেনা। মনে পড়ে যাচ্ছে পুরনো সব কথা। শাশুড়ির মৃত্যুর পর শেফালীর সারাটা দিনই কেটে যেতো সংসার সামলাতে। অসুস্থ স্বামীর সেবা ও সংসারের সব কাজ একা হাতে করতে হতো তাঁকে। ইচ্ছা থাকলেও নীপা পারতোনা মাকে সাহায্য করতে। কারণ টিচারী পাওয়ার পরও, সকাল সন্ধ‍্যে টিউশনি করা বন্ধ করেনি নীপা। সেই পঁচিশবছর বয়সে চাকরি পেয়ে সংসারের হাল ধরেছিল নীপা।সেটা বারোবছর আগেকার কথা।তখন থেকেই সংসারের ভেতরটা সামলাচ্ছেন শেফালী আর বাইরেটা সামলাচ্ছে নীপা। মায়ের কষ্টের কথা ভেবে একজন ঠিকে কাজের লোক রেখেছে নীপা বছরখানেক আগে। তাই এখন একটু কাজের চাপ কম শেফালীর।

     কিডনির অসুখে মৃত্যু হয়েছিল সঞ্জয় বসুর।অসুখ ধরা পড়ার পর যে একবছর ব়েঁচেছিলেন, চিকিৎসার খরচ চালাতে হিমসিম খেতে হয়েছিল নীপাকে। সঞ্জয় যে প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করতেন, সেখানে পেনসেনের কোন ব‍্যাপার ছিলনা। সঞ্চয়ও তেমন ছিলনা তাঁর। বাধ‍্য হয়ে লোন নিয়ে বাবার চিকিৎসা করিয়েছিল নীপা। ধীরে ধীরে সেই লোন শোধ করে ফেলেছিল নীপা। তারপরই শেফালী বলেছিলেন―তোর বাবার চিকিৎসার জন্য অনেক টাকা খরচ হতো। এখন তো সেগুলো লাগছেনা। লোনও শোধ করে ফেলেছিস।এবার তুই টিউশনি করা বন্ধ করে দে নীপা। বছরের পর বছর একটানা এত ধকল কারো শরীর নিতে পারেনা। শেষে অসুস্থ হয়ে পড়বি।

নীপা বলেছিল― এখন যে আমার কাঁধে আরো অনেক বড় দায়িত্ব মা। সুমিত আর সুজিত দুজনের পরের বছর উচ্চমাধ্যমিক।ওদের জন্যে অতিরিক্ত টিউটার রাখতে হবে এখন থেকে। নাহলে হয়তো রেজাল্ট খারাপ হবে। ওরা দুজনেই ইঞ্জিয়ারিং পড়তে চায়। ডিগ্ৰীকোর্স করাতে যে টাকা লাগবে, সেটা আমি জোগাতে পারবোনা। তাই ওরা ডিপ্লোমা কোর্সই করতে চায়। তবে রেজাল্ট ভালো হলে, ডিপ্লোমা করেও ভালো চাকরী পাওয়া যায়। ওরা চাকরী পেলে আমি একটু হালকা হতে পারবো।

তুমি আমাকে নিয়ে একদম ভেবোনা। আমার অসুবিধা হচ্ছেনা তেমন।

শেফালী বলেছিলেন―আমি আর কি ভাববো?আর আমার করারই বা সাধ‍্য কি। তবে একটা কথা সবসময় মনেহয়। বহু তপস‍্যা করে আমি বা তোর বাবা যেমন তোর মতো মেয়ে পেয়েছিলাম, তেমনি ওরা দুইভাইও তোর মতো দিদি পেয়েছে।

নীপা হেসে বলেছিল―ওরা চাকরি পেলে সুদে আসলে উসুল করে নেব।

     এরপর পেরিয়ে গেছে চারটে বছর।সিভিল নিয়ে পড়েছে সুমিত।সুজিত পড়েছে ইলেকট্রিক‍্যাল নিয়ে। ভাগ‍্যক্রমে দুভাইই চাকরী পেয়েছে। ক‍্যাম্পাসিং থেকে ওদের প্লেসমেন্ট হয়েছে। সুমিতের কলকাতাতেই পোস্টিং হয়েছে। কিন্তু সুজিত পেয়েছে মাইথনে। সুজিত বাইরে চাকরি পেয়ে খুব খুশী। বাইরে থাকলে সংসারের দায়দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া যাবে, এমনই ওর মনভাব। বলেছিল, মাকে দেখার জন্যে দিদি তো রয়েছে। আমি বরং এখন থেকে নিজের কেরিয়ারটা তৈরীর দিকে মন দেবো। তবে বাড়ি আসবো প্রত‍্যেক মাসে একবার করে।

নীপা বলেছিল― তোরা অনেক বড় হবি,অনেক ভালো জীবন কাটাবি,এটাই তো আমার স্বপ্ন ছিল। মায়ের ভাবনা তোদের করতে হবেনা কখনো।

      সুমিত অবশ্য আরো অনেক বেশি স্বার্থপর।

ও যে প্রিয়াঙ্কা নামের একটি মেয়েকে ভালবাসে, সে খবরটা অনেক আগেই জানিয়েছিল সুজিত। ক'দিন আগে সুমিত নিজেই বাড়িতে নিয়ে এসেছিল  প্রিয়াঙ্কাকে। ওদের দেখে ভীষণ খুশী হয়েছিল নীপা।প্রিয়াঙ্কা চলে গেলে বলেছিল― খুব ভালো লাগছে আমার। তোরা চাকরি পেয়েছিস। এবার সংসারী হলে আমি নিশ্চিত হব। সুজিতেরও যদি কাউকে ভালো লাগে, তাকে ...

কথা শেষ করতে না দিয়ে সুজিত বলেছিল―আমার তো মাথা খারাপ হয়নি যে বাইশবছর পেরোতে না পেরোতেই বিয়ে করব। অবশ‍্য সুমিতের ব‍্যাপারটা আলাদা। ওর মতো ভাগ‍্য হয় কজনের? একসঙ্গে রাজত্ব ও রাজকন্যা–দুই লাভ। এটা কি চাট্টিখানি ব‍্যাপার?

সুজিতের কথায় মুখ টিপে হেসেছিল সুমিত।

      পরদিন সকালে অফিস যাওয়ার আগে গর্ব করে জানিয়েছিল সুমিত হবু শ্বশুরবাড়ির কথা। প্রিয়াঙ্কারা দুই বোন।ওর কোন ভাই নেই। ওর বাবা বড় মেয়েকে একটা ফ্ল্যাট কিনে দিয়েছেন। প্রিয়াঙ্কার জন‍্যেও একটা ফ্ল্যাট বুক করেছেন। ওই ফ্ল্যাটটা শ্বশুরবাড়ির একেবারে কাছে। একবছর পর ফ্ল্যাটটা পাওয়া যাবে। বিয়ের পর এই একবছর সুমিত শ্বশুরবাড়িতেই থাকবে। কারণ এই পুরোনো বাড়িতে প্রিয়াঙ্কা কোনভাবেই থাকতে পারবেনা।

কথাটা শুনে আশাহত গলায় শেফালী বলেছিলেন

―সুজিত বাইরে থাকবে।আবার তুইও বাড়িতে থাকতে পারবি না। তোর দিদি আর কত একা সংসার ঠেলবে? ও কি কখনো দায়মুক্ত হতে পারবেনা? নিজের জীবন শেষ করে মানুষ করল তোদের দুই ভাইকে। সেসব ভুলে গেলি?

ফুঁসে উঠেছিল সুমিত―সবই দিদি করেছে?আমার বাবা কিছুই করেনি?তুমি এইরকমই ভাবো?আসলে দিদি যেটা বুঝিয়েছে তোমাকে,সেটাকেই বিশ্বাস কর। কিন্তু আমরা দুভাই সেটা মানতে পারিনা। বাবার গ্ৰ‍্যাচুইটির টাকা,ইনসিওরেন্সের টাকা সবই তো ছিল দিদির হাতে।দিদি নিশ্চয় সেসব থেকেই চালিয়েছে সংসার। আর সংসারে সব খরচ আমাদের জন্যে হয়নি। তুমি, দিদিও তো আছো। তোমাদের জন্যেও তো খরচ হয়েছে।

সুমিতের কথা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল নীপা। শেফালী রাগে গজগজ করে উঠেছিলেন― এতবড় বেইমান তুই? কতটুকু জানিস তুই?

নীপা ছুটে এসে মায়ের মুখে হাত দিয়েছিল―তুমি এখন ওসব বলোনা মা। সুমিত সবে অফিসে জয়েন করেছে। মুড খারাপ হলে,ঠিকমতো কাজ করতে পারবে না।

অবাক হয়ে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়েছিলেন শেফালী। মনে হয়েছিল, কি ধাতুতে গড়া এই মেয়ে? এর যে কিছুতেই কিছু গায়ে লাগে না।

        *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *

       ঘড়ির কাঁটাদুটো বারোটার ঘর ছুঁই ছুঁই করছে।নীপা এখন স্কুলে। সুমিত অফিস গেছে। সুজিত বেরিয়েছে নিজের প্রয়োজনীয় কিছু কেনাকাটা করতে। রান্নাঘর গোছাচ্ছিলেন শেফালী। তখনই কলিংবেলটা বেজে উঠলো। শেফালী হাতের কাজ ফেলে উঠে গেলেন দরজা খুলতে। ভেবেছিলেন সুজিত বাড়ি ফিরলো। কিন্তু দরজা খুলে অবাক হলেন। দেখলেন দরজার পাল্লা ধরে দাঁড়িয়ে আছে বেশ লম্বাচওড়া চেহারার একজন ধোপদুরস্ত মানুষ। একটু দূরেই দাঁড় করানো রয়েছে একটা চকলেট কালারের বড় গাড়ি। সংকোচিতভাবে শেফালী বললেন― আপনাকে তো ঠিক চিনলাম না। কাকে চাইছেন আপনি?

ভদ্রলোক বললেন―চাইছি আপাতত আপনাকেই। কিন্তু যদি বাড়ির ভেতরে দশমিনিটের জন্যে ঢুকতে দেন,তাহলে আমি আমার প্রয়োজনটা জানাতে পারি।

শেফালী প্রমাদ গুনলেন। একেবারে অপরিচিত একজনকে বাড়িতে ঢোকাতে একটু ভয় ভয় করছে।আমতা আমতা করে বললেন―আসলে বাড়িতে এখন কেউ নেই তো?

ভদ্রলোক হাসলেন― সে তো বটেই।বাড়িতে ঢুকে কি করে বসি,তার ঠিক নেই। আমার আবার চাহিদা অনেক। একটা নারকেল নাড়ুতে আমার পোষায় না।ওটাতো দাঁতেই আটকে থাকে।আবার কেউ ছোলারডাল ছাড়া লুচি খেতে দিলে বড্ড বিরক্ত লাগে, তাইনা কাম্মা?

চমকে উঠলেন শেফালী। স্মৃতির ঝাঁপি হাতড়ে, খুঁজে বার করলেন সেই রোগা ছিপছিপে ছেলেটাকে। যে সবসময় বলতো এইধরনের কথাগুলো। মুখের দিকে তাকাতেই থুতনির কাটা দাগটা চোখে পড়ল। আর কোন কথা না বলে হাত ধরে টান দিলেন― তুই আমার নাড়ুগোপাল? দুষ্টু ছেলে!এতক্ষণ কেন বলিসনি। তোকে দেখে কি এখন চিনতে পারা সম্ভব।

     ছেলের পড়াশোনার জন্য কলকাতায় চলে গিয়েছিলেন অলোক, রুদ্রের ক্লাস এইটের পরই।তারপর ওর সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল প্রায় বছরদশেক আগে। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পর দুদিনের জন্য নিজেদের বাড়িতে এসেছিল একবার রুদ্র। দেখা করতে এসেছিল শেফালীদের সঙ্গে। তখনো রোগা ডিগডিগে ছিল ছেলেটা। এর মাসদুয়েক পরই শোনা গিয়েছিল খারাপ খবরটা। কিডনির অসুখে মারা গিয়েছিলেন রুদ্রর মা।

     সঞ্জয় বসু আর অলোক ঘোষ ছিলেন অভিন্নহৃদয় বন্ধু। রেলে চাকরি করতেন অলোক ঘোষ। কলকাতাতেই পোস্টিং ছিল ওনার। সপ্তাহে একদিন বাড়ি আসতেন। স্ত্রী আর ছেলেকে নিয়ে চলে আসতেন বন্ধুরবাড়ি। আসার সময় নীপা, রূপার জন্যে লজেন্স-বিস্কুট আর সকলের জন্যে চপ,সিঙ্গাড়া, মিষ্টি নিয়ে ঢুকতেন। সন্ধ‍্যেটা কাটিয়ে যেতেন শেফালীদের বাড়িতে। শেফালী আপত্তি জানাতেন,রোজ এতকিছু আনার জন্যে। অলোক রাগ করতেন।বলতেন― আমরা আপনাদের আপন ভাবলেও, আপনি আমাদের আপন ভাবতে পারেননা বৌঠান। অলোকের ছেলে রুদ্র খুব নারকেলনাড়ু খেতে ভালবাসতো। ওরা আসবে বলে,শাশুড়িমা নাড়ু করে রাখতেন। নাড়ু,গাছের পেয়ারা নিয়ে হাতাহাতি লেগে যেতো নীপা আর রুদ্রের মধ্যে। শেফালীকে মাঝে মাঝেই ওদের ঝগড়া থামাতে হতো। শেফালী রুদ্রকে নাড়ুগোপাল বলে ডাকতেন। তাই নিয়ে নীপা ভেংচি কাটতো। বলতো, নাড়ুগোপাল না ছাই। ও একটা তালপাতার সিপাই। কখনো কখনো হুঁকো মুকো হ‍্যাঙলা বলে রাগাতো। আর রুদ্র তার শোধ নিতে শাঁকচুন্নি, শ‍্যাওড়া গাছের পেত্মী–এসব বলে ডাকতো নীপাকে। অলোকের স্ত্রী সুলতা প্রায়ই বলতেন ―দাঁড়া তোদের এই ঝগড়া থামাতে, বড় হলে তোদের বিয়ে দিয়ে দেবো। 

তখন রুদ্র আর নীপা– দুজনেই অক অক শব্দ তুলে,নিজেদের অপছন্দ জানিয়ে দিতো। সেই রুদ্র আজ রীতিমতো ভব‍্যিযুক্ত একজন মানুষ।

     প্লেটের মধ্যে দুটো মিষ্টি ও জলের গ্লাস নিয়ে ঘরে ঢুকলেন শেফালী। রুদ্রের সামনে প্লেটটা নামিয়ে রেখে বললেন―তুই আসবি জানলে, নাড়ু করে রাখতাম।এখন এই মিষ্টি দুটোই খা বাবা। হ‍্যাঁরে, তোর বাবা আছে কেমন?

―খুব একটা ভালো নয়। বাবার ইচ্ছাতেই এখানে আসতে হল আজ।

―কি ইচ্ছা রে?

―প্রথমটা হচ্ছে এই বাড়িটা বিক্রি করা।আর দ্বিতীয়টা নাহয় পরে শুনো।

শেফালী বললেন―তুই বোস।আমি একটু রান্নাঘরে যাই। শোন,এখানেই খাবি দুপুরে।

রুদ্র বলল―না না কাম্মা, আমি জেঠিমার কাছেই খেয়ে নেবো। তুমি আর কিছু করোনা।

শেফালী বললেন―জেঠিমার কাছেও খাওয়া যা আর কাম্মার কাছেও খাওয়া তা। তুই চুপ করে বস একটু। আমি এখুনি আসছি। তারপর অনেক কথা বলবো তোকে। আজ তো শনিবার। আড়াইটার মধ্যে বাড়ি চলে আসবে তোর শাঁকচুন্নি।

কথাটা বলেই হাসতে হাসতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন শেফালী।

        *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *

      সুজিত আর সুমিতকে দেখেছে রূদ্র ওদের একবছর বয়সে। ওরা চেনেনা রুদ্রকে। কিন্তু শেফালীর মুখে ওদের সব কথা শুনে, রীতিমতো  অবাক হয়ে গেছে রুদ্র। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রুদ্র বলল―নীপা তো তাহলে একদম ভালো নেই কাম্মা। অদ্ভূত চরিত্রের মেয়ে তোমার। একটা কথা তুমি জানোনা। গ্ৰামে না এলেও নীপার সঙ্গে আমার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। প্রথমে চিঠিতে, পরে ফোনে। আমি ওকে বারবার বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছি।কিন্তু ও কোনভাবে রাজি হয়নি। সবসময় সংসারের দোঁহাই দিয়েছে। আমাদের দুজনেরই বিয়ের বয়স পেরিয়ে গেছে। আমার আটত্রিশ মানে স্বাভাবিকভাবেই ওর সাঁয়ত্রিশ। আমি বিয়ে করার ইচ্ছা ত‍্যাগ করেছিলাম। কিন্তু বাবা এই নিয়ে খুব অস্থির হয়ে উঠেছেন। বাবা একটা চিঠি দিয়েছে নীপাকে। আমিও শেষবারের মতো বলবো আর একবার।ও রাজি হলে ভালো। তানাহলে বাবার ইচ্ছে পুরণ করতে পারবোনা আর।

শেফালী রুদ্রের হাতদুটো চেপে ধরলেন―তুই ওকে বিয়ে করে আমাকে দায়মুক্ত কর বাবা। ওকে আমি রাজি ক‍রাবোই।

      সুজিত বাড়ি ফিরে অচেনা লোক দেখে প্রথমে একটু অবাক হল। শেফালী পরিচয় করিয়ে দিলেন ―এই হচ্ছে তোর বাবার সেই বন্ধু অলোকদার ছেলে রুদ্র। ওদের বাড়িটা পূর্বপাড়ায়। তবে অনেক বছর ধরেই ওরা দক্ষিন কলকাতায় থাকে। ওখানে ওদের ফ্ল্যাট আছে।

সুজিত বলল―ছোটবেলায় বাবার মুখে আপনার বাবার কথা অনেক শুনেছি।

রুদ্র বলল―হ‍্যাঁ, আমাদের দুটো পরিবারের মধ্যে একসময় একটা নিবিড় সম্পর্ক ছিল।

সুজিত স্নান করতে ঢুকলে রুদ্রকে খেতে দিয়ে দিলেন শেফালী। তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করে,উঠে দাঁড়ালো। নীপার উদ্দেশ্যে লেখা ওর বাবার চিঠির খামটা শেফালীর হাতে দিয়ে বেরিয়ে গেল রুদ্র। বলে গেল―এখন আমার একবার বাড়ি যাওয়া দরকার কাম্মা। সন্ধ‍্যেবেলায় আসবো। তখন সকলের সঙ্গে কথা হবে।

     স্কুল থেকে ফেরার পরই নীপার হাতে চিঠিটা ধরিয়ে দিয়েছেন শেফালী। খাম ছিঁড়ে চিঠিটা পড়ে বেশ অবাক হয়েছে নীপা। শেফালী জানতে চাইলেন, কি লিখেছেন অলোক ঘোষ।

চিঠিটা মায়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে নীপা বলল ―এবার আমি কি করি বলতো মা? যে কাকু আমাকে মা ছাড়া ডাকতেন না, তাঁর শেষ ইচ্ছের কথা জানিয়েছেন তিনি।

শেফালী মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন― কি করবি এখনো বুঝতে পারছিস না পাগলী? এবার আর কোন কিছু না ভেবে, ওনার প্রস্তাবে রাজি হয়ে আমাকেও চিন্তামুক্ত কর মা।

―কিন্তু তোমাকে কে দেখবে মা?

―আমাকে ভগবান দেখবেন। তাছাড়া আমি তো এখন যথেষ্ট সুস্থ ও কর্মক্ষম রয়েছি। পরে তেমন কিছু হলে, তখনই ভাবা যাবে। এখন তুই আগে বিয়েটা তো কর। কিরে, করবি তো?

নীপা ঘাড় কাৎ করে সম্মতি জানালো।

      সন্ধ‍্যে সাড়ে সাতটায় রুদ্রের গাড়িটা এসে দাঁড়ালো নীপাদের বাড়ির দরজার সামনে।  শেফালী হবু জামাইয়ের জন্য হিংয়ের কচুরী ও আলুরদম বানাচ্ছিলেন।কচুরীর গন্ধে বাড়ি ম-ম করছে। গাড়ির শব্দ পেয়ে, তাড়াতাড়ি দরজা খুলতে উঠে গেল সুজিত― ওই বুঝি এলো রুদ্রদা। 

অফিস থেকে ফিরে ফ্রেশ হয়ে, চা-জলখাবারের অপেক্ষায় সবে টেবিলের সামনে বসেছিল সুমিত। 

ও বলল―রুদ্রদা কে রে সুজিত?

হাঁটতে হাঁটতেই উত্তর দিল সুজিত―বাবার বন্ধু অলোক ঘোষের ছেলে।

―অলোক ঘোষ মানে তো বিল্টুর সেই বড়লোক কাকা, যিনি কলকাতায় থাকেন?

সুজিত হেঁকে বলল― হ‍্যাঁ। দুপুরে একবার এসেছিল। মা কেন এই সন্ধ‍্যেবেলাতেই কচুরী বানাচ্ছে, ব‍্যাপারটা এতক্ষণে বোধগম্য হল সুমিতের।

     রীতিমতো সুদর্শন সুবেশ রুদ্রের দিকে কিছুক্ষণ পলকহীন তাকিয়ে রইল সুমিত। রান্নাঘর থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এলেন শেফালী― তোর পছন্দের হিংয়ের কচুরী করছি রুদ্র। আগে গরম গরম খেয়ে নে সবাই মিলে। তারপর তোর সঙ্গে কথা হবে।

চেয়ার টেনে নিয়ে বসে পড়ল রুদ্র―ও.কে কাম্মা।

তুমি নিয়ে এসো।

শেফালীর অনুরোধে নীপাকেও বসতে হয়েছে টেবিলে। খেতে খেতে সুমিত বলল―আচ্ছা রুদ্রদা, তোমাদের বাড়িটা নাকি বিক্রি করবে এবার?

―হ‍্যাঁ, শুধু শুধু পড়ে আছে বছরের পর বছর।বাবা তো আমার মাধ‍্যমিকের পরই কলকাতায় বড় ফ্ল্যাট কিনে ফেলেছেন। ওখানেই থাকার কেউ নেই।

― হ‍্যাঁ শুনলাম ফ‍্যাক্টরি করবে বলে তোমাদের বাড়ির দাম এককোটি তিরিশ লক্ষ্য দিতে চাইছে একজন ব‍্যবসাদার?

সুজিত বলল―তা তো দেবেই। বাগান নিয়ে অনেকটা এরিয়া তো।

রুদ্র হাসলো―কিন্তু বাবা তাকে দেবেননা ঠিক করছেন। বাবার খুরতুতো এক ভাই দিল্লিতে থাকেন।উনি বাড়িটার অনেক আগেই পঁচাত্তর লক্ষ্য টাকা দাম দিয়েছেন। তাকেই বিক্রি করবো বাড়িটা।

সুমিত বড় বড় চোখ করে তাকালো―বলো কি? প্রায় হাফ দামে?

―হ‍্যাঁ। বাবা বলেন, রক্তের সম্পর্ককে এটুকু মূল্য দেওয়া উচিত। তাছাড়া ঈশ্বরের করুণায় আমার উপার্জন তো কম নয়। কি হবে অত টাকা নিয়ে?

সুমিত বলল―হ‍্যাঁ, জানি। তোমার বাড়ির দাম নিয়ে কথা বলতে বলতে কদিন আগে তোমার কথা বলছিল বিল্টু। ওর মুখেই শুনলাম যে তুমি এখন মাসে দেড়লাখ টাকা মাইনে পাও।

সুজিত বলল―তুমি বিয়ে করোনি রুদ্র দা?

শেফালী সকলের পাতে আবার একটা করে কচুরী দিতে দিতে বললেন―করেনি এতদিন। এবার করবে।

সুমিত বলল―গ্ৰেট। তাহলে নিশ্চয় ইনভাইট করতে এসেছো আমাদের?

নীপা খেতে খেতে মুখ নীচু করল লজ্জায়।

শেফালী অলোক ঘোষের চিঠিটা দিলেন সুজিতের হাতে। সুজিত চিঠিটা পড়ে এগিয়ে দিল সুমিতের দিকে।চিঠি পড়ে সুমিত বলল―দিদি রাজি?

শেফালী বললেন―হ‍্যাঁ। অনেক চেষ্টায় রাজি করিয়েছি।

রুদ্র বলল―বাবা তোমাকেও একটা চিঠি দিয়েছে।কিন্তু সেই চিঠির প্রয়োজন হলে,তবেই দিতে বলেছিলেন। নীপা রাজি। তাই এবার তোমার  চিঠিটা পড়ো।

       পরিবারের চারজন সদস‍্যই পরপর পড়লো চিঠিটা। অলোক ঘোষ লিখেছেন―আপনি আমাকে দাদা বলতেন বৌঠান।তাই আমার একান্ত অনুরোধ ছোট বোন হিসাবে আপনি যদি আমার বাড়িতে জীবনের বাকি দিনগুলো থাকেন,তাহলে অকালে মা হারানোর কষ্টটা রুদ্র কিছুটা ভুলতে পারে। আমি জানি ও কখনো আপনার অসম্মান করবে না।

আপনি নিশ্চিন্তে আসতে পারেন।

শেফালী বললেন―যাব তো নিশ্চয়। আমাকে ছেড়ে যেতে হওয়ার ভয়ে যে মেয়ে এতদিন বিয়ে পর্যন্ত করতে চায়নি, তার সঙ্গেই বাকি জীবনটা কাটাবো।

       *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *

       দেখতে দেখতে একটা মাস পেরিয়ে গেছে কোথা দিয়ে। আজ তিরিশে শ্রাবণ। এমাসের শেষ বিয়ের দিন আজ। দুদিনের ছুটি নিয়ে এসেছে সুজিত। বাঙ্গালোর থেকে স্বামী ও ছেলেকে নিয়ে এসেছে রূপা। বাড়িতেই এসেছেন ম‍্যারেজ রেজিস্ট্রেশন অফিসার। রুদ্র আর নীপার বিয়ে হয়ে গেছে সন্ধ‍্যে সাতটায়। কাল সকালে নীপা ও শেফালীকে নিয়ে যাত্রা করবে রুদ্র। শেফালী গোছগাছে ব‍্যস্ত। বর্ধমানের বড় রেস্তোরাঁ থেকে রাতের খাবার এসেছে। ডায়নিংটেবিলে বসে রাজকীয় খাবার খেতে খেতে সুমিত বলল― সুজিত!এতদিন তুই বলতিস, তুই নাকি আমার ভাগ‍্যকে হিংসা করিস। বলতিস, আমি নাকি রাজকন্যা আর রাজত্ব একসাথে লাভ করতে চলেছি। আমার ব‍্যাপারটা তো দিদির কাছে নস‍্যি। দিদি এইবয়সে একসঙ্গে আসল রাজপুত্র আর রাজত্ব লাভ করল। এখন তো ওর ভাগ‍্যকেই হিংসা হচ্ছে আমার।

রূপা বলল― আসলে কি জানিস ভাই, ঈশ্বর দিদির মতো ভালো মানুষের জন‍্য ভান্ডার ভরিয়ে রাখেন। ঠিক সময়মতো উপুড় করে ঢেলে দেবেন বলে। এসব তো তারই পাওয়া উচিত, যে কখনো নিজের পাওয়া না পাওয়ায় দিকে তাকায়নি। আসলে সবটাই দিদির ত‍্যাগের জন্য তাঁর দেওয়া পুরস্কার।

শেফালী বললেন―হ‍্যাঁ, শেষ হাসিটা সেই হাসতে পারে,যাকে তিনি দয়া করেন। তবে ঈশ্বর শুধু নীপাকেই করুণা করেননি। আমার মতো অভাগা মানুষকেও অনেক দয়া করেছেন। তাই আমি দায়মুক্ত করে যেতে পারবো আমার গর্ভজাত পুত্রসন্তানদের।

নীপা বলল―মা,আমি কিন্তু তোমার প্রথম সন্তান। তাই তোমার ওপর আমার দাবি  সবচেয়ে বেশি। oআমি যেখানে থাকবো, সেখানেই থাকতে হবে তোমাকে। 


রাকেশ ঘোষাল

Comments

Popular posts from this blog

গ্রীষ্মের_ছুটিতে ছাত্রের লেখা খোলা চিঠি