ঝরা বকুলের গন্ধ
বকুল আমাকে সকালের জলখাবারে লুচি আর বেগুন ভাজা দিয়ে গেল। এই বকুল বলে মেয়েটিকে আমার বউ জোগাড় করে এনেছে বাড়ির কাজকর্ম করার জন্য। সকাল বেলা আসে আর সন্ধ্যেবেলায় বাড়ি চলে যায়। মেয়েটির স্বভাব ভাল। কোনও দাবি দাওয়া নেই। কাজেকর্মেও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। নিজের মতো করে গুছিয়ে সব কিছু করে রাখে। মাস তিনেক হল জয়েন করেছে। তখন থেকে ওর উপর সংসারের ভার নিয়ে আমার ঘরণী নিশ্চিন্ত। এই যেমন আজ রবিবার ছুটির দিনে দাদাবাবুকে দেখভালের দায়িত্ব দিয়ে উনি গিয়েছেন বাপের বাড়ি। সেই সন্ধ্যেবেলায় ফিরবেন।
বকুল এখন কলিন্স দিয়ে ড্রেসিং টেবিলের কাঁচ মুছছে পরম যত্নে। লুচি খেতে খেতে আমার চোখ ঐদিকে ঘোরাফেরা করছে। কচি মেয়ে, স্লিম চেহারা। হাতের মুভমেন্টের সঙ্গে সমস্ত শরীর দুলে দুলে উঠছে যা আমার হৃদয়ে তরঙ্গ তোলার পক্ষে যথেষ্ট। আয়নার মধ্যে দিয়ে আমার চোখে চোখ পড়তেই বকুল মুচকি হেসে জিজ্ঞাসা করল - "আর লুচি দেব দাদাবাবু?" আমি ঘাড় নাড়লাম।
হঠাৎ মনে পড়ল বকুল দিন কয়েক আগে হাজার দশেক টাকা ধার চেয়েছিল আমার বৌয়ের কাছে। ওর বাবার কি যেন অপারেশন হবে। মাসে মাসে মাইনের টাকা থেকে কেটে নিলেই হবে। যদিও ওই পরিমান টাকা আমার হাতের ময়লা, তবুও মিসেস আমার কাছে কথাটা পাড়তেই আমি পত্রপাঠ না করে দিলাম। মিসেস গাইগুঁই করলে বললাম - "দেখ, এই সমস্ত মেয়েছেলেদের কোনও বিশ্বাস নেই। আজ তোমার থেকে দশ হাজার টাকা হাতিয়ে কাল থেকে যে ডুব মারবেনা তার কোনও গ্যারান্টি আছে?"
আমি বকুলের দিকে তাকিয়ে বললাম - "হ্যারে, তুই নাকি দশ হাজার টাকা ধার চেয়েছিস শুনলাম।" বকুল উল্লসিত হয়ে বলল - "হ্যাঁ, দাদাবাবু। বাবার প্রস্টেট অপারেশন হবে। টাকাটা খুব দরকার।"
আমি বললাম - "দুপুরে খাবার পরে আমার ঘরে আসিস, দিয়ে দেব।"
দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পরে আলমারি থেকে গুনে গুনে কুড়িটা পাঁচশো টাকার নোট টেবিলের উপর রেখে খাটের উপর বসে বকুলের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। কিছুক্ষণ বাদেই কাজকর্ম মিটিয়ে বকুল ঢুকল ঘরে। আমি বললাম - "এই নে, পুরো দশ হাজার টাকা আছে।" বকুল একবুক কৃতজ্ঞতা নিয়ে টাকাটা নিতে কাছে আসতেই বুকের উপর টেনে নিলাম ওকে। ওর মাথাটা পেছন থেকে আঁকড়ে ধরে ঠোঁটের মধ্যে ডুবিয়ে দিলাম ঠোঁট।
বকুল এক ঝটকায় আমাকে সরিয়ে দিয়ে বলল -"কি হচ্ছে দাদাবাবু? ছি! আপনার না বিয়ে করা বউ আছে?" আমি বললাম - "চটছিস কেন? কত টাকা চাই? তোকে আরও টাকা দেব।"
বকুল ঝাঁঝিয়ে উঠে বলল - "আমরা গরীব হতে পারি, কিন্তু নোংরা নই। সেরকম হলে লোকের বাড়ি কাজ না করে ওই লাইনে যেতে পারতাম। আমার যা গতর, অনেক রোজকার করতাম।"
এই বলে টাকাগুলো খাটের উপর ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বকুল বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
সঙ্গে সঙ্গে একরাশ অপরাধ বোধ আর দুশ্চিন্তা গ্রাস করল আমাকে। মনে হল কাল সকালে এসে অবধারিতভাবে বকুল কথাগুলো ফলাও করে বলবে আমার বউকে। তখন কি অজুহাত দেব তাকে? সঙ্গে সঙ্গে মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। ভাবলাম বকুলকে চুরির দায়ে ফাঁসালে কেমন হয়?
যেমন ভাবা তেমনি কাজ। সন্ধ্যেবেলায় বউ বাপের বাড়ি থেকে ফিরতেই বললাম - "এইযে, তোমার গুণধর চাকরানীর কান্ড শুনেছ?"
"কি হয়েছে?" বউ বলল। আমি বললাম - "ওকেই দশ হাজার টাকা দেব বলে টেবিলের উপর রেখে বাথরুমে গিয়েছিলাম। ফিরে এসে দেখি টাকার বান্ডিল হাওয়া। তখন কিন্তু ঘরে ও ছাড়া কেউ ছিলনা। তখনই বলেছিলাম এই জাতীয় মেয়েছেলেদের স্বভাব চরিত্র ভালো হয়না। আজ দশ হাজার টাকা সরিয়েছে, কাল গয়না গাটি সরাবে। তুমি কাল সকালেই পাওনা গন্ডা মিটিয়ে ওকে পত্রপাঠ বিদায় করে দাও।"
পরদিন সন্ধ্যেবেলায় অফিস থেকে ফিরে যখন শুনলাম বকুলকে ছাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, আমি বুক ভরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। যাক, আপদ বিদায় হয়েছে।
এর কয়েকমাস বাদে অফিস যাবার সময় বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছি, হঠাৎ বকুলের সঙ্গে দেখা। আমি না দেখার ভান করে অন্যদিকে মুখ ঘোরাতে যাব, বকুল এগিয়ে এসে বলল - "দাদাবাবু ভাল আছেন?"
আমি বললাম - "তুই কেমন আছিস? বাবার অপারেশন হয়েছে?"
"হ্যাঁ" বকুল বলল - "বাবা এখন ভাল আছে"।
- টাকা কোথা থেকে পেলি?
- বউদি দিয়েছিল।
- এখন কোন বাড়িতে কাজ করছিস?
- একটা স্কুলে আয়ার কাজ করি। বৌদিই ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। বলেছিল - "এখানে হায়নার সঙ্গে বাস করতে পারবিনা। নজর যখন একবার পড়েছে, আবার কোনওদিন ছিঁড়ে খাবে। তুই মেয়েটা খুব ভাল। তোকে আমি সৎপথে রোজগারের অন্য উপায় করে দিচ্ছি।"
রাকেশ ঘোষাল
Comments
Post a Comment