ভালো থেকো কলকাতা

 


এই স্কুলটা কি জয়েন না করলেই নয়? কি এমন মাইনে দেবে ওরা? একটা পাতি পঞ্চায়েত স্কুল .... কলকাতায় কি চাকরির অভাব ?" কফিতে চুমুক দিতে দিতে সায়নী কে কথাগুলো বলল অর্পণ।


 কয়েক মাস পরেই সায়নীর সাথে অর্পনের বিয়ে ।কয়েক বছরের প্রেম, তারপর ওরা বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয় । কফিকাপটা একটু পাশে সরিয়ে রেখে টেবিলে আপন মনে আঁকিবুকি কাটতে থাকে সায়নী । 


অর্পণ আবার বলে― ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড সায়নী....  আমার ফ্যামিলি .. বাবা মা কেউই এই ব্যাপারটাতে রাজি নয় । আমাদের কারোরই তোমার চাকরি করা নিয়ে কোনো সমস্যা নেই ।সমস্যাটা অন্য জায়গায় । ফালতু একটা পঞ্চায়েত স্কুল.. তোমার মত এডুকেটেড একটা মেয়ে, ওই স্কুলে গিয়ে পড়াবে! কত বেটার জব পাবার যোগ্য তুমি। কিসের অভাব তোমার.. টাকা পয়সা কোন দিকে থেকে সমস্যা নেই.. তাহলে??


 নানা প্রশ্ন শুনতে শুনতে প্রথমবার উত্তর দেয় সায়নী― একদমই তাই.. কোন অভাব নেই আমাদের । আর পাঁচটা মধ্যবিত্তের মত ভালোভাবে খেয়ে-পড়ে বেঁচে থাকার সাধ্য আমাদের আছে। অভাব কি জিনিস আমরা জানি না। আর সেই কারণেই আমি বড় বড় অফিস , স্কুল , কলেজ ছেড়ে ওই পাতি পঞ্চায়েত স্কুলে যেতে চাই ।ওই স্কুলে সেইভাবে কোন ভাল টিচার নেই জানো। এখনো আঠারো বছর হওয়ার আগেই কত মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয় । কত ছেলেমেয়ে পয়সার অভাবে টিউশন পড়তে পারে না। স্কুলেও সেভাবে কেউ গাইড দেয়না। আমার বাবার লক্ষ্মীপুরেই জন্ম। দশ-বারো বছর অব্দি ওখানেই ছিল, তারপর সবাই এখানে চলে আসে । কলকাতাতেই বাবার চাকরি .. সংসার। ছোট বেলায় বাবার সাথে কয়েকবার গেছিলাম তবে ওই এক-দু'দিনের জন্য। সবকিছুর মাঝে ভুলেই গেছিল বাবা গ্রামটাকে.. সে কথা বাবা নিজেও স্বীকার করে। কয়েক মাস আগে গ্রামের বাড়িতে গিয়ে বাবা দেখতে পায় বদলায়নি এখনো কিছুই। একটু উন্নতি হয়েছে তবে সে একেবারেই চোখে পড়ে না । 


ফিরে এসে শান্ত চুপচাপ হয়ে বাবা আমায় বলেছিল― ভুল করলাম রে মা....জীবনে হাজার হাজার টাকা রোজগার করেছি তবে ভুলে গেছি যেখানে জন্মালাম সেই ছোট্ট গ্রামটার কথা। তুই একবার চেষ্টা করে দেখবি! অভাব তো কিছু নেই আমাদের ... যদি ওই গ্রামে গিয়ে ছেলেমেয়েগুলোকে পড়াস বিনা টাকা-পয়সায়। কিছুটা হলেও যদি ওদের আশার আলো দেখাতে পারিস।


তারপর আমি গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধানের সাথে যোগাযোগ করি। কথাবার্তা বলে আমি ঠিক করেছি আমি ওখানেই পড়াবো।


― ওয়াও..... যে গ্রাম এত বছরেও এগোতে পারল না... তুমি গিয়ে সেই গ্রাম কে একেবারে কলকাতা বানিয়ে দেবে। কান্ট বিলিভ ...এই ছেলেমানুষীগুলো তোমার এখনও গেল না ।


― একদিন বোধ হয় এই ছেলেমানুষী গুলোর জন্যই ভালোবেসেছিলে আমায়। ছেলেমানুষী গুলোই তোমার বড্ড বেশি প্রিয় ছিল । আজ চাকরি পেয়ে , প্রতিষ্ঠিত হয়ে ইচ্ছে গুলো বদলে গেল?


― বদলাতে হয়.. সময়ের সাথে পা মিলিয়ে চলতে হয় আর পেছনে তাকালে পিছিয়ে পড়তে হয়। রিয়্যালিটি টা বুঝতে শেখো ।


― এগিয়ে চলা মানে কি শুধু শহরকে কি নিয়ে যাওয়া? শুধু কলকাতা কে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া? নাকি গ্রামের মানুষজনকে পিছনে ফেলে শুধুমাত্র নিজেদের চিন্তা করে এগিয়ে যাওয়া? আমি জানিনা আমি কতটা পারব... কিন্তু বিশ্বাস করো, গ্রামের একটা নাবালিকার বিয়েও যদি আমি বন্ধ করতে পারি, একটা ছেলেকেও যদি চাকরি পেতে সাহায্য করতে পারি ... আমার কাছে সেটা অনেক বড় পাওনা হবে। 


― মোট কথা তুমি শুনবে না তাইতো ? তুমি তোমার মতই চলবে!


 একটু চুপ থেকে সায়নী জানায়― আমি যাব .. যেতে আমাকে হবেই।


 একটু হেসে অর্পণ বলে ― বেশ যাও.. বিয়ের আগে অব্দি নিজের মন মর্জি মতো চলো, পরের ব্যাপারটা নয় আমি বুঝে নেব । 


মাঝে মাঝে অর্পণের মাথা গরম হয়ে যায় সেটা সায়নী ভালো করেই জানে। পরে আবার ঠিক হয়ে যায়। তাই আর কোনো কথা না বাড়িয়ে উঠে আসে দুজন ।


পরেরদিন লক্ষীপুর যাওয়ার জন্য খুশি মনে নিজের ব্যাগ গোছাতে থাকে সায়নী । নরেন বাবু বলেন― শুধু আমার ইচ্ছে রাখতে এই কলকাতা ছেড়ে তোকে ওখানে গিয়ে থাকতে হবে.. তবে তোর কোন অসুবিধা হবে না দেখবি। তমাল আছে না! ওকে আমি বলেছি.. ও তোকে ঠিক দেখে রাখবে।


― শুধু তোমার কথা রাখতে নয় বাবা.. আমি যাচ্ছি আমার ইচ্ছায় । আর তমাল কে?


― ওমা চিনতে পারলি না? ছোটবেলায় তোর হরিশ কাকার বাড়িতে কতবার নিয়ে গেছি তোকে। ওই হরিশ কাকার ছেলে তমাল .. পড়াশুনায় খুব ভালো ছিল ছেলেটা জানিস ।মাধ্যমিক পাস করেছিল খুব ভালো নাম্বার পেয়ে। হরিশ মরে যাওয়ার পর, মায়ের দায়িত্ব নিতে গিয়ে কাজে নামল তমাল । তোর থেকে মাত্র দুই বছরের ছোট ছেলেটা। তুই ছোটবেলায় দেখেছিস ওকে.. ভুলে গেছিস হয়ত।


 ―না না মনে পড়েছে একটু একটু.. আর তাছাড়া আমাদের নিজের বাড়ি যখন আছে ,থাকার অসুবিধা তো আর নেই। খাওয়া-দাওয়া  আমি ঠিক সামলে নেব।


 পরেরদিন পৌঁছাতে পৌঁছাতে দুপুর হয়ে যায় সায়নীর। ট্রেন থেকে নেমে লক্ষীপুরের মাটির রাস্তায় কিছুটা হাঁটতেই একটা ছেলে এসে পেছন থেকে রীতিমত লাফিয়ে দাঁড়ায় সামনে। চমকে ওঠে সায়নী । 


ছেলেটি বলে ― সায়নী দিদি না? এতগুলো ব্যাগ তুমি নিয়ে যাবে নাকি! আমি আছি কি করতে! আমায় দাও।


 কিছুটা বুঝতে পেরেই সায়নী বলে― তমাল ....? 


― ঠিক চিনেছ.. তোমায় দেখেই বুঝতে পেরেছি তুমি সায়নী দিদি । জ্যেঠুমনি আমাকে বলেছিল তুমি আসবে। তোমার কোন অসুবিধা হবে না ।যখন যা লাগবে আমাকে শুধু একবার হুকুম করবে , তোমার এই ভাই ঠিক হাজির হয়ে যাবে।

এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে থামল তমাল। 


*****    *****   *****   *****    ******   ******

পরের দিন থেকে স্কুলে জয়েন করে সায়নী। খুব বেশি ছাত্রছাত্রী নেই ..থাকলেও সবাই প্রতিদিন আসে না। কাটতে থাকে দিন। একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে সাইকেলের দোকানে কাজ করতে দেখতে পায় তমাল কে।

" কি ভীষণ মায়া জড়ানো ছেলেটার মুখে, খুব সহজে সবাইকে আপন করে নিতে পারে.." একটু দাঁড়িয়ে আপন মনে কথা গুলো ভাবছিল সায়নী।


 সায়নী কে দেখতে পেয়ে তমাল উঠে এসে জিজ্ঞেস করে― পড়ানো শেষ হল দিদি?


 সায়নী মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলে.. তারপর বলে ― আচ্ছা এই গ্রামের সব বাড়ি তুমি চেনো ?


― হ্যাঁ তা চিনি.. কেন বলোতো ?


 তোমার সময় মতো তোমার সাথে বেরিয়ে বাড়ি গুলোতে একবার যেতাম, বুঝিয়ে বলতাম সবাইকে স্কুলে পাঠাতে ..।


তমাল রাজি হয়ে যায়। কয়েক দিনের মধ্যেই ওরা সব বাড়ি ঘুরে নেয় । অনেকে রাজি হয় ,অনেকে হয় না। তবু যারা রাজি হয় তাদেরকে নিয়েই এগোতে চায় সায়নী । তমালকে একবার বলে― আচ্ছা তুমি তো আবার পড়াশোনা শুরু করতে পারো.. তখন না হয় ছোট ছিলে কিন্তু এখন সাইকেলের দোকানে কাজ করেও বাকি সময় পড়াশুনার জন্য দিতেই পারো ।


―ধুর, ওসব এখন আর আমার দ্বারা হবে না , কিন্তু আমি খুব খুশি হয়েছি জানো দিদি। কেউ এ গ্রামে আসতে চায় না, সেখানে তুমি এসেছ ..পড়ানোর দায়িত্ব নিয়েছো.. আমার সময় যদি তুমি থাকতে, এমন করে বোঝাতে.. তাহলে হয়তো আমাকেও পড়াশোনাটা ছাড়তে হতো না।  যাইহোক ছাড়ো সে সব।


স্কুলে শিউলি বলে একটি মেয়ে বেশ কাছাকাছি চলে আসে সায়নীর । শিউলির প্রতি একটু বেশি দুর্বলতা ওর। পড়াশোনা শেখার একটা আগ্রহ আছে মেয়েটার মধ্যে কিন্তু হঠাৎ একদিন শিউলি জানায় আর পাঁচজনের মতো ওর বাড়ি থেকেও ওর বিয়ে ঠিক করেছে সামনের মাসে। খবরটা পেয়ে একটু ভেঙে পড়ে সায়নী। ইতিমধ্যেই আবার বাড়ি থেকে ফোন আসে । নরেন বাবু জানান , আগামীকাল বিকেলে অর্পণের বাড়ি থেকে কয়েকজন আসবে, আর অর্পণও। তাই দুপুরের মধ্যেই সায়নী যেন ফিরে আসে।


 সব শুনে তমাল বলে ― আমি তোমাকে কলকাতায় বাড়ি অব্দি পৌঁছে দেবো দিদি।


― আরে না না আমি চলে যাব ঠিক .. একাই তো এলাম ।


―তাহলেই বা, এখন দায়িত্ব আমার ..আমি তোমাকে বাড়ি অব্দি ছেড়ে তবেই আসবো।


 ট্রেনের গন্ডগোল এর জন্য দুপুরের মধ্যে ওরা বাড়ি পৌঁছাতে পারে না । কলকাতায় যখন পৌঁছায় তখন বিকেল চারটে। জমাটি মেঘে আকাশ ঘোর করে এসেছে ,বৃষ্টি নামল বলে ।একটা অটো ধরে দুজন রওনা দেয় । অটোতে দুটো ছেলে আর অটোচালক। তমালের সাথে গল্প করতে করতে, যেতে যেতেই একটু পরে সায়নী খেয়াল করে অটো অন্য রাস্তায় চলেছে। চারিদিক বেশ নির্জন। কিছু বলার আগেই অটো থেমে যায়। দুটো ছেলে টেনে নামায় সায়নী কে। পাশের জঙ্গলের দিকে নিয়ে যাবার চেষ্টা করতেই ,তমাল বাধা দেয়। অটো চালক কিছু একটা দিয়ে আঘাত করে তমালের মাথায়, তারপর তিনজন হামলে পড়ে সায়নীর ওপর ।


আঘাত পেলেও অচৈতন্য হয়ে যায়নি তমাল। কোনোমতে উঠে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে লোক জড়ো  করার চেষ্টা করতে করতে ইট আর লাঠি যোগাড় করে আঘাত করে তিনজনকেই ।ততক্ষণে বৃষ্টি নেমেছে, তমালের চিৎকারে এসে হাজির হয়েছে আরও দু তিন জন লোক। তারাও তমালকে সাহায্য করে সায়নী কে উদ্ধার করতে। অটো চালক ও বাকি দুজনকে ধরে পুলিশের কাছে নিয়ে যাওয়া ইত্যাদি কাজে কেটে যায় আরও এক ঘন্টা। ততক্ষনে নরেন বাবুর বাড়িতে এসে হাজির হয়েছে অর্পণ ও তার পরিবার ।


তমাল আর সায়নী যখন বাড়িতে ঢোকে তখন সন্ধে ছ'টা..। সায়নীর পোশাকের অবস্থা আর এলোমেলো চুল ও তমালের মাথায় আঘাতের চিহ্ন দেখে ঘটনার কিছুটা আন্দাজ করতে পারে সবাই । চোখ চাওয়াচাওয়ি চলতে থাকে বাকিদের মধ্যে।


 আত্মীয়দের মধ্যে একজন জিজ্ঞেস করে― কিছু হয়েছিল নাকি!... খারাপ কিছু?


 তমাল ওর ছেলেমানুষী মন নিয়ে বলে― কটা লোক ধরেছিল দিদিকে, কোন ক্ষতি হয়নি... আমি কিছু হতে দিইনি। ওরা সর্বনাশ করার আগে আমি ওদের মেরে মাটিতে শুয়ে দিয়েছিলাম।


 নরেন বাবু বলেন ― সব কথা পরে হবে... আগে যাও, তোমরা জামা কাপড় চেঞ্জ করে ফ্রেশ হয়ে নাও।


 কিছুক্ষণ পর ফ্রেশ হয়ে সায়নী বাইরে আসে ।আত্মীয় দের কথায় পরিষ্কার বোঝা যায় ব্যাঙ্গের সুর― যাই বলুন ... এভাবে অচেনা একটা ছেলের সাথে আপনার মেয়ের আসা উচিৎ হয়নি। একবার খবর দিতে পারতো অর্পণ কে। ও না হয় গিয়ে নিয়ে আসতো ।


আরেকজন আত্মীয় বলে ― সাবধান টা নিজের কাছে ..একবার কিছু ঘটলে যে বদনাম রটে তা কিন্তু মোছে না। আর এখন তো শুধুমাত্র আপনাদের বাড়ির মেয়ে নয় আমাদের বাড়ির হবু বউ। এই সব দিক একটু খেয়াল রাখতে হবে ওকে।


 সবার কথা মাথা নিচু করে চুপচাপ মেনে নেয় সায়নী। তারপর অর্পণ আর সায়নী বাইরে গিয়ে দাঁড়ায়। মনের সমস্ত রাগ উপরে দিয়ে অর্পণ বলে ― ইচ্ছা মিটেছে তো, মহান হওয়ার ইচ্ছা ?আমার গায়ে কালি  লাগিয়ে আনন্দ পেয়েছো তো? তা ঠিক কি কি হয়েছিল তোমার সাথে? ওরা ঠিক কী কী করেছিল সায়নী ?


চেনা অর্পণের এক ভীষণ অচেনা মূর্তিতে অবাক হয়ে যায় সায়নী, বলে― তার মানে? ওরা কোন ক্ষতি করতে পারেনি আমার... তার আগেই...


― প্লিজ আমি সত্যিটা জানতে চাই ..ওরা কত দূর এগিয়েছিল? চরম সর্বনাশ টা হয়ে গেছে বলে নিজেকে বাঁচাতে সতী প্রমাণ করতে চাইছ না তো?


 ধৈর্যের বাঁধ ভাঙ্গে সায়নীর, ও বলে ― ধরে নাও সত্যি আমার ক্ষতি করেছে ওরা। তাহলে? কি বলতে চাইছো তুমি? ঠিক কি ইঙ্গিত করতে চাইছ? আর আমি অসতী কখনই নই, যাই ঘটুক না কেন তাতে আমার দোষ ছিল না। আমি তো ...


― তখনই বলেছিলাম কোন দরকার নেই ওখানে যাওয়ার.. আর একবারও আসার সময় আমাকে ফোন করা গেল না ? ওই তমালের সাথে আসতে হল .. কি বিশ্বাস আছে ওই ছেলেটা কে? ও নিজেও তো কিছু ঘটাতে পারত।


― তুমি বলতে চাইছো তুমি সাথে থাকলে কিছু হতো না... তুমি সাথে থাকলে ওরা কিছু করতে পারত না? আর ওই ছেলেটা ? ওই ছেলেটা কিন্তু আমাকে বাঁচিয়েছে... ওর প্রতি আমার বিশ্বাস আছে। 


― আচ্ছা .... তাহলে সম্পর্ক অনেক দূর গড়িয়েছে কি বলো?


 আর কোন কথা বাড়াতে ইচ্ছে করে না সায়নীর ।তমালের সাথে ওর সম্পর্ক টা ঠিক কি, সেটা বোঝাতেও মন চায় না ওর । যে অর্পণ কে এতদিন চিনত আজ সে ভীষণ  অচেনা। 


 সব কথা মনে রেখে চুপ করে যায় সায়নী।অর্পণ জানায়― তোমাকে এইভাবে একসেপ্ট করা আমার পক্ষে সম্ভব না.. 


হাসি মুখে সায়নী বলে― আজ তুমি আমায় মানলেও আমি আর মানতে পারব না। আমাকে রিজেক্ট করার যোগ্যতাটাও না আজ আর তোমার নেই। তোমার সাথে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব না।


দূরে দাঁড়িয়ে সব কথা শুনতে না পেলেও কিছু কিছু কথা কানে যায় তমালের। দু চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে ওর । খুব ইচ্ছে করছিল ওর ছুটে গিয়ে একবার বলতে যে ওর সায়নী দিদির সাথে কিচ্ছু হয়নি। আর ওদের সম্পর্কটাও নিষ্পাপ। কিন্তু সম্মান আর অসম্মানের হিসেব টা তমালও বোঝে তাই যে সম্পর্কে ওর সায়নী দিদিকে এত অপমান সহ্য করতে হয় সেই সম্পর্কর ভিত গড়তে ও নিজেও চায় না।


*****    ****   *****   *****   *****   *****  ****

সম্পর্কটা শেষ করলেও ভেতর থেকে একেবারে ভেঙে পড়ে সায়নী। পরের দিন সকালে তমাল কে বলে ―আমি আর ফিরবো না গ্রামে.. তুমি চলে যাও , ফিরেই বা কি করব ! মানুষগুলো তো বদলাবে না কিছুতেই.. শিউলির বিয়ে দিচ্ছে ওরা। পুলিশ নিয়ে হাঙ্গামা করে বিয়ে বন্ধ করতেই পারি, কিন্তু তাতে লাভ! আজ বন্ধ করব, তো কাল লুকিয়ে বিয়ে দেবে.. এইভাবে বদল আনা সম্ভব নয়। 


লুকিয়ে লুকিয়ে সায়নী কে চোখের জল ফেলতে দেখে কষ্টে তমালের বুকটাও ভারী হয়ে আসে ।ফিরে যায় গ্রামে । গ্রামের স্কুল, নরেন বাবুর পুরনো বাড়ি সবকিছুই যেন বড্ড খালি খালি লাগে । লক্ষ্মীপুর গ্রামে সায়নীর আগমন অনেকটা গ্রীষ্মের রোদ্দুরে এক পশলা বৃষ্টির মত ছিল । সারাটা গ্রাম যেন ভরিয়ে রেখেছিল সায়নী ।আজ সেই সব বড্ড খালি। স্কুলের ছেলেমেয়েরা আজও পড়তে আসে। ওদের চোখ প্রতিদিন খোঁজে সায়নী কে । 


বাড়িতে সায়নীরও মন বসে না। কিন্তু গ্রামে ফিরতে ও আর ইচ্ছে করে না ।কলকাতার রাস্তা দিয়ে ইউনিফর্ম পড়ে হেঁটে যায় কত ছেলে মেয়ে। স্কুল বাসে চলে যায় কত ছাত্র ছাত্রী, তাদেরকে দেখে আর মনে পড়ে লক্ষীপুরের কথা। মনে মনে ভাবে― এখানেই এবার একটা কোনো কাজ খুঁজতে হবে.. চুপ করে বাড়িতে আর কতদিন বসে থাকবো। সাজানো গোছানো পরিপাটি কলকাতা, এখানেই না হয় নিজেকে সাজিয়ে নেব। 


 কাটে আরো কটা দিন। একটা চাকরি জোগাড় করে ফেলে সায়নী, কলকাতাতেই। দুদিন পর জয়েনিং। আর সেই জয়েনিং লেটারটাই হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে বারান্দায়। মনটা মানছেনা কিছুতেই।  


হঠাৎ তমাল আর শিউলিকে আসতে দেখে চমকে যায় সায়নী― তোমরা এখানে ?


শিউলি সায়নীকে জড়িয়ে ধরে বলে ― ফিরে চলো দিদি ... বিয়ে আমি করবো না। আমি মা-বাবাকে বারণ করে দিয়েছি। আমি বলেছি আমায় জোর করে বিয়ে দিলে আমি পুলিশের কাছে যাব। পড়াশোনা আমাকে করতে দিতেই হবে । বাবাও আপত্তি করেনি, বলেছে তোর যখন ইচ্ছে তখন তাই হোক। কিন্তু তুমি যদি না পড়াও আমি পাশ করতে পারব না ।


তমাল বলে― তোমার কথা শুনে কত নতুন নতুন ছেলে মেয়ে ভর্তি হয়েছে স্কুলে .. তুমি ওদের পড়াবে না?


 সায়নী বলে― এত বড় কথাটা শোনার পরেও না বলি কি করে? সে ক্ষমতা আমার নেই.. তবে আমি ফিরব একটাই শর্তে।


― কি শর্ত ?


― তমালকে আবার পড়তে হবে ..আমি দায়িত্ব নেব , তবে ওকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করতেই হবে ।আরে সরকারি না হোক তবুও কিছু চাকরি তো পাবে । ওই সাইকেলের দোকানে কাজ করার থেকে তো ভালো।


― আমি...?? এই বয়সে ....


―লোকে কত বেশি বয়সে ভর্তি হচ্ছে, পড়াশোনা করছে... তোমার কি এমন বয়স? পড়াশোনার কোনও বয়স হয় না.. তোমার ইচ্ছেটাই আসল।


 তমাল বেশ আনন্দের সাথে বলে― ঠিক আছে ..কথা দিচ্ছি আমি পড়বো। ভালো করে মন দিয়ে পড়বো। তুমি শুধু ফিরে চলো । 


পাশে দাঁড়িয়ে নরেন বাবুর মুখ হাসিতে ভরে ওঠে। কলকাতায় নতুন চাকরিতে জয়েন করার চিঠিটা চেয়ারের ওপর নামিয়ে রাখতে রাখতে মনে মনে সায়নী বলে― আমার গ্রামকে ভালো রাখাটাও খুব জরুরী... ভালো থেকো কলকাতা ... তোমার বুকে হাজার সায়নী আছে তবে লক্ষ্মীপুরে আমি একাই। সেখানে আরও সায়নী তৈরি করতেই হবে। যেতে আমাকে হবেই।


 শিউলি আর তমালের হাত ধরে সায়নী রওনা দেয় লক্ষীপুরের উদ্দেশ্যে । এক নতুন আরম্ভের প্রতিজ্ঞা নিয়ে। মনের জোর আর সময় বদলে দেয় অনেক কিছু । আজ শিউলি যা পেরেছে হয়ত কাল বাকিরাও পারবে।


রাকেশ ঘোষাল

Comments

Popular posts from this blog

গ্রীষ্মের_ছুটিতে ছাত্রের লেখা খোলা চিঠি