রিপন দা

   


বিয়ের অনুষ্ঠানে বসে আছি।

সরি, বিয়ে না, বৌভাত। বিয়ে মিস হয়েছিল।

বরপক্ষের নেমন্তন্নতে এসেছি। বর আমার স্ত্রীর বড় মামা, এটা তার দ্বিতীয় বিয়ে। অত্যন্ত বিত্তবান একজন লোক। প্রথম স্ত্রী মারা গিয়েছেন বেশ কয়েকবছর হলো। দুই মেয়ে দুজনেই বিদেশে থাকে, স্বামী-সন্তান নিয়ে। মামা শেষ বয়সে একা একা থাকবেন, এ ভেবেই আবার তার বিয়ে করা। মামা ততটা বুড়িয়েও যান নি, এইতো, ষাট হবে তার বয়স। আসলে শেষ বয়সে একজন সঙ্গী  লাগে।

নতুন মামীরও এটা দ্বিতীয় বিয়ে। তবে না দেখে থাকলেও শুনেছি তিনি এতটা বয়স্কা নন। অল্পবয়সে বিয়ে করেছিলেন। পরে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। একটা ছোট ছেলে আছে, বয়স দশ-এগারো হবে। তারও নাকি বিয়ের ইচ্ছে ছিলো না, তাকেও জোর করে বিয়ে করানো হচ্ছে।

অনুষ্ঠানের এক সময়ে সবাই একে একে মঞ্চে উঠছে বর-বধূর সাথে ছবি তোলার জন্যে। আমিও স্ত্রী-কণ্যা নিয়ে উঠলাম। নতুন মামীর দিকে তাকিয়ে চোখ আটকে গেলো। কেমন যেন পরিচিত মনে হচ্ছিল। এদিকে পেছন থেকে এক আত্মীয় বউ-বাচ্চা নিয়ে তাগাদা দিচ্ছেন তাড়াতাড়ি করার জন্য, ওনার ছবি তুলতে দেরি হয়ে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি ছবি তুলে চলে এলাম।


বাড়ি ফিরছি উবেরে, তখনই হঠাৎ করে মনে পড়ে গেলো।

প্রায় বারো বছর আগের কথা।

ম্যাথের স্টুডেন্ট তখন আমি। ফার্স্ট ইয়ার। ক্যাম্পাসে, হলে, এই নতুন শহরে খাপ খাওয়াতে একটু কষ্ট হচ্ছিলো। গ্রামের ছেলে প্রথম বাড়ি ছেড়ে এলে যা হয় আরকি।

ফাইনাল ইয়ারে ছিলেন ডিপার্টমেন্টের বড়দাদা রিপন দা । খুব হেল্পফুল ছিলেন। পাশাপাশি অংকের টিউশনও দিতেন। খুব নাম-ডাক ছিলো তার।

আমাকে রিপন দা খুব সাহায্য করতেন। আমিও বড়দাদা মেনে নিয়েছিলাম তাকে। অন্যরকম মানুষ ছিলেন তিনি।

রিপন দায়ের ও প্রেম ছিলো এক দিদির সাথে। দিদির বাবা ছিলো না, দাদুর বাড়ি থাকতেন মা আর ছোট ভাইকে নিয়ে। মাঝে মাঝে আসতেন ক্যাম্পাসে, রিপন দার সাথে হাত ধরাধরি করে হাঁটতেন। খুব ভালো লাগতো আমাদের।

রিপন দা প্রচুর টাকা কামাতেন টিউশনি করে।

নিজের আর বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অল্প কিছু রেখে বাকি টাকা উনি দুভাগ করতেন। একভাগ পাঠাতেন বাড়িতে, আর একভাগ দিতেন সেই দিদিকে। রিপন দা মিথ্যে বলতেন না, আদর্শবাদী লোক ছিলেন। তার প্রেম ছিলো পবিত্র। বিয়ের আগে শারীরিক সম্পর্ক তিনি ঘৃণা করতেন। আমরা জানতাম তিনি দিদিকে বিয়ে করেন নি। তবু তিনি প্রতিমাসে দিদি এবং দিদির পরিবারের খরচ দিতেন। একাজটা তিনি কেন করতেন, এ প্রশ্ন করলে শুধু বলতেন, ওটা তো আমারই দায়িত্ব।

তোর দিদিই তো তোর বৌদি । এভাবে আমার  প্রায় চারবছর তিনি ঐ দিদিকে এভাবে সাহায্য করে যাচ্ছিলেন।

সেই দিদি একদিন হারিয়ে গেলো। কোথাও পাওয়া গেলো না। ফোন বন্ধ, বাড়িতে গিয়ে জানা গেলো বাড়ি ছেড়ে পুরো পরিবার চলে গেছে। দিদি  একজায়গায় চাকরি করতেন, সেখানে গিয়ে দেখা গেলো চাকরি ছেড়েছেন প্রায় ছ মাস হলো। রিয়াদ দাদা আমাকে নিয়ে গ্রামে গেলেন। সেখান থেকে খবর পাওয়া গেলো, তারা ভিটে বাড়ি বিক্রি করে বিদেশ চলে গেছেন।

রিপন দা মেনে নিলেন না। প্রতিদিন সকালে উঠে বেরোন, রাতে ফেরেন। হাসপাতাল, থানা, রাস্তায় রাস্তায় খুঁজে বেড়ান। সড়ক দুর্ঘটনার খবর তদন্ত করেন। তার লেখাপড়া তিনি নিজেই বন্ধ করে দিলেন। তার জীবনের উদ্দেশ্যই তখন ছিলো দিদিকে খুঁজে বের করা।


কিছুদিন পর একজন ফোন করে রিপন দার সাথে দেখা করতে চাইলো। বললো, দিদির ব্যাপারে কথা বলবে। রিপন দা যেন জীবন ফিরে পেলেন। আমাকে সাথে নিয়ে গেলেন।

একটা ছেলের সাথে আমাদের দেখা হলো। সে আমাদের পরিচয় দিলো না।

একা কথা বলতে চাইলো রিপন দার সাথে। রিপন দা জোর করে আমাকে সাথে রাখলেন।

সে রিপন দা কে যা বললো সেটা আমরা বিশ্বাস করতে পারলাম না। সে বললো, রিপন দার মতো অনেকের সাথেই দিদির সম্পর্ক ছিলো, সবার কাছ থেকেই তিনি টাকা নিতেন। এই ছেলেটাও দিদির অনেক প্রেমিকের একজন, অনেক কষ্টে সে বের করেছে রিপন দাকে। এখন দিদি দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। ছেলেটা চায় রিপন দা তার সাথে যাবেন আর মেয়েটাকে আইনের হাতে তুলে দিতে সাহায্য করবেন।

রিপন দা বিশ্বাস করলেন না। কোনভাবেই তিনি বিশ্বাস করবেন না। তিনি শুধু বিড়বিড় করছিলেন "দেবী, দেবী"। ছেলেটা এক সময়ে বললো তার কাছে প্রমাণ আছে। সেটা সে রেখেছিলো মেয়েটাকে পুলিশে দেওয়ার পর আইনি লড়াইয়ে ব্যাবহার করতে। তবে এখন রিপন দাকে বিশ্বাস করাতে সে সেটা দেখাতে বাধ্য হচ্ছে।

এটা বলে সে একটা হ্যান্ডিক্যাম বের করলো। আমি দূরে সরে গেলাম। সেখানে সে রিপন দাকে কি দেখিয়েছিলো আমি জানি না। শুধু দেখলাম রিপন দা কিছুক্ষন অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন ক্যামেরার দিকে। তারপর উঠে একটা টান দিয়ে ছোট ক্যাসেটটা খুলে ফিতেগুলো খাওয়া শুরু করলেন।

আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। ছেলেটাও একই অবস্থা।

রিপন দা ক্যামেরাটা রেখে দিলেন। আর ক্যাসেটটা ভেঙে ফেললেন। তখনো ফিতাগুলো তিনি চাবিয়ে যাচ্ছেন।

আমি ছেলেটাকে দিকে তাকালাম। সে ক্যামেরাটা মাটি থেকে তুলে কেঁদে ফেললো। আমি জানি না সে কেন সেদিন কাঁদতে কাঁদতে চলে গিয়েছিল। আমি জানি না সেই ভিডিওতে কি ছিলো। শুধু জানি সেই মূহুর্ত থেকেই রিপন দা পাগল হয়ে গিয়েছিলেন।

যাওয়ার আগে আমি ছেলেটাকে দৌড়ে ধরেছিলাম। জিজ্ঞেস করেছিলাম কি ছিলো ভিডিওটাতে।


সে জবাব দিয়েছিলো। সে বলেছিলো সেখানে ছিলো সেই দিদির সাথে কাটানো তার একান্তই অন্তরঙ্গ মূহুর্তের ভিডিও। রিপন দা আসলে তারপরেও চান নি দিদির কোন ক্ষতি হোক। তাই ক্যাসেটটা নষ্ট করেছিলেন। কিন্তু বিশ্বাস ভঙ্গের  ধাক্কাটা সামলাতে পারেন নি।

রিপন দাকে নিয়ে সেদিন হলে ফিরেছিলাম। সেদিন থেকে তিনি পাগল হয়ে যান। ক্যাম্পাসের রাস্তায় বসে চক দিয়ে ক্যালকুলাস করতেন। একসময় তার বাড়ি থেকে তাকে নিয়ে যায়। আর কখনো দেখা হয়নি। আমরা লেখাপড়া  শেষ করে ক্যাম্পাস ছাড়ি। শুনেছিলাম রিপন দা পালিয়েছিলেন বাড়ি থেকে। এখনও কলকাতা  শহরের বিভিন্ন রাস্তায়, কখনো ধর্মতলা , কখনো পার্ক স্ট্রিট , কখনো রাজাবাজার , কখনো ক্যাম্পাসে তাকে রাস্তায় বসে চক দিয়ে জটিল সব অঙ্ক কষতে দেখা যায়।

সেই দিদিই আমার নতুন মামী।

বহুবছর আগে ক্যাম্পাসে দেখেছিলাম, আজ বিয়েতে দেখলাম। খুব বেশি তো পাল্টাননি তিনি!


আমি ভুলে গিয়েছিলাম রিপন দার কথা। তিনি আমার কাছে এতদিন একটা গল্পই হয়েছিলেন।

ভাবছিলাম আমার নতুন মামীকে ধরবো। প্রশ্ন করবো, ন্যায় চাইবো, কেন তিনি এমন করেছিলেন। পরে ভাবলাম, কি লাভ হবে এমনটা করে। রিপন দাও শেষে চেয়েছিলেন দিদির যেন সমস্যা না হয়। আমি ঠিক করলাম, আমি বরং সেই দেবতার মতো মানুষটার সাথেই আরেকবার দেখা করবো, রিপন দাকে খুঁজে বের করবো, একবার দেখা করবো।

ভার্চুয়াল জগতেও খুঁজে পেতে সময় লাগলো।

দুূদিন পর খবর পেলাম। ছুট লাগালাম তক্ষুনি। ভাবছিলাম রিপন দাকে বলবো দিদিকে খুঁজে পাওয়ার কথা, তিনি চাইলে শেষ দেখা করিয়ে দেবো।

পার্ক সার্কাস মোড়ে মাথাভর্তি সাদাচুলের হাফহাতা শার্ট পরা একটা লোক রাস্তায় চক দিয়ে অঙ্ক  করছে। তাকে ঘিড়ে সশ্রদ্ধ চোখে একদল মানুষ দাঁড়িয়ে। গাড়ি গুলোও রাস্তায় তার করা অঙ্কের  ওপর দিয়ে যাচ্ছে না, পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। তিনি মনে হলো কোথাও আটকে গেছেন। চক থেমে গেছে।

আমি তার পাশে দাঁড়ালাম। তিনি মুখ তুলে দেখলেন।

চিনতে পারলেন না। শিশুর মতো হাসলেন।

আর বললেন, 

"সরে দাঁড়াও। তুমি সূর্য্যের আলো আটকে দিচ্ছো।

পারলে অঙ্কটা  সলভ করতে আমাকে সাহায্য করো।"

আমি চোখে জল নিয়ে তার পাশে ফুটপাতে বসে পড়লাম। এ অঙ্কের  সমাধান আমার কাছে নেই।

কারো কাছেই হয়তো থাকে না।


রাকেশ ঘোষাল

Comments

Popular posts from this blog

গ্রীষ্মের_ছুটিতে ছাত্রের লেখা খোলা চিঠি