অন্য পুজো


"মা, আজ অফিস থেকে ফিরতে দেরি হবে, আবীরের সাথে পুজো শপিংএ যাবো!"


ব্রেকফাস্ট খেতে খেতে কাজে ব্যস্ত সাবিত্রী দেবীকে জানালো তার একমাত্র মেয়ে তিস্তা।  সাবিত্রী দেবীর তখন নিজেরও অফিসে যাওয়ার তাড়া, তবুও হবু জামাইয়ের জন্যে কিছু টাকা এনে মেয়ের হাতে গুঁজে দিয়ে বললেন, "আবীরকে আমার হয়ে পুজোর জন্যে ভালো কিছু কিনে দিস এটা দিয়ে। " তারপর ভয়ে ভয়ে যোগ করলেন, "এতে হবে তো রে?"


"আবীরের জন্যে তো ব্র্যান্ডেড ছাড়া কিনে লাভ নেই, ও  পরবে  না ! তুমি বরং আরেকটু দাও। "


মেয়ের হাতে আরো কিছু টাকা দিয়ে নিশ্চিন্ত হলেন সাবিত্রী দেবী। এত কাজের মধ্যে পুজো শপিংটা করার সময়ই হচ্ছিলো না। যাক তিস্তা আজ শপিং করতে গিয়ে ভালোই করছে !


ইতিমধ্যে কর্নফ্লেকসের বাটি খালি করে টেবিল থেকে উঠে পড়েছে তিস্তা। পুজোর আর মোটে দিন কুড়ি বাকি। খুব কড়া ডায়েটিং করছে মেয়ে এবার। আবীরের বন্ধুদের সাথে এবার প্রথম রাত জেগে পুজো দেখার প্ল্যান হয়েছে, তারা যেন তাকে মোটা বলার কোনো সুযোগই না পায়, মনে মনে ঠিক করলো তিস্তা। এবছর প্রথম আবীরের সাথে ঠাকুর দেখবে, সে চায় এবাবের পুজোটা হোক অন্য সব বারের থেকে আলাদা, অন্য সব বারের থেকে সেরা। 


দুপুরের স্যালাডটা ব্যাগে ভরে বেরিয়ে পড়লো সে গাড়ি নিয়ে অফিসের দিকে। রিয়ার ভিউ মিররের দিকে এক ঝলক তাকিয়ে ভাবলো, ইশ, হেয়ার স্পা আর ফেসিয়ালটা করতে হবে তো, পার্লারে বুকিং নিতে হবে এর মধ্যেই !" 


অন্যমনস্ক ভাবে হাত বাড়িয়ে রেডিওটা অন করলো সে, সকালে এই সময়টুকুই  একটু রেডিও শোনার অভ্যেস তার। একজন রেডিও জকি আবোলতাবোল বকে চলেছে, উফ্, এরা গান কম শোনায়, বকবক বেশি করে, বিরক্ত ভাবে ভাবলো তিস্তা।


"এবার পুজো কেমন ভাবে কাটাবেন আপনারা? কি আশা করছেন? নতুন কি করতে চান? চটপট ফোন করে জানান আমাদের।" বলে চলছিলো একজন  RJ, "এই তো আমাদের প্রথম বন্ধুটির ফোন এসে গেছে, চলুন দেখি  আমাদের এই কলার বন্ধুটি পুজো কিভাবে কাটাতে চান?"


একে অফিস টাইম, তার উপর বৃষ্টি, রাস্তার উপর মনোযোগ দিয়ে গাড়ি চালাতে চালাতে অন্যমনস্ক ভাবে শুনছিলো তিস্তা রেডিওটা। 


"হ্যালো, আমার নাম তিস্তা"  কচি শিশুকণ্ঠে নিজের নাম শুনে হটাৎ চমকে উঠলো তিস্তা। রেডিওর আওয়াজটা আরেকটু বাড়িয়ে দিলো সে। 


RJ তখন বলছিলো "বলো তিস্তা, কি ভাবে কাটাতে চাও তোমার পুজো?"


"নতুন জামা পরে। " চট করে এলো শিশু কণ্ঠের উত্তর।


RJ হেসে উঠলো, "সে তো সবাই পরে তিস্তা! তা তোমার কটা নতুন জামা হয়েছে?"


"এখনো একটাও হয়নি ! তবে আন্টি বলেছে কাকুদের বাড়ি থেকে যে জামাগুলো এসেছে, ওগুলো নতুন করে দেবে আমাদের।"


কিছুটা হতভম্ব RJ বলে উঠলো, "নতুন করে দেবে মানে? তুমি কি আন্টির সাথে থাকো?"


সলজ্জ কচি কণ্ঠের উত্তর এলো, "হ্যাঁ "!


-"তোমার আন্টির সাথে কথা বলতে পারি?"


ফোনে এলেন এক বয়স্ক মহিলা, "হ্যালো?"


- "আচ্ছা দিদি, এই কাকুদের জামা নতুন করে দেয়ার ব্যাপারটা কি? তিস্তা বললো আপনি ওর আন্টি, একটু বুঝিয়ে বলতে পারবেন?"


- "আসলে দিদি, এটি একটি অনাথ আশ্রম। আমি এখানে কাজ করি। পুজোয় এতগুলো বাচ্চাকে তো নতুন জামা দেয়া সম্ভব হয়না, তাই ডোনেশনে যে পুরোনো জামা আসে, ওটাই আমরা সেলাই করে ধুয়ে দেই ওদের। নতুন জামা তো পুজোতে পায়না, তাই মনের ইচ্ছেটা বোধহয় আপনাদের ফোনে জানিয়েছে ।"


RJ র মতো কণ্ঠরুদ্ধ হয়ে এলো তিস্তারও। একই শহরে একই চাহিদা নিয়ে একই পুজো দেখবে দুটি একই নামের মেয়ে। অথচ কত পার্থক্য দুজনের জগতে! নিজের ছোটবেলার কথা মনে পড়লো তার। ছোট্ট তিস্তার পুজো মানেই তো ছিল কটা নতুন জামা হলো! আর এই ছোট্ট তিস্তা কিনা আজ পর্যন্ত পুজোতে একটা নতুন জামা পায়নি? স্তম্ভিত রেডিও জকিও নিজেকে সামলানোর জন্যে একটি গান চালিয়ে আশ্রয় নিলো তার আড়ালে। কিন্তু একটা ভাবনা সারাদিন ব্যথিত করতে থাকলো তিস্তাকে, "কেন এই বৈষম্য, কেন এই বিভেদ?"! মনের ভিতর থেকে যেন একটাই উত্তর সে পেলো বারংবার "কারণ এই বিভেদ দূর করার কোনো চেষ্টাই আমরা করিনি"!


বিকেলে কিছুটা আনমনা হয়েই  শপিং মলের বাইরে দেখা করলো সে আবীরের সাথে। মায়ের কথা মত একটা ভালো জামাও  কিনে দিলো সে আবীরকে।


-"তুমি কিছু নিলে না? চলো, এবার তোমার শপিংটা করি। " আবীর বলে উঠলো তিস্তাকে।


-"আমার ইচ্ছে করছে না!"


-"সেকি, কোনো? আমি কিছু শুনবনা, আমি আমার তিস্তাকে একটা ভালো শাড়ি দিতে চাই ! ওটা পরে আমার সাথে ঠাকুর দেখতে বেরোবেন, বুঝলেন ম্যাডাম?" হাসতে হাসতে বললো আবীর।


 তিস্তাকে আনমনা দেখে অবাক হয়ে সে আবার বললো "তোমার কি হয়েছে বলতো? শপিংএ মন নেই তোমার, এমন তো আগে কখনো দেখিনি?"


-"আমাকে সত্যি কিছু গিফ্ট করতে চাও? তাহলে চল আমার সাথে এক জায়গায়!"


আবীর আর কথা না বাড়িয়ে বেরিয়ে পড়লো তিস্তার সাথে। উত্তর কলকাতার একটি জীর্ণ বাড়ির বাইরে এসে থামলো তারা। বাইরে বোর্ডে বড় করে লেখা একটি অনাথ আশ্রমের নাম। ভিতরে গিয়ে মেট্রনকে বললো তিস্তা, "আমি তিস্তার সাথে দেখা করতে চাই!"


মিনিট দুয়েক পর একটি রোগা, বছর পাঁচেকের শিশু তাদের সামনে এসে দাঁড়ালো। 


"তুমি জানো, আমার নামও তিস্তা?" বিস্মিত শিশুটিকে জানালো তিস্তা। আবিরের দিকে ফিরে বললো "কিগো, তুমি যে বললে তিস্তাকে গিফ্ট দিতে চাও?"


হেসে ফেললো আবীরও। 


অনাথ আশ্রমটিতে এমন জনা কুড়ি বাচ্চা থাকত, তাদের সাথে গল্প করে, হৈচৈ করে দিব্যি কাটলো তাদের সন্ধেটা। পরের দিন দুজনের পুজোর পুরো বাজেট মিলিয়ে কুড়িটি বাচ্চার জন্যে জামা কিনতে বেরোলো আবীর আর তিস্তা। নতুন জামা পেয়ে উৎসাহিত ছোট্ট তিস্তা দৌড়ে এসে বলে উঠলো, "দিদি, তুমি আর দাদা আমাদের পাড়ার পুজোয় এস কিন্তু। খিচুড়ি ভোগ খেয়ে যাবে। "


সেবছর অষ্টমীর দিনে অঞ্জলি দিলো তারা কুড়িটি নতুন পোশাকে সজ্জিত খুদের সাথে। কচি হাতে যখন শাল পাতার বাটিতে ভোগের খিচুড়ি এনে দিলো তারা, তিস্তার খেয়ে মনে হলো, এই ভোগের স্বাদ যেন আলাদা। 


চারটে পুচকে ছেলের সাথে মার্বেল পাথর নিয়ে ব্যস্ত আবীরের দিকে তাকিয়ে ভাবলো তিস্তা, সত্যি এবারের পুজোটা হলো অন্যবারের থেকে একদম আলাদা। ছোট্ট তিস্তার ফ্রকের বেল্টটা বেঁধে দিতে দিতে মুচকি হাসলো সে, এবছর দুই তিস্তারই পুজো যে কাটলো ঠিক তাদের মনের মতন করে !


রাকেশ ঘোষাল

Comments

Popular posts from this blog

গ্রীষ্মের_ছুটিতে ছাত্রের লেখা খোলা চিঠি