টিউশন_ফি

 

ছয় বছরের ব্যবধান স্বত্বেও দুই ভাইয়ের মনের  মিল ছোট্ট বেলা থেকেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবধান অবশ্য আরো অনেক ভাবেই প্রকাশ পেল কিন্তু তাদের মধ্যে ভাবের কোনো অভাব ঘটলো না। 


দাদা প্রতিম স্কুল থেকে ইউনিভার্সিটি সব স্তরেই কৃতিত্বের পরিচয় রাখলেও এবং তার নিরলস প্রচেষ্টার পরেও ভাই মনিশ সাধারণ নম্বর নিয়েই উচ্চ-মাধ্যমিক পাশ করল। 


প্রতিম পিএইচডি শেষ করার আগেই মনিশ বি.কম পাশ করে মা - বাবা ও দাদার আশীর্বাদ নিয়ে ঠিকাদারি ব্যবসায় প্রবেশ করল। এক বছর পরেই প্রতিম যখন শহরের প্রথম সারির কলেজে অধ্যাপনা শুরু করল তার এক মাসের মধ্যেই মনিশ তার প্রথম বড় বরাত পেয়ে গেল। এর পর থেকে ক্রমশ মাসের শুরুতে বাবার হাতে তুলে দেওয়া দুই ভাইয়ের সংসার খরচের পরিমাণে সামঞ্জস্য রইল না। তবে এই নিয়ে দুই ভাইয়ের কাউকেই বিশেষ বিচলিত বলে মনে হয়নি কখনোই। 


প্রতিম এর সঙ্গে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠিনী আভার বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার কিছু দিনের মধ্যেই  বোঝা গেল ব্যবসা থেকে সময় নষ্ট করে নিজের জন্য পাত্রী সন্ধান করার কোন ইচ্ছেই মনিশের নেই। বছর তিনেক এর মধ্যেই সম্বন্ধ করে মেঘার সঙ্গে মনিশের বিয়ে দেওয়া হল। 


নিজের নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও বছরে একবার দুই ভাই সস্ত্রীক মা বাবাকে নিয়ে ছুটি কাটাতে বেরিয়ে পরত। গন্তব্য সেই বাঙালির চিরকালের পুরী বা দার্জিলিঙে হলেও সবাই এক সঙ্গে সময় কাটানোর আনন্দই ছিল মুখ্য। বছর কয়েক এর মধ্যে এই পর্যটকদের  দলে প্রতিমের পুত্র ঋভু এবং আর দুই বছরের পরে মনিশ এর কন্যা তৃপ্তি যোগ হয়ে আনন্দ বহু গুণ যেন বৃদ্ধি পেল।


তবে সব অনর্থের মূলেই অর্থ - এই সংসারেও তার অন্যথা হল না। প্রথমে বাবা ও তার বছর খানেকের মধ্যে মা চলে গেলেন বউমা-দের উপর সংসারের ভার ছেড়ে। সংসার খরচের অসম ভাগ নিয়ে মেঘার আপত্তি ছিল আগে থাকতেই। মেঘার এও মনে হতে লাগল তার স্বামীর মোটা আয় অনুযায়ী বিলাস বহুল জীবন যাপন না করতে পারার এক মাত্র কারন ভাসুরের অপেক্ষাকৃত স্বল্প সামর্থ্য। মেঘার উপচে ওঠা পয়সার গরম এর বিপরীতে আভার বিদ্যা নিয়ে গুমর স্বামীর পেতে থাকা নানাবিধ সম্মানের সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকলো। 


এই টানাপোড়েনে দুই  ভাইয়ের যৌথ সংসারে লক্ষী সরস্বতীর সহাবস্থান আর টিকিয়ে রাখা গেল না।  নিত্য অশান্তির জেরে মনীশই বউয়ের উপর চরম বিরক্তি নিয়ে দাদাকে সংসার ভাগ করে নেওয়ার প্রস্তাব দেয়। প্রতিম সম্মতি জানিয়ে  বলে - "এর জন্য আভা বা মেঘার উপর আমরা রাগ করতে পারি না। মনে রাখিস ওরা কিন্তু বোন নয়।" অবাক হয়েছিল মনীশ। ভেবেছিল এই মানুষটার থেকে আরও কত কিছু শিখব। আরও একবার মন থেকে প্রনাম করেছিল দাদাকে।


বাবার রেখে যাওয়া দু তলা একান্নবর্তি বাড়িটা খুব সহজেই দুটো নিউক্লিয়ার  ফ্ল্যাট হয়ে গেল।   নিচের তলায় মেঘার বিলাস বহুল অ্যাপার্টমেন্ট। উপরে আভার ছিমছাম মধ্যবিত্ত সংসার।


পরিবারের এই ভাঙা গড়ায় অবশ্য ঋভু ও তৃপ্তির মধ্যে কোন ফারাক চোখে পড়ল না। ছোট বেলা থেকেই বিদেশী 'কাজীন' শব্দটা নিজেদের মধ্যে আসতে দেয়নি তারা। প্রজেক্টের কাজে কাকার অফিস ঘরের ল্যাপটপ ও প্রিন্টার ব্যবহারের জন্য ঋভুর অনায়াস যাওয়া আসা আগের মতোই চলতে থাকল। এদিকে ক্লাস ফাইভে উঠতেই তৃপ্তির পড়াশোনার দায়িত্ব যে কখন তার জ্যেঠু নিয়ে নিল সেটাও কেউ জানতেই পেল না। আভা অবশ্য বোঝানোর চেষ্টা করেছিল যে একটা ল্যাপটপ আর প্রিন্টার কিনে দিলে সম্মানটা বাঁচে। মেঘাও বারবার মনে করিয়ে দিয়েছিল যে আজকালকার আধুনিক সিস্টেমে পড়ানো কোচিং সেন্টারে পড়ালে তৃপ্তি অনেক ভালো রেজাল্ট করতে পারে। তবে শব্দ খরচ না করেও প্রতিম ও মনীশ হাবেভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিল যে এই উপদেশ গুলো তাদের কাছে বাহুল্য ছাড়া কিছু নয়।


বাড়ির ভাগাভাগির রেশ অবশ্য আর এক ভাবে পড়ল। বার্ষিক ছুটি আর ছাপোষা গন্তব্যে কাটাতে রাজি ছিল না ছোট বউ। সেই মত মনীশ কে এবার বিদেশ ভ্রমনের ব্যবস্থা শুরু করতে হল। প্রতিমের সাধ্যের বাইরে এই খরচ। তাই এক সঙ্গে ছুটি কাটানোর পারিবারিক প্রথাটিও নিঃশব্দে বাতিল হয়ে গেল। ছেলে বউকে খুশি দেখতে প্রতিম তার গন্ডি বাড়িয়ে দিল কেরালা রাজস্থান অবধি। ছেলে তাতেই খুশি হলেও আভার মন পুরোপুরি ভরলো না। 


কৃতি বাবার যোগ্য ছেলে ঋভু। ক্লাস টুয়েলভ্ পাশ করেই দেশের সেরা ইন্জিনিয়ারিং কলেজে সুযোগ করে নিল। ছেলে হস্টেলে চলে যাওয়ায় প্রতিম আরও বেশি করে মন দিল কন্যাসম ভাইঝির পড়াশোনায়। তৃপ্তিও জ্যেঠুর পরিশ্রমের যথাযথ মর্যাদা রাখল। দাদার ইন্জিনিয়ারিং পড়তে যাওয়ার দুই বছর পরে সে সুযোগ করে নিল অন্যতম সেরা ডাক্তারি কলেজে। 


মনীশ সস্ত্রীক এসে দাদা বৌদিকে প্রনাম করে খবরটা দিতেই প্রতিম যেন আনন্দের সঙ্গে একটু স্বস্তিও পেল। শিক্ষক হিসেবে পক্ষপাতীত্ব সে যে করেনি তা আজ প্রমাণ করে দিতে পেরেছে সে। আভা অবশ্য কোথাও যেন একটু হেরে গেল। মেঘার পয়সার ধারের সামনে সে যে বিদ্যার বর্ম নির্মান করেছিল তাতে আজ তৃপ্তি যেন একটা ফাটল ধরিয়ে দিল। দেওর চলে যেতেই ঝাঁঝটা বেরিয়ে পড়ল স্বামীর উপর। কি কি কথোপকথন হয়েছিল পুরোটা না শুনতে পেলেও ছাদে সিগারেট খেতে খেতে মনীশ শুনল বৌদি দাদাকে বিদ্ধ করছে - ''কোনো কিছুতেই তো ছেলেটাকে সমান সুযোগ সুবিধে দিতে পারলে না। কিন্তু তোমাকে দিয়ে নিজের মেয়েকে কেমন আমার ছেলের সমকক্ষ করে নিল। তোমার শিক্ষাও  হয় না?" ঋষিতুল্য দাদার এই হেনস্থাতে মনীশ কেন যে একটু হাসল তা সেই জানে।


প্রতিমের অবশ্য একটু বিবেকের দংশন হল। তৃপ্তি কে সফলভাবে শিক্ষাদানের জন্য অবশ্যই নয়। ঋভুকে তো সত্যিই বড় সাধারণ ভাবে বড় করেছে সে। ছেলে এমনিতেই বাবার মতো দৈনন্দিন ভোগবিলাসে অনাসক্ত। তবে একটা শখ তার ক্রমশ প্রকাশ পাচ্ছে। ভীষণ ভ্রমণ পিপাসু সে। সুযোগ পেলেই রওনা দিচ্ছে এদিক ওদিক। প্রতিম ভেবে নিল এইবার ছেলে বউ কে একবার বিদেশ ভ্রমন করাবে সে। লাখ দুয়েকের সঞ্চয় ভেঙে ফেললেই চলবে। মনীশ তো নিশ্চয়ই সামনের ছুটিতে বিদেশে যাবে। ওদের সংগেই ব্যবস্থা করতে বলবে। তাহলে শুধু টাকা দিয়েই নিশ্চিন্ত।


পরের দিন সন্ধেবেলায় বাড়ির সামনে গাড়ি থেকে নামতে নামতেই মনীশ দাদার গলা পেল - "একবার ছাদে আসিস তো ভাই"। এই সময়টা প্রতিম পায়চারি করে ছাদে। হুকুমটা সেখান থেকেই এল। "ছাদে দু কাপ চা দিয়ে যা" - মেয়েকে হাঁক দিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেল মনীশ। তারও দাদার সঙ্গে দরকারী কথা আছে আজ। 

ছাদে পৌঁছে কার্নিশে রাখা দাদার সিগারেট প্যাকেট থেকে একটা নিতে নিতে মনীশ বলল - "বল"। 


"এবার ছুটিতে কোথায় যাচ্ছিস তোরা?"


"আমেরিকা - আঠাশ দিনের লম্বা ট্যুর। ওয়েস্ট কোস্ট টু ইস্ট কোস্ট পুরোটাই" - বলে ঠোঁটে সিগারেটটা দিয়ে দেশলাই জ্বালাতে উদ্বত হল মনীশ।


ভাইয়ের উত্তরে দাদা মুহূর্তের জন্য একটু ম্রিয়মাণ হয়ে পড়লো। বিজ্ঞাপনের দৌলতে এইটুকু সে জানে যে এক মাসের আমেরিকা সফর তার সাধ্যের কতটা অতীত। ভাইয়ের সঙ্গে বিদেশ ভ্রমন তবে আর হল না।


সিগারেট জ্বালিয়ে এক রাশ ধোঁয়া ছেড়ে মনীশ অবশ্য বলেই যেতে লাগলো - "তবে এবার আমরা ছয় জন যাচ্ছি এক সঙ্গে। ঋভুর সঙ্গে সকালে কথা হয়েছে - ওর ছুটি মিলিয়েই টিকিট কেটেছি। তোদের পাসপোর্ট গুলো দিস।"


"তিন জনের অনেক টাকা খরচ রে। তুই এটা কি বলছিস ভাই ? আমি তোর এত টাকা খরচ করাতে পারব না" - প্রতিবাদ করল প্রতিম।


"আমার টাকা কোথায়? সাত বছর ধরে যে ছাত্রী পড়ালি তার টিউশন ফীস আমি মাসে মাসে সরিয়ে রেখেছিলাম। সেটাই জমে গিয়ে সুদে আসলে তোদের তিন জনের খরচ এর সমান হয়েছে। তাই টিকিটটা কেটে নিলাম। ঋভু কিন্তু খুব খুশি। তুই আর না করিস না।"


ট্রে করে চায়ের কাপ নিয়ে ছাদে ঢুকতে গিয়ে তৃপ্তি থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। 


প্রতিমের দুই হাত মনীশের দুই কাঁধে। গর্বের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ভাই এর দিকে। গনিতের গভীর জ্ঞান থেকে সে এইটুকু বোঝে যে টিউশন ফীস জমিয়ে এই দীর্ঘ  আমেরিকা সফর সম্ভব নয়। 


মনীশের চোখ নামানো। দাদার এই দৃষ্টির সম্মুখীন হতে পারবে না সে। ক্ষুরধার ব্যবসা বুদ্ধি থেকে সে এটাও জানে যে এক মাসের আমেরিকা সফর দিয়ে এই টিউশন ফীস মিটিয়ে দেওয়া অসম্ভব।


ট্রে হাতে দাঁড়িয়ে রইল তৃপ্তি। দুই ভাইয়ের মধ্যে এই সুন্দর মুহূর্তটা আরও একটু প্রলম্বিত হতে দিতে চাইল সে।

রাকেশ ঘোষাল

Comments

Popular posts from this blog

গ্রীষ্মের_ছুটিতে ছাত্রের লেখা খোলা চিঠি