শূন্য
'পাঁচ টাকার তেল দে না বিপিন?'
‘আপনাকে কতবার বলেছি মাসীমা । পাঁচ টাকার তেল হয় না । সে দিন গেছে ।'
'দে না কৌটোয় এট্টু খানি । বেলায় দুটো চিংড়ি পেয়েছি । ভেজে খাব ।'
‘আপনাকে নিয়ে আর পারি না । এই ভাবে কত দিন চলবে? ছেলে মেয়ে টাকা দেয়?'
'তাতে তোর কী রে বিপিন? তেল চেয়েছি তেল দিবি।'
'চোপা করলে তেল ফেল কিচ্ছু দেব না । ভাল মনে একটা কথা জিজ্ঞাসা করলাম।'
'আহা রাগ করিস কেন বিপিন। ছেলে মেয়ে ভাল আছে রে । একটা কথা বল দিকি । হাজার কোটিতে কটা শূন্য?'
'গুপ্তধন পেলেন নাকি মাসীমা? হাজার কোটির খবর নিয়ে কী করবেন?'
'গোপাল বলছেল কে নাকি কত হাজার কোটি টাকা চুরি করে পেইলেছে ।'
'তাতে আপনার কী মাসীমা? আপনার ব্যাংকে টাকা আছে?'
'ব্যাংকে তো যাইনি বাপু । উনি বেঁচে থাকতে যেতেন । '
'টাকাগুলো কী হল?'
'সব ভাগাভাগি করে নেছে । মাসে মাসে আমায় দেয় তো।'
‘মেসোমশাইর পেনশন থেকে আপনাকে এট্টুখানি ধরিয়ে দেয় ।'
'যা দেয় আমার চলে যায় রে । তা বল না, হাজার কোটিতে কটা শূন্য?'
'ওসব শুনলে আপনার মাথা ঘুরে যাবে । কটা শূন্য দেখেছেন আপনি?'
'আমার জীবনটাই তো শূন্য রে ।'
'আমারই বা জীবন কী মাসীমা? দোকান চালিয়ে কোন মতে সংসার চলে । সব ধারে কেনার খদ্দের । মেসোমশাইরর শুনেছি অনেক টাকা ছিল। কোথায় গেল সব?'
'সে সব তিনিই জানতেন । ছেলে মেয়েরা সব বুঝে নেছে । আমায় কি আর বলবে তারা?'
‘আপনার নাকি অনেক গয়না ছিল?'
'সে সব গেছে । বাড়িতে ডাকাত পড়েছেল, জানিস? বাকি যা ছিল মেয়ের বিয়েতে দিয়েছি । ছেলে ব্যবসায় ঢেলেছে ।'
'লোকে তো অনেক কথা বলে ।'
'তা মুক থাকলে বলবেনি? বলুক না ।'
‘মাসীমা, আপনার নাকি এক নকশাল বন্ধু ছিল। গয়না বেচে ...'
'তাতে তোর কী রে পোড়ারমুখো? তেল দিবি তো দে নইলে চিংড়ি সেদ্ধ করে খাবো ।'
'আহা হা রাগছেন কেন মাসীমা? লোকে বলে তাই বললাম । কী যেন নাম ছেল তার?'
'নাম দিয়ে কী হবে রে বিপিন? তারা আজকের দিনে থাকলে এত টাকা চুরি হত?’
‘তাহলে তোমার বাড়ির ডাকাতিটা সাজানো ছিল তো? তোমার নকশাল বন্ধুরই কাজ।’
‘বেশ করেছে লুটেছে । আমার গয়না লুটে গরীবদের দিয়েছে ।’
‘গরীবদের দিয়েছে না ছাই । অস্ত্র কিনেছে গো মাসীমা? কত খুন খারাপি করেছে বলো?’
‘বাজে লোকদের মেরেছে । আজকের দিনে কেউ চোরদের ধরে মারুক দেকি? কার কত বুকের পাটা।’
‘ও বাবা আপনিও তো নকশাল দেকচি । আপনার বয়ফ্রেন্ডের নাম কী ছিল মাসীমা?’
‘সেটা আবার কী রে?’
‘ছেলে বন্ধু । আপনার ছেল না একজন?’
‘বন্ধু কী রে? আমায় বাড়ি এসে পড়াত ।’
‘আপনি তাকে লাভ করে ফেলেছিলেন তো?’
‘লাভ কী রে? মন দেওয়া? তোর মেসোমশাই মারা গেছেন এখন আর বলতে বাধা কী? মন তো দেছিলাম কিন্তু বড্ড ভয় পেতাম রে । কী তার চেহারা। কী তার বক্তৃতা । আমি একটা ছোট্ট পাখির মত তার কথা শুনে যেতাম ।’
‘বিয়ে করলেন না কেন?’
‘ওসব কি আর বে করার মানুষ? ইনিয়ে বিনিয়ে তাকে জানিয়েছিলুম । আমি মুখ্যু মেয়ে । কেলাস 4 অব্দি পড়িছি । আমাকে কি আর মনে ধরে তার? বাবা বে দিয়ে দিল যে তাড়াতাড়ি ।’
‘মনে ধরেনি কিন্তু গয়না হাপিস করার বেলায় তো ঠিক হাজির হয়েছেন ।’
‘আমাকে চিঠি লিখতো তো।’
‘বিয়ের পর আপনি চিঠি লিখতেন?’
‘হ্যাঁ লিকেচি । তো কী হয়েছে? ওনার কথা জানতে চেয়েছি । উত্তরে শুধু ওনাদের লড়াইর কথা জেনেছি । মানুষটার খাওয়া দাওয়া ঠিক ঠাক হতো না । পেইলে পেইলে বেড়াত । ‘
‘তা তো হবেই । মেসোমশাই জানতে পারেনি?’
‘মেয়েদের মুখে কুলুপ আঁটা থাকে রে বিপিন । সংসার তো ঠিক ঠাক করেছি । ছেলে মেয়ে মানুষ করেছি । অত বড় সংসারে রোজ ভাত তরকারি রান্না করিছি ।’
‘ডাকাতির গল্পটা বলুন না মাসীমা ।’
‘আমি তাকে বিপ্লবদা বলে ডাকতাম । আসল নাম ছিল ...না সে এখন বলবনি । পরে একদিন । হঠাৎ বিপ্লবদার চিঠি পেলুম - তাদের নাকি দেদার টাকার দরকার । আমি লিকে পাঠালুম ডাকাতি করতে হয় তো আমার বাড়িতেই করো ।’
‘তারপর?’
‘সে অমাবস্যার রাত । আমি জেগে । নিশুতি অন্ধকারে চুপটি করে সদর দোরের পাশে দাঁড়িয়েছিলুম । যেই না দরোজায় লাতি মেরেছে আমি খুলে দিয়ে দৌড়ে গিয়ে চুপটি করে তোর মেসোমশাইর পাশে শুয়ে পড়েছি । তোর মেসোমশাইরা তিন ভাই । আগে সব একসঙ্গে থাকত । চাকর বাকরও ছিল । গুড়ুম গুড়ুম করে দুটো বন্দুকের আওয়াজ হতেই সব উঠে পড়েছে । আমি মটকা মেরে পড়ে আছি । আমার শোবার ঘরে বন্দুক ছিল । ইয়া বড় শিকার করার বন্দুক । একেতে মরচে পড়া তায় কার্তুজ নেই । সে দেকালে কি আর ডাকাত ভয় পায় । তারা সটান শোবার ঘরেই হাজির । মুখ বাঁধা ছিল । কত রোগা হয়ে গেছিল মানুষটা । তাও তো চোকের দেকা হল । আমার দেওরের ঘরে যে একটা কুকরী ছিল জানতুম না । নেপাল বেড়াতে গিয়ে নাকি নিয়ে এসছেল । সিন্দুকের চাবি ছেল আমার আঁচলে । বিপ্লবদা বন্দুক নিয়ে ঘরে ঢুকতেই আমি ভয়ে এক কোণে সিঁধিয়ে গেছি । ঢুকেই দৌড়ে এসে আমার এক হাত ধরে যেই মাতায় বন্দুক ঠেকিয়েছে তোর মেসোমশাই ঘরে ঢুকে বললেন - সিন্দুকের চাবিটা দিয়ে দাও বিন্দু । আমি তো সেই অপেক্ষায় ছিলুম রে । বিপ্লবদা হাত ছেড়ে দিতেই আঁচল থেকে চাবি খুলে মেঝেতে ফেলে দিলুম । আমার গয়নাই ছিল শুধু । আর সামান্য কিছু টাকা । হঠাৎ দেকি আমার দেওর একটা কুকরী নিয়ে ঘরে ঢুকে বিপ্লবদার দিকে তেড়ে যাচ্ছে । তখন সিন্দুক ফাঁকা । ওনার ব্যাগও ভরে গেছে । বন্দুক আর ব্যাগ নিয়ে দেওর কে ধাক্কা দিয়ে উনি আবার আমার পাশে হাজির । আমার মাতায় বন্দুক ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন । তোর মেসোমশাই বলল - কুকরীটা ফেলে দে মোহন ।’
‘তারপর কী হল মাসীমা?’
‘মোহন কুকরীটা ফেলে দিতেই আমার মাতায় বন্দুক ঠেকিয়ে পিঠে গয়নার ব্যাগ নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন বিপ্লবদা । সঙ্গে আমি । আমাদের বাড়ির পেছনে ছিল কচুর ঝোপ আর তারপর আম গাছের বন। সদর দোরে বন্দুক নিয়ে বিপ্লবদার সাথী দাঁড়িয়ে । আমার হাত ধরেই দৌড়োতে শুরু করলেন ।’
‘আপনাকে নিয়ে?’
‘তবে না তো কী? পেছন পেছন আমাদের বাড়ির সব ধাওয়া করেছে । নকশালদের সঙ্গে পারবে কেন? খালে ওদের একটা নৌকো বাঁধা ছিল । খাল পেরিয়ে একটা মন্দিরে নিয়ে গিয়ে তুলল আমায় । কুচকুচে কালো অন্ধকারে ঠাহর করতে পারিনি কোনদিকে যাচ্ছি । আমি আর বিপ্লবদা সেই পোড়ো মন্দিরে একরাত কাটিয়েছিলাম ।’
‘সে কি গো মাসীমা? এতো পুরো সিনেমা ।’
‘মুখ সামলে কথা বলবি বিপিন । আমি তোর মায়ের বয়সী । ‘
‘আমি আবার কী বললাম? তুমিই তো বললে । আপনার ভয় করেনি মাসীমা?’
‘ভয় কী রে পাগল? মানুষটাকে ভালবাসতাম যে। পাশে বসে শুধু গল্প শুনে গেলাম । আমি তো জানতাম আসবে । আঁচলে কিছু মুড়কি বেঁধে রেখেছিলুম । সেই খেয়ে রাত কাটালো মানুষটা । যেন কত দিন খায় নি । তারপর তার কত কতা শুনলুম । মানুষটাকে বে করতে বললেম । সে কি আর শোনে? তার নাকি অনেক কাজ । একদিক দিয়ে ভালই - বে করে কে সাত তাড়াতাড়ি বেধবা হতে চায় বল? ওই সব মানুষের জীবন কচুর পাতায় দু ফোঁটা বৃষ্টির জলের মতো - কখন যে গড়িয়ে পড়বে তার ঠিক আছে? কারো সব্বোনাশ করার থেকে একা থাকাই ভাল বাপু । ঝিঁঝি ডাকছে । অশ্বত্থের কোটর থেকে তক্ষক ডাকছে । আর মানুষটা এক টানা গল্প করে যাচ্ছে । ওনার হাতে দু একজন মানুষও খুন হয়েছিল । কোথাকার এক বেইমান দারোগা - ইনামের লোভে নিরীহ ছেলেকে অত্যাচার করে মেরে ফেলেছিল । আর একটা ব্যবসায়ী, টাকা না দিয়ে ওদের দলের লোক ধরিয়ে দিয়েছিল । কেমন একটা ঘোরের মধ্যে ছিলুম, জানিস । যেন আঁধার কেটে গেলেই একটা অন্য রকম সকাল হবে ।’
‘তা সকাল হয়েছিল মাসীমা?’’
‘সকাল আর হল কোতায়? কেমন একটা পাখির ডাক শুনেই বিপ্লবদা বলল পুলিশ আসছে । আমাকে যেতে হবে বন্দিনী । ‘
‘আপনাকে বন্দিনী বলতেন?’
‘হ্যাঁ আমার নাম ছিল বিন্দু । কিন্তু উনি বন্দিনী বলে ডাকতেন । আমার কপালে, মাথায় একটু আদর করে দিয়ে চলে গেলেন । তারপর আর কোনদিন দেকিনি রে।’
‘ব্যাস লাভ স্টোরি শেষ?’
‘সেটা আবার কী রে বিপিন? শেষ আর হল কই? পুলিশ এসে বাড়ি নিয়ে গেল আমায় । কিন্তু ডাকাতে ছুঁয়েছে বলে কতা ! সবাই আমায় ঘেন্না করত রে । ‘
‘মেসোমশাই?’
‘সে মানুষটা কিছু বলেনি । শুধু বলেছিল, আঁচল খুলে চাবি বের করার সময় মুড়কি পড়েছিল মেঝেতে । পরিস্কার করে ফেলো? লোকে জিজ্ঞাসা করবে ।’
‘মেসোমশাই সন্দেহ করেছিল?’
‘করতেই পারেন । তিনি বুদ্ধিমান মানুষ । কিন্তু আমায় বিশ্বাস করতেন । তবে শাশুড়ীমা যখন আমার বাচ্চাটাকে অনাথ আশ্রমে দিয়ে আসতে বলল তখন তিনি আটকাননি ।’
‘আপনার আর এক সন্তান ছিল?’
‘হ্যাঁ ছেলে । যে মাসে ডাকাত পড়েছিল সে মাসেই পোয়াতী হয়েছিলাম । তাই ওকে বিদেয় করেছে ।’
‘সে কি মাসীমা? কেউ আপনাকে বিশ্বাস করল না?’
‘না রে, মেয়ে মানুষকে কেউ বিশ্বাস করে না । দু হপ্তার ছেলেটাকে আশ্রমে দিয়ে এসেছিল । কোন আশ্রম সেটাও আমাকে বলেনি । কি রে তোর মুখটা অমন হয়ে গেল কেন? তেলটা দে এবার । হাজার কোটিতে কটা শূন্য বললি না তো? উল্টে সব পেটের কতা শুনে নিলি তুই ।’
‘কটা চিংড়ি মাছ পেলেন?’
‘তিনটে দশটাকার নোট নিল - দশটা ছোট ছোট চিংড়ি দিল রে । বেলার দিকে নাকি এট্টু সস্তা । ’
‘ধরে নিন আপনার চিংড়িগুলোই হাজার কোটির শূন্য । বেশ করে তেল দিয়ে ভেজো দেকবে শূন্যের মতোই গুটিশুটি মেরে যাবে ।’
‘দশটা শূন্য? গোপাল যে নটা বলছিল । একটা ফাউ নিয়ে দশটা চিংড়ি দিল । এই নে বিপিন, পাঁচ টাকাই পড়ে আছে ।’
‘ওটা থাক । আমিও অনাথ আশ্রমে মানুষ মাসীমা । বাবা মা নাকি ছোটবেলায় ছেড়ে চলে গেছে । মুখটা অমন করছেন কেন মাসীমা? বেলা পড়ে এল । বাড়ি গিয়ে আবার রান্না করে খেতে হবে তো ।’
‘তুই খাবি না বিপিন? হ্যাঁ রে তোর বুকে একটা আঁচিল আছে?’
‘ও সব দেকে আর কী হবে মাসীমা । আঁচিল থাকুক না থাকুক আপনি না হয় আমার মা’ই হলেন। দুটো মুড়কি খেয়ে নিয়েছি মাসীমা । দিনের বেলা দোকান ফেলে যেতে পারি না । রাতেও এখানে শুই । একবার তো চুরি করে দোকান শূন্য করে দিয়েছিল । সাবধানে থাকি । বড্ড চুরি চামারি হচ্ছে ।’
বুড়ি চলে গেলে বিপিন হাত মুড়ে পিঠের আঁচিলটায় একটু হাত বুলিয়ে নিল । বুড়ির খেয়াল আছে? আঁচিল বুকে ছিল না পিঠে ছিল? তবে কীই বা হবে? এই বয়েসে মা থাকা না থাকা সমান । বুড়ির সম্পত্তি তো কিছু নেই । সব ছেলে মেয়ের নামে । দুই শূন্য মিলে সেই শূন্যই হবে । রোজ এসে বরং তেল, নুন নিয়ে যাক । এর বেশী আর কী করবে বিপিন?
রাকেশ ঘোষাল
Comments
Post a Comment