নির্বাসন
"মা, দেখো কাকে এনেছি ধরে?" চিৎকার করতে করতে অর্ণব সায়নকে নিয়ে ঘরে ঢোকে।
সেই ছোট্ট বেলার বন্ধু সায়ন আর অর্ণব।
উচ্চ মাধ্যমিকের পর বাবা অসুস্থ হয়ে পড়ায় আর পড়া হয়নি অর্ণবের।
বাবার ট্যাক্সিটাই আয়ের একমাত্র অবলম্বন।
তাই শেষ পর্যন্ত ঐ ট্যাক্সিটাকেই বেছে নিতে হয়েছে অর্ণবকে। পিছনে পড়েছে তার স্বপ্ন, তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, তার প্রাণের বন্ধুরা।
অনেক বছর পর আবার দেখা দুই বন্ধুর।
দূর থেকেই চিনেছে অর্ণব সায়নকে। প্যাসেঞ্জার নামিয়ে ফিরছিল হঠাৎই দেখে সায়ন মোড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে ট্যাক্সি খুঁজছে।
আর পায় কে? একবারে বগলদাবা করে তুলে এনেছে সে সায়নকে।
"চল, চল কতদিন দেখা নেই তোর সাথে। মা প্রায়ই তোর কথা বলে? নে ওঠ ট্যাক্সিতে।"
দুই বন্ধুর কতদিনের জমে থাকা কথা মুক্তি পায় কথায় কথায়। সায়ন একটা বড় ব্যাঙ্কের ম্যানেজার। বিয়ে করেছে আজ তিন বছর হল।
মা মারা গেছে এক বছর হতে চলল প্রায়।
সায়নের মা মারা যাওয়ার পর বাবা ক্রমশঃ ভেঙে পড়েছে। একেবারে অসহ্য উঠছে দিন দিন।
সূর্যকে নিয়ে অবন্তিকা মানে সায়নের স্ত্রী এমনিতেই হিমসিম খাচ্ছে। তারমধ্যে বাবার ফাইফরমাস খাটতে হয়। দিনদিন বাবা ম্যানিয়াকদের মতো হয়ে উঠছেন।
তাই বাধ্য হয়ে সায়ন বৃদ্ধাশ্রমের খোঁজ করতে এসেছিল।
ঘরে ঢুকতেই অর্ণবের মায়ের সেই প্রাণখোলা হাসি "আয় বাবা, তুই তো ভুলেই গেছিস। আমি প্রায়ই তোর কথা বলি। আগে কত আসতিস। এটা ওটা খাওয়ার বায়না করতিস। এখন তো আর আসিসই না।"
সত্যিই অনেকদিন আসে না সায়ন। সেই একই আছে প্রায় সব। শুধু বিছানার উপর কঙ্কাল সার অর্ণবের বাবার দেহটা ছাড়া। ইস! কি চেহারা হয়েছে কাকুর। তাকিয়ে দেখে সায়ন। তবু মানুষটা হাসছে। সায়নকে দেখেই শ্বাস টেনে টেনে বলল "তুমি সায়ন না। হু, চিনেছি তবে ঠিক। অনেক দিন পর এলে বাবা" বলে হাঁপাতে থাকলো।
সায়ন তাড়াতাড়ি বলল "হ্যাঁ, কাকু আপনি বেশী কথা বলবেন না কষ্ট হবে।"
মনে মনে ভাবলো তার বাবাও তো রয়েছেন। খাচ্ছেন, দাচ্ছেন আর পিন্ডি চটকাচ্ছেন।
এতো করা হয় তবু মন পাওয়া যায় না।
কোন কিছুর অভাব নেই। চব্বিশ ঘন্টার আয়া
তবু দেখ খিটখিট করেই যাচ্ছেন।
ততক্ষণে কাকিমা ডিমের ওমলেট আর চা নিয়ে হাজির দুই বন্ধুর জন্যে। অর্ণব সায়নের হাতে প্লেট ধরিয়ে বলল "তুই শুরু কর। আমি খাচ্ছি।"
বলে বাবার ওষুধ, পত্র ঘাটতে লাগলো।
অর্ণবের মা বলল "থাক না অনু ওসব। খেয়ে করিস। সব জুড়িয়ে যাবে।"
অর্ণব হেসে বলল "কেন মা? আগে দেখি সব ওষুধ ঠিকঠাক দিয়েছো কিনা বাবাকে। নয়তো বাবারই কষ্ট হবে। তাছাড়া থাকবে কেন? এই একটু একটু থাকতে থাকতেই... ব্যবধানটা যে বেড়ে যায়,অনীহা এসে যায়।"
বলে বাবাকে ধরে পরম যত্নে নিজের কাঁধে ভর দিয়ে বাথরুমে নিয়ে গেল।এটা তার নিত্যনৈমেত্তিক কাজ। সে বুঝে যায় কখন বাবার কি দরকার। অর্ণবের মা মাঝে মাঝে হেসে বলেন "উনি তোর বাবা নয়। তুই ওর বাবা।আমি বুঝি না তুই ঠিক বুঝে যাস।"
বাথরুম থেকে এসে ধীরে ধীরে বাবাকে নিয়ে যত্ন করে বিছানায় শুইয়ে দেয়। মাকে ডেকে বলে "বাবার খাবারটা দাও মা, আগে বাবাকে খাইয়ে দিই।"
অর্ণবের বাবা জোর করে অর্ণব কে খেতে বলেন। "সব ঠান্ডা হয়ে গেল তো। তুই আর সায়ন খা । আমি একেবারে রাতে খাব।"
সায়নের দিকে চেয়ে বলেন "বাবা সায়ন তুমি কিন্তু এখানে খেয়ে যেও।"
সায়ন এতোক্ষণ অর্ণবকে দেখছিল। সারাদিন পরিশ্রম করেও কি অপরিসীম ধৈর্য্য নিয়ে সে তার বাবার দেখাশোনা করছে।না আয়া রাখার ওর ক্ষমতা নেই। হয়তো দরকারও নেই। কি ভালোবাসা একে অপরের প্রতি। ছোট্ট ঘরখানায় তারই প্রতিফলন। সম্পদের প্রাচুর্য হয়তো নেই।
কিন্তু নিখাদ ভালোবাসা কাণায় কাণায় পূর্ণ।isায়নের মনেই পড়ল না কবে সে শেষ তার বাবাকে জিঞ্জাসা করেছে "কেমন আছো বাবা?" কবে শেষ বলেছে "খেয়েছো?"
বুড়ো মানুষটা রোজ তার ফেরার অপেক্ষায় কান পেতে থাকে। ফিরলেই বলেন "বাবান ফিরলি?"
অথচ দায়সারা উত্তর দিতেও তার কষ্ট। নিজের পেনশনের টাকায় চলেন। তবু আয়ার খরচের কথা প্রতি মাসে তাকে শোনায় । ওষুধ পত্র কি নিচ্ছেন দেখা দূরে থাক, আছে কিনা খোঁজ পর্যন্ত নেয় না সে। আয়া বা বাবা বললে তবেই এনে দেয়?
"আচ্ছা, ছোট বেলায় যেমন সে বায়না ধরতো এটা খাবো,ওটা খাবো। বাবারও তো ইচ্ছা করে মাঝে মাঝে এটা, সেটা খাবার। বেরোতে পারেন না।
কই সায়ন তো কখনও জিঞ্জাসা করে নি বাবা কি খাবে?"অথচ রোজ বাজার যাবার আগে অবন্তিকাকে জিঞ্জাসা করে "কি আনবো? আজ কি খাবে বল? "
সায়নের নিজের কাছেই নিজেকে অপরাধী মনে হল। হ্যাঁ, বাবা হয়তো একটু খিটখিট করেন।
কিন্তু সায়ন তো কোনদিন তার দায়িত্ব ঠিক ঠাক পালন করেনি। ছোট বেলায় কতো দুষ্টুমি করেছে । কতজন বলেছে ব্যানার্জী দা ছেলেকে হোস্টেলে পাঠিয়ে দিন। ওকে মানুষ করা আপনাদের কম্ম নয়। কই বাবা তো তাকে কাছ ছাড়া করেননি।
বরং সায়নকে বলেছেন "তুই চিন্তা করিস না। তোকে হোস্টেলে যেতে হবে না। আমি বেঁচে থাকতে তো নয়ই। শুধু দুষ্টুমিটা একটু কমা।"
তবে তার মনে এল কেন বৃদ্ধাশ্রমের কথা। মনে আছে আসার আগেও বাবার চোখ দুটো যেন তাকে মিনতি জানাচ্ছিল "আমায় এখানেই মরতে দে বাবান।"
অর্ণব বলল "তুই একটু বস সায়ন। আমি বাবাকে খাইয়ে নিই। ওষুধ খাবে তো। সময় মতো খাবার না খেলে ওষুধ খেতে পারবে না। তারপর আমরা দুই বন্ধু একসাথে খাবো। দেখ, গরীবের ঘরের খাবার খেতে পারিস কিনা?"
সায়ন এক দৃষ্টিতে দেখছিল অর্ণব তার বাবাকে কেমন ছোট ছেলের মতো খাইয়ে দিচ্ছিল।
কেমন আদর করে মুখ মুছিয়ে সারা দিনের তার কান্ডকর্মের গল্প করছিল। মনটা ব্যথায় ভরে উঠল সায়নের। সে তবে কেন অর্ণবের মতো হয়ে উঠতে পারলো না।
হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বলল "আমায় এক্ষুনি যেতে হবে রে অর্ণব। হঠাৎ একটা জরুরী কাজ মনে পড়ে গেছে। না গেলে অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে। আমি কথা দিচ্ছি আর একদিন এসে ঠিক খেয়ে যাবো।"
অর্ণবকে অনেক করে বুঝিয়ে একটা ট্যাক্সি নিয়ে দ্রুত ফিরে আসে নিজের বাড়ি। জামাকাপড় ছেড়ে ফ্রেস হয়ে অবন্তিকাকে বলে "বাবার খাবারটা আমাদের সাথে বাড়। আমি আসছি।"
অবন্তিকা অবাক হয়ে যায়। সায়ন তার বাবাকে এড়িয়ে চলে এটাই দেখে এসেছে এতোদিন। আজ হঠাৎ কি এমন হল ভাবতে ভাবতে খাবার বাড়ে।
"বাবা, চলো খাবে চলো।" সায়নের ডাকে ঘুরে তাকান পৌঢ় মানুষটা।
চোখে জল নিয়ে বলেন "এতোদিন তো একাই খেলাম তোর মায়ের মৃত্যুর পর থেকে।
কাল থেকে ঐ বৃদ্ধাশ্রমেও একাই খাবো। তবে আর মায়া বাড়িয়ে লাভ কি?"
"না, বাবা। আজ থেকে তুমি রোজ আমাদের সাথেই খাবে। আমার সাথে বাজারে যাবে।
তোমার যেটা পছন্দ বলবে সেটাই রান্না হবে।
তুমি তো এখন আমার ছেলে তোমাকে হোস্টেলে পাঠাই কি করে? শুধু দুষ্টুমি গুলো একটু কমাতে হবে।" বলে হেসে ওঠে সায়ন।
বৃদ্ধ মানুষটির গাল বেয়ে নেমে আসে অশ্রুর ধারা। তবু এক তৃপ্তির হাসি নিয়ে বলে "নির্বাসনে যেতে হবে না বলছিস।"
সায়ন হাতে হাত রেখে বলে "আমি বেঁচে থাকতে নয়।"
রাকেশ ঘোষাল
Comments
Post a Comment