মোহনা
পাত্রপক্ষ পছন্দ করে চলে যাবার পর থেকেই মুখ ভার করে বসে আছে মোহনা।
মা বেশ বিরক্তির গলায় বলল, আমরা তো তোর মত নিয়েই বিয়ের যোগাযোগ করলাম। এখন কি হলো?
তোকে বারবার জিজ্ঞেস করা হয়েছে, তোর কাউকে পছন্দ কিনা? তখন তুই বললি, তোর জীবনে তেমন কেউ নেই।
তাছাড়া শুভাশিস যথেষ্ট ভালো ছেলে। এখন কিসের অমত?
অমতটা যে কিসের সেটা তো মোহনাও বুঝতে পারছে না। কেমন একটা বেপরোয়া খামখেয়ালি বাতাস এলোমেলো ভাবে তছনছ করে চলেছে ওর মনের অলিন্দগুলোকে। ওই বাতাসের ঝাপটা এসে লাগছে মোহনার হৃৎপিণ্ডের প্রকোষ্ঠে। এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে হিসেব নিকেশ। শুভাশিস ছেলে হিসাবে মন্দ নয়। হয়তো দীপ্ত না এলে মোহনা বিনা বাক্যে শুভাশিসকেই বিয়ে করে নিত, কিন্তু গতকাল ওরা দেখে যাওয়ার পর থেকে যতবারই শুভাশিসকে নিজের স্বামী হিসাবে কল্পনা করেছে ততবারই ওর পাশে বসে থাকা ওর বন্ধু দীপ্তর মুখটা দৃষ্টিপথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মোহনা বরাবরই খুব ভালো কবিতা বলে। কবিতাটা ওর প্যাশান।
পাত্রপক্ষ ঢুকতেই, মা বলে উঠলো ...মোহনা একটা কবিতা শোনা না ওদের।
মোহনা খেয়াল করেছে ও যখন আবৃত্তি করছিলো,
তখন শুভাশিস ফোনে কিছু একটা করছিলো মন দিয়ে। আর ওর বন্ধু দীপ্ত গলা মিলিয়েছিল মোহনার কবিতায়।
আপ্লুত গলায় বলেছিলো, এটা তো আমারও প্রিয় কবিতা।
মোহনার মত দীপ্তও খুব বই পড়তে ভালোবাসে।শুভাশিস অফিসের কোনো কনফারেন্সের কল রিসিভ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল, তখন তো দীপ্ত আর মোহনা ওদের প্রিয় বইয়ের প্রিয় ক্যারেক্টারদের নিয়ে চুটিয়ে গল্প করে যাচ্ছিল।
শুভাশিসেরও মোহনাকে ভীষণ পছন্দ হয়েছিল, তাই বিয়েতে অমতের কোনো জায়গাই ছিল না।
মুস্কিলটা হচ্ছে মোহনাকে ঘিরে। শুভাশিসের বাড়িতেও জানানো হয়ে গেছে, যে মোহনাদের কোনো আপত্তি নেই, এখন অকারণে মোহনা বলছে, শুভাশিস ইস নট মাই টাইপ!
বাবাও একটু রেগেই বললো, দেখো মোহনা! মাই টাইপ বলে কিছু হয় না। পৃথিবীর প্রত্যেকটা মানুষ আলাদা আলাদা চরিত্র নিয়েই তৈরি হয়েছে তাদের গঠনও আলাদা। মানিয়ে নিতে হবে দুজনে দুজনকে।
মোহনা সবই বুঝতে পারছে কিন্তু তবুও কেন বারবার মনে হচ্ছে দীপ্তর রুচির সাথে ওর বড্ড মিল। বারবার দীপ্ত নামক মানুষটা ভালোলাগা শব্দের সঙ্গে জোট বেঁধে হাজির হচ্ছে ওর অবচেতনে।
দীপ্ত কিন্তু মোহনাকে বন্ধুর হবু বৌ হিসাবেই দেখেছে। ওর মধ্যে কোনো অসঙ্গতি চোখে পড়েনি মোহনার।
মোহনা দীপ্তকে জিজ্ঞেস করেছিল, আপনি বিয়ে করেন নি?
দীপ্ত স্বভাবিক গলায় বলেছিলো, সব বন্ধুদের উইকেট ডাউন করিয়ে নট আউট থাকার মজাই আলাদা। অবশ্য জানি না কতদিন উইকেটে টিকে থাকতে পারবো, কারণ আমার বাড়িতেও মা মাসীরা ম্যাচ ফিক্সিং-এ যোগ দিয়েছে।
ওর কথা বলার ধরণে মোহনা হেসে ফেলেছিল।
লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট বলে একটা কথা মোহনা এতকাল শুনে এসেছে। দীপ্তর ক্ষেত্রে কি সেটাই ঘটলো! কেন মোহনার মনে হচ্ছে শুভাশিস নয় দীপ্তকেই ও জীবনসঙ্গী করে পেতে চায়!
সন্ধের দিকে শুভাশিসের মা কল করেছিল ...
মোহনার পছন্দের রং জানতে চেয়েছিলো। তারমানে ওরা বিয়ের দিকে একধাপ করে এগোতে চাইছে।
মানসিক দ্বন্দ্ব যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে তখনি মোহনা কোনো কথা না ভেবেই শুভাশিসকে ফোন করে বসলো।
শুভাশিস মোহনার কথায় পাত্তা না দিয়েই বললো, শপিংয়ে কবে বেরোতে চায় মোহনা যেন জানিয়ে দেয়।
মরিয়া হয়ে ও বলেছিলো, শুভাশিস আমি আপনাকে বিয়ে করতেই চাই না।
মজার গলায় শুভাশিস বললো, বিয়ে ঠিক হবার পর সকলেরই মনের অবস্থা এমন হয়! আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে।
একটু অন্যমনস্ক ভাবেই ইউনিভার্সিটি থেকে ফিরছিলো মোহনা।
জেব্রা ক্রসিং দিয়ে রোড ক্রস করবে ভাবতে ভাবতেই ভুলটা করেছিল। সিগন্যাল না দেখেই পেরোতে গিয়েছিলো রাস্তাটা। ওর ঠিক সামনে এসে দক্ষ ড্রাইভারের মতোই ব্রেক কষেছিলো চারচাকাটা।
পিছনের হৈ হৈ শব্দ টাকে উপেক্ষা করেই সামনে এগুনোর চেষ্টা করেছিল মোহনা।
চমকে উঠেছিল গাড়ির চালককে দেখে। দীপ্ত নেমে এসেছিল গাড়ি থেকে।
দীপ্তকে সামনে দেখে আরেকচোট ঘাবড়ে গিয়েছিলো মোহনা।
দীপ্ত হেসে বলেছিলো, এখনো তো তিন মাস বাকি শুভকাজের, এখন থেকেই কি আমার বন্ধুর চিন্তায় মশগুল হয়ে রাস্তা পার হচ্ছেন?
কি বলবে মোহনা!
শুভাশিস নয়, দীপ্তই বারবার ওর স্বপ্নে এসে এলোমেলো করে দিচ্ছে ওর চিন্তা শক্তিকে।
কোনো কথা না শুনেই সেদিন বন্ধুর হবু স্ত্রীকে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিলো দীপ্ত।
গাড়ি ড্রাইভ করতে করতেও দীপ্ত সারাক্ষণ শুভাশিসের প্রশংসা করে চলেছে।
মোহনা অসন্তুষ্ট স্বরে বলে উঠেছে, বন্ধুর কথা তো অনেক হলো ...এবার নিজের কথাও কিছু বলুন!
ওর বলার ধরণে এমন কিছু ছিল যেটা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে গিয়েছিলো দীপ্ত।
খুব শান্ত স্বরে বলেছিলো .....আমার কথা শোনার থেকে শুভাশিসকে জানাটা তোমার জন্য বেশি জরুরি।
দীপ্তর ভিজিটিং কার্ডটা চেয়েই নিয়েছিল মোহনা।
মোহনার আংটির মাপটাও নিয়ে নিলেন শুভাশিসের মা। আর বোধহয় চুপ করে থাকাটা শোভা পায়না।
মায়ের কোলে মুখ গুঁজে মোহনা বললো, মা আমি শুভাশিসের বন্ধু ঐ দীপ্ত বলে ছেলেটাকে মনে মনে ভালোবেসে ফেলেছি।
মায়ের চমকে ওঠা দেখেই মোহনা বুঝতে পারে সে একটা অসম্ভব কথা বলে ফেলেছে।
মা শুনেই বললো, অবান্তর ভাবনা মাথা থেকে বাদ দিতে। আর কোনোভাবেই নাকি বিয়ে আটকানো সম্ভব নয়। সমাজের কাছে ওদের পরিবারকে কি ছোট করতে চায় মোহনা!
মোহনার আর কিছুই করার নেই, ইচ্ছের বিরুদ্ধেই বিয়েটা হয়ে যেতে বসেছে।
দিন দুই পর, হঠাৎই বিকেলের দিকে মোহনার বাবা-মা বেড়িয়েছিলো, মোহনা ঘরে বসে সঞ্চয়িতার পাতা ওল্টাচ্ছে ....
চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে দীপ্ত। স্বপ্ন ভেবে মোহনা নিজের চোখ বন্ধ করলো।
তবুও চোখ খুলেই দেখলো, হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে দীপ্ত।
দীপ্ত ওর এতটা কাছে ...তবে কি উদাসী মনখারাপের বাতাস গিয়ে জানিয়ে দিয়ে এসেছে মোহনার মনের খবর! মোহনার মুখে সলাজ হাসি।
ভনিতা না করেই দীপ্ত বললো, সামনেই বন্ধুর বিয়ে, তাই আমার ওপর দায়িত্ব পড়েছে তোমাদের বাড়ির নমস্কারীর লিস্টটা নিয়ে যেতে।
মুহূর্তের দেখা রঙিন ভাবনাটা নিমেষে শেষ হয়ে গেলো যেন।
একটু সামলে নিয়ে মোহনা বললো, বাবা-মা তো আজ বাড়িতে নেই। একটু অপেক্ষা করুন, হয়তো এসে যাবে।
দীপ্ত বললো, অপেক্ষা করতেই পারি তবে একটু চা আর তোমার কবিতা চাই। মোহনার গলা ধরে এসেছে কষ্টে।
বেলাপিসি চা নিয়েই ঘরে ঢুকলো।
কান্না ভেজা গলায় রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করেই কবিতার ছন্দে প্রেম নিবেদন করলো মোহনা, তার হঠাৎ দেখা স্বপ্নের পুরুষের সম্মুখে। এই প্রথম কোনো পুরুষকে এতটা উপযাচিত হয়ে নিজের মনের কথা কবিতার লাইনের মাধ্যমেই বললো মোহনা।
কবিতা শেষে দীপ্ত বললো, শুভাশিস খুবই লাকি ...তবে আমিও লাকি, ওর বন্ধু হিসাবে মাঝেমাঝে তোমার কবিতা শুনতে পাবো।
মোহনার মনের কথাটা বুঝেও না বোঝার ভান করে কাটিয়ে দিলো দীপ্ত বাকি সময়টুকু।
অভিমানে অন্ধকার হয়ে এলো মোহনার মনের গোপন প্রকোষ্ঠ।
বিয়ের আগের দিনই দীপ্তর নাকি কি জরুরী কাজ পরে গেল ব্যাঙ্গালোরে। শুভাশিস অনেকবার আফসোস করছিলো, দীপ্ত ওর বিয়েতে থাকতে পারলো না বলে।
মোহনা আর কোনো ফোন করেনি দীপ্তকে।
শুধু বিয়ের দিন সকালে দীপ্তকে ফোনটা করে বলেছিলো, আপনার বন্ধু তার বিয়েতে আপনাকে মিস করছে।
দীপ্ত ক্লান্ত গলায় বলেছিলো,।কিছু কিছু মানুষের উপস্থিতি কোনো কোনো অনুষ্ঠানে ভয়ঙ্কর কষ্টদায়ক হয়ে ওঠে। বরং তাদের অনুপস্থিতিতেই হালকা বাতাসটা প্রবাহিত হতে পারে সানন্দে।
মোহনা বলেছিলো, সেই সন্ধেতে রবি ঠাকুর সাক্ষী ছিলেন কিন্তু....
দীর্ঘশ্বাসটা গোপন না করেই দীপ্ত বলেছিলো, আর আমাদের বন্ধুত্বটা যে সেই কোনকালের গুলিডাণ্ডাকে সাক্ষী রেখে, কাঠি লজেন্সকে ভাগ করার স্বাদকে সাক্ষী রেখে তৈরি হয়েছিল মোহনা।
তার গায়ে বেইমানির রং লাগাই কি করে?
বন্ধুত্ব আর ভালোবাসার মধ্যে অবশেষে বন্ধুত্বকেই জয়ী করে দিয়েছিল দীপ্ত।
শুভাশিসের সঙ্গে সিঁদুর দান, মালা বদল হয়ে বিয়ে হয়ে গেলো মোহনার। বাবা, মা,আত্মীয়রা সকলেই খুব খুশি।
মোহনা চুপি চুপি লুকিয়ে নিয়েছিল নিজের রামধনু রঙা স্বপ্নগুলোকে।
মোহনা শুভাশিসের জীবনসঙ্গিনী আর দীপ্তর বন্ধুর বৌ- এই পরিচয়েই কাটিয়ে দেবে জীবনটা। মেনে নাই বা নিলো, মানিয়ে তো নিতেই হবে।
মোহনা যে মেয়ে তাই মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাটা ওর জন্মগত। কান্না চেপে হাসতে মেয়েদের খুব বেশি কষ্ট করতে হয় না। ঐ অভিনয়ের তালিমটাও ঈশ্বর প্রদত্ত কিনা। ছোট থেকে ক্রমাগত শুনতে হয়, মানিয়ে নিস মা। ক্ষতবিক্ষত হলেও মানিয়ে নিস।
আস্তে আস্তে মোহনা হয়ে উঠবে শুভাশিসের ঘরনি, শুভাশিসের সন্তানের মা।
হয়তো কোনো বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যায় বেলফুলের মাতাল গন্ধে, কবিতার ছন্দে অনেক বছর পর এলোমেলো বাতাস এসে মনে করিয়ে দেবে দীপ্তকে। তখনও মোহনা মনের মধ্যেই লুকিয়ে নেবে দীপ্তর নামটা, অনুভূতিটাকে মেরে ফেলবে গলা টিপে কর্তব্যের দোহাই দিয়ে। ও যে এখন কারোর স্ত্রী, কারোর মা .....নিজের জন্য সময় কোথায় সময় নষ্ট করার !!
রাকেশ ঘোষাল
Comments
Post a Comment