ছবি



মহিলা সমিতির সভাপতি নীলিমাদেবী মাইকের সামনে ভাষণ দিলেন, আজ ওয়ার্ল্ড ডে এগেনস্ট চাইল্ড লেবার, আমাদের সমিতি থেকে আজ প্রায় একশো গরিব শিশুকে আমরা পেট ভরে খাওয়াবো। আর বস্ত্র দান করবো। হাততালি আর প্রশংসার বন্যায় ভাসতে ভাসতে বাড়ি ফিরলেন নীলিমাদেবী। তাড়াতাড়ি লাঞ্চ সেরেই আবার বেরোতে হবে। দলের মেয়েগুলোকে দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকা যায় না। গিয়ে দেখবে সব ভুলভাল করে রেখেছে। তাছাড়া উনি যেহেতু সমিতির সভাপতি তাই লাইমলাইটে উনিই থাকুন সেটাই চাইবেন। 

বাড়ি ঢুকেই দেখলেন রান্নাঘরে বাসন্তীর বদলে ওর দশ বছরের মেয়ে ঝুনু ভাতের হাঁড়ির ফ্যান ঝড়াতে গিয়ে হাত পুড়িয়েছে। দেখেই মনটা বিরক্তিতে ভরে গেল। ধমক দিয়ে বললেন, এই তোর মায়ের কি হয়েছে? আসেনি কেন?
মেয়েটা যন্ত্রনাকাতর গলায় বলল, মায়ের পা কেটে গেছে গো দিদিয়া। আমি করে দিচ্ছি। 
নীলিমাদেবী টেবিলে বসেই হাঁক পারলেন, লাভলী এখনও ঘুমাচ্ছিস? আয় খেয়ে নিবি আয়। এত বেলাপর্যন্ত না খেয়ে কেউ ঘুমায়? নীলিমাদেবীর ছাব্বিশের মেয়ে লাভলী ঘুম চোখেই এসে বসলো টেবিলে। কাল মাঝরাত পর্যন্ত অফিসের কাজ করছিলাম মা, আজ সেকেন্ড হাফে যাবো অফিস। একটা প্রজেক্ট শেষ করার ছিল। 
নীলিমাদেবী বললেন, দিনরাত তোর কাজ,সকালে বেরিয়ে সেই রাতে ফিরিস, কি যে তোদের আইটি সেক্টর হয়েছে কে জানে! 
দশ বছরের বাচ্চা মেয়েটা পোড়া হাতের যন্ত্রনা নিয়েই দুজনকে গরম ভাত বেড়ে দিলো। মা বলে কামাই করলেই নাকি মাইনে কেটে নেন দিদিয়া, তাই মায়ের শরীর খারাপ হলেই ও নিজে আসে এবাড়িতে কাজ করতে। এই নিয়ে তিনদিন হলো। দিদিয়ার মেয়েটকে অবশ্য আজই প্রথম দেখলো ঝুনু। কি মিষ্টি দেখতে দিদিটাকে। কি সুন্দর করে হাসলো দিদিটা ওকে দেখে। 
লাভলী বললো, মা তোমাদের কাজের প্রশংসা দেখলাম এইমাত্র ফেসবুকে। তোমার গাদা গাদা ছবি পোস্ট হয়েছে, ওই যে বাচ্চাদের যখন কেক দিচ্ছিলে তুমি তখন। 
শাড়িটা কি ব্রাইট উঠেছে দেখো ছবিতে?

ঝুনু ভাবছিলো, কোথায় বাচ্চাদের ফ্রিতে কেক দিচ্ছে কে জানে?
ইস যদি দিদিয়াকে বলে দুটো ফ্রির কেক জোগাড় করতে পারতো তাহলে বেশ হতো, মা আর ও বিকেলে খেতো। 
দিদিয়াকে কথাটা বলার আগেই চেঁচিয়ে উঠলেন নীলিমা দেবী, হ্যাঁরে ঝুনু বয়েস তো তোর কম হলো না। তোদের ঘরে তো চোদ্দতে বিয়ে দিয়ে দেয়, তো এখনো ভালো করে তরকারি কাটতে পারিস না? পটলের খোসা মুখে লাগছে দেখ। 
ঘরের কোণে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঝুনু, হাতে মাছের বাটি আর হাতা। ওপরের অংশটা গরম ফ্যান পড়ে লালচে হয়ে আছে। 
লাভলী বললো, মা এর নাম কি গো হিপোক্রেসি? তুমি বোধহয় ভুলে গেছো ঝুনুর বয়েসটা দশ। এগেনস্ট চাইল্ড লেবার নিয়ে যে বক্তৃতাটা দিয়েছো ওই ভিডিওটা পেলাম তোমাদের সমিতির নিজস্ব পেজে। তোমার হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে দিলাম, পোস্ট করে দিও তোমার প্রোফাইলে। 
এই ঝুনু এদিকে আয়, একটুকরো বরফ নিয়ে ওর ছোট্ট হাতের পোড়া অংশের ওপরে ধরে বলল, পড়াশোনা করিস? কিসে পড়িস? ফাইভে? কি নাম তোর স্কুলের বন্ধুদের? ফ্রিজ থেকে কেক আর চকলেট বের করে ওর হাতে দিয়ে বললো, যা ভাগ, তোকে রান্না করতে হবে না। আমি সুইগিতে অর্ডার করে দেব এ কদিন। মা সুস্থ হলে আসতে বলিস। নীলিমাদেবী মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ওকে কেকটা দেবার সময় বলতে পারতিস, আমি একটা ছবি তুলে নিতাম তোর। সবাই বুঝতো, তুই আমার মতই হয়েছিস। 
লাভলী মুচকি হেসে বললো, তোমার মনে আছে মা, ছোটবেলায় কেউ যদি আমার জিজ্ঞেস করতো, তুমি কার মত হতে চাও, মায়ের মত না বাবার মত?
আমি তখন খুব ছোট ছিলাম, তাও একটাই কথা বলতাম নিজের মত। আমার তোমার মত হবার কোন আকাঙ্খা নেই মা। যাও তোমার দেরি হয়ে যাচ্ছে। তুমি না পৌঁছালে তো ওই বাচ্চাগুলো অভুক্ত থাকবে। যতক্ষণ না তোমার সঙ্গে ওদের ছবি উঠছে ততক্ষণ পর্যন্ত তো সামনে খাবার আর পেটে ক্ষিদে থাকলেও ওরা খেতেও পারবে না। তাড়াতাড়ি যাও প্লিজ। 
ঝুনু দুহাতে চকলেট আর কেক নিয়ে অনাবিল হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেল। 
নীলিমাদেবী গজগজ করে বললেন, আজকালকার ছেলেমেয়েগুলোর যেন সবই উল্টো!

*(*গরীব মানুষ কে সাহায্য করুন কিন্ত ক্যেমেরাটা বাড়ী তে রেখে এলে ওদের সম্মান করা হয়*)*

রাকেশ ঘোষাল

Comments

Popular posts from this blog

গ্রীষ্মের_ছুটিতে ছাত্রের লেখা খোলা চিঠি