লুচি

 


লুচি হলো  মশাই বাঙ্গালীর হেঁশেলের সুচিত্রা সেন । যতই মাধবী-সাবিত্রীর ধারালো অভিনয়, সুপ্রিয়ার চাপা যৌনতা, অপর্ণা সেনের আদ্যন্ত শহুরে বুদ্ধিদীপ্ত ম্যানারিজম, গঙ্গা গার্ল সন্ধ্যা রায়ের গ্রাম্য সারল্য, বা অরুন্ধতি দেবীর রাবীন্দ্রিক সফিস্টিকেশনের কথা বলুন না কেন, দিনের শেষে ঘাড়টা বেঁকিয়ে, কাজল-কালো দীঘল চোখে উদ্ধত ভাবে বলা, “ও আমাকে টাচ করতে পারবে না”- এটাই বাঙ্গালী রোম্যান্টিসিজমের শেষ কথা । উফ ! কি তাকানো ! একটা ছুরি যেন বুকের এদিক দিয়ে ঢুকে ওদিক দিয়ে বেরিয়ে গেলো । 

                   

                   মনে মনে  কল্পনা করুনতো রবিবারের সকাল, আপনার পাতে এসে পড়লো চারটি থেকে ছয়টি গরম লুচি, সাথে কালোজিরে, কাঁচালঙ্কা দেওয়া সাদা আলুচচ্চড়ি, বা চারটি বেগুনভাজা, নরম পান্তুয়ার মতো যার ওপরটা গাঢ় খয়েরি, আর ভিতরের শাঁসটা নরম আর শাদাটে । আর সাথে অবশ্যই থাকবে এক বাটি ঘিয়ে জবজবে মোহনভোগ, ভিতরে কাজুবাদাম আর কিশমিশে ঠাসা । আপনি আঙ্গুল দিয়ে গরম লুচির ওপরটায় আলতো ভাবে একটা টোকা দেবেন, যেন সপ্তপদীর কৃষ্ণেন্দু পরম মমতায় রীণা ব্রাউনের গালে হাত বোলাচ্ছে । এরপর ভিতর থেকে ফুস করে একটু ধোঁয়া বেরিয়ে এলো, যেন  শ্যামপেন বোতলের কর্কটা  খোলার পর সামান্য ভুড়ভুড়ি, আপনি তিনকোণা করে আঙ্গুল দিয়ে একটা টুকরো ছিঁড়লেন, চচ্চড়িটা বা বেগুনভাজাটা মাঝখানে দিয়ে গালে ফেললেন, এবার  চোখটা বুজে  আস্তে আস্তে চিবোন, মাইরি বলছি, আপনার অতিপরিচিত খাণ্ডার অর্ধাঙ্গীনিকেও সাত পাকে বাঁধায় গুণ্ডা ভেবে বসা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে মাসতুতো ভাইয়ের বাড়িতে কলেজের প্রফেসর হিসাবে আবিষ্কার করে  লজ্জিত সুচিত্রা সেনের মতো লাগবে । 


                   বাংলা ছবির সুপ্রতিষ্ঠিত নায়িকাটির মতো লুচিও তার সহযোগী নির্বাচনের  বিষয়েও অত্যন্ত খুঁতখুঁতে । যার তার পিছনে বসে তো আর 'এই পথ যদি না শেষ হয়' গাইতে গাইতে তো যাওয়া কখনোই যায়না ! এতো আর একথালা ভাত নয় যে যেমন তেমন করে গবগবিয়ে খেয়ে নেবেন, লুচি হলো গিয়ে বাঙ্গালির ভোজন সংস্কৃতির চুড়ান্ত রোম্যান্টিক স্বপ্নবিলাস । যদি হয় কোন নেমন্তন্ন বাড়ি তাহলে লুচির সঙ্গে আপনাকে রাখতেই হবে লম্বা করে কাটা বেগুনভাজা, ডাঁটিশুদ্ধ  লম্বমান, তার পরেই আসবে আলুর দম, শুকনো শাদা, কড়াইশুঁটি মাখানো,আর ঘন, গাঢ়  ছোলার ডাল, যার  ভিতরে নারকোল কুচি আর কিশমিশের স্বাদে আপনি সদ্য বিবাহিত জামাইবাবুর প্রতি রহস্যময়ী  অবিবাহিতা শ্যালিকার দুষ্টুমির স্পর্শ পাবেন ।  আবার প্রাতরাশ হলে আগেই বলেছি এর সঙ্গে অবশ্যই থাকবে শাদা আলুচচ্চড়ি,  স্বয়ং মহানায়ক উত্তমকুমারও নাকি এই দেবভোগ্য বস্তুটির একান্ত অনুরাগী ছিলেন (বেণুদি উবাচ) । আপনার নিশ্চয়ই এতক্ষণে মনে পড়ে গেছে  নিশিপদ্ম ছবিটার কথা, অনঙ্গবাবু (উত্তম কুমার) লুচি আলু চচ্চড়ি খাওয়ার আবদার করছেন পুষ্প (সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়) এর কাছে, কাটলেট ভেজে খাওয়ানোর আমন্ত্রণ উপেক্ষা করে । গরম লুচির সাথে যদি তরকারি বা বেগুনভাজা তেমনই ঠাণ্ডা লুচির সঙ্গে মিষ্টি জাতীয় খাবারের সঙ্গতটাই ভালো । হেমন্তকালের কোজাগরী লক্ষীপুজোর ঘন সরপড়া পায়েসের সাথে ঘিয়ে ভাজা মিইয়ে যাওয়া লুচি - যেন ইন্দ্রাণী ছবিতে উত্তম সুচিত্রার লিপে হেমন্ত মুখুজ্জে - গীতা দত্তের ডুয়েট 'নীঢ় ছোট ক্ষতি নেই আকাশতো বড়' । 


                              আবার ধরুন গিয়ে মিয়োনো লুচির  ওপরের চামড়াটা  আলতো করে তুলে নিয়ে তলার মোটা অংশটা দিয়ে লালচে রঙের মিষ্টি দই - যেন দীপ জ্বেলে চাই বা মেঘ কালো ছবিতে বসন্ত চৌধুরীর দৃপ্ত পৌরুষের সঙ্গে মিসেস সেনের অনাবিল ন্যাকামি । আবার একটু বেশী ময়াম দেওয়া খড়খড়ে লুচির সঙ্গে আপনাকে খেতেই হবে সেন মহাশয়ের দোকানের ঘিয়ে ভাজা সীতাভোগ আর মিহিদানার মিশ্রণ, সাদা আর হলুদে মাখোমাখো, মাঝে মাঝে রম্বসাকৃতি রসে ভেজানো ছানার মুড়কির দ্রঢ়িমা । ঠিক যেন অসিত সেনের জীবন তৃষ্ণা, রুক্ষ অহংকারী, উত্তম কুমারের সঙ্গে ব্যক্তিত্বময়ী সুচিত্রা সেনের দুষ্টুমিষ্টি সংঘাতের মধ্যে দিয়ে প্রণয়ের ইতিহাস । 


                              আমাদের আম বাঙ্গালীর প্রাত্যহিক যাপনের সাথে অবিচ্ছেদ্য ভাবে জড়িয়ে আছে লুচি । ষষ্ঠিপদ চট্টোপাধ্যায়ের পাণ্ডব গোয়েন্দা বা সুচিত্রা ভট্টাচার্যের অঘটনঘটন পটীয়সী মিতিনমাসির ভ্যাবলা স্বামী পার্থ, লুচি সবারই  হট ফেভারিট । বেড়াতে গেলে টিফিন ক্যারিয়ারে চারটি লুচি- আলুর দম, বাক্সভর্তি কড়াপাকের সন্দেশ, জলের বোতলে  জল, আর পেল্লায় সবুজ রঙের হোল্ডল ----  বাঙ্গালীর বেড়াতে যাওয়ার অনিবার্য অনুষঙ্গ ছিলো – এই প্রজন্ম যদিও তার খবর রাখে না ।  ভাবুনতো আপনার কোথাও যাবার তাড়া আছে, পরিবারের কর্ত্রী যদি, “চট করে কটা লুচি ভেজে দিই” বলার পরিবর্তে বলে, “কটা রুটি সেঁকে দিই”, আপনি কি একটু ইনসিকিওর্ড বোধ করবেন না !  এমনকি  বাঙ্গালীর আল্টিমেট পরকীয়ার সাথেও কিন্তু লুচির অনুষঙ্গ জড়িয়ে আছে । কিরণময়ী যদি রান্নাঘরে লুচি ভাজতে ভাজতে উপেন্দ্রকে নিজের মনের কথাটা না বলতো, চরিত্রহীন উপন্যাসের ট্র্যাজেডিটা দাঁড়াতো কি ! 


                                অবশ্য একথা ঠিক সবার হাতে লুচি ঠিক ফোলে না । ফুলকো লুচি ভাজা, থোড়, মোচা আর ডুমুর কোটা, আর তিলের নাড়ুর সঠিক পাক দেওয়া - এই তিনটে হলো গিয়ে বাঙ্গালী গৃহিণীর সুরন্ধনকারীনি হওয়ার লিটমাস টেস্ট । মনে করুনতো পারমিতার একদিন ছবিটার কথা, সনকা (অপর্ণা সেন)  টিভিতে আদর্শ হিন্দু হোটেল সিরিয়াল দেখছেন, দুই পুত্রবধু লুচি ভাজছে, স্বামী দুলাল লাহিড়ী খেঁকিয়ে উঠলেন লুচির  গুণমান নিয়ে । বিরক্ত সনকা উঠে লুচি ভাজতে বসলো, আর আমরা পর্দায় ফুলকো লুচি দেখলাম - ছবিটির জন্য প্রয়োজনীয় উত্তর কলকাতার মধ্যবিত্ত জীবনের আবহটি কেমন তৈরি হয়ে গেলো । আসলে লুচি ফোলানোর একটি মেধাবী টেকনিক আছে, সেটি হলো খুব গরম তেলে লুচির লেচি ছেড়ে দিয়ে খুন্তি দিয়ে লেচির ধারটা আলতো করে চাপ দিতে হয়, তবেই লুচি ফোলে । 


                        আজ বাঙ্গালী আন্তর্জাতিক হয়েছে, তার বিবাহ অনুষ্ঠান থেকে লুচি ব্রাত্য হয়ে গেছে, এই প্রজন্মও বোধ করি জাঙ্ক ফুডের আকর্ষণে এই সব আটপৌরে খাবারের স্বাদ প্রায় ভুলতে বসেছে । আজ কষ্ট হয় সেইসব ছেলেমেয়েদের জন্য, যারা কে এফ সি, ম্যাকডোনাল্ডস, ডোমিনোস-এর পাঁউরুটি চিনলো কিন্তু ঘরোয়া হেঁশেলের লুচি - তরকারির অনুপম স্বাদ জানলো না ।


রাকেশ ঘোষাল

Comments

Popular posts from this blog

গ্রীষ্মের_ছুটিতে ছাত্রের লেখা খোলা চিঠি