তিন্নি



তিন্নির মাত্র দশ বছর বয়সে ওর বাবা উজানবাবু অফিস-ফেরৎ ট্রেন অ্যক্সিডেন্টে মারা যান। সেই থেকে তিন্নির মা জয়ী তিন্নির জীবনে একইসঙ্গে বাবা ও মায়ের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। তিন্নির বাবা চলে যাবার পর তাঁর অফিসে তিন্নির মায়ের চাকরি হয়ে যায় ক্ল্যারিকাল পোস্টে।  ছোটবেলায় তিন্নির হাজার বায়নাক্কা একাই সামলিয়েছিলেন তিনি। মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে সার্কাস, মেলা; একটু বড় হয়ে সিনেমা দেখার আবদার সবই মা মিটিয়েছেন। তা বলে তিন্নির আবদার কখনোই  অত্যাধিক ছিলো না,ও খুব বোঝদার মেয়ে। বুঝতো মা কে অনেক ধকল সামলিয়ে চলতে হয়।  তিন্নির এখন পঁচিশ, বেসরকারি ব্যাংকের উচ্চপদে চাকুরে তথাপি বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা অপেক্ষা মায়ের শরীরের গন্ধ, আঁচলের তলাই তার প্রিয় জায়গা। মা-ও মেয়ে-অন্ত প্রাণ। আর কে-ই বা আছে ওদের সংসারে। দুজন দুজনের আদিগন্ত অবলম্বন। 
       কিন্তু মেয়ে তো, তাকে তো বিয়ে দিতেই হবে, না হলে তাঁর অবর্তমানে মেয়ের কী হবে- এই চিন্তা আস্তে আস্তে জয়ীর মনকে আচ্ছন্ন করে তোলে। নিজের ভাইয়ের সঙ্গে আলোচনা করে  পেপার দেখে তিন্নির বিয়ে ঠিক করে ফেলেন তিনি।পাত্র আই. টি সেক্টরের ইঞ্জিনিয়ার সৌরভ, তিন্নির ভালো নাম সুরভী। জয়ী মেয়েকে হেসে বলেন "তোদের দুজনের নামের ভালোই মিল হয়েছে মা।" তিন্নির মা জয়ীর অফিসের কাছেই সৌরভদের বাড়ি। কাজেই সৌরভ সম্পর্কে ভালোই খোঁজ-খবর নিয়ে নেন তিনি। সৌরভের বাড়িতে চারজন, ওরা দু' ভাই বোন আর বাবা,মা। 
       বিয়ের দিন যতই এগিয়ে আসতে থাকে কেনাকাটাও প্রায় সেরে ফেলতে থাকে মা ও মেয়ে মিলে। একটিমাত্র মেয়ে, কোনোকিছুর কমতি রাখতে চান না মা। নিপুনহাতে সব গুছিয়ে কোনাকাটা করতে থাকেন। সৌরভের জন্য  ডিজাইনার পাঞ্জাবির সম্পূর্ন সেট কেনেন, পার্টিওয়ার, ব্র্যান্ডেড শার্ট-প্যান্ট কিছুই বাদ যায়না। 
      কিন্তু আনন্দের সঙ্গে সঙ্গে কোথাও যেন একটা চাপ চাপ ব্যথা বুকের ভেতরে অনুভব করতে থাকেন জয়ী, একটা শুন্যতা সৃষ্টি হয় হৃদয়ের অন্তঃস্থলে। মা-মেয়ের সংসারে তো একে অপরের পরিপূরক, অফিস থেকে বাড়ি ফিরে মেয়ের জন্য চাতকের মতো অপেক্ষা করেন, বারবার ফোন করতে থাকেন," কি রে তুই কোথায়?? আর কতক্ষন তোর ফিরতে?? সাবধানে আয়।" সেই মেয়ে আর কয়েকদিন বাদেই চলে যাবে তাঁকে ছেড়ে...কী করে একা বাড়িতে দিন কাটবে তাঁর? বাড়ি ফিরে কার জন্য অপেক্ষা করবেন? কে গলা জড়িয়ে বলবে "মা আজ রাতে একটু জমিয়ে মাটন করো তো।" অথবা ছুটির দিনে "মা আজ মিক্সড ফ্রাইড রাইস সঙ্গে চিকেন বাটার মশালা চাই কিন্তু।" হাসিমুখে মেয়ের সব আবদার মিটিয়েছেন মা, মেয়েও যথেষ্ট সহযোগিতা করেছে মা কে। কিন্তু এরপর......। বিয়ের দিন যত এগিয়ে আসতে থাকে, জয়ীর বুকটাও ততটাই ফাঁকা হতে থাকে। মেয়েকে কিছুই বুঝতে দেন না। দেখেন মেয়ে বেশ হাসিখুশিই আছে, সৌরভের সঙ্গে মাঝে মাঝে মিট করে ছুটির দিনে শপিং হয়, খাওয়া-দাওয়া হয়।  ভালো লাগে মায়ের। একদিকে মেয়ের নতুন সংসারের জন্য আনন্দ অপরদিকে নিজের সুখী গৃহকোণ শূন্য হওয়ার বেদনা- এ এক অদ্ভুত দোলাচলোতা!!
      অবশেষে আসে সেই কাঙ্খিত দিন। বিয়ে হয়ে যায় তিন্নির।আজ তিন্নির বিদায়, জয়ী আড়ালে হাজারবার চোখের জল মুছছেন, মেয়ে যাতে না দেখে। বিদায়লগ্ন উপস্থিত, তিন্নির শ্বশুরমশায় শ্রীজাতবাবু নিজে এসেছেন বৌমা-কে বাড়ি নিয়ে যাবার জন্য। তিন্নিকে তার বন্ধুরা  খুব সুন্দর করে সাজিয়েছে শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার জন্য।  কনাকাঞ্জলির ব্যাপারে তিন্নির তরফ থেকে তীব্র আপত্তি এসেছিলো বলে আর ওসবের ব্যবস্থা করা হয়নি। জয়ী সামনে এলেন বিদায়ের আগে মেয়ে-জামাইকে আশীর্বাদ করতে। ফোলা চোখের বেয়ানকে দেখে শ্রীজাতবাবু বললেন, "মেয়ে-জামাইকে আগে আশীর্বাদ করুন, তারপর আপনার সঙ্গে আমার দরকারি কথা আছে বেয়ান।" জয়ীর বুক ঢিপঢিপ করতে শুরু করে। কী আবার বলবেন তিন্নির শ্বশুরমশায়। বিয়েতে কোন ভুলচুক হলো না তো??? মেয়েকে আশীর্বাদ করতে গিয়ে চোখ থেকে অঝোর-ধারা, মেয়ের চোখেও ভরা শ্রাবন। শ্রীজাতবাবু এইবার গম্ভীর-কণ্ঠে বলে উঠলেন, " বেয়ান আপনার সঙ্গে কথাটা কিন্তু হয়নি এখনও, দেরি হয়ে যাবে আমাদের।" জয়ী কেঁপে উঠলেন। হাতজোড় করে বেয়াইয়ের সামনে এসে মাথা নিচু করে বললেন, "বলুন দাদা।" 
             " হমম, বলছি যে অকাল-বর্ষণে নদীর জলস্তর না বাড়িয়ে এইবার প্যাকিং শুরু করুন।" জয়ী হতভম্ব, বিহ্বল-দৃষ্টিতে শ্রীজাতবাবুর দিকে তাকিয়ে থাকেন। শ্রীজাতবাবু প্রাণখোলা হাসি হেসে বললেন," আরে বেয়ান আপনার মুখ দেখে তো মনে হচ্ছে আপনি একা আন্দামানের  জারোয়াদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন।" জয়ী আরও সংকুচিত হয়ে ওঠেন...কী যেন বলতে গিয়েও বলতে পারে না। "শুনুন আমার মা-জননী যখন অস্টমঙ্গলা সেরে ফিরবে তখন যেন ও বাড়িতে আপনাকে দেখতে পাই।" জয়ীর হতভম্ব ভাব এখনও কাটে নি, এইবার শ্রীজাতবাবু খোলসা করে জয়ীকে বললেন, "শুনুন বেয়ান আমার আর আমার স্ত্রী অর্থাৎ আপনার বেয়ান  আমাদের দুজনেরই একান্ত ইচ্ছে বাকি জীবনটা আমরা একসঙ্গে এক বাড়িতে হেসে-খেলে কাটিয়ে দেই। আপনার প্রাণভোমরা কে ছেড়ে আপনি এত-কষ্ট করে বাঁচবেন কেন??? জীবন তো একটাই...চলুন না যতদিন পৃথিবীর অতিথি হয়ে আছি ততদিন আনন্দে একসঙ্গে জীববটাকে উপভোগ করে বাঁচি।" জয়ীর চোখ দিয়ে জল গড়াতে থাকে...শ্রীজাতবাবু বলে চলেন, "আমাদের দুটো বাড়ি হলো, এ বাড়িতে মাঝে মাঝে এসে হৈ-হল্লা করে দু-চারটে দিন কাটিয়ে যাবো।" সৌরভ এইবার এগিয়ে এসে বলে , "মা বাবা যা বলছে তাতে অমত করোনা প্লিজ। আমরা সবাই ভালো থাকবো তাতে।" তিন্নির মুখে প্রাপ্তির হাসি।
       জয়ীর চোখে এখন বাঁধভাঙা প্লাবন।  তিনি মানেন ঈশ্বর তো মানুষের মধ্যেই থাকেন... আজ তার প্রত্যক্ষ প্রমান পেলেন।

রাকেশ ঘোষাল

Comments

Popular posts from this blog

গ্রীষ্মের_ছুটিতে ছাত্রের লেখা খোলা চিঠি