অমর প্রেম


তোমাকে বহুবার বারণ করেছি এমন পালক সাদা শাড়ি তুমি পরবে না তুলিকা, তুমি কি কোনোদিন আমার কথা শুনবে না?

সেকি! শুভজিৎ আমি তো চেয়েছিলাম সারাজীবন তোমার কথা শুনতে। 

ক্ষমা কি আর করা যায় না তুলিকা? অপরাধটা কি এতটাই বড়?

ক্ষমা? ক্ষমা শব্দটা অদ্ভুত না শুভজিৎ?

আদৌ কি ক্ষমা শব্দের ব্যাখ্যা আছে তোমার কাছে? ক্ষমা করেছি বলেও মনে কষ্টটা পুষে রাখা যায় কিন্তু। শুধু ক্ষমা প্রার্থীর মানসিক শান্তি মাত্র। 

উফ..তুলি..তুমি আজকাল বড্ড ভারী ভারী শব্দ ব্যবহার করছো! এভাবে এড়িয়ে যেও না প্লিজ। 

তুলির ঠোঁটের কোণে ব্যঙ্গের হাসি, স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে শুভজিৎ। 

বলতো জিৎ..ওই যে পাখিটা আকাশে ওড়ার ভয়ে লোকের বাড়ির খাঁচায় বন্দি আছে, ওর কি আত্মসম্মান বোধ আছে বলে তোমার মনে হয়!

আমি জানি তুলি..তুমি কথার বানে বিদ্ধ করে আমার বুকে রক্ত ক্ষয় করবেই। এতে কি তুমি তৃপ্তি পাচ্ছ তুলি?

আমার স্কুল এসে গেছে, এবার তুমি এসো জিৎ। 

আজও কোনো কথা বলা হলো না শুভজিৎয়ের। অভিমানের বরফ যে এতটা কঠিন হয়ে জমে রয়েছে তুলির মনে সেটা কল্পনা করতে পারেনি শুভজিৎ। 

বড্ড বদলে গেছে ওর সেই চেনা জানা তুলিটা।

মানছে শুভজিৎ, ভুল ওর ছিল। তবুও এভাবে তুলি ওকে এড়িয়ে যেতে পারবে এটাও কি কোনোদিন ভেবেছিল শুভজিৎ?

তুলিকার বিয়ে হয়ে যাওয়ার খবরটা তুলিই দিয়েছিল এক সানাই বাজা সন্ধেতে। 

আবার করুন মালকোষের সুরে ওই জানিয়েছিল বাবা মারা গেল, মাকে নিয়ে ফিরে যাচ্ছি নবদ্বীপের বাড়িতে। 

সবটাই বড্ড চমক!

জিৎ তুতলে জিজ্ঞেস করেছিল, তুমি মাসিমাকে নিয়ে ফিরে আসছো তো...তোমার সংসার?

তুলি গম্ভীর গলায় বলেছিল, বেরঙিন আমার জীবন। না, তুলির ওই গলাটা শোনার পর আর সাহস করে জিজ্ঞেস করতে পারেনি জিৎ...তোমার স্বামী, শ্বশুরবাড়ির কি খবর?

প্রায় বছর সাতেক পরে দেখা হলো তুলির সাথে। 

সাদা শাড়িতে ধূসরতা ঘেরা ক্লান্ত মলিনতা যেন আপাদ মস্তক মুড়ে রেখেছে ওকে। 

শুভজিৎ অনেক চেষ্টা করলো, সেই স্কুল-কলেজের শেষ দেখা তুলিকে আবিষ্কার করতে, কিন্তু ব্যর্থ হলো ও।

এখনকার তুলিকার চোখ দুটো বড্ড পরিণত.. সাবধানী।

সেই ক্লাস ইলেভেনের তুলিকা ছিল উচ্ছল ঝর্ণার মত। কোয়েডস্কুলের একমাত্র মেয়ে, যে কিনা ছেলেদের সাথে বন্ধুত্ব করতে গিয়ে ভাবতো না ছেলেরা আলাদা জেন্ডার হয়। 

তুলিকা বলতো, বন্ধুর আবার জেন্ডার হয় নাকি?

বন্ধু মানে তো একরাশ ভালোবাসা, অনেক ঝগড়ার পরে অভিমান মুছে আবার ভাব ভাব খেলা।

শুভজিৎ তখন ক্লাস টুয়েলভ। 

একটু মুখচোরা স্বভাবের ছিল ও। সাধারণত মুখচোরা ছেলেদের নিয়ে মজা করে একটা পাশবিক সুখ উপভোগ করে স্মার্ট ছেলে মেয়েরা। 

এটাই নিয়ম, ভেবে মেনেও নিয়েছিল শুভজিৎ। 

ঘটনাটা ঘটেছিল ক্লাস ইলেভেনের নবীন বরণ অনুষ্ঠানে। 'বর্তমান শিক্ষায় কম্পিউটারের সুফল আর কুফল' নিয়ে একটি স্পিচ তৈরি করেছিল শুভজিৎ। ফিজিক্সের অরুণা ম্যাডাম বলেছিলেন, ভালো ছেলেরা যদি এই বিষয়গুলো নিয়ে একটু বলো তো বেশ ভালো হয়। 

ক্লাসের ফার্স্ট বয় না হোক, শুভজিতকে টিচাররা ভালো ছেলের দলেই ফেলতেন। 

আসলে একগাদা ছেলে-মেয়ের সামনে স্টেজে উঠে বলাটা শুভজিতের কাছে একটু কঠিন ছিল। তবুও ইচ্ছে ছিল বলবে কিছু।

মুস্কিলটা হলো, হাতে নিজের লেখা স্পিচটা নিয়ে কোনোমতে স্টেজে উঠলেও গলা দিয়ে একটা স্বরও বেরোচ্ছিলো না শুভজিতের। 

আয়নার সামনে এতবার রিহার্সাল দিলেও স্বাভাবিক হতে পারছিল না ও। আয়নায় ছিল শুধু ওর প্রতিচ্ছবি ...এখানে এক ঝাঁক পরিচিত-অপরিচিত অবয়বের ভিড়। ওর হাতের তালু ঘামতে শুরু করেছিল, সামনে বসে থাকা ওদের ক্লাসের ছেলেরা হুল্লোড় করে বলছিল, নেমে যা বাছা.. ক্যাসেটের ফিতে ছিঁড়ে গেছে। মায়ের নাড়ু গোপাল ...

ঠিক সেই সময় একটা অপরিচিত মেয়ে উঠে এসেছিল স্টেজে, ঠিক ওর পাশে। ওর হাত থেকে কাগজটা নিয়ে বললো, চলো শুরু করো। তুমি পারবে...আমি জানি তুমি পারবে।

কম্পিউটার বিজ্ঞানের একটা অসাধারণ আবিষ্কার....

ওর হাতে কাগজটা ধরিয়ে দিয়ে বলেছিল, আমি জানি এটা তোমার মুখস্ত হয়ে গেছে...শুরু কর। 

একটা অপরিচিত মেয়ে ওকে বিশ্বাস করেছিল, মেয়েটি জানে শুভজিৎ পারবে? এই কথাটিতেই ছিল ম্যাজিক। 

শুরু করেছিল শুভজিৎ...

হাসি থেমে সকলের মুখের মুগ্ধতাই প্রমান করেছিল,শুভজিৎও পারে।

মঞ্চ থেকে নেমেই এদিক ওদিক তাকিয়ে শুভজিৎ খুঁজে যাচ্ছিল ওই সাহস জোগানো অচেনা মেয়েটিকে। 

ক্লাস টেন পর্যন্ত শুধু বয়েজ, ইলেভেনে এসে কোয়েড হয়ে যাওয়া ওদের জ্ঞানপীঠ বিদ্যালরের সবুজ মাঠের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত চোখ চলে যাচ্ছিল ওর। তবুও পেলনা মেয়েটাকে। 

ঠিক সেই সময়েই গোলাপি চুড়িদার কোমরে ওড়না জড়িয়ে মঞ্চের লালচে কার্পেটে একটা ঘুঙুরের আওয়াজ। 

"হিমের রাতে ওই গগনের দীপগুলিরে

হেমন্তিকা করল গোপন আঁচল ঘিরে"


সাবলীল ভঙ্গিমায় নাচছে মেয়েটি। 

শরীরী বিভঙ্গ বলে দিচ্ছে, মেয়েটির শুধু শরীর নয় ...ওর মনও একাত্ম হয়ে গেছে নাচের সাথে। 

এতক্ষণ আপনারা দেখলেন, তুলিকা মিত্রের নৃত্য পরিবেশনা...ঘোষকের কাছেই শুভজিৎ প্রথম শুনেছিল তুলিকার নামটা।

তখনও নাচের পরিশ্রমে হাঁপাচ্ছিলো তুলিকা। তবুও শুভজিৎ সামনে যেতেই বলেছিল, আরে তুমি তো অসাধারন স্পিচ দিলে!

লজ্জায় শুভজিৎ মুখ নিচু করে বলেছিল, ভাগ্যিস তুমি ছিলে। 

এরপর তো টুয়েলভের ক্লাসের শুভজিৎ রায় অফ পিরিয়ডে ওই নির্দিষ্ট বারান্দাতেই দাঁড়িয়ে থাকত যেখান থেকে ক্লাশ ইলেভেনের আর্টসের তুলিকা মিত্রকে পরিষ্কার দেখা যাবে। 

তুলিকার কাছে ধরা পড়তে খুব বেশিদিন লাগেনি শুভজিতের। রঞ্জন স্যারের কাছে থেকে টিউশন সেরে ফিরছিল শুভজিৎ..

রাস্তায় হঠাৎই দেখলো তুলিকার সাইকেলের চেন পড়ে গেছে। শুভজিৎ সাহায্য করতে এগিয়ে গিয়েছিল। 

তুলিকা সাইকেলটা ধরে দাঁড়িয়েছিল। শুভজিৎ চেনটা পরাচ্ছিলো...

তুমি ওভাবে তাকাও কেন? আমাকে বন্ধু বান্ধবীরা ভীষণ রাগায়। 

আবার কথা আটকে গিয়েছিল শুভজিতের। 

তুলিকা বলেই চলেছে, তুমি ওই বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমাদের ক্লাস রুমের দিকে তাকিয়ে কি দেখ? আমাকে তো?

তোমার সাইকেল ঠিক হয়ে গেছে। বলেই উঠে দাঁড়িয়ে ছিল শুভজিৎ। 

নিজের সাইকেলের প্যাডেলে পা দিয়েই বলেছিল, আমার চোখদুটো বড় অবাধ্য, কথা শোনে না, তোমাকেই দেখতে চায় বারবার। বলেই স্পিডে সাইকেল চালিয়ে পালিয়ে এসেছিল শুভজিৎ, উত্তরের আশা না করেই।  

তারপর তো স্কুল যাওয়া কমে গেল। টেস্টের পর এমনিতেই পরীক্ষার প্রিপারেশনের জন্যই  টুয়েলভের স্টুডেন্টরা বেশি স্কুলে যাচ্ছিল না। 

সেদিন ছিল প্রাকটিক্যাল ক্লাশ। 

স্কুলে ঢোকার সময়েই দেখা হলো তুলিকার সাথে। 

স্বাভাবিক গলায় সকলের কান বাঁচিয়ে বললো, তোমার দৃষ্টিরা কি এখন নিতান্তই বাধ্য হয়ে গেছে! আমাকে না দেখে বেশ ভালোই আছে দেখছি তোমার চোখ দুটো। 

দুজনেই হেসে ফেলেছিলো। 

তুলিকাই শুভজিতের বাড়ির ল্যান্ড নম্বরে প্রথম ফোনটা করেছিল । 

একটু থেমে তুলিকা বলেছিল, যেদিন তোমার চোখ দুটো অবাধ্য হবে, সেদিন বিকেলে আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে একবার ঘুরে যেও।

কত কত কথা বলতো তখন তুলি। কিন্তু মেদিনীপুর থেকে ফিরে আসার পরে এতটা চুপচাপ যে জিৎ কোনোভাবেই ওকে চিনতে পারছে না।

তুলির সাজ পোশাক দেখে মনে হচ্ছে ও এখন বিধবা। স্বামী মারা গেছে বলেই কি এমন চুপ করে গেছে ওর অনর্গল কথারা!

অফিসের টেবিলে বসেও কাজে মন দিতে পারছে না আজ শুভজিৎ। বারবার পুরোনো স্মৃতি ওকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে ওদের সেই অপরিণত মনের রঙিন দিনগুলোতে।

সেই ওদের দুজনের সাইকেল প্রেম...সেই জলঙ্গী নদীর ধারের কদম ফুলের গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে প্রথম হাতে হাত রাখার অনুভূতিগুলো আবার নতুন করে রক্ত ক্ষরণ চালাচ্ছে শুভজিতের বুকে। 

হৃদয়ের লাব ডুব লাব ডুব শব্দটা কি আজও বলতে চাইছে...শুভজিৎ তুমি কিছুই ভোলানি বস...তোমার সব মনে আছে!

সেই গার্লস কলেজের তুলিকার চোখ রাঙানিটা তো এখনো মিস করে শুভজিৎ। 

তখন তুলিকা সেকেন্ড ইয়ারে..হঠাৎ বিকেলে কাঁদতে কাঁদতে এসে হাজির শুভজিতের কলেজের সামনে। 

অপ্রস্তুত শুভজিতকে আরেকটু অপ্রস্তুত করে দিয়ে তুলিকা বলেছিল, তুমি নাকি কলেজে অন্য কারোর প্রেমে পড়েছ? অনির্বাণ বললো, শুভজিতের ডানা গজিয়েছে তুলি। ও অন্য একটা মেয়ের প্রেমে পড়েছে। 

শুভজিৎ কিছু বলার আগেই, ওড়নার কোন দিয়ে চোখের জল মুছে তুলি বলেছিল, জ্যান্ত কবর দিয়ে দেব জিৎ , নয়তো পুড়িয়ে মারবো! আমাকে ছেড়ে যদি অন্য কারোর দিকে তাকিয়েও দেখো...

যেমন এসেছিল তেমনি ঝড়ের বেগে চলে গিয়েছিল অবুঝ তুলি। সন্ধেবেলা অনির্বাণকে খুব ঝাড় দিয়েছিল জিৎ। অনির্বাণ হেসে বলেছিল,ওরে পাগলা মাঝে মাঝে প্রেমিকার কাছে মিথ্যে বলে প্রেমের গভীরতার পরখ করতে হয় রে!

প্রমাদ গুনেছিলো জিৎ...অনির্বাণ তো আর জানে না..জিতের পাক্কা একমাস লেগেছিল তুলিকার ভুল ভাঙাতে।

তুলিকার গ্র‍্যাজুয়েশনের পরেই ওর বাবার ট্রান্সফার হয়ে গেল মেদিনীপুরে। নবদ্বীপের চেনা পরিবেশ ছেড়ে মেদিনীপুর যেতে কিছুতেই মন সায় দিচ্ছিল না তুলির। বাবা মায়ের চাপে পড়েই জিৎকে ছেড়ে তুলিকা চলে গিয়েছিল মেদিনীপুর।

রোজই নির্দিষ্ট সময়ে ফোনে কথা হত ওদের। অকারণেই তুলিকা হুমকি দিত, ভুলেও যেন জিৎ কোনো বাঁদরির দিকে না তাকায়! অত দূরে বসেও নাকি তুলিকার মনটা নজর রাখছে জিতের ওপর। 

পাগলী তুলি। অবুঝ তুলি! 

তুলি জানতই না , শুভজিতের মনের সমস্তটা জুড়েই একটা নামের দাপট, কারোর সাধ্যি নেই সেখানে প্রবেশ করার। 

তবুও তুলিকার ওই মিষ্টি শাসনগুলো শুনতে খুব ভালো লাগতো জিতের। 

শুভজিৎ তখন এম এস সি পাশ করেছে, চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছে। 

শুভজিতের বড় দিদির একটা চোখে একটু প্রবলেম আছে। তাই বিয়ের জন্য আসা বেশিরভাগ সম্বন্ধই ভেস্তে যাচ্ছে। যদিবা দু চারজন রাজি হচ্ছে,তাদের পণের টাকা শুনে ওর বাবা মায়ের রাতের ঘুম চলে যেতে বসেছে। জিৎ তখন চাকরির পরীক্ষায় বসছে, ঠিক সেই সময়েই তুলিকা ফোনে বলেছিল, মাস্টার্স কমপ্লিট ওর। বাড়িতে বিয়ের যোগাযোগ শুরু করতে চায়...শুভজিৎ যেন একদিন এসে বাবা মায়ের সাথে কথা বলে যায়।

জিৎ অনেক বুঝিয়েছিলো তুলিকাকে। আরো সময় দরকার জিতের। দিদির বিয়ে না দিয়ে, চাকরি না পেয়ে কি করে বিয়ে করবে ও। 

তুলিকা বলেছিল, জিৎ নাইবা পেলো চাকরি, তুলি চাকরি করবে!

তা হয় না তুলি, এই অবস্থায় আমি আমার বাড়িতে কিভাবে নিজের বিয়ের কথা বলবো?

কথাটা শুনেই ফোনের মধ্যেই ফুঁপিয়ে উঠেছিল তুলি।

শুভজিৎ নিরুপায়,কিছুটা অসহায়। টিউশনি পড়িয়ে, আর বড় দিদি বাড়িতে অবিবাহিত থাকতে ও কি করে বিয়ে করবে সেটাই বোঝাতে পারছিল না তুলিকে। 

তুলি স্কুলের চাকরিটা পেয়ে গেল বছর খানেকের মধ্যেই। তখনও শুভজিৎ বেকার। 

চাকরিটা পাওয়ার পরই তুলি ফোনে একদিন বললো, তুমি কি চাইছো জিৎ? তোমার দিদির বিয়ের দেরি আছে বলে.. আমার বাবা মাও মেয়ের বিয়ে নিয়ে ভাববে না? তোমার সাথে আমি আমার সম্পর্কের কথা সব বলেছি মাকে। আমি তো চাকরি করছি, আমার টাকায় না হয় চলবে সংসার! তারপর তুমিও পেয়ে যাবে চাকরি!

শুভজিৎ সেদিন ভাবতে ভাবতেই আসছিল,আজ ও বাড়িতে বলবে তুলির কথা। 

7বাড়ির কাছে এসেই মায়ের কান্নার আওয়াজটা পেয়েছিল। ছুটে বাড়িতে ঢুকতেই দেখলো, দিদির ঘরে একটা লম্বা টুল, আর ফ্যান থেকে ঝুলছে মায়েরই একটা শাড়ি। দিদি আর মা দুজনেই বসে কাঁদছে। ভাগ্যিস আজ মা দিদিকে দেখেছিল,তাই বাঁচানো গেল।

মা বললো, দেখ জিৎ...তোর দিদি বাবা ভাইয়ের বোঝা হতে চায়না আর। তাই ...

দিদিকে জড়িয়ে ধরে খুব কেঁদেছিল সেদিন জিৎ। 

ভুলে গিয়েছিল, তুলির কথা বাড়িতে জানানোর প্রতিজ্ঞাটাও।

কলেজ লাইফে তুলির প্রিয় রং ছিল সাদা। আর জিতের সব থেকে অপছন্দের রং সাদা। জিৎ ভীষণ রেগে যেত যেদিন তুলি সাদা পোশাক পরতো। জিৎ বলতো, কেমন একটা সব রঙ হারিয়ে ফেলা রং হচ্ছে সাদা। জীবনের নানা রঙের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া রং সাদা। তুমি কেন এই রঙের পোশাক পর?

তুলি বলতো, সাদা হচ্ছে স্নিগ্ধতার প্রতীক। সব রঙের সমন্বয়। 

কি ছোট্ট ছোট্ট বিষয়ে ওদের ঝগড়া হত,আবার ভাব। 

অথচ তুলিরা প্রায় তিনমাস হলো নবদ্বীপ ফিরে এসেছে। এই তিনমাসে অসংখ্য বার কথা বলার চেষ্টা করেছে জিৎ, তবুও তুলির অভিমানের বরফ একটুও উষ্ণতা পায়নি জিতের উপস্থিতিতে।

হঠাৎই কয়েক বছর আগে, একটা মায়াবী সন্ধেতে

তুলি ফোন করেছিল শুভজিৎকে। দূরে কোথাও সানাইয়ের আওয়াজ ভেসে আসছিল তুলির ফোন থেকে। 

খুব ধীর গলায় তুলি বলেছিল, জিৎ আজ থেকে তুমি মুক্ত। 

আমি অন্য কারোর হয়ে যাচ্ছি। আমার যে ঠোঁটে একদিন প্রথম চুম্বন এঁকেছিলে তুমি.. আজ সেখানে আঁকা হবে অন্য কারোর গল্প। এ ঠোঁট দুটো আর তোমার একার রইলো না। 

আমার ঠোঁট ছোঁবে অন্য পুরুষের পৌরুষ। 

আমি আজ থেকে অন্যের হয়ে যাবো জিৎ..

আর সহ্য করতে পারেনি শুভজিৎ, ফোনটা কেটে দিয়েছিল। নিরুপায় জিৎ কষ্টগুলোকে জমিয়ে রেখেছিল গোপন কুঠুরীতে। 

তারপর আর ফোন করেনি তুলি। জিতের ফোন আর ধরেওনি তুলি।

মাত্র পাঁচমাস আগে হঠাৎই একদিন ফোন করে বলেছিল, কাকু নাকি কার্ডিও অ্যারেস্টে মারা গেছেন। তুলি মিউচুয়াল ট্রান্সফার নিয়ে কৃষ্ণনগরের স্কুলে চলে আসছে। 

নিজের বিবাহিত সংসারের কথা বলেনি কিছুই। 

ততদিনে, শুভজিতের দিদির বেশ ভালো ছেলের সাথেই বিয়ে হয়েছে। শুভজিৎও SBI তে চাকরি পেয়েছে। জিৎয়ের সংসারে এখন বেশ স্থায়ী নিরাপত্তা বিরাজ করছে। ইদানিং মা জিৎয়ের বিয়ের কথা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে। 

এমন দিনেই আবার দেখা তুলির সাথে। সিঁদুরহীন, সাদা শাড়ির স্কুল শিক্ষিকার মধ্যে আগেকার তুলিকাকে খুঁজতে খুঁজতে বারবার হাঁপিয়ে উঠছে শুভজিৎ। 

তবুও শেষ চেষ্টা করবে ও। তুলিকার বাড়িতে গিয়ে ওর মায়ের কাছে ওদের দুজনের বিয়ের কথাটা বলবে একবার। 

হয়তো জিতের বাড়িতে বিধবা বিয়ে নিয়ে একটু আপত্তি উঠবে, কিন্তু তুলির জন্য সেটার সাথে লড়াই করার ক্ষমতা বর্তমানে জিতের আছে। 

না, সেদিন বেকার জিতের সত্যি ছিল না কিছুই করার। 

অফিস থেকে সাত তাড়াতাড়ি বেরোলো জিৎ।  অফিস থেকে খুব দূরে নয় তুলির স্কুল। 

কৃষ্ণনগর গার্লসের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো জিৎ। 

সেই কলেজবেলার মতোই অপেক্ষা করছে ও তুলির জন্য।  মুস্কিলটা হলো, সেই ঊনিশের তুলি জিৎকে দেখলে ছুটে বেরিয়ে এসে একমুখ আনন্দের হাসি উপহার দিতো ওকে। এই আঠাশএর তুলি যেন নিশ্চুপ,তরঙ্গহীন গভীর নদী। যার তল পাওয়া সত্যি অসম্ভব শুভজিতের পক্ষে। হয়তো আজকের তুলিকা ভ্রু কুঁচকে বলবে, আমার রংহীন জীবনে বড্ড অনাহুত তুমি জিৎ! প্রবেশের চেষ্টা করো না,দুয়ারে দাঁড়িয়ে আমার ধ্বংস দেখো চেয়ে চেয়ে। 

তুলিকা বেরোচ্ছে...বুকের ভিতরের সেই স্কুলবেলার লাব ডুব লাব ডুব শব্দটার দ্রুততা অনুভব করলো জিৎ। 

তুলি যত এগিয়ে আসছে, হাতের তালুটা যেন ততই ঘেমে উঠছে ওর। 

স্বাভাবিক গলায় তুলি বললো, কি ব্যাপার..আমাদের স্কুলের সামনে? কারোর অপেক্ষায় বুঝি!

জিৎ বললো, তুমি জানো কার অপেক্ষায়!

না ,জানি না জিৎ...

একদিন আমি ছিলাম তোমার একটা সম্মতির অপেক্ষায়। আমি অন্যের হয়ে যাচ্ছি শোনার পরেও তুমি সেদিন স্থির থাকতে পেরেছিলে। ছুটে যাওনি আমার কাছে। সব অপেক্ষারা এতগুলো বছরে ক্লান্ত হয়ে ছুটি নিয়েছে জিৎ। 

তুলি, তুমি আজও সেই আগের মতোই অবুঝ! একটু বোঝার চেষ্টা করো গো। তখন আমি বেকার, দিদি অবিবাহিত...আমি কি করে..

আমি তো চাকরি করছিলাম জিৎ। আমরা দুজনেই নাহয় দিদির বিয়ে দিতাম। 

আমার বাবার ইচ্ছে ছিল ধুমধাম করে মেয়ের বিয়ে দেবে। সেটার কোনো মূল্য নেই জিৎ?

হাঁপাচ্ছে জিৎ। তুলিকার অভিযোগের মুখে বরাবরই ও অসহায় বোধ করে। আজও তার ব্যতিক্রম নয়। 

তুলি শোনো, বাড়িতে আমার বিয়ের কথা বলছে মা। আমি তোমার কথা বলবো ভেবেছি। 

সেই নরম গোলাপি ঠোঁট দুটো আজ ব্যাঙ্গের হাসিতে বেঁকে যাচ্ছে তুলির!

বাড়িতে বলবে? আমরা সাত বছর প্রেম করেছি জিৎ, আমরা দূরে সরে গেছি প্রায় চারবছর ..এতদিনেও যখন তোমার বলা হয়ে ওঠেনি তখন থাকনা জিৎ। 

শোনো তুলি...প্লিজ, মা হয়তো তুমি বিধবা বলে প্রথমে আপত্তি করবে, কিন্তু সেটাকে মানানোর দায়িত্ব আমার। 

কথাটা বলেই শুভজিৎ বুঝলো, কি মারাত্মক ভুল করে ফেলেছে ও।

তুলিকা রক্ত চোখে তাকিয়ে বলল, সহানুভূতি? করুণা? 

শুভজিৎ রায় দয়া করছে বিধবা মেয়েকে?

স্কুলবেলার প্রেমের স্বীকৃতি দিতে চাইছে শুভজিৎ রায়?

কিন্তু তুলিকা মিত্র যে করুণা গ্রহণ করে না শুভজিৎ। 

হালকা শীতের নরম রোদে কালো পিচের রাস্তায় একদম একা দাঁড়িয়ে আছে শুভজিৎ। 

একবারও পিছন ফিরে না তাকিয়ে তুলিকা বাসে উঠে পড়ল। 

কষ্ট হচ্ছে শুভজিতের। তুলিও বুঝলো না ওকে! একদিন এই তুলিই মঞ্চে অত লোকের সামনে অপরিচিত জিৎকে বলেছিল, আমি জানি তুমি পারবে। 

ফুটপথ ধরে একা হেঁটে যাচ্ছে জিৎ। 

বিষণ্ন মন, উদাস দৃষ্টি দেখেই মা বললো,জিৎ তোর বড় মামা দুটো পাত্রীর সন্ধান এনেছে। একটা ধানবাদ ,একটা মেদিনীপুর। 

সামনের রবিবার বড় মামা ,মামীর সাথে দেখে আয় না মেয়েটাকে। 

মায়ের চোখে করুণ আর্তি। 

বিয়ে জিৎ করবে না, তবুও মায়ের কথা শুনেই মেয়েটাকে দেখতে একবার যেতেই হবে। 

এসে নাহয় বলবে পছন্দ হলো না।

মামাকে বলো, মেদিনীপুরে যাবো। 

মেদিনীপুর নামটাই আগে মনে এলো। হয়তো সাতটা বছর তুলিকা ওখানের হাওয়ায় নিশ্বাস নিয়েছে বলেই ওই শহরটাকে দেখার ইচ্ছে জাগলো মনে। তুলিকা বলে দিয়েছে, কখনো সামনে এসো না জিৎ। 

মেয়েটা বেশ ছোট। সবে গ্র‍্যাজুয়েশন কমপ্লিট করেছে। মামার আক্কেল দেখে অবাক লাগে জিতের। একটা কুড়ি বছরের মেয়ের সাথে ঊনত্রিশ-ত্রিশের শুভজিতের সম্বন্ধ নিয়ে হাজির হয়েছে মামা। 

মেয়ের বাবার আবার জিৎকে বেশ পছন্দ। তিনি বলছেন, অমন দশ বারো বছরের ছোট বিয়েতে কোনো সমস্যা হয়না।

জিৎ আলাদা ভাবে কথা বলতে চাইল মেয়েটির সাথে। 

মেয়েটিকে জানিয়ে দিয়েই যাবে ওর বিয়েতে আপত্তি, শুধু মামার কথায় এসেছে দেখতে। 

জিৎকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই মেয়েটি বললো, শুনুন স্যার..আমি এ বিয়ে করতে পারবো না। আসলে বাবার জোরাজুরিতে আমি দেখতে আসায় রাজি হয়েছি। 

আসলে আমি একজনকে ভালবাসি। সে আমার থেকে মাত্র দু বছরের বড়। 

আমি ওর প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য অপেক্ষা করবো। 

একটা কলেজ পড়ুয়া মেয়ের মুখে এই কথা শুনে বেশ চমকে গেছে জিৎ। 

তুলিও যদি এর মত আরেকটু অপেক্ষা করতো ওর জন্য!!

মেয়েটির সরল কথায় বেশ ভালো লাগছিলো জিতের। 

জিৎ আগ্রহী হয়ে বলল, তা কি নাম তোমার লাভারের?

মেয়েটি উৎসাহী হয়ে বলল, আমি ইন্দ্রানী ওর নাম ইন্দ্র। কি মিল না আমাদের?

আমরা সেই স্কুল থেকে প্রেম করছি। 

দুজনেই চাকরি পেয়ে তারপর বিয়ে করবো। 

আমি জানি ভালোবাসলে সব ছাড়া যায়। আমাদের তুলিকা ম্যাডাম বলেছিলেন, ভালোবাসলে তার স্মৃতি নিয়েই বাঁচা যায়। 

আরেকটু হলেই চা টা ছলকে গায়ে পড়ে যাচ্ছিল জিতের। 

কে বলেছিল? কি নাম?

ইন্দ্রানী বললো, আমাদের বীনাপানি বালিকা বিদ্যালয়ের সংস্কৃতর ম্যাডাম ছিলেন তুলিকা মিত্র, উনি বলেছিলেন। 

আমরা তো ওনার কাছে টিউশন পড়তে যেতাম। 

সেই স্কুলবেলার প্রেমকে মনে রেখে ঠিক হয়ে যাওয়া বিয়ে ভেঙে দিয়ে একলা ছিলেন ম্যাডাম। আমরা বলেছিলাম,ম্যাডাম আপনি বিয়ে করবেন না?

ম্যাডাম বলতেন, জলঙ্গী নদীর ধারে কদম গাছটার নীচে আমাদের গান্ধর্ব মতে বিয়ে হয়ে গিয়েছিল সেই কোন স্কুলবেলায়। 

ভালো থেকো ইন্দ্রানী। আমি চাই তুমি ইন্দ্রর সাথে বিয়ে করে সুখে থাকো। 

ঝড়ের মতোই বেরিয়ে এলো শুভজিৎ। 

ইন্দ্রানীর বাবাকে বললো, মেয়ে পছন্দ নয়। 

ড্রাইভারকে বলল, জোরে চালাও...আমাকে তাড়াতাড়ি নবদ্বীপ পৌঁছাতে হবে। 

মামা,মামী একটু অবাক হয়েই তাকিয়ে আছে ওর দিকে। 


ইউনিট টেস্টের খাতা দেখছিল তুলি। 

কাকিমা দেখেই এক মুখ হেসে বললেন, কেমন আছো শুভজিৎ? তোমাদের ঝগড়া মিটেছে? শুধু তোমার কাকুই মেয়ের বিয়েটা দেখে যেতে পারলেন না। 

যাও তুলি ওই ঘরে। 

ঘরে ঢুকেই জিৎ বললো, মেয়ে দেখতে গিয়েছিলাম। আমার বিয়ে ফাইনাল হলো। 

তুলি চমকে উঠে বললো, ভালো তো...

কি নাম মেয়ের? দেখতে কেমন?

জিৎ বললো, ইন্দ্রানী। দেখতে খুব মিষ্টি। তোমার আগের স্কুলের ছাত্রী ছিল বলল। 

তুলিকা বলল, তা বেশ কমবয়সী মেয়ে বিয়ে করছো, ভালো তো। 

চেষ্টা করে যাচ্ছে তুলি..চোখের জল আর মনের দ্বন্দ্বের আভাস যেন কিছুতেই না পৌঁছায় জিতের সামনে। 

জিৎ বললো, আমার এই নিকোটিনে পোড়া ঠোঁটের ছোঁয়া পাবে অন্য কারোর ঠোঁট। আমি অন্য কাউকে জড়িয়ে ধরবো এবার থেকে...

আমি আর সে বিকেলে জলঙ্গীর নদীর তীরে বেড়াতে যাবো। 

কদম গাছের নিচে....

চুপ একদম চুপ...

প্রায় গর্জে উঠলো তুলি। 

খবরদার ..আমাকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে বিয়ে করলে তোমাকে...

কি করবে ? জ্যান্ত কবর দেবে? নাকি পুড়িয়ে মারবে?

মিথ্যেগুলো তুমি বলেছিলে তুলি! তোমার বিয়ে হয়ে গেছে, তুমি অন্য কারোর হয়ে গেছ...

বেশ করেছিলাম মিথ্যে বলেছিলাম। 

তাহলে আমিও নাহয় দুটো মিথ্যে বললাম। অকারণ অভিমান করে এতগুলো বছর তুমি দূরে থাকলে তুলি? তুমি বড্ড অবুঝ গো। ভীষণ একগুঁয়ে জানো। 

একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছে শুভজিৎ তুলির দিকে। 

বুঝলে তুলি আমি জানি আমি পারবো...তুমিও তো জানো আমি পারবো...

তুলিকে জড়িয়ে ধরে ওর ঠোঁটে ঠোঁট রাখলো শুভজিৎ। সেই চেনা মেয়েটা, সেই চেনা স্পর্শ। তুলি কাঁদছে। তুলির চোখের নোনতা জলে ভিজে যাচ্ছে শুভজিতের শার্ট। ভিজুক, আরও ভিজতে চায় শুভজিৎ। বরফ গলছে.... উষ্ণ হচ্ছে...ফিরে পাচ্ছে ওর হারিয়ে যাওয়া তুলিটাকে। 

রাকেশ ঘোষাল

Comments

Popular posts from this blog

গ্রীষ্মের_ছুটিতে ছাত্রের লেখা খোলা চিঠি