অসুরদলনী দেবী
শ্রীচরণেষু বাবা,
আজ এই পাঁচ বছরের যুদ্ধের পর আমি আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হচ্ছি। তোমার মনে পড়ে বাবা যখন শ্যামলদের বাড়ি থেকে যখন আমাকে দেখতে এলো, ওদের কথাবার্তায় ভারি বিরক্ত হয়েছিলাম! তোমাকে বলেছিলাম এই বাড়িতে বিয়ে না দিতে, তুমি শোনোনি। বিয়ের দশদিন পর থেকে সেই যে শুরু হয়েছে , জানিনা এই শারীরিক, মানসিক আর অর্থনৈতিক শোষণ কবে বন্ধ হবে! তোমার উকিল জামাই আর তার বাবা মা আমাকে চাপ দিচ্ছে তোমার শেষ সম্বল বাড়ি টুকু যেন নিজের নামে করিয়ে নিই। গত পাঁচ বছরে তোমার থেকে তো কম টাকা এনে এদের হাতে দিইনি। নিঃস্ব মানুষের শেষ সম্বল মাথার ছাদটা কি করে কেড়ে নিই বলো? তার থেকে এই জীবন থেকে মুক্তি নিলাম আর তোমাদের সকলকে মুক্ত করলাম আমার দায়ভার থেকে!
ইতি
তোমার অভাগী মেয়ে
চিঠিটা ভাঁজ করে টেবিলের উপর রেখে উঠে দাঁড়ালো সুমিত্রা। গত এক সপ্তাহ ধরে মারাত্মক অত্যাচারের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। গতকাল বাম পায়ে গরম তেল দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছেন শ্বাশুড়ি মা আর বাধ্য সন্তানের মতো তাকে সাহায্য করেছে তার গুণধর ছেলে শ্যামল। পা টিপে টিপে বের হলো সুমিত্রা। বাগবাজারের ঘাট ওর শ্বশুর বাড়ি থেকে পাঁচ মিনিটের হাঁটা পথ। ভোর চারটে বাজে। এখন ঘাটে লোক কম থাকে, আস্তে আস্তে একটু করে নিচে নামতে থাকলো সুমিত্রা। মা দূর্গার পূজোর পরও তো তাকে গঙ্গায় বিসর্জন দেওয়া হয়, সেও নয় এই পথেই মুক্তি পাক!
চোখ খুললো সুমিত্রা। মাথাটা বেশ ভারি লাগছে, উঠে বসতে গিয়ে দেখলো গায়ের সেই শাড়ি টি নেই, একটা নাইটি পড়ানো। অচেনা একটা ঘর, একটা পুরোনো খাটের উপর ও শুয়ে ছিল। ডানদিকে একটা ড্রেসিং টেবিল আর তার পাশে একটা ছোট ঠাকুরের আসন। অনেক দিন এই ঘরে কেউ ঢোকেনি, ঠাকুরের উপর প্রচুর নোংরা জমে আছে। আস্তে আস্তে উঠে এসে ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার টানতেই ছোট একটা ওড়না পেল। ওটা দিয়েই ঠাকুরের আসনের ধূলো পরিস্কার করে রাখলো। ধূপ জ্বালিয়ে দিল। খাটের নিচে রাখা ঝাঁটা দিয়ে ঘরটাও একটু পরিস্কার করা শুরু করলো। দরজাটা খুলছে।
ও মেয়ে উঠেছিস্? বাব্বা যা ভয় পেয়েছিলাম! তা মরতে গেছিলি কেন গা!
একজন মোটা মতো বয়স পন্চাশের মহিলা দাঁড়িয়ে, পিছনে আরও দুটি মেয়ে।
আর এই কি করছিস্, ওঠ ওঠ, এ ঘর পরিস্কার করতে তোকে কে বলেছে? উঃ আবার ধূপ জ্বালা হয়েছে! এ ঘর চান্দেরির ছিল, গেল মাসে অসুখে মরেছে। কেউ থাকে না। নে ফোট্ এবার , ভাগ এই নরক থেকে!
আমি কোথায় মামণি?
কি , কি বললি আমাকে মামণি? হাসালি! বছর চল্লিশ অবধি যখন লোকের বিছানা গরম করতিম তখন ছিলাম মালিনী রাণী, আর এখন সবার মাসি! তা তোর নাম কি রে?
সুমিত্রা।
ও তা মরতে যাচ্ছিলি কেন?
সব কথা খুলে বললো সে। আর পারছি না কেন বাঁচবো বলতে পারো মামণি, আমি হওয়ার পর মা মারা যায়, বাবা কত কষ্ট করে আমাকে মানুষ করেছেন, তারসাধ্য মতো পাত্রস্হ করেছেন। আসলে জানো আমি অপয়া, আমার কপালটাই খারাপ! কথা শেষ করে কাঁদতে থাকলো সুমিত্রা। জীবনের সব দুঃখ, গ্লানি, ব্যথা আজ চোখের জলে ধুয়ে যাচ্ছে।
মালিনী উঠে দাঁড়ালো, কাছে এসে সুমিত্রার মাথায় হাত রেখে বললো, মা রে, আমাকে সেই বিয়ের পর বরটা শহর দেখাবে বলে এখানে বিক্কিরি করে চলে যায়। সেই থেকে এখানে, তুই আমাকে মামণি বলেছিস্, আমার মেয়ে তুই। এখানে এই ঘরেই থাকবি! এই কমলা দিদির জন্য গরম দুধ নিয়ে আয়!
এরপর এক বছর কেটে গেছে। সুমিত্রা নতুন করে জীবন শুরু করেছে। অনেক বদলে গেছে পতিতা পল্লীর সকলের জীবন। ওরা বলে স্বয়ং মা লক্ষী রূপে নাকি ও এসেছে এই পাড়াতে। যখন মেয়েগুলো নিজের শরীর দিয়ে বাবুদের যৌন ক্ষিদে মেটায়, সুমিত্রা ওদের বাচ্ছা গুলোকে নিয়ে নিজের ঘরে থাকে। ওদের লেখা পড়া করায়, খাইয়ে দেয়। অনেক বাবুরা ফেরত যাওয়ার সময় আবার এই বাচ্চাদের জন্য কিছু টাকা দিয়ে যায়, যতই অবৈধ হোক তবুও তো ওরা অনেকেই এই বাবুদের ঔরসজাত!
আজকাল আবার পতিতা পল্লীতে কোন মেয়ে কে বিক্রি করে গেলে মালিনী মাসি তাকে শরীর বিক্রি করতে জোর করে না, বরং তার মেয়ের কথা মতো ঐ মেয়েদের জন্য স্বনির্ভর কাজের বন্দোবস্ত করে। অন্য মেয়েরা পিছনে বলে সুমিত্রা আসার পর মালিনী মাসি নাকি ডাইনি থেকে সাক্ষাৎ দেবী হয়ে গেছে! একে তো সুমিত্রার মিষ্ট ব্যবহার আর বাচ্ছাগুলোর প্রতি অকৃত্রিম স্নেহ ওকে চরম ভালোবাসা দিচ্ছে এই মানুষগুলোর থেকে। আঃ কত শান্তি এখন!
এই রকমই একদিন পাড়ার মোড়ে ওষুধের দোকানে গেছে সুমিত্রা। চম্পার বাচ্চার দুধ শেষ হয়েছে, ওটাই কিনতে। ফেরার পথে মনে হচ্ছে কেউ যেন ফলো করছে! হঠাৎ চুলে একটান!
তবে রে মাগী, এখানে এসে লুকিয়েছিস্? মরিস্ নি বলে তোর বাবাও উইল করে বাড়িটা তোর নামে লিখেছেন আর তোর অবর্তমানে অনাথ আশ্রমের। দাঁড়া আগে তোকে এই রাস্তায় ভোগ করবো, তারপর ঐ সামনের গঙ্গায় চোবাবো।
কথা শেষ করেই মাটিতে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছে সুমিত্রা কে শ্যামল। শ্যামলের চিৎকারে সব ঘর থেকে মেয়েরা বেড়িয়ে এসেছে। নন্দিতার মেয়েটা দৌড়ে গিয়ে মালিনী কে খবর দিয়ে এলো। মালিনী দৌড়ে এসেছে। তার মেয়েকে একটা লোক মাটিতে ফেলে লাথি মেরেই যাচ্ছে, আর যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠছে সুমিত্রা।
এই কে রে এই দানবটা?
মাসি মাঝে মাঝে আসতো ঐ জবার ঘরে। আমাদের দিদিমণির বর গো, মেয়েটাকে বাঁচাও তুমি!
ভরত সিং, অমর, লখা ধর লোকটাকে!
তিনটে ষন্ডামার্কা লোক এগিয়ে গিয়ে শ্যামলকে ধরলো। সুমিত্রা তখনও মাটিতে পড়ে। মালিনী গিয়ে তুলে ধরলো ওকে। সারা গায়ে মারের দাগ, ঠোঁট ফেটে রক্ত পড়ছে।
এই ওঠ্ এই লোকটা যে এতো ফেলে পেটালো তোকে পড়ে পড়ে মার খেলি? এই তুই আমার মেয়ে? যা চলে যা ওর সঙ্গে! ফিরে গিয়ে আরও মার খা!
মামণি! আমি আর পারছি না! আমি তোমার কাছে থাকবো। এই মানুষকে আমি পারলে এখনই মেরে ফেলি। কি হবে এই সিঁদুর রেখে! যেখানে মাথা ফাটিয়ে জানান দিতে হবে যে আমি বিয়ে করা বৌ তাই ওদের সম্পত্তি! মানসিক আর শারীরিক অত্যাচারের পর তাকে বিছানায় ফেলে ধর্ষণ করতে হবে!
হঠাৎ উঠে দাঁড়ালো সুমিত্রা, এগিয়ে গিয়ে একদম শ্যামলের মুখোমুখি দাঁড়ালো। তারপর ঠাস করে সজোরে একটা চড় মেরে বললো, সব অপমানের জবাব দিলাম!
তারপর নিজেই অদ্ভুত গম্ভীর হয়ে বললো, ভরত সিং প্রথমে এই লোকটার পুরুষাঙ্গ কাটবে , তারপর হাতের আর পায়ের আঙ্গুল একটা একটা করে কাটবে। তিলে তিলে কষ্ট পায় যেন এই দানবটা! তারপর হাত পা বেঁধে গঙ্গায় বিসর্জন দিয়ে দিও এই অসুরের!!!!
সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে রয়েছে সুমিত্রার দিকে, অসুরদলনী দেবী যেন দাঁড়িয়ে, দুচোখে আগুন ঝড়ছে।
১৫ বছর পর।
আজ চল্লিশ বছর বয়স হলো সুমিত্রার, মালিনীর ছবির পাশে বাবার ছবিটি টাঙানো। চোখের চশমা মুছে বাইরে এলো। কমলাদি, কি করছো?
কে মামণি? এই যে রে, ঐ অর্ডারে যে নকশিকাঁথা গুলোর প্যাকিং করাচ্ছি!
সারপ্রাইজ!!!!হ্যাপি বার্থডে মামণি!!!!
জনা কুড়ি বিভিন্ন বয়সের ছেলে মেয়েদের দল। পিছনে তাদের মায়েরা। সবার আগে কমলা দি এগিয়ে এসেছে, হাতে পায়েসের বাটি।
মামণি প্রতি বছর মাসি তোর জন্য এই দিন পায়েস বানাতো, আজ আমার হাতে খেয়ে দেখ্।
চোখে জল নিয়ে কমলাদির হাতে পায়েস খেয়ে প্রণাম করতে যেতেই বললো, ছিঃ ওঠ্ মামণি, তুই আমাদের দশভূজা! আমাদের নোংরা জীবন থেকে আলোয় নিয়ে এসেছিস্, স্বনির্ভর তৈরি করেছিস্। আমরা কেউ আজ পতিতা নেই, আমাদের হাতের কাজ নিয়ে আমরা বিজনেস করছি। আমাদের ছেলে মেয়েরা অন্ধকারে ডোবেনি। কেউ ডাক্তার, ইন্জিনিয়ার আবার কেউ টিচার। সবটুকু তোর জন্য। নিজের বাড়িটা পর্যন্ত হাসপাতাল করতে লিখে দিলি।
আমাদের মা রে তুই নতুন জন্ম দিয়েছিস্! কেউ আর আজ এটাকে পতিতা পল্লী বলেনা, বলে সুমিত্রা দেবীর পাড়া, যেখানে প্রতি ঘরে ঘরে আজ আনন্দের দীপ জ্বলছে।
রাকেশ ঘোষাল
Comments
Post a Comment