আবার দেখা



এই গল্পটা কোনও সিনেমার গল্প নয়। ভালোবাসার মানুষটাকে একদিন আচমকা হারিয়ে ফেলার পর যদি অনেকবছর পর আবার তার সাথে দেখা হয়? তখন সে অন্যকারও, আপনিও তাই। কী বলবেন তাকে? ৭২ বছর পর এক দুপুরবেলা মি.একনারায়ণন নাম্বিয়ারের সাথে দেখা হলো সারদাদেবীর। তাঁদের গল্পটা আজ একটু বলি বরং।

সাল ১৯৪৬, মাত্র ১৪ বছর বয়সী সারাদাদেবীর সাথে বিয়ে হলো ১৮ বছর বয়সী একনারায়ণন নাম্বিয়ারের। ওইটুকু বয়সে মা-বাবাকে ছেড়ে আসা কিশোরী সারদার সমস্ত আব্দার মেটাতে সর্বদা প্রস্তুত থাকতেন একনারায়ণন। বিয়ের সবে তখন আটমাস পেরিয়েছে। বাবার মতোই ইংরেজ শাসক ও জমিদারদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে স্থানীয় কৃষক বিদ্রোহে নাম লেখালেন একনারায়ণন। ১৯৪৬ সালের ৩০ শে ডিসেম্বর কয়েকশো বিদ্রোহী কৃষকের সাথে আক্রমণ করলেন জমিদারের বাড়ি। কিন্তু সে খবর আগে থেকেই জানতেন জমিদার। এর ফলে ব্রিটিশ পুলিশবাহিনীর লোকেরা অপেক্ষা করছিলো বিদ্রোহীদের জন্য। 

কেউ মারা গেলো পুলিশের গুলিতে। কেউ সাংঘাতিক আহত হলো। একনারায়ণন ও তাঁর বাবা সেখান থেকে পালালেও দু'মাস বাদে ধরা পড়লো ব্রিটিশ পুলিশবাহিনীর হাতে। ওদিকে আগুন লাগিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হলো সমস্ত বিদ্রোহী কৃষকের ঘর। কিশোরী সারদাকে নিয়ে কোনওমতে পালিয়ে বাঁচলেন একনারায়ণনের মা। রটিয়ে দেওয়া হলো একনারায়ণন ও তাঁর বাবা মারা গেছেন ব্রিটিশদের হাতে।

নিজের সন্তানসম পূত্রবধূকে বিভিন্ন আপদ-বিপদ থেকে বাঁচাতে, তাঁর আবার বিয়ে দিয়ে দিলেন একনারায়ণনের মা। দ্বিতীয় স্বামীর হাত ধরে রাজ্য ছাড়লেন সারদা। এদিকে আটবছর বাদে জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর, বাড়ি ফিরলেন একনারায়ণন। বহু জায়গায় খুঁজলেন তার বাল্যবয়সের প্রথম সঙ্গিনীকে। কিন্তু কোত্থাও খুঁজে পেলেন না। অবশেষে নতুন করে সংসার পাতলেন তিনিও।

এই ঘটনার কয়েক যুগ বাদে "৩০ শে ডিসেম্বর" নামক একটা গল্পের বইয়ের পাতা উল্টোচ্ছিলেন সারদাদেবীর ছেলে ভার্ঘবন। পড়তে পড়তে তিনি বুঝতে পারলেন এ যেন হুবহু তাঁর মায়ের বর্ণনা করা কিশোরীবেলার স্মৃতি অন্য একজনের চোখ দিয়ে দেখছেন তিনি। সাথে সাথে তিনি খোঁজ লাগালেন লেখিকার। তাঁর সাথে যোগাযোগ করে ভার্ঘবন জানতে পারলেন সেই লেখিকা আদতে তাঁর মায়ের প্রথম জীবনসঙ্গী একনারায়ণন-এর ভাগ্নী এবং এও জানতে পারলেন, একনারায়ণন নাম্বিয়ার আজও বেঁচে আছেন। সাথে সাথে তিনি পরিকল্পনা করে নিলেন মায়ের সাথে তিনি দেখা করাবেন একনারায়ণনবাবুর। সেই মতো তাঁকে আমন্ত্রণ জানালেন বাড়িতে। 

এরপর এক দুপুরবেলা ৭২ বছর বাদে দেখা হলো ৯০ বছরের একনারায়ণন নাম্বিয়ার ও ৮৬ বছরের সারদাদেবীর। বেশ কিছুক্ষণ চোখের জল ফেললেন দু'জনেই। একে অপরের থেকে জেনে নিলেন গত ৭২ বছরের জীবনকাহিনী। এরপর দুই পরিবার মিলে একসাথে খাওয়াদাওয়া হলো। আর তারপর ৭২ বছর বাদে দেখা হওয়া প্রথম জীবনসঙ্গীকে আবার দেখতে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিজের বাড়ি ফিরে গেলেন মি.নাম্বিয়ার। ওই যে প্রথমেই লিখেছিলাম এটা কোনও সিনেমার গল্প নয়। তাই হয়তো একসাথে থাকা হলো না ওঁদের। তবে বহুবছর একসাথে থাকার পরেও কটা সম্পর্কের গল্প এমন রূপকথার মতো হয়?

রাকেশ ঘোষাল

Comments

Popular posts from this blog

গ্রীষ্মের_ছুটিতে ছাত্রের লেখা খোলা চিঠি