মধুরেণ সমাপয়েত



ঝুল বারান্দায় বসে গায়ের চাদরটা আরেকটু ভালো করে জড়িয়ে নেন প্রবীণা রমলাদেবী।একটু আগেই বসবার ঘরের সাবেক আমলের পেল্লায় ঘড়িটা সশব্দে জানিয়েছে রাত এগারোটা বাজল, বৌমা রূপসা এসে বার তিনেক ডেকে গেছে ওনাকে ঘরের ভিতরে গিয়ে বসবার জন্যে।কিন্তু খোকা মানে ওনার ছেলে শুভম বাড়ি ফিরে না আসা পর্যন্ত নিজের ঘরে গিয়ে ঠিক স্বস্তি বোধ করেন না রমলা।নিজের পেল্লাই মাপের ঘরটা যেন দৈত্যের মত দুহাত বাড়িয়ে গিলে খেতে আসে রমলাকে।আগে অবশ্য রমলার স্বামী রঞ্জনবাবু থাকতে অবশ্য বাড়ির পরিস্থিতিটা একদম অন্যরকম ছিল।

মাস ছয় হল রঞ্জনের মৃত্যুর সাথে সাথে বেশ কিছু পরিবর্তন এসছে।এটা কিন্তু কোনোমতেই বলা যায় না ছেলে শুভম আর ছেলের বউ রূপসার কাছে রমলাদেবী অযত্নে আছেন।তবু স্বামী চলে যাবার পর থেকে উনি যেন মণিহারা ফনী সবকিছু বড় ফাঁকা ফাঁকা লাগে। 

সকাল থেকে পুজোআর্চা,জপতপ নিয়ে থাকেন উনি আর সন্ধ্যা থেকে হট ওয়াটার ব্যাগে ছেক নিতে নিতে ওই রঙিন বোবাবাক্সের  মধ্যে মানুষজনের হাঁটাচলা দেখেই দিন কাটে কচ্ছ  পের  গতিতে।স্বামী থাকাকালীন দিনে দশবার করে চা কর,এই রান্না কর,তাই রান্না কর নানারকম ফাইফরমাস,আফদার মেটাতে মেটাতে দিন কাটত বেশ রমলাদেবীর।সেই সময় মনে হত এগুলো ঝকমারি কারণ রঞ্জনবাবুর রান্নার সময় বেশ খেয়াল রাখতে হত রমলাকে।উনি ছিলেন মধুমেহ রুগী তাই মিষ্টি ভালোবাসা সত্ত্বেও একটু এধার থেকে ওধার হবার সুযোগটুকু ছিলনা।রান্নাবান্না,চা,জলখাবারের প্লেটে মিষ্টি একদম নৈব নৈব চ ছিল রঞ্জনবাবুর। কড়া ডায়েট চার্টের মধ্যেই জীবন কাটাতেন উনি গিন্নীর নজরে।আর সন্ধ্যা হলেই রঞ্জনবাবুর নেশা ছিল নানা ধরনের লেখালিখি করা। যৌবনে কাজের চাপে এসব কিছুই করতে পারেননি তাই অবসরের পর দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতেন আর উৎসাহ দিতেন পত্নী রমলা।সে সবই আজ অতীত। 

হটাৎ একদিন দুম করে পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে গেলেন উনি ভোররাতে রমলাকে একলা করে রেখে।ছেলে শুভম পুলিশ বিভাগে উচ্চপদে কর্মরত আর ছেলের বউ রূপসা শিক্ষিকা। সারাদিন ওরা বেরিয়ে যায় অবশ্য সর্বক্ষণের জন্য একজন কাজের মেয়ে অবশ্যই আছে কিন্তু রমলার সাথে তার বয়সের ফারাক অনেক!কি যেন বলে এখনকার ভাষায় ওই জেনারেশন গ্যাপ সেতো কাজের ফাঁকে সুযোগ পেলেই রিমোট হাতে বসে যায় টিভির সামনে আর গপগপ করে গেলে ঢিসুম ঢিসুম।আর অন্যদিকে বাগানের গাছে, ছাদের টবের গাছগুলোর পরিচর্যা করে যেটুকু সময় কাটে রমলার আর কি! চশমাটা ঝাপসা হয়ে আসে এসব ভাবতে ভাবতে ,আঁচলের খুঁটটা দিয়ে নিজের চোখের কোণটা মোছেন রমলা, এমনসময় চোখ পড়ে গাড়ির হেডলাইটের আলো।খোকা ফিরল অফিস থেকে। বাড়ি ফিরেই শুভম একবার আসে মার কাছে আজও তার ব্যতিক্রম হয়না।শুভ ওরফে শুভম মৃদু ধমকের সুরে বলে "এখনও খাওনি কেন মা, আমার কি ডিউটির কোনো ঠিক থাকে।এমন করে চললে তো শরীর খারাপ করবে।" রমলা ছেলের মাথায় হাত রেখে বলেন "আমি আর কতদিন খোকা, তোরা নিজের মত সংসারটা সাজিয়ে গুছিয়ে নে এবার।" খাবার টেবিলে ডাক পড়ে সবার। 

না অনেক রাত হল আজ।রমলা বলেন,"বৌমা আজ আর বিশেষ কিছু খাবনা।আমিষে বিশেষ রুচি নেই।তুমি বরং একটু দুধ আর রসগোল্লা পাঠিয়ে দাও আমার ঘরে।এত রাতে ভাত খেলে আবার হজমের গোলমাল হবে, বয়স হয়েছে তো বুঝেশুনে না খেলে অযথা বিপত্তি বাড়বে।" 

কথাগুলো বলে নিজের ঘরে চলে যান রমলা।আগের মতোই সব জিনিস পরিপাটি সাজানো এমনকি লেখার টেবিলে পেনদানিটাও।ঘরের দেওয়ালে এক জোড়া টিকটিকি টিকটিক করে উঠছে মাঝেমধ্যে।উত্তরের খোলা জানলা দিয়ে শিরশির করে ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে,আর পাতা খসার মচমচ শব্দ আগাম জানান দিচ্ছে শীতকাল আসছে। কাজের মেয়ে এসে দুধ আর রসগোল্লা রেখে যায় টেবিলে।এমনসময় দেওয়ালে টানানো স্বামীর ফটোর দিকে নজর যায় রমলার। ফ্রেমের মধ্য থেকে রঞ্জনবাবু যেন স্পষ্ট বলে ওঠেন,"কিগো গিন্নি আমাকে না দিয়ে একা একাই খাচ্ছ রসগোল্লা, তুমি কি নিষ্ঠুর গো!" রমলা পুরনো অভ্যেস মত ধমকে ওঠেন "আঃ মলো যা বুড়োর লোভ দেখ, তোমার না সুগার।"এতদূর বলে জিভ কেটে দেখেন সবটাই ভ্রম, বড় মায়া জাগে রমলার মনে।কি মনে হতে রসগোল্লা রেখে দেন বাটিতে। দুধটুকু খেয়ে তারপর মুখ হাত ধুয়ে বিছানায় আসেন,কখন যে এপাশ ওপাশ করতে করতে ঘুম এসে যায় ওনার। 

কিন্তু মাঝরাতে হটাৎ ঘামতে শুরু করেন রমলা,কাউকে ডাকার আগেই মাথাটা ঘুরে চোখে অন্ধকার দেখেন। শরীরটা হালকা লাগতে শুরু করে রমলার।কোথায় আছেন উনি,এরকম তুরীয় অনুভূতি হচ্ছে কেন?একটা সুন্দর বাগান,চারদিকে অসংখ্য ফুল ফুটে আছে।মধ্যিখান দিয়ে একটা ছোট্ট নদী তিরতির করে বয়ে চলেছে অনেকটা ছোটবেলায় ওনার বাপের বাড়ির পিছনের নদীটার মত। শরীর যেন আর চলছে না। নদীটার ধারে  গিয়ে বসেন রমলা এক আঁচলা জল নিয়ে মুখ চোখে দেন রমলা।চোখ মুছে উঠে দাঁড়াতেই চোখ ছানাবড়া হয়ে যায় আবার! 

একি সামনে কাকে দেখছেন রমলা?স্বামী রঞ্জনবাবু দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছেন আর বলছেন "কি গিন্নী খুব মনখারাপ করছিল বুঝি আমাকে ছেড়ে তোমার একা একা থাকতে?তাই চলে এলে আমার কাছে?" রমলা হোচট খেয়ে আমতা আমতা করে বলেন "মানে আমি কোথায় এলাম বলোতো কিছুই তো বুঝতে পারছিনা গো।সেই যে ঘুমালাম তারপর তো কিছু মনে আসছেনা..." পুরনো ভঙ্গিতে হো হো করে হাসতে হাসতে রঞ্জনবাবু এবার বলেন "বুঝলে গিন্নী ও ঘুম তোমার আর ভাঙ্গবেনা।গঙ্গাপ্রাপ্তি ঘটেছে তোমার মানে তুমি আর আমি দুজনের নামের আগেই এখন লেট বা ঈশ্বর যুক্ত হবে বুঝলে। স্বর্গের খাতায় তোমার নাম এন্ট্রি হয়ে গেছে"।

রমলা বলেন,"এবার  বুঝলাম সব।তাহলে বুড়োবুড়ি মিলে আবার কাছে আসলাম দুজনে।সেই আনন্দে মিষ্টিমুখ করে নিই নলেন গুড়ের রসগোল্লা দিয়ে।তোমারও তো এখন মিষ্টি খেতে আর কোনো অসুবিধা নেই। ঘরের টেবিলে রসগোল্লাগুলো এখনও পড়ে আছে।"এই বলে চোখের নিমেষে ওগুলো নিয়ে স্বামীর মুখে দুটো রসগোল্লা দেন রমলা তারপর রঞ্জনবাবুও গিন্নীর মুখে তুলে দেন বাকি দুটো।নন্দনকাননে তখন নাচা গানার আসর শুরু হয়েছে দুর থেকে শোনা যায় সুন্দরী অপ্সরার কণ্ঠে "আমি কলকাতার রসগোল্লা রসেতে টইটম্বুর।" জলসার দিকে পা বাড়ান কর্তা গিন্নী মিলে মধুরেণ সমাপয়েত ওই যাকে বলে আর কি!

রাকেশ ঘোষাল

Comments

Popular posts from this blog

গ্রীষ্মের_ছুটিতে ছাত্রের লেখা খোলা চিঠি