দাসীবৃত্তি
"তা মা তুমি ঘরের কাজ কি কি জান ? রান্না বান্না সব পারো তো '?
- ' হ্যাঁ হ্যাঁ ও সব রান্না পারে l ' অনুভা কিছু বলার আগেই বলে উঠলো ওর মা অপালা l
উফফ বাবা মেয়েটাকে কোন বিশ্বাস নেই l যা ঠোঁট কাটা স্বভাব ছোট থেকে l কি বলতে কি বলে দেবে !
কতবার ওকে বুঝিয়েছে অপালা গরিবের মেয়ের এতো তেজ থাকতে নেই l
মেয়েটার পাঁচ বছর বয়সেই কি একটা খারাপ জ্বরে দু দিনের মধ্যেই চলে গেল ওর বাবা l অপলার কোলে তখন এক বছরের ছোট মেয়েটাও রয়েছে l
সহায় সম্বলহীন বিধবা অপালা সেই থেকে জীবন সংগ্রাম চালাচ্ছে দুই মেয়েকে আঁকড়ে l
বাড়ি বাড়ি রান্না করে , সেলাই করে , ঠোঙা বানিয়ে সে বড় করে তুলেছে দুই মেয়েকে l
আজকাল যেন শরীর আর চলে না .. দুই মেয়েকে ঘরে বরে থিতু করতে পারলেই অপলার শান্তি l তারপরে নিশ্চিন্তে দু চোখ বুজে পাড়ি লাগাবে ও তেরো বছর আগে চলে যাওয়া মানুষটার কাছে l
- ' আচ্ছা রান্না তো না হয় বুঝলাম , সেলাই টেলাই পার ? তোমরা আজকালকার মেয়ে l ওসবের তো আবার ধার মাড়াও না 'l
মহিলার কথা বলার ধরণটা দেখে বুকটা ধকধক করে উঠলো অপলার l
ছেলের মা তো একটু বেশিই খড়খড়ে মনে হচ্ছে l
মেয়েটা আবার বেঁকে বসবে না তো ! এমনিতেই অনুভার গায়ের রং বড্ডো কালো l পড়াশুনাও শেখেনি বিশেষ l গরিব বিধবার মেয়ে lএতো কিছু প্রতিকূলতার মধ্যে ওর বিয়ে হওয়াটাই দুষ্কর l বেশির ভাগ পাত্রপক্ষই ছবি দেখেই নাকচ করে দিয়েছে ওকে lঅতি কষ্টে এই পার্টিকে মেয়ে অবধি এনেছে অপালা lতাই এদের হাতছাড়া করা যাবে না কোনোমতেই l
- ' কি হল বললে না তো সেলাই পারো কিনা '?
- ' হুম ' ছোট জবাব দিয়ে ঘাড় নাড়লো অনুভা l
- ' হ্যাঁ দিদি ওর হাতের কাজ দারুন l আমাদের পাড়ায় তো সকলে বলে এক্সিবিশন এ দেবার মতো কাজ ওর 'l
ছুটে গিয়ে ও ঘর থেকে নিজের হাতে বানান একটা টেবিল ক্লথ নিয়ে এল অপালা l
পাত্রের মা বেশ করে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলো জিনিসটা l
তারপর রেখে দিল দলা পাকিয়ে l
- ' তা মা অনুভা তুমি সেবা শুশ্রুষা করতে পারবে তো ? মানে বেশ ধৈর্য আছে তো '?
অনুভা তাকাল মহিলার দিকে l কিছু একটা বলতেই যাচ্ছিল তার আগেই অপলা বলে উঠলো
- ' হ্যাঁ দিদি l মেয়ে আমার বড় নরম মনের l সেবা শুশ্রুষা ও বড় ভালবাসে 'l
- ' তা ভাল l এবার তাহলে আসল কথায় আসি l আমার সোয়ামি পঙ্গু হয়ে বিছনায় তা প্রায় মাস ছয়েক হল l পেচ্ছাপ পায়খানা সবই তার বিছনায় এখন l তা ওনার সেবা করার জন্যই ছেলের বৌ আনছি l ঘটক কে তাই বলেই দিয়েছিলাম আমার সুন্দরী মেয়ে দরকার নেই l ঘরের কাজ পারবে , খাটতে পারবে এমন মেয়ে চাই l
তা শোন বাছা ঘরের আর শশুর এর দায়িত্ব তোমাকেই কিন্তু বুঝে নিতে হবে l তোমার বাড়ি বর্ধমানের এই এলাকায় আর আমাদের বাড়ি কলকাতায় l দূরত্ব তো কম না l তাই রোজ রোজ বাপের বাড়ি আসার বায়না করলে কিন্তু মোটে চলবে না lবিজয়া দশমী আর পয়লা বৈশাখ ছাড়া কিন্তু এদিকে আসা যাবে না l
আমার বয়স হচ্ছে সংসারের জোয়াল আর টানতে পারছি না l সেইজন্যই না ছেলের বিয়ে দেওয়া l
দেনা পাওনা ছাড়া নইলে কি আর এক কথায় এভাবে রাজি হতাম কালো মেয়ে দেখতে আসতে !ছেলে তো আমার সোনার টুকরো l একেবারে নিজস্ব মুদির দোকান, মা কালী ভান্ডার l সম্বন্ধ তো অনেক পেয়েছিলাম l কিন্তু .. ' বলেই একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো ছেলের মা l তারপর আবার বললো
- তা বল বাছা তুমি রাজি কিনা .. রাজি থাকলে দিন দেখতে হবে l মেয়ে আমার মোটামুটি খারাপ লাগে নি' l'
শেষ কথাটাতেই বুকের ভিতর কলকল করে উঠলো অপালারlমেয়ে পছন্দ ! উফফ আর কি চাই ! কিন্তু মেয়েটাকে তো বেশি আসতেই দেবে না বলছে !
এটা মনে করতেই গলার কাছে বাষ্প জমছে কেমন যেন !
তা কি আর করা যাবে ! মেয়ে ভাল ঘর বর পাচ্ছে এই না অনেক l
কান অবধি অমায়িক হেসে অপালা বললো
- ' অরাজি হবার তো কোন কথাই নেই দিদি l আপনাদের পরিবারে ও জায়গা পেলে সে তো ভাগ্যের ব্যাপার l তা বাবা , তুমি কি কিছু কথা বলে নিতে চাও মেয়ের সাথে '? পাত্রের দিকে তাকালো অপালা lছেলে বেশ তাকাচ্ছে মেয়েটার দিকে বারবার সেটা লক্ষ্য করেছিল অপালা l এখন সে বেশ মন দিয়ে সিঙ্গারা চিবাচ্ছে l
চিবাতে চিবাতেই একটু হেসে সে বললো
- ' মা এর পছন্দ হলেই হল 'l
খুশির এক ঝলক হাওয়া খেলে গেলো অপলার বুকের ভেতর l
- ' তুমি এবার ভিতরে যেতে পারো বাছা l আমি বাকি কথা তোমার মায়ের সাথে সেরে নি' l বললো পাত্রের মা l
- 'হ্যাঁ তুই ভিতরে যা ' l বললো অপালা ও l
- ' হ্যাঁ ভিতরে যাওয়ার আগে আমার ও কিছু বলার আছে 'l চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পাত্রের মায়ের চোখে চোখ রেখে বলে উঠলো অনুভা l
মেয়ের গলার স্বরটা ভাল লাগলো না অপলার l
- ' কি আবার বলবি তুই '? দুরুদুরু বুকে জিজ্ঞাসা করলো মেয়েকে অপালা l
- ' এতক্ষন তো শুধু ছেলের বাড়ির আমাকে পছন্দ হয়েছে কিনা , তাদের শর্ত এইসব নিয়েই কথা হল l কিন্তু আমার ছেলেকে পছন্দ কিনা , আমার শর্ত এইসব নিয়ে তো এখনো কোন কথাই হয়নি l বিয়ে তো ছেলের একার নয় , বিয়ে তো আমিও করবো lতাই না ' ?
- ' তার মানে '! একসাথে আঁতকে উঠেছে মা ছেলে কালো গরিব মেয়েটার কথা শুনে l ঘাবড়ে গেছে অপালা ও l
- ' শুনুন জেঠিমা আপনার ছেলের মাথায় যদিও বা এত্ত বড় টাক , নাকটাও বিচ্ছিরি রকমের থ্যাবড়া আর গায়ের রংটাও কিছু দুধে আলতার মতন গোলাপি নয় তবুও আপনার ছেলেকে বিয়ে করার কথা আমি বিবেচনা করে দেখতে পারি যদি আপনারা আমার বাকি শর্ত গুলো মেনে নেন l
বিয়ে করে আপনাদের সংসারে গেলে সেখানে আমার কিছু দায়িত্ব বর্তাবে সেটা স্বাভাবিক l তাই রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠে সকলের রান্না সেরে আমি আমার কাজে বেরিয়ে যাব l
রাতে ফিরে এসে রাতের রুটি বা আর কিছু কাজ থাকলেও না হয় সেটা করে নেব l
এর বাড়তি কোন কাজ করতে পারবো না l কারণ আপনি তো ছেলের বৌ নিতে এসেছেন , নিশ্চই কাজের লোক নয় l তাই এর থেকে বেশি কিছু প্রত্যাশা আপনার করাও মনে হয় উচিত নয় l তাই তো ? যদিও আপনার কথা শুনে মাঝে আমার মনে হচ্ছিলো যে আপনি আয়া সেন্টারের বদলে ভুল করে আমাদের বাড়ি চলে আসেননি তো ?
তারপর বুঝলাম না ভুল বোধ হয় নিl
আপনাদের মতো মানুষদের জন্যই বোধ হয় আজ ও বহু ঘরেই ঘরের বৌ আর কাজের মেয়েরা মিলেমিশে এক হয়ে যায় l
তবে সে যে যাই করুক আমি বিয়ে করে আয়া হতে যাব কোন দুঃখে ?
তাই যা বলার গোড়াতেই বলে দিলাম l
আর হ্যাঁ আপনার ছেলের এই মেয়ে দেখলেই সোজা চোখ দুটোকে ফেভিকল দিয়ে তার বুকের দিকে সেঁটে দেবার যে স্বভাব সেটা কিন্তু বদলাতেই হবে l নইলে অমন বিকৃত রুচির পুরুষের পাশে আমি চলতে পারবো না ' l
- ' এই সবের মানে কি অপালা দেবী '? বাজখাঁই চিৎকার করে উঠলো এবার মা ছেলে l
- ' আপনার এই কালো মেয়ের সাহস তো কম নয় l'
- 'এই অনু তুই কি পাগল হলি '? মেয়ের এ হেন আকস্মিক ব্যবহারে হতভম্ব অপালা ও l
- ' পাগল আমি হইনি , হয়েছো তুমি মা l নইলে কি বুকের রক্ত দিয়ে মানুষ করা মেয়েকে কেউ অন্য লোকের বাড়িতে বিয়ের ছদ্মবেশে আয়াগিরি করতে পাঠিয়ে দেয় '?
- ' সংসারে থাকতে গেলে মেয়েদের একটু মানিয়ে তো নিতেই হয় মা 'l মরিয়া স্বর এবার অপলার l
- ' কিসের সংসার মা ? যে মা নিজের সবটুকু উজাড় করে আমায় বড় করলো , সেই মা ছোট বোন এদের ভুলে গিয়ে অন্যের সংসারে দাসীবৃত্তি করার নাম সংসার ! মিথ্যা সুখের ভান করার নাম সংসার ?
উনি আমায় বিয়ের পরের দায়িত্ব বোঝাতে চাইছিলেন l কিন্তু জীবনের উনিশটা বছর যাদের সাথে কাটিয়েছি তাদের প্রতি দায়িত্ব অস্বীকার করে দু দিন চেনা মানুষের প্রতি দায়িত্ব পালন হয়না এই সামান্য কথাটুকু ও উনি বোঝেন না l তাই তো নিজের মানুষ গুলোর থেকেই সরিয়ে দেবার কথা বলতে পারছিলেন 'l
' আপনার মেয়ের শুধু গায়ের রং কালো তা নয় , এর তো মাথারদোষ ও আছে দেখছি ' l ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো পাত্রের মা l
- ' আমার তো না হয় গায়ের রং কালো l আপনাদের তো মনেই কালো জেঠিমা l সেইজন্যই ছেলের বৌ খুঁজতে এসে ক্রীতদাসী নিয়ে যাবার সওদা করেন একটি পরিবারের দারিদ্র এর সুযোগ নিয়ে l এক বিধবার অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে l আর তাই আপনাদের মতো অন্ধকার মনের মানুষদের সাথে আর যাইহোক সম্পর্ক হয়না l ভালোবাসা বা শ্রদ্ধা ও হয়না 'l
- ' এই কালো কুৎসিত মেয়ের কোন গতি হবে না এই আমি বলে দিলাম l এতো তেজ তোর ! ' হুঙ্কার ছাড়লো ছেলের বৌ খুঁজতে আসা মহিলা l
- কেন কালো মেয়ের তেজ আগে দেখেননি ? কালো মেয়ে মানেই দুর্বল এমন ভাবেন নাকি ? ভুলে গেছেন আপনার মূল্যবান ছেলের মুদির দোকানের নামটাও কিন্তু এক কালো মেয়ের নামেই l
সেই মেয়েও কিন্তু একা হাতে দমন করেছিল সব অনাচারী শয়তান কে ' l
দু মিনিটের জন্য থমকে গেল মা ছেলে l
- চল বাবু চল ' .... মা ছেলে দরজার দিকে এগোল সুরসুর l
- ও হ্যাঁ আর একটা কথা , ছেলের বিয়ে দিতে চাইলে এবার বৌ খুঁজতে বেরোবেন l বিয়ের মোড়কে ঝি খুঁজতে গিয়ে মেয়েদের অপমান করে তাদের বাড়ির চা সিঙ্গারা অযথা নষ্ট করবেন না l
****
পাত্রপক্ষ বিদায় নেবার পর থেকেই ঘরে দোর দিয়েছে অপালা l এটা কি করলো অনু আজ ! এবার কি হবে ওর ? ছেলের মায়ের কথা বার্তা একটু রুক্ষ ছিল এটা ঠিক , তা বলে অনু যে খুব কালো সেটা তো আর মিথ্যা হয়ে যায়না ...
অসহায় গরিব বিধবার মেয়ের বিয়ে দেওয়া যে কি দায় সেকি ওর নিজের মেয়েও বুঝবে না l
প্রায় তিন ঘন্টা পর ঘর থেকে বেরোল অপালা l রাতের রান্নাটা তো করতে হবে l রান্না ঘরের কাছে গিয়েই থমকে গেল ও l অনু গুনগুন করে গান গাইছে আর কি যেন রান্না করছে l বেশ ভাল গন্ধ বেরিয়েছে l
অপালাকে দেখেই গাল ছড়িয়ে হাসলো অনু l খুব সহজ ভাবেই বললো
- ' চিংড়ির পোলাও করছি মা l টিভি দেখে শিখেছি l পাশের বাড়ির কানু দা এনে দিয়েছে জিনিসগুলো l ওদের কর্তা গিন্নি কেও দিয়ে আসবো খানিকটা কিন্তু 'l
অপলার কোন ভাবান্তর হল না l বিরক্তিতে গা জ্বলছে ওর lও মুখটা গোমড়া করেই রইলো l
- আসলে আজ একটা বিশেষ দিন তো তাই lআমি চাকরি পেয়েছি কিনা ... মাঝে একদিন মাসির বাড়ি যাবার নাম করে কলকাতায় গিয়েছিলাম l তখনি পরীক্ষা দিয়ে এসেছিলাম l তাই হয়ে গেছে চাকরিটা l'
- ' চাকরি ! মানে ? কে চাকরি দিলো তোকে ? তুই তো বেশি দূর লেখা পড়াই শিখিসনি 'l আকাশ থেকে পড়লো এবার অপালা l
- ' পড়া লেখা না জানলেই কেউ ফেলনা হয়ে যায় তোমায় কে বললো ? কানু দা তো ড্রাইভারি করে নিজের গাড়ি ভাড়া খাটিয়ে , তাই ওর কাছ থেকেই আমি গাড়ি চালানো শিখেছি মা l রোজ কাক ডাকা ভোরে তুমি যখন রান্নার কাজে বেরোতে আমি তখন কানুদার কাছে গাড়ি চালান শিখতাম l লাইসেন্স ও করিয়ে নিয়েছি l
কানু দা কে বলেছি আস্তে আস্তে ওর পারিশ্রমিক শোধ করে দেব আমি l
কলকাতা শহরে অনেক রকম ভাড়ার ক্যাব চলে মা l সেরকমই ভাড়ার ক্যাব চালানোর কাজ পেয়েছি আমি l সকাল থেকে সন্ধ্যা l রোজগার ভালোই l আপাতত লেডিজ হোস্টেলে থাকবো l তারপর ঠিক তৈরী করবো নিজের ছোট্ট একফালি ঘর l তখন সেখানে নিয়ে যাব তোমাদের l বোনকে আমি কলকাতার কলেজে পড়াব l ওকে আমি আরও যোগ্য করে তুলবো দেখো l তারপর আমরা দুই বোন মিলে তোমায় রানী করে রাখবো l
সারাজীবন আমাদের ভালো রাখতে সব করেছো তুমি l এবার যে আমাদের পালা l নইলে আর আমরা কিসের মানুষ হলাম বল l
তুমি বাধা দেবে ভয় পেয়ে এতদিন তোমায় কিছু জানাইনি l প্লিজ আমায় ক্ষমা করে দিও মা l
জান , কাজটা নেব কিনা এই নিয়ে বড় দ্বন্দে ছিলাম l কিন্তু আজ বিকেলে ওই পাত্রপক্ষের সামনে বসার পর বুঝলাম প্রতিটা মেয়ের আগে দরকার নিজের পায়ের নিচের জমিকে শক্ত করে তোলা l তবেই না সে লড়তে পারবে সমাজের হিংস্রতার সাথে l পাশে দাঁড়াতে পারবে নিজের পরিবারের l ছেলে আর মেয়ে সন্তানের মধ্যে তো কোন পার্থক্য নেই l তাহলে একটা ছেলে যেভাবে সাবলম্বী হয়ে পরিবারের পাশে দাঁড়ায় একটা মেয়ে সেটা পারবে না কেন ?
সকলেই যে অনেক পড়াশুনা শিখে জজ ব্যারিস্টার হবে এমন তো কোন কথা নেই l
সাধারণ ঘরের মেয়েরা সাধারণ ভাবে ছোট ছোট পা ফেলেই এগোক না l
শুধু সাহস করে এগিয়ে আসা টা বড় দরকার l শুরু করতে পারাটাই আসল মা l
আর সেই শুরুটাই আমি করতে যেতে চলেছি l তুমি পাশে থাকলে আমি অনেক দূর যাব আমি জানি মা l
তুমিও তো মেয়ে হয়েও একাই লড়াই করে বড় করেছো আমাদের l মাথা উঁচু করে থেকেছো সারাজীবন l তুমি তো আমাদের আদর্শ ' l মা কে এবার জড়িয়ে ধরেছে মেয়ে l
- তা বলে তুই ভাড়ার গাড়ি চালাবি ? আর কিছু পেলিনা ? এটা যে মার্কা মারা ছেলেদের কাজ l তুই পারবি এতগুলো ছেলের সাথে '?
- কাজের কি ছেলে মেয়ে হয় বল ? কাজ তো কাজই l মানছি আজ ওই কাজে ছেলের সংখ্যা বেশি , কিন্তু একটা একটা করে মেয়ে এগোতে এগোতেই তো একদিন সমান হবে ছেলে মেয়ের সংখ্যা l তবেই না ঘুচবে ছেলেদের কাজ , মেয়েদের কাজ মার্কা বিভাজন 'l
- ' আর বিয়ে ? সংসার ? এসব চাস না তুই ' ?
- ' চাই মা lকিন্তু বিয়ে মানে তো দেনা পাওনা বা ঝি কিংবা আয়াগিরি করা নয় l বিয়ে মানে নতুন কিছু সম্পর্কের মাঝে নিজেকে অন্য রূপে খুঁজে পাওয়া l হৃদয়ের সাথে হৃদয়ের বন্ধনের কথাই তো বলে বিয়ের পবিত্র মন্ত্র l তাই যে দিন সত্যিকারের মনের মানুষ খুঁজে পাব , যে আমায় আমি ঠিক যেমন তেমন করেই ভালোবাসবে তার সাথেই সাজাবো আমি নিজের সংসার l আর তেমন একজনকে খুঁজে পাবার জন্য আমি যে জীবনের শেষ দিন অবধিও অপেক্ষা করতে রাজি 'l
অনেকদিন পর মেয়ের মুখের দিকে ভাল করে তাকাল আজ অপালা l ওর দু চোখের
আত্মবিশ্বাস ও স্বপ্নের ঝিকিমিকি কখন যেন পূর্ণাঙ্গ নারী করে তুলেছে l ওর গায়ের কালো রংটা আর চোখে বাঁধছেই না আজ l
মেয়ের ললাটে বহুদিন পর একটা স্নেহ চুম্বন এঁকে দিল আজ অপালা l সস্নেহে ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললো
- ' মা তোর বোনটাকেও তোর আদর্শেই গড়ে তুলবি কথা দে আমায় ' l নোনা জলে ভরে উঠেছে মা মেয়ে দুজনেরই চোখ l
' কথা দিলাম মা ' l মায়ের হাত চেপে বললো অনুভা l চোখের জল মিলেমিশে একাকার দুজনেরই l আর তারই সাথে আজ যোগ হয়েছে পোলাও এর সুবাস l আজ যে সত্যি ওদের উৎসবের দিন l
বহুযুগ পর আজ নিজেকে বড্ডো সুখী লাগছে অপলার l ওর ছোট্ট ফালি ঘরটাতেও আজ থই থই করছে এক সমুদ্র খুশি l
রাকেশ ঘোষাল
Comments
Post a Comment