ছায়া ছবি


আমি যখন মারা গেলাম আমার অফিস কলিগরা তখন আমাকে ঘিরে রেখেছে। রাত তখন নটা।

সেদিন সকাল থেকেই শরীরটা ওয়ার্নিং দিচ্ছিল। ইয়ার এন্ডিং এর প্রেশার চলছিল বলে টানা তিনরাত ঘুমাইনি, ঞসঙ্গে অজস্র সিগারেট, মদ, সাথে হাবিজাবি খাওয়া দাওয়া, টেনশনে ছিলাম বলে প্রেশারটাও ধাঁ ধাঁ করে বেড়ে গেছিল।

অফিসের মধ্যেই সেরিব্রাল স্ট্রোক হয়ে আমি পড়ে যাই এবং কাউকে কোনো সময় না দিয়েই মাত্র আধঘন্টার মধ্যে আমার রক্তমাংসের শরীরটা ছেড়ে আমি বেরিয়ে আসি। শরীরটা নিথর হয়ে আমরি হসপিটালের দুধ সাদা বিছানায় অসহায়ের মত পড়ে থাকে। সত্যি বলছি নিজের নিথর শরীরটা দেখে আমার নিজেরই কষ্ট হচ্ছিল।

আমি চিত্রগুপ্ত কে বললাম-প্লিজ একদিন বাদে আমাকে নিতে  আসুন। আমার মৃত্যুতে আমি সবার রিঅ্যাকশনগুলো দেখতে চাই।


আমি-ইন্দ্রজিত সেন পেশায় একজন ব্যস্ত চাটার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট এবং নেশায় লেখক। এই দুই বিপরীত পৃথিবীতে জার্নি করা যে কী পরিমান স্ট্রাগলের তা ভুক্তভোগী মানুষই জানেন। যদিও এইভাবেই সুইচ অফ ও সুইচ অন করেই আমি বর্তমানের একজন প্রতিষ্ঠিত ও জনপ্রিয় লেখক হিসেবে নিজেকে পরিচিত করেছি।

যাই হোক আমরি থেকে ছোটম্যাটাডোরে  'বডি' হয়ে বাড়ি পৌঁছলাম।


আমার বাবা মা আগেই মারা গেছেন। দেখলাম পাড়ার লোক ও বোন ভগ্নীপতি এসেছে। ব্রততী অঝোরে কেঁদে চলেছে। ওর দিদি জামাইবাবু এসেছে, ওকে সামলানোর জন্য। আমার সাত বছরের নাবালক ভাগ্নে হতভম্বের মত আমার মৃত শরীরের দিকে তাকিয়ে আছে। ওই আমাকে মুগাগ্নি করবে কারন আমরা নিঃসন্তান।


আমার এক কলিগ ও ফেসবুক ফ্রেন্ড এর মাধ্যমে ব্যাপারটা সবাই জেনে যাওয়ায় শ্মশানে প্রচুর লেখক ও কবি বন্ধুর সমাগম হয়েছিল। আমার মৃতদেহে প্রচুর ফুলের মালা পড়েছিল। এমনিতে গাছ থেকে ফুল পাড়া আমি একদম সহ্য করতে পারিনা, মৃতদেহের উপর ফুলের মালা দেখলে আমার পিত্তি জ্বলে যায় কিন্তু অগত্যা...


আমার মৃতদেহ যখন চুল্লি তে পুড়ছে তখন আমার কবি বন্ধুরা একসঙ্গে জটলা করে চা আর সিগারেট খাচ্ছিল।আমি ছায়া শরীরে তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম।

প্রত্যেকেই আমার লেখার ভূয়সী প্রশংসা করছে এবং শুধু তাই নয়-মানুষ হিসেবেও যে আমি কতখানি খাঁটি এবং পরোপকারি ছিলাম তার লম্বা ফিরিস্তি চলছে।আমার আনন্দে বুক ভরে গেল। সত্যিই এরা আমাকে ভালবাসে।

কিছুক্ষন বাদে সবাই আলাদা আলাদা গন্তব্যে রওনা দিল। আমি ছায়া শরীরে তাদের পিছু নিলাম।

দেশপ্রিয় পার্ক থেকে এসেছে কৌশিক ও সোহিনী। ওরা দুজনেই আমার অনুজ লেখক। ওরা দুজনেই আমার অত্যন্ত স্নেহের। আমি ওদের দুজনের মধ্যে ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।


-যাই বল্ ইন্দ্র দা র লেখার মধ্যে ইদানীং নতুনত্ব কিছু ছিলনা..ঐ থোর বড়ি খাড়া আর খাড়া বড়ি থোর, বলল কৌশিক।

-উফ্ ইদানীং তো একেবারে ট্র্যাস লিখছিল..সেই পরকীয়া..সেই যৌনতা..মাগো! পড়তে ইচ্ছে করতো না, কিছু বলাও যেতোনা, সিনিয়র লেখক..ভাল বলতেই হত।

-লোকটাও তেমন ভাল ছিলনা, বড্ড অহঙ্কারি, নিজেকে কেউকেটা ভাবত।

-অন্য দোষও ছিল.. ফ্লার্ট করার টেন্ডেন্সি ছিল।

-তোর জন্য কিন্তু অনেক করেছে। আনন্দপত্রে তোকে সুযোগ করে দিয়েছিল..কম কথা না।

-ওইটুকুই..আমি এই জায়গায় এসেছি, প্রতিষ্ঠা পেয়েছি আমার নিজের ট্যালেন্টে। সত্যি বলতে কী ইন্দ্রজিত সেন লোকটাকে এখন আমার আর ভাল লাগতোনা।


হায় কপাল! এদেরকে এত ভালবাসতাম আর এরাই....

মনটা খারাপ হয়ে গেল। আমি এবার বাড়ি ফিরে এলাম।আমাকে পুড়িয়ে সবাই বাড়ি ফিরে এসেছে। ছাদে দাঁড়িয়ে নিভৃতে কথা বলছে আমার বোন ভগ্নিপতি।আমি ছায়া শরীরে তাদের পাশে এসে দাঁড়ালাম। ওরা দুজনেই আমাকে খুব সম্মান করে, ভালবাসে।


-তোমার বৌদি কী এবার আমাদের ঘাড়ে?

-না না, বৌদি তো চাকরি করে। তাছাড়া দাদার কম টাকা আছে নাকি? তবে খানিকটা দেখাশুনো তো করতেই হবে।

-যাই বলো তোমার দাদা লোকটাকে কোনোদিনই আমার তেমন পছন্দ হয়নি। কেমন যেন উন্নাসিক প্রকৃতির ছিল, সবসময় কেমন যেন উপর থেকে কথা বলত, তার উপর লেখক হিসেবে নাম করে ফেলার জন্য একটা অহঙ্কারও ছিল।

-দাদা খুব স্বার্থপর আর আত্মসুখি ও ছিল..নিজের টুকু ছাড়া দাদা কিচ্ছু বুঝতোনা, সেই ছোটোবেলা থেকেই।


আমি হাঁ হয়ে গেলাম। এদের জন্য কী না করেছি। ওদের বাচ্চা হওয়ার সময় রাজীব কলকাতায় ছিলনা। নানান কম্প্লিকেশন ছিল। আমিই যাবতীয় দায়দায়িত্ব নিয়ে দামি নার্সিংহোমে রেখে সমস্ত ব্যয় নিজে বহন করেছিলাম। তারপর যখনই বিপদে পড়েছে.....

মনটা দমে গেল। আমি আমার বেডরুমে ঢুকলাম।দেখলাম কেঁদে কেঁদে ব্রততী র মুখচোখ ফুলে গেছে।ওকে ঘিরে রেখেছে ওর দিদি, জামাইবাবু ,মা।

বেঁচে থাকতে ব্রততীই ছিল আমার প্রিয় বন্ধু। লোকে বলত রাজযোটক। ও ছিল আমার ছায়াসঙ্গিনী, আমার প্রতিটি লেখার প্রথম পাঠিকা। নিঃসন্তান হওয়ায় আমরাই দুজন দুজনকে আগলে রাখতাম। গল্পে আর আনন্দে আমাদের দিন কেটে যেত।

ব্রততীর চরিত্রে কিছু রেয়ার কোয়ালিটি আছে। ওর মত অনেষ্ট মেয়ে দেখা যায়না। ব্রততী বলতো-তুমি অন্য অনেকের সঙ্গে ফ্লার্ট করতে পার কিন্তু আমি তোমাকে ছাড়া কিচ্ছু ভাবতে পারিনা।

আমি ছায়া শরীরে আমার বিছানায় এসে বসলাম।


-তুই সুন্দরী, অল্প বয়স, ভাল সরকারি চাকরি করিস-তোর ছেলের অভাব হবেনা। এভাবে একা একা থাকা যায়না।

-তাছাড়া ইন্দ্র তোকে সারাজীবন ডমিনেট করেছে..তোকে নিজের মত বাঁচতেও দেয়নি।

-অথচ নিজে..।

-তুই না করিসনা, তোর বিয়ে দেব-


না ব্রততী না..অন্তত আজকের রাতটায় তুমি না বলো..প্লিজ..।


ব্রততী মুখ নামিয়ে স্বগতোক্তি করল-হ্যাঁ, আমি কষ্টই পেয়েছি..ও কোনোদিনই সেভাবে আমাকে..আমি এবার বাঁচতে চাই..নিজের শর্তে..তোমরা যা ভাল বোঝো কর।


রাত অনেক হয়েছে। আমি ছাদে এলাম। পাশের লাগোয়া ঘরটাই আমার লেখার আঁতুরঘর। আমার অতি প্রিয় লেখার চেয়ার টেবিলে শেষবারের মত বসে আমি যাত্রা করলাম অমৃতলোকের পথে। মাথার উপর অজস্র তারা ভরা আকাশ।

মনটা ভারি হয়ে গেছে। আমি ভেবেছিলাম সবাই আমাকে ভালবাসে, কিন্তু হায় এ পৃথিবীতে সবাই আমার সঙ্গে অভিনয়ই করে গেছে। আমাকে আদৌ কেউ ভালবাসেনি, পছন্দ করেনি।


আমি যাত্রা করলাম অমৃতলোকের উদ্দেশে। অনেক দুর যাওয়ার পর দেখলাম দাঁড়িয়ে আছে আমার স্বর্গগতা মা।মায়ের পাশে বাবা। দুজনেরই যুবাবয়স।

আমি এবার নিজের দিকে তাকালাম। আমি টলমল করে হাঁটছি। আমি হয়ে গেছি ঠিক একটা দু বছর বয়সী শিশু। আমার শরীরে কোনো বস্ত্র নেই।

আমি দৌড়ে গিয়ে মায়ের কোলে উঠলাম। আমাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলো বাবা, ঠিক ছোটোবেলার মত।


আমি অপার আনন্দে ভাসতে লাগলাম...

রাকেশ ঘোষাল

Comments

Popular posts from this blog

গ্রীষ্মের_ছুটিতে ছাত্রের লেখা খোলা চিঠি