অনামী সম্পর্ক
মা তুমি কাঁদছো কেন?
দশ বছরের মেয়ে টুসকি মায়ের আঁচল ধরে ধরে ঘুরছে। শিশুমন নিশ্চয় বুঝেছে, মায়ের চোখের জলে লেখা হচ্ছে কোনো কষ্টের ইতিহাস।
আপন মনেই গীতবিতানের পাতা ওল্টাচ্ছে মধুশ্রী।
তবুও বারবার মনে পড়ে যাচ্ছে ইমনের মুখটা।
টুসকিকে গান শেখাবার জন্য যেদিন প্রথম ইমন এই বাড়িতে এসেছিলো, সেদিনই মধুশ্রীর বড্ড মায়া লেগেছিল ওর মুখটা দেখে।
আহা,মা মরা ছেলে...সেই মায়াতেই হয়তো রোজ জলখাবারটা মনের মত করে বানিয়ে দিতো মধুশ্রী।
বিজয় ঘরে ঢুকেছে খেয়াল করেনি মধুশ্রী। মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, তোর মা তোর গানের স্যারের জন্য কাঁদছে রে টুসী। আহা,বড্ড ভালোবাসতো কিনা?
দাঁত চিপে চিপে বলা বিজয়ের ব্যঙ্গাত্মক কথাগুলো যেন তীরের মতোই বিঁধলো মধুশ্রীর বুকে। অবাক হয়ে বিজয়ের দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকলো মধুশ্রী। এই মানুষটাই তার স্বামী? এর সাথেই কাটিয়ে দিলো বারো বছর!!
একটা পরিচিত মানুষের মৃত্যুর পরেও তাকে নিয়ে শোক করা দূরে থাক, কাদা ছেটাতে বাঁধছে না। আজ আর তর্ক যুদ্ধে নামতে ইচ্ছে করছে না মধুশ্রীর।
ভারাক্রান্ত মন নিয়েই মেয়ের মাথায় হাত বোলালো ও।
মধুশ্রী খেয়াল করলো,বিজয়ের মা ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। বেশ তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, আজ আর রান্না চাপবে? নাকি মাস্টার মরেছে বলে শোক করেই দিন কাটাবে বৌমা?
অদ্ভুত ভাষায় কথা বলেন আরতিদেবী। মধুশ্রীর মনেই হয় না যে সে এই বাড়ির বউ। তার সন্তানের বয়েস দশ। বারো বছর এই বাড়িতে দিনরাত এক করেও কখনও বাড়িটা ওর নিজের হলো না। কাউকে এক কাপ চা করে দিতে গেলেও শাশুড়িমায়ের পারমিশন লাগবে।
বিয়ের পর নিজের শখের গানটা ত্যাগ করতে হয়েছিল মধুশ্রীকে। শাশুড়িমা বাড়ির বউয়ের গান করা পছন্দ করে না। বিজয় বলেছিল,মধুশ্রী, বিয়ের পর আর নাইবা গাইলে! তুমি তো আর প্লে ব্যাক সিঙ্গার হচ্ছ না!!
গান না গেয়ে কাটিয়ে দিয়েছিল অনেকগুলো বছর। তারপর তো টুসকি এলো ওদের মধ্যে। টুসকিকে নিয়ে নিজের জীবনের পাওয়া না পাওয়ার হিসেব ভুলেছিলো মধুশ্রী।
তারপর টুসকির যখন বছর আট বয়েস তখনই নিজের স্বপ্নের ধুলো ঝেড়ে মেয়েকে গানের স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিল মধুশ্রী। বৌমার গান গাওয়া বারণ থাকলেও নাতনির ছিল না। মধুশ্রীর ঘরে হারমোনিয়ামের রিডে কচি গলার সারেগামা শোনা গিয়েছিল। ঠিক যেমন মধুশ্রী গাইতো ওর ছোটবেলায়।
হঠাৎই টুসকির গানের দিদিমনির বিয়ে ঠিক হয়ে যায়। দিদিমনিই মধুশ্রীর অনুরোধে তার বন্ধু ইমনকে ঠিক করে দেয় টুসকির গানের শিক্ষক হিসেবে।
সেই থেকেই বছর দেড়েক ইমন সপ্তাহে একদিন সন্ধেবেলা আসছিল এই বাড়িতে।
অদ্ভুত আবেশ বিহ্বল গানের গলা ছেলেটার। টুসকিকে গান শেখাত ইমন , মধুশ্রী অবাক হয়ে শুনতো। বড় ভালো গায় ছেলেটা। বছর ত্রিশের ইমনের সাথে বত্রিশের মধুশ্রীর বন্ধুত্ব হতে সময় লাগলো না। বিশেষ করে গান যখন মাধ্যম। মধুশ্রী এককালে গান গাইতো শুনে , একদিন ইমনই জোর করে মধুশ্রীকে গাইতে বাধ্য করেছিল। তারপর বলেছিল, বারো বছরের অনভ্যাসের পরও যখন আপনি এত সুন্দর গাইতে পারলেন, তখন আর থামা চলবে না।
শ্বশুরবাড়ির বারণ শুনে ফন্দি এঁটেছিল ইমন। বলেছিল, আমি বিজয়দাকে বলবো, সপ্তাহে একদিন মাত্র আমি আসি, বাকি দিনগুলো টুসকি ওর মায়ের কাছেই চর্চা করুক।
আস্তে আস্তে ইমনের গানের সুরে মধুশ্রীর বারো বছরের বন্ধ দরজাটা আবার পেখম মেলতে শুরু করেছিল। মধুশ্রীর রুদ্ধ কণ্ঠে আবার সুরের মূর্ছনা জেগে উঠেছিল।
মধুশ্রী ইমনকে নাম ধরে ডাকলেও, ইমন ওকে ম্যাডাম বলেই ডাকতো। কেন ওকে ম্যাডাম বলতো তা ওর জানা নেই। তবুও ওই ম্যাডাম ডাকটাতে যেন অনেকখানি শ্রদ্ধা মিশে ছিল।
ওই একটাই শনিবার সন্ধে ছিল মধুশ্রীর কাছে খোলা হওয়ার মত। ইমন যখন টুসকিকে গান শেখাত, তখনই মধুশ্রী মাঝে মাঝে আব্দার করতো, আজ রবিঠাকুরের একটা গান শোনাও।
ইমন খুশি হয়ে গোটা চারেক গান গেয়ে যেত নিজের খেয়ালে।
ইমনের মা নেই, বাবা আর ও। সংসার বলতে দুটি প্রাণী।
সন্ধের টিফিনটা পরম যত্নে মধুশ্রী বানিয়ে দিত ইমনকে। তৃপ্ত মুখে ইমন বলতো, বুঝলেন ম্যাডাম , আপনার হাতের রান্নার উদাহরণ শুধু আপনি। দ্রৌপদীর সাথে কম্পিটিসনে আপনি ফার্স্ট হতেন।
মধুশ্রী মজা করে বলতো, তুমি বুঝি দ্রৌপদীর রান্না খেয়েছো?
সরল হেসে ইমন বলতো, এত ভালো রান্না আমি এই প্রথম খেলাম। বারো বছর ধরে বিজয়ের জন্য রান্না করছে মধুশ্রী। বিজয়,ওর মা বা ওর বাবা কখনো হাসি মুখে মধুশ্রীর রান্নার প্রশংসা করেনি। এই বাইরের ছেলেটা দুটো লুচি খেয়েই এত সুনাম করছে!!
হয়তো কেউ কেউ খুব অল্পেই সন্তুষ্ট হয়ে যায়।
ইমনের স্বপ্ন ছিল একটা স্কুল খুলবে। গানের স্কুল। তবে বেশ কিছু টাকা লাগবে তার জন্য। ও বাড়ি বাড়ি গান শিখিয়ে সেই টাকা জমাচ্ছে। দিনের বেলায় একটা প্রাইভেট কোম্পানীতে সামান্য মাইনের চাকরি করে ইমন। আর সন্ধে থেকে রাত পর্যন্ত গানের টিউশনি।
মধুশ্রী বলেছিল, গানের স্কুল হয়ে গেলে তুমি তো আর আমাদের বাড়িতে আসবে না ইমন?
তাহলে তোমার এই বুড়ি ছাত্রীটির কী হবে?
টুসকি না হয় তোমার স্কুলে গিয়ে শিখবে।
ইমন রাগী মুখে বলছিল, আহা ম্যাডাম আপনি বুড়ি কোথায়?
আপনি তো ইমন রাগের মতোই স্নিগ্ধ।
কে জানে কেন, এত এত প্রশংসা পেতে পেতে আবার নতুন করে বাঁচতে ইচ্ছে করছিল মধুশ্রীর। আবার খুঁজে পাচ্ছিল নিজেকে। বারো বছর আগের মৃত মধুশ্রী যেন জীবন খুঁজে পাচ্ছিল।
বিজয়ের চোখে তো বহুদিন আগেই মধুশ্রী শুধুই ওদের বাড়ির রান্নার লোক আর ওর শয্যাসঙ্গিনীতে পরিণত হয়েছিল। মধুশ্রীর আবার একটা পৃথক মন থাকতে পারে, এটা তো ভুলেই গেছে এবাড়ির সকলে। হয়তো মধুশ্রী নিজেও ভুলে গিয়েছিল। শুধুমাত্র ইমন এসে আবার মনে করিয়ে দিল , মধুশ্রী একটা পৃথক মানুষ। বিজয়ের স্ত্রীর বাইরে, আরতিদেবী আর রাধামোহন বাবুর বৌমা ছাড়াও তার একটা আলাদা সত্ত্বা আছে। সে সত্ত্বার একটা নরম মন আছে। যে এখনও মাঝে মাঝে প্রশংসা পেতে চায়।
সে চায় দুটো মুগ্ধ চোখ তার দিকে তাকিয়ে বলুক, বাহ বেশ গাইলেন তো গানটা....
বেশ কয়েক মাস ধরেই মধুশ্রী খেয়াল করছিল, টুসকির গান শেখার সময় মধুশ্রী আর ইমনের মধ্যে ঠিক কী কথা হয়, সেটা শোনার জন্যই আরতিদেবী খোলা দরজার বাইরেও আড়ি পাতছেন।
ওনার অমন নোংরা মানসিকতা দেখে প্রথম চমকে উঠেছিল মধুশ্রী।
ইমনকে ও শুধুই ভালো বন্ধুর চোখে দেখে। মধুশ্রীর বদ্ধ জীবনে এক ঝলক খোলা হাওয়া যেন ইমন। এ ছাড়া কখনো কিছুই ভাবে নি ইমনকে। ছি ছি এতটা নোংরা মানসিকতার মানুষও আছে পৃথিবীতে!! ভাবতে গিয়েই শিউরে উঠেছিল মধুশ্রী। যদি কোনোদিন আরতি দেবী ইমনকে কিছু বলে বসেন, তাহলে তো লজ্জায় মুখ দেখাতে পারবে না ও।
সেদিন সন্ধ্যায় ইমন বললো, ম্যাডাম, কি ব্যাপার মুখটা এত গোমড়া কেন?
বিজয়দার সাথে ঝগড়া হয়েছে বুঝি!!
বেশ বেশ আমি একটা গান শেখাচ্ছি আপনাকে। বিজয়দাকে শোনালেই তার রাগ কমে যাবে।
হঠাৎই মাথা গরম করে , মধুশ্রী বলে ফেলেছিল, কেন? আমি কি বিজয়দার মনোরঞ্জনের যন্ত্র নাকি! যে গান শুনিয়ে তার রাগ ভাঙাতে হবে। তুমি টুসকিকে গান শেখাও। বলেই ঘর থেকে রেগেমেগে বেরিয়ে এসেছিল মধুশ্রী।
বেশ কয়েকটা সপ্তাহ টুসকি একাই গান শিখেছিল ইমনের কাছে। মধুশ্রী ইচ্ছে করেই ওই সময়টাতে অনুপস্থিত ছিল ওদের গানের জায়গায়।
তবে সন্ধ্যের টিফিনটা বীনা পিসিকে দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছিল ইমনের জন্য।
ইমন চলে গেছে গান শিখিয়ে। টুসকি এসে একটা সবুজ কাগজে মোড়া বই এনে মধুশ্রীর হাতে দিয়ে বললো, এই নাও মা..এটা স্যার তোমাকে দিয়েছে।
বইটা খুলেই দেখলো, ওপরে লেখা... জন্মদিনে ম্যাডামকে ।
চমকে উঠলো মধুশ্রী। ইমন কি করে জানলো আজ মধুশ্রীর জন্মদিন!!
গীতবিতানের পাতার এক কোনে লেখা 'মধুশ্রী'।
মনেপড়ে গেল মধুশ্রীর..একদিন ওর গানের থার্ডইয়ায়ারের সার্টিফিকেটটা দেখিয়েছিল ইমনকে। ওই ফাইলেই হয়তো ছিল মধুশ্রীর এডমিড কার্ড। সেখান থেকেই কি?
মধুশ্রী তো এই বাড়িতে এসে ভুলেই গিয়েছিল, ওরও আবার একটা জন্মদিন ছিল?
বাপের বাড়িতেও দুই দাদার জন্মদিনে পায়েস করে দেয় মা এখনো। কিন্তু মধুশ্রীর জন্মদিনটা বয়েস বৃদ্ধির সাথে সাথে স্মৃতির অতলে তলিয়ে গিয়েছিল সকলের কাছে।
সেদিন সারারাত মধুশ্রী বারবার ওই গীতবিতানের প্রতিটি পাতায় হাত বুলিয়েছিলো।
মধুশ্রী জিজ্ঞেস করেছিল, ইমন! তোমার গানের স্কুলের কি নাম দেবে?
ইমন বলেছিল, রাগশ্রী দিলে কেমন হয় ম্যাডাম?
ইমন ও থাকলো আবার শ্রীও থাকলো। ভ্রু কুঁচকে ও জানতে চেয়েছিল, 'শ্রী' রাখার কি দরকার!!ইমন হেসে বলেছিল, শ্রী থাকলে আমার স্কুলেরও শ্রী বৃদ্ধি হবে তাই।
সকলের বিশ্রী সন্দেহের বশেই আস্তে আস্তে নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল, মধুশ্রী আর ইমনের খোলামেলা বন্ধুত্বটা। বিজয় ওর মায়ের প্ররোচনায় একদিন বলে বসলো, টুসকির গানের টিচারের সাথে তোমার অত মাখামাখি কিসের?
নিজের কান দুটো গরম হয়ে গিয়েছিল, মধুশ্রীর। মাখামাখি শব্দটা যেন গরম বাতাসের মতোই প্রবেশ করেছিল ওর কানে।
ইমনও হয়তো কিছু বুঝতে পেরেই নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলো। শুধু একদিন এসে বললো, ম্যাডাম...আমার স্কুল প্রায় কমপ্লিট। সামনের সপ্তাহ থেকেই শুরু করবো।
শুরুর দিন যদি আপনি যেতে পারেন, খুব ভালো লাগবে।
শ্বশুর বাড়িতে কিছুটা মিথ্যে বলেই মেয়েকে নিয়ে বাজারে বেরোনোর নাম করে ইমনের 'রাগশ্রী' স্কুলে উপস্থিত হয়েছিল মধুশ্রী।
ওকে দেখে ইমনের চোখদুটো মুহূর্তের জন্য আনন্দে দিশেহারা হয়েছিল,সেটা খেয়াল করেছিল মধুশ্রী।
মধুশ্রীর মত নগন্য মানুষের আগমনে যে কেউ এতটা খুশি হতে পারে, এই প্রথম দেখলো ও।
ভারী সুন্দর ছিমছাম একটা স্কুল বানিয়েছে ইমন। সাদা দেওয়ালের গায়ে সুন্দর অল্পনায় গানের লাইন লেখা।
গোটা কুড়ি ছাত্র ছাত্রীদের নিয়ে ছোট্ট অনুষ্ঠান। ইমন গাইছিল...
"যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে,
আমি বাইবো না মোর খেয়াতরী এই ঘাটে।"
মধুশ্রী অনুষ্ঠান শেষে বলেছিল, আজকের দিনে আর গাওয়ার গান পেলে না তুমি?
ইমন তেমনই এক আকাশ হেসে বলেছিল..যদি সত্যি কোনোদিন চলে যাই, সেদিন আমার এই রাগশ্রীকে আপনি বাঁচিয়ে রাখবেন ম্যাডাম!!
কথারা মুহূর্তে কথা হারিয়ে চুপ করে গিয়েছিল মধুশ্রীর গলায়।
ইমন বলেছিল, টুসকিকে আর পাঁচমাস বাড়িতে শেখাবো, তারপর ও বড় হয়ে যাচ্ছে, এবার থেকে রাগশ্রীতে যাবে।
ইমন আর বাড়িতে আসবে না। মধুশ্রী আর শনিবারের সন্ধ্যেতে ইমনের গান শুনতে পাবে না, ভেবেই মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল ওর।
গতকাল রাত্রে এসে বিজয় সেই ভয়ানক খবরটা দিয়েছিল মধুশ্রীকে।
ইমন নাকি অ্যাকসিডেন্ট করেছে। অফিস থেকে ফেরার পথে একটা লরি এসে পিষে দিয়ে গেছে ইমনের ছোট খাটো শরীরটাকে।
সকলের সামনেই কঁকিয়ে কেঁদে ফেলেছিল মধুশ্রী।
তারপর থেকেই বাবা-মা আর বিজয়ের মধ্যে শুরু হয়েছে মধুশ্রীর চরিত্র নিয়ে কাটাছেঁড়া।
সাথে ওই মৃত ছেলেটাও বাদ পড়ছে না।
ইমনের মুখটা বারবার দৃষ্টিপথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ওর ওই ম্যাডাম ডাকটা কানের মধ্যে দিয়ে হৃদয়ে পৌঁছাচ্ছে।
কি করে এদের বোঝাবে মধুশ্রী, প্রেম ছাড়াও ভালোলাগার সম্পর্ক তৈরি হয় পৃথিবীতে। যে সম্পর্ক প্রেমিক-প্রেমিকা বা স্বামী-স্ত্রীর বন্ধন ছেড়ে মুক্ত আকাশে ডানা মেলে উড়তে পারে। সেই সম্পর্কগুলোর বিশেষ কোনো নাম না থাকলেও, তা জীবনে অপরিহার্য হয়ে ওঠে।
কোনো দূষিত বাতাস এসে সেই সম্পর্কের মাধুর্য নষ্ট করে দিতে চাইলেও তা রয়ে যায় অমলিন। ইমন আর মধুশ্রীর বন্ধুত্বটাও গানের সুরে সুরে স্থায়িত্ব অর্জন করেছিল। বাইরের কেউ সেটা বুঝতেও পারবে না কখনো।
ইমনের জন্য মধুশ্রীর চোখের জলটা তাই সকলের কাছে অন্যরকম বার্তা পাঠাচ্ছে।
আরতিদেবী বললেন, বেহায়া মেয়েমানুষ! মেয়ের গানের মাস্টারের জন্য কেঁদে ভাসাচ্ছে। অমন কত মানুষ রোজ মরছে রাস্তায়। অসহ্য লাগছে মধুশ্রীর। সব কিছুরই বোধহয় একটা শেষ আছে।
বিজয় বলল, কি ব্যাপার কোথায় চললে... ইমনের সৎকার হয়ে গেছে। এখন শাড়ি পরে কি তার চিতার সামনে সোহাগ দেখাতে চললে নাকি?
বিজয় চমকে গেছে, সাথে আরতিদেবীও।
না, এই মধুশ্রীকে তারা চেনেন না। এর চোখের আগুনে মুহূর্তে ভস্ম হয়ে যেতে পারে এই ঘোষাল বংশ।
মধুশ্রী বললো, আমি ইমনের স্কুল 'রাগশ্রীটার' দায়িত্ব নেব আজ থেকেই। আমি ওখানে আজ থেকে গান শেখাবো।
ওর বাবার কাছ থেকে স্কুলের চাবিটা নিতে যাচ্ছি। রাগশ্রীকে শেষ হতে দেব না আমি!!
বিজয় বললো, আমাদের বাড়ির বউ গানের স্কুল...
কথাটা শেষ করতে না দিয়েই মধুশ্রী বললো, আমি গান শেখালে যদি তোমাদের বাড়ির সম্মান যায়, তাহলে নাহয়, আমি আমার মেয়েকে নিয়ে অন্য কোথাও থাকার ব্যবস্থা করে নেব। স্তম্ভিত বিজয়ের চোখের সামনে দিয়েই ইমনের দেওয়া গীতিবিতানটা সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে গেল মধুশ্রী।
রাধামোহনবাবু বললেন, রাগারাগি করো না বৌমা, তুমি এ বাড়িতেই ফিরে এসো। এখান থেকেই না হয় গানের স্কুলের দায়িত্ব নিও।
রাগশ্রীতে বসে ইমনের ছবির সামনে মধুশ্রী শুরু করলো ওর জীবনের আরেকটা অধ্যায়। ইমন যেন ছবির ভিতর থেকেই হেসে বললো, ম্যাডাম..আমার ছাত্র-ছাত্রীগুলোকে মন দিয়ে গান শিখিয়ে রাগশ্রীর নাম উজ্জ্বল করে তুলুন। আমি সঙ্গে আছি...
মধুশ্রী ইমনের ছবির সামনেই গাইছে...
"জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে
বন্ধু হে আমার রয়েছো দাঁড়ায়ে"
রাকেশ ঘোষাল
Comments
Post a Comment