চিঠি
' দীপ ' আঁত্ কে উঠলে !! মন মানছেনা, তাই
চিঠিটা পাঠাচ্ছি তোমাকে......।
দয়িত ( দয়িত কুমার রায় ) আমার আরাধ্য দেবতা, ঘুমোচ্ছে।এই ফাঁকে পরিচয় পর্বটা চিঠিতে সেরে নিচ্ছি, কেমন !!
ভেবোনা তোমাকে অপমান করছি। দু'দুবার চেষ্টা ক'রেও আলাপ হ'য়নি। তোমার দে'খাই
পাইনি..... ।
ও এখন রবিনসন গ্লাস ফেক্টোরির জোন্যাল
ম্যানেজার, কাজের ব্যস্ততা ভীষণ। ত'বে এভরী
ফ্রাইডে পার্টিতে এটেন্ড ক'রি। ওর সে'দিনটা
রেস্ট ডে। লেট নাইটে ঘরে ফিরি। কোন কিছুর
অভাব বোধ ক'রিনা। বাড়ি, গাড়ি, শাড়ি,গয়না,
মান-সম্মান,অর্থের প্রাচুর্য্যতা বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে সংসার করছি...।অভাব শুধু বাকী ছ'টা
দিন, ওকে একান্তভাবে কাছে পাইনা। গড়নে ফর্সা, লম্বা, ছিমছিমে চেহারা। বয়সের ফারাক
আমার সাথে ওর আট বছরের..... ।
আমাদের বাংলোটা এখন হিলকিট টাউনে। ছোট্ট শহর। সাজানো-গোছানো। সমুদ্র, পাহাড়
পাশেই,দূরত্ব মাইল তিনেক। ভাল না লাগলে,
আমিই গাড়ি নিয়ে মাঝে মধ্যে বেড়িয়ে আসি..।
ওই চালানো শিখিয়েছে আমাকে.....।
রাত এখন বারোটা, কি অদ্ভুত দ্যাখো, তোমার
ওখানে টকটকে রোদের উজ্জ্বলতা। কাজের ব্যস্ততা। রোদেগরমে ঘাম ঝরাচ্ছো।আর এখানে
--নি:ঝুম রাত, ক্লান্ত দেহ ঝিমুতে চাইছে... ।অথচ
পৃথিবী একটাই...... ।
পুরোনো স্মৃতিকে ছাড়া যায়না, তাই এই লম্বা চিঠি আমার.... ।
দীপ, চার বছর হ'ল এখানে এসেছি। কলকাতার
পুজো ত ' ভুলতে বসেছি। আসতে ভীষণ মন চায়...।
এখানে, মানে দশ কিলোমিটার দূরে, সেন্টক্যান্টিতে দূর্গাপুজো হ'য়। বাংগালী থাকে
কিছু। ওরাই উদ্দ্যোক্তা, ওরাই পুজোক'রে। আমরা যাই সেখানে, পুজো দিই।এবারও দিয়েছি।দয়িত গরদের পাঞ্জাবি-পায়জামা, আর
আমি গরদের সাদা জমিনের ওপর লাল পাড়ে
শাড়ি পরেছিলাম। দেশীয় সাজ,দেশীয় ঢংগে
পুজো।পুষ্পাঞ্জলি,ভোগ, আরতি, জলসা সবকিছুর ব্যবস্থা ছিল। তোমার নামেও পুজো
দিয়েছি, তবে মনেমনে..।তোমার কেমন কাটল!!
মনে পড়ে !! আমাদের মিলনগড়ের বাড়িতে পুজো হ'ত। তুমি বিজয়া করতে এসে হঠাত্ ক'রে
টেনে আমাকে সব্বার সামনে, তোমার এত্ত বড়
বুকের খাঁচায় বন্ধী ক'রলে....!! সে ' আমার কী লজ্জা...।সে'দিন তোমার শরীরের গন্ধ প্রথম পেয়েছিলাম। তুমি বললে,-- লজ্জার কী !! বিজয়ার আলিঙ্গন ত ' সবাই ক'রে, আমি ক'রলে
দোষ !! আমি মনে ভেবেছি, সাহস আছে তোমার... ।
সে ' বার, দোলপূর্ণিমায়, -- তুমি আমার সর্বাংগে
আবির দিয়ে পালিয়ে গেলে, আমাকে মাখাবার
সুযোগই দাওনি...!!
এখানে ও'সব নেই। রাত যত বাড়ছে স্মৃতিগুলো
জমাট হ'চ্ছে, তোমার মনে পড়ে !! কলেজ পালিয়ে ইডেনে গিয়েছিলাম, দু'জনে... । গাছের
আড়ালে তুমি আমার তাঞ্চুই শাড়ি'র কোলে মাথা রেখেছিলে। এ 'কথা-সে 'কথার ফাঁকে দুষ্টুমি ফাঁদলাম..। সরু ঘাস তোমার কানে-নাকে
সুড়সুড়ি দিচ্ছিলাম। আমাকে তারপর জাপটে
ফেলে গড়াগড়ি করালে...।কত হাসাহাসি... ।
ভালোও লেগেছিল বেশ। বাড়ি ফিরে সে কী
চুলকানি, সারা শরীরে আমার লালচে হ'য়ে , সে
কী অবস্থা..... ।
একবার লাইট হাউসে ' ব্লো হট ব্লো কোল্ড ' সিনেমা দেখেছিলাম আমরা দু'জনে....। 'A'--
পিকচার...। সে' কী ভীড় !! দু'টো টিকিট যোগাড়
ক'রে ' উত্তাপ থেকে নিথরে ' দু'জনের সংগ্রহশালায় জমলো ঘন্টা আড়াই সেই অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে....!!
তোমাকে দেখতে খুব ইচ্ছে ক'রে। এবার গেলে
দেখা দিও। তুমি পলিটিক্স-এ জড়ালে, চাকরি নেই।পুলিশের জালে ধরা পড়লে...। তারপর ত '
তোমার সব জানা। আমার মত খাটলোনা বাড়িতে, বিয়ে হ'ল দয়িতের সাথে। চলে এলাম
সব ছেড়ে... । দু'দুবার মিলনগড় এসেও তোমার
সাথে দেখা পাইনি। বেশ কিছু কথা জমানো,
সম্ভব হ'লোনা, দূর্ভাগ্য আমার... ।
শুনলাম, চাকরি-সংসার হয়েছে। ত'বে বিয়ে করছোনা কেন....??
দয়িত এখনো ঘুমিয়ে।নি:স্তব্ধতা চারদিক,দেয়াল
ঘড়িটা জানান দি'ল একটা। সময় বয়ে যাচ্ছে,
স্মৃতির সাথে পাল্লা দিচ্ছে.... ।
জানো, হিলটপ এখান থেকে তিন কিলোমিটার,
হিলকিট টাউনটা নিচে। পাহাড়ে উঠি। টাউনটাকে ছোট দেখায়..., সমুদ্রকে বড় লাগে।
বড় বড় ঢেউ আছড়ে পড়ে। পাহাড় তবু টলেনা।
প্রচন্ড হাওয়া... শরীরটাকে ঠান্ডা ক'রে দ্যায়।
তোমার ত ' খুব সখ ছিল, মনুমেন্টে প্রায়ই উঠতে !! অবশ্যি, তোমার হাত ধ'রে একবার
উঠেছিলাম..., নিচে তাকাতেই মাথাটা ঘুরেছিল,
তোমার গায়ে হেলে হেলে নামিয়ে এনেছিলে
আমায়... । মনে পড়ে তোমার.....!!
জানো, এতদিন বিয়ে হ'য়েছে আমাদের... সংসার ভরলোনা। এত বড় বাংলোটা খাঁ..খাঁ...
ক'রে। অনেক চেষ্টার বৃথা পন্ডশ্রম। ডাক্তার
বলেছেন, ওরই গোলমাল... হতাশায় দিনগুলো
কাটছে....... ।
যাক্ সে ' সব কথা, ---
কিছুদিন আগে দয়িত নিয়ে যায় ফ্রেংকফুট বইমেলায়। প্রকান্ড...। বিশ্ব বইমেলা.... । না দেখলে বিশ্বাস হবেনা। কলকাতা থেকে এসেছিল গোনা ক'য়েক পাবলিশারস্.... ।
জানো, নবনীতা দেব সেন, নিমাই ভট্টাচার্য্য,
মৈয়েত্রী দেবী, সুনীল গংগোপাধ্যায় এসেছিলেন,
দয়িত ত ' ইঞ্জিনিয়ারিং বই খুঁজছে.. আর আমি,
তোমার ফেভারিট রাইটার নিমাই ভট্টাচার্য্য'র
' মেমসাহেব ' এবং মৈয়েত্রী দেবী'র ' নহন্বতে '
কিনলাম....। ওঁদের দু'জনের অটোগ্রাফ নিলাম।
তোমাকে প্রেজেন্ট ক'রতে চিঠির সাথে V.P. --
ক'রে পাঠাচ্ছি.....। গ্রহণ ক'রো, প্লিজ...... ।
ঘুম পাচ্ছে খু উ উ উ ব...।চোখ দু'টো বুজে আসছে.......... ।
এক বুক ভালবাসা নিয়ে জবাবের আশায় তোমাকে ভেবে দয়িতের পাশে শোবার ঘরে
এগিয়ে যাচ্ছে রাত পোহানোর কিছু আগে..........
আদরিণী ----
' মৌ '
রাকেশ ঘোষাল
Comments
Post a Comment