লড়াই
দক্ষিণ কলকাতার নামজাদা এক হাসপাতালের ওটির ভিতর থেকে তীব্র স্বরে একটি শিশুর কান্না ভেসে আসছে । ওটির বাইরে চিন্তিত মুখে অপেক্ষারত শিশুটির বাবা শুভ্র ব্যানার্জি । প্রথম সন্তান ,তাই দুশ্চিন্তার রেখা ফুটে উঠছে তার কপালে । ওটির দরজা খুলে তোয়ালে মোড়া ছোট্ট একটা প্রাণ কোলে বাইরে এসে দাড়ালো দুজন নার্স । শুভ্র ছুট্টে গেল কাছে । জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো নার্সদের দিকে । মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে করতে একজন বলে উঠলো -- সরি ,মিস্টার ব্যানার্জি । একটি ট্রান্সজেন্ডার শিশুর জন্ম দিয়েছে আপনার ওয়াইফ ।
শিশুটির দিকে একটিবার মাত্র চেয়ে ঘৃণায় কুঁচকে ওঠে শুভ্রর মুখখানা । শুভ্রর বাড়ির লোক , অপর্ণার বাড়ির লোক ,কেউই কোলে নিতে এগিয়ে আসেনা শিশুটিকে । শুভ্র ছিটকে সরে যায় শিশুটির সামনে থেকে । বাকিরাও সরেই যায় । নার্সটি শিশুটিকে কোলে নিয়ে ওটির দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে । জন্মের কয়েক মিনিটের মধ্যেই শিশুটি ব্রাত্যের পরিচয় লাভ করে ।
অপর্ণাকে বেডে দেয়া হয়েছে । শুভ্র অপর্ণার পাশে গিয়ে দাঁড়ায় । অপর্ণা স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছে কাঁচের জানলার দিকে । শুভ্রর অস্তিত্ব টের পায় সে । বলে -- ওর খিদে পায়নি ? ওরা ওকে আমার কাছে আনলোনা তো !
গম্ভীর স্বর ফুটে ওঠে শুভ্রর গলায় । বলে -- ওকে তুমি ভুলে যাও অপর্ণা ! ওকে আমরা নিজেদের পরিচয় দিতে পারবোনা ।
-- কেন ? এতে ওর কি দোষ শুভ্র ? ও তো আমাদেরই সন্তান !
-- হোক ,তবু পারবোনা । অপেক্ষা করবো ,সুস্থ স্বাভাবিক বাচ্চার জন্মানোর জন্যে । তুমি ওকে নিয়ে আর ভেবোনা ।
ডক্টর রায়ের কেবিনে ঢোকে শুভ্র । ডক্টর রায় বলেন -- আপনি শুধু শুধু আমাকে একিউস করছেন । এটা একটা জেনেটিক ডিসঅর্ডার ।
-- এতগুলো ইউএসজি করলেন ,একবার ও বুঝতে পারলেননা !
-- সত্যিই বোঝা যায়নি মিস্টার ব্যানার্জি । আই এম সরি !
-- আমি ,আমার ওয়াইফ ,আমার পুরো ফ্যামিলি আজ কতটা ইনসাল্টেড হলাম ,আপনার কোনো আইডিয়া নেই ডক্টর । কিভাবে বলবো বলুনতো লোককে যে আমরা দুজন একটা হিজ... একটা ট্রান্সজেন্ডারকে জন্ম দিয়েছি !
-- আই ক্যান আন্ডারষ্ট্যান্ড মিস্টার ব্যানার্জি ।
-- না ,কিচ্ছু বুঝতে পারছেন না আপনি । শুনুন ওকে আমার ওয়াইফের কাছে প্লিজ আনবেননা আর ওদের হোমে ওকে পাঠানোর ব্যবস্থা করুন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব !
শিশুটি যে জন্মেই সকলের দুশ্চিন্তা এবং বিরক্তির প্রত্যক্ষ কারণ হয়ে উঠেছিল, সেকথা শিশুটি না বুঝলেও নার্সটি বিলক্ষণ বুঝেছিল । বিবাহিত সে । কিন্তু নিঃসন্তান । অনেক চেষ্টা করেও গর্ভধারণ সম্ভব হয়নি তার । এই কয়েক ঘন্টার মধ্যেই শিশুটি যেন মায়ার বাঁধনে জড়িয়ে ফেলেছে তাকে । বড় বড় চোখে অপার বিস্ময় মাখা ভারী আদুরে তার দৃষ্টি । ফোনটা নিয়ে স্বামীর নম্বর ডায়াল করে সে । রিং হচ্ছে ।
-- হ্যালো , শোনো না ,একটা কথা ছিল ।
-- বলো ! এক্ষুনি ক্লাসে ঢুকবো ।
-- বলছিলাম, ট্রান্সজেন্ডার শিশুদের কি তুমি ঘৃণা করো ?
-- কেন ? ঘৃণা করবো কেন ? কোনো শিশুকেই আমি ঘৃণা করিনা ।
-- যদি এরকম কেউ তোমাকে বাবা ডাকে... খারাপ লাগবে তোমার ?
-- কি হয়েছে ! খুলে বলবে ?
ঘটনাটা সংক্ষেপে বলে অঙ্কিতা নামের নার্স মেয়েটি । সব শুনে আবির বলে -- আমি আছি তোমার পাশে । এইরকম একটা দৃপ্ত পদক্ষেপে তোমার পাশে থাকবোনা, আমি ভাবতেই পারিনা । ফর্মালিটিস কি আছে জেনে আমাকে জানাও । অঙ্কিতার স্বামী আবির কলকাতার এক নামি কলেজের অধ্যাপক । অন্ধকার কাটিয়ে আলোয় ফেরার কান্ডারী সে । ফলে ইচ্ছাপূরন হয় অঙ্কিতার । মা হয় সে ।
কয়েকদিনের মধ্যেই সমস্ত লিগ্যাল ফর্মালিটিজ পেরিয়ে ছোট্ট ঋদ্ধিকে সাথে নিয়ে নিজেদের বাড়ি ঢুকলো দুজন । দক্ষিণ কলকাতায় নিজস্ব ফ্ল্যাট xx xর থেকে উদ্বিগ্ন হয়ে ফোন করেন ।
-- বাবু , এ তোরা কি করলি ? একটা বার আমাদের সম্মানের কথাটা ভাবলিনা ?
-- ভুল তো কিছু করিনি আমরা ! উত্তর দিয়েছিল আবির ।
উত্তর কলকাতা থেকে ছুটে এসেছিলেন অঙ্কিতার বাবা মা । বলেছিলেন -- এর চেয়ে অনাথ আশ্রম থেকে একটা বাচ্চা দত্তক নিতে পারতিস ! সুস্থ স্বাভাবিক বাচ্চা ! একে নিয়ে কি করবি তোরা ?
অঙ্কিতা উত্তর দিয়েছে -- মানুষ করবো । আর তোমাদের কে বলেছে যে ও সুস্থ বাচ্চা নয় ?
স্বাভাবিক ভাবেই দুই পক্ষই দূরত্ব বেছে নিয়েছিল । নাতি অথবা নাতনি নয় , যে এসেছিল তার পরিচয় কি হবে , সেই প্রশ্নের উত্তর নিজেরাও পাননি আর অন্যকেও দিতে পারেননি । তাই দুরত্বই শ্রেয় বলে মনে করেছিলেন ।
প্রথম দিকে একজন মহিলা আয়াকে রাখে ওরা । প্রথম দিন ন্যাপি খুলতেই ছিটকে সরে আসে সে কয়েক পা , বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে অঙ্কিতার দিকে তাকিয়ে বলে -- ও বৌদি ! এ তোমার বাচ্চা ? এসব বাচ্চা তো শুনেছি ওরাই নিয়ে যায় গো ! একে তুমি ঘরে রেখেছো কেন ?
বিছানা থেকে ঋদ্ধিকে নিজের কোলে তুলে নিয়ে অঙ্কিতা বলেছিল -- তোমার অসুবিধা আছে কাজ করতে ? তুমি আসতে পারো । এক দিনের টাকাটা নিয়ে যেও ।
হসপিটালে যাওয়ার পথে ট্রাফিকে দু একজন বৃহন্নলা চোখে পড়তো অঙ্কিতার । একদিন তাদের মধ্যেই একজনকে বললো ঋদ্ধির জন্যে একজন বিশ্বাসী আয়া দেখে দেওয়ার জন্যে । সে জানালো জানাজানি হলে অঙ্কিতার কোল থেকে ঋদ্ধিকে ছিনিয়ে নিয়ে যেতে কাল বিলম্ব করবেনা অন্য বৃহন্নলারা । সেই সাথে আশ্বস্তও করলো যথাসাধ্য গোপনীয়তা রক্ষা করেই সে ব্যবস্থা করার চেষ্টা করবে । কয়েকদিনের মধ্যে ওদের মতোই একটু মধ্যবয়সী একজনের খোঁজ পাওয়া গেলো অনেক চেষ্টা চরিত্র করে । অঙ্কিতা চিরকৃতজ্ঞ হয়ে রইল বিশেষ সেই সহমর্মী বৃহন্নলার প্রতি । নতুন আয়াটি ঋদ্ধিকে দুই হাতে আগলে রাখলো । অঙ্কিতা আর আবির নিশ্চিন্ত হলো ।
ধীরে ধীরে বড় হতে লাগলো ঋদ্ধি । ফুটফুটে চেহারা , একমাথা কোঁকড়ানো চুল , আধো আধো বুলি ফুটেছে মুখে । পাড়ার কিড জি তে ভর্তি করবে এবার অঙ্কিতা তাকে । দেখা গেল ফর্মে sex এর জায়গায় ' other ' কথাটা লেখা নেই । প্রিন্সিপালের সাথে দেখা করলো অঙ্কিতা , আবির তখন সেমিনারে বাইরে । দীর্ঘ তর্ক বিতর্ক , যুক্তির কাঁটা তার পেরিয়ে ভর্তি হলো ঋদ্ধি স্কুলে । সেই শুরু । এরপর বড় স্কুলে ভর্তি হলো একটা সময় । সহজ ছিলোনা চলার পথ । তবু হার মানেনি অঙ্কিতা । আবির কিছু সময় পাশে ছিল , কিছু সময় হয়তো পারেনি , কিন্তু ঋদ্ধির যে দায়িত্ব অঙ্কিতা নিজের হাতে তুলে নিয়েছিল, তার থেকে কখনো সে পিছিয়ে আসেনি । দেখতে দেখতে ঋদ্ধি এখন ক্লাস সেভেনের ছাত্র ।
আমি ঋদ্ধি
এখন আমার ক্লাস টেন । বয়েজ স্কুলে পড়ি । আমার ক্লাসের অন্য ছেলেদের থেকে আমি যে কিছুটা আলাদা.... বুঝি । স্কুলের বাকি ছেলেদের থেকেও আমি আলাদা । আমার বাবা নামি কলেজের প্রফেসর , মা নামি হসপিটালের মেট্রন । আমি নিজে পড়াশোনাটা বেশ মন দিয়েই করি । কারণ আমি জানি ওটাই আমার একমাত্র লক্ষ্য । তবু, এর পরেও স্কুলে আমার একটাও বন্ধু নেই । প্রতিবছর আমি ক্লাসে সেকেন্ড হই । ফার্স্ট হয় একটি ছেলে । দুজনের নম্বরের তফাত থাকে বড়জোর এক নম্বর অথবা দুই নম্বর । ঠিক বুঝতে পারিনা কোথায় কমে যায় এই নম্বর টুকু প্রতিবার । মা বলে -- ফার্স্ট সেকেন্ডে কি আসে যায় ঋদ্ধি ! যেটা শিখছিস সেটা শেখার মতো করে করে শেখাটাই আসল । এসব কোনো ব্যাপার নয় ।
বাস্কেটবল খেলতে দারুন ভালোবাসি আমি । স্কুলের টিমে আমার পারফরমেন্স দারুন । তবু আমি কিন্তু ক্যাপ্টেন নই ! কেনোর উত্তর এখানেও আমার জানা নেই । তবু ম্যাচগুলোতে আমিই জেতাই আমার স্কুলকে ।
আমাদের স্কুলের পাশেই একটা গার্লস স্কুল আছে । আমাদের স্কুলের অনেক ছেলেই এই স্কুলের মেয়েদের সাথে প্রেম ট্রেম করে । আমারও একটি মেয়েকে ভালো লাগে । আমি দূর থেকে শুধু দেখি ওকে । কাছে গিয়ে কথা বলিনা । মাকে বলেছিলাম ওর কথা । মা বাবার দিকে তাকিয়েছিল কিছুক্ষন । বাবা মায়ের দিকে । তারপর আমাকে বলেছিল -- নিজেকে তৈরি করো ঋদ্ধি । এমন ভাবে তৈরি করো যাতে শুধু এই মেয়েটা কেন, সারা দুনিয়া তোমার সামনে মাথা ঝোঁকাতে বাধ্য হয় । এখন এসব দিকে মন দিওনা । নিজের কাজে কনসেনট্রেট করো ।
জানিনা , কথাগুলোর মধ্যে কি ছিল ! কিন্তু নিজের ভিতর কিছু একটা অন্যরকম তাগিদ অনুভব করেছিলাম সেদিন । ফাইনালে দারুন রেসাল্ট উপহার দিলাম আমার স্কুলকে , বোর্ডের পরীক্ষায় বরাবর আমাদের ক্লাসের ফার্স্ট বয়... আমার থেকে পিছিয়ে রইলো অনেকটাই । স্কুলের মধ্যে প্রথম হলাম আমি, শহরে তৃতীয় । মায়ের কথাগুলো আমাকে ভিতর থেকে প্রতি মুহূর্তে উদ্বুদ্ধ করতো, আরো ভালো করতে উৎসাহ দিতো ।
ক্লাস টুয়েলভ তখন । একদিন টিউশন নিয়ে ফিরছি । আগেই বলেছি , আমার কোনো বন্ধু ছিলোনা । একাই ফিরতাম । হঠাৎ পাশের স্কুলের সেই মেয়েটার সাথে দেখা । আমাকে দেখে হাত নাড়ছিল । দাঁড়িয়ে পড়েছি আমিও । এগিয়ে এলো মেয়েটি ।
-- আমি মিশা । তুমি ঋদ্ধি তো ?
-- হ্যাঁ । তুমি চেনো আমাকে ?
-- চিনি , তোমার মত ব্রিলিয়ান্ট একজন ছেলেকে চিনবোনা, তা কি হয় ?
-- কি জানো তুমি আমার ব্যাপারে ?
থমকাল মিশা । বললো -- না , বেশি কিছু জানিনা । তবে তোমাকে নিয়ে অনেক রকম কথা কানে আসে ।
আমি হাত দুটো বুকের ওপর আড়াআড়ি ভাবে রেখে বললাম -- যা কানে আসে , সেসব কিন্তু সত্যি । ভেবে দেখো , রাস্তায় দাঁড়িয়ে আমার সাথে কথা বলছো , ঠিক করছো তো ?
-- এরকম কেন বলছো ?
-- বারোটা বছর একটা স্কুলে পড়েও একটা বন্ধুও হয়নি আমার । প্রতিবছর এক নম্বর বা দু নম্বরের জন্যে সেকেন্ড হয়েছি । বাস্কেটবল টিমের বেস্ট পারফর্মার হওয়া সত্ত্বেও ক্যাপ্টেন হতে পারিনি কোনোদিন । কিছু তো খামতি আছে আমার মধ্যে , তাইনা !
-- কিন্তু তুমি ব্রিলিয়ান্ট ! সেটাও তো সত্যি ?
-- হয়তো , কিন্তু এর চেয়েও বড় যে সত্যিটা সেটা কেউ মেনে নিতে পারেনা মিশা । আমার বাবা মা আমাকে এডপ্ট করেছিল । যারা আমার নিজের বাবা মা , আমি তাদের চিনিনা , তারা আমাকে ফেলে দিয়েছিল ছুঁড়ে । আমার দাদু দিদা ঠাম্মা, কাউকে আমি চিনিনা । তারা আমাকে আজ পর্যন্ত দেখতে আসেনি । আমাকে দত্তক নেওয়ার অপরাধে বাবা মা দূরে সরে গেছে নিজেদেরই বাবা মার থেকে । এবার বলো... এই সত্যির চেয়েও বড় অন্য কোনো সত্যি জানা আছে তোমার ?
-- কিন্তু বাইরে থেকে তোমাকে দেখে তো কেউ....
-- আসি মিশা । সত্যিটা আমি জানি । আর এই সত্যিটা আমি বদলাতে পারবোনা । কেউই পারবেনা । হ্যাঁ, তোমাকে ভালো লাগতো আমার, কিন্তু যা সম্ভব নয় , তার জন্যে সময় নষ্ট করতে আমি রাজি নই । তবু তুমি এসে কথা বললে... এই সন্ধ্যেটুকু আমার মনে থেকে যাবে আজীবন । ভালো থেকো মিশা । চলি !
চলে এসেছিলাম বাড়িতে । দলাপাকানো একটা কান্না আটকে ছিল গলার কাছে । কি যেন তীব্র যন্ত্রনা ছিঁড়ে খুঁড়ে দিচ্ছিল আমার কিশোর মনটাকে । ভালোবাসার অদম্যতাকে ঘাতকের মতো নিজেই দমন করেছিলাম সেদিন । বাধ্য হয়েছিলাম ।
◆◆◆
হসপিটালে যাওয়ার পথে কয়েকজন বৃহন্নলাকে দেখতে পাই রোজ । আমারই মতো । পার্থক্য শুধু এই যে অঙ্কিতা বা আবিরের মতো কারোর হাত ওদের মাথার ওপর পড়েনি । জানলার কাঁচটা নামিয়ে পঞ্চাশ টাকা বাড়িয়ে ধরতেই মাথায় হাত ছুঁইয়ে আশীর্বাদ করলো , ঠিক যেমন মাকে করতে দেখি । বললো -- ভগবান তোর মঙ্গল করুন ।
আজ আমার একটা অপারেশন আছে । আমি নারীও নই পুরুষও নই । কিন্তু আজ আমার হাতে জন্মায় নারী পুরুষের সন্তান । আমি একজন গায়নোকলজিস্ট । তবে আজকের অপারেশনটা একজন বয়স্কা মহিলার । মায়ের মতোই বয়স প্রায় । বহুদিন যাবৎ ইউটেরাসে একখানা টিউমার পুষে রেখে এখন শেষ মুহূর্তে আমার কাছে এসেছেন । বাদ দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই । নিঃসন্তান ভদ্রমহিলা ।
ওটিতে ঢুকলাম । এনাস্থেসিয়া চলছে । আমার এসিস্টেন্টকে বললাম -- ফরসেপ..... !
অপারেশন সাকসেসফুল । ভদ্রমহিলাকে বেডে দেওয়া হবে একটু পরে । ভদ্রমহিলার স্বামী এলেন আমার সাথে দরকারি আলোচনা করতে । সবকিছু বুঝিয়ে দেওয়ার পর হঠাৎ বললেন -- জানেন ডক্টর ! প্রথম যখন বাবা হয়েছিলাম আর অপর্ণা মা ,সেদিন যে এসেছিল আমাদের কোলে, তাকে ভালোবেসে বুকে জড়িয়ে নিতে পারিনি । অপর্ণাকেও বাধ্য করেছিলাম আমার সিদ্ধান্ত মেনে নিতে । ভেবেছিলাম আবার আমি বাবা হবো, ও মা হবে ! কিন্তু নিয়তির কি অদ্ভুত পরিহাস দেখুন ! আজও আমরা নিঃসন্তানই রয়ে গেলাম ।
বললাম -- বুকে জড়িয়ে নিতে পারেননি কেন ?
-- ভেবেছিলাম পরের বার সুস্থ সন্তান আসবে আমাদের কোলে । আর কেউ এলোইনা ।
-- কি সমস্যা ছিল আপনাদের সন্তানের ?
-- আসলে ও... মানে , মানে.... ইট ওয়াজ এ hermaphrodite চাইল্ড ! সো বুঝতেই পারছেন ! এই হসপিটালেই জন্মেছিল ও । জানিনা হয়তো সে আজ কোনো আশ্রমে বড় হয়েছে , হয়তো রাস্তায় ভিক্ষা করে বেড়ায় !
-- বা হয়তো সে জীবনের সমস্ত লড়াইকে অতিক্রম করে এসে আজ নিজের লক্ষ্যে ঠিক পৌঁছে গেছে ! এমনটাও তো হতে পারে !
-- কিকরে ?
-- সেটা আমি কিভাবে বলবো মিস্টার ব্যানার্জী ! আমি জাস্ট একটা সম্ভাবনার কথা বললাম । আমার রাউন্ডে যাওয়ার সময় হয়ে গেল মিস্টার ব্যানার্জী । আপনি একটু পরে মিসেস ব্যানার্জীর সাথে দেখা করতে পারবেন । তবে কথা বলাবেননা বেশি । টেক কেয়ার !
করিডোর দিয়ে হেটে চলেছি ,গলায় স্টেথো, সাদা এপ্রন গায়ে আমি...ঋদ্ধি সরকার । অঙ্কিতা সরকার আর আবির সরকারের একমাত্র উত্তরসূরী । মিস্টার ব্যানার্জীর কথামতই হতে পারতো হয়তো আমার জীবনটাও । কিন্তু হয়নি । জীবন আমাকে হার স্বীকার করতে দেয়নি , প্রতিকূলতাকে জয় করে সাফল্যকে শেষপর্যন্ত ছুঁতে পেরেছি ।
রাকেশ ঘোষাল
Comments
Post a Comment