শ্যামবর্ণা
"কলকাতায় নিজগৃহসম্পন্ন মুম্বাইতে কর্মরত ইঞ্জিনিয়ার সুপুরুষ পাত্রের জন্য প্রকৃত ফর্সা, সুন্দরী পাত্রী চাই। ইচ্ছুক ব্যাক্তিরা সত্বর যোগাযোগ করুন নিম্নলিখিত নম্বরে " - ঘুম থেকে উঠে চোখ খোলার পর দৈনন্দিন খবরের কাগজে বিজ্ঞাপনটা পড়েই সুনির্মলবাবু বললেন, "বেঁড়ে হয়েছে বলো আমাদের বিজ্ঞাপনটা। দেখো এবার কেমন সুন্দর বউ আনি তোমার ছেলের জন্য। "
-"হ্যাঁ। তা যা বলেছো। আমাদের দীপের জন্য তো এরকমই একটা মেয়ে চাই। ইঞ্জিনিয়ার ছেলে বলে কথা।তার ওপর দেখতেও এত সুন্দর"-বেশ গর্বিত ভঙ্গীতেই কথাটা বললেন রুপাদেবী।
স্বচ্ছল পরিবারে বাবা মা এর একমাত্র ছেলে দ্বৈপায়ন সেনগুপ্ত বেসরকারী কলেজ থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করার পর মুম্বাই তে কর্মরত প্রায় দু'বছর ধরে ,ছয়মাসে একবার কলকাতায় আসে। রেলের চাকরী থেকে অবসরপ্রাপ্ত সুনির্মলবাবু এবং রুপাদেবী ছেলের জন্য পাত্রী খুঁজছেন কিছুদিন ধরেই।প্রাথমিকভাবে দেখে তাঁদের মেয়ে পছন্দ হলে ছেলে মুম্বাই থেকে এসে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। দু-তিনজনকে দেখেওছেন, কিন্তু কাউকেই মনে ধরেনি।
সেদিন রুপাদেবীর জা এর এক দুঃসম্পর্কের ভাগ্নিকে দেখতে যাওয়ার কথা ছিল। পরিপাটি সেজে রুপাদেবী ও সুনির্মলবাবু রওনা দিলেন নিজেদের গাড়ি করে।পাত্রীর বাড়ি শোভাবাজারে। পুরনো দিনের একতলা বাড়ির সামনে ছোট্ট ফুলের বাগান। বাগান পেরিয়ে বাড়িতে ঢুকলেন সুনির্মলবাবু এবং রুপাদেবী। পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে বলে ঘরদোর যে সুন্দর করে গোছানো হয়েছে নতুন চাদর পর্দা দিয়ে, তা দেখলেই বোঝা যাচ্ছে। তাঁদের দেখেই সাদর অভ্যর্থনা জানালেন মেয়ের মা সরবত দিয়ে। অতি বিনয়ের সঙ্গে মেয়ের বাবা জিজ্ঞেস করলেন - "আসতে অসুবিধা হয়নি তো আপনাদের??"
--"তা তো হয়েইছে একটু। আমরা তো লেক গার্ডেন্সের বাসিন্দা। এসব উত্তর কলকাতার অলিগলিতে যাতায়াত করতে অসুবিধা তো হবেই।"-হেসে বললেন সুনির্মল বাবু।
কিছুক্ষণ বসে কথোপকথনের পর মেয়েটি এল প্লেটে করে হাতে লুচি, আলুর দম আর মিষ্টি নিয়ে।শ্যামবরণ মেয়েটির মুখে লক্ষ্মীশ্রী ভাব, চোখে বুদ্ধিদীপ্ততার ছাপ স্পষ্ট।কিন্তু রুপাদেবীর তো বেজায় মুখ ভার শ্যামবর্ণা মেয়েকে দেখে। কিছুক্ষন পর মৌনতার সীমা ভঙ্গ করে তিনি বলেই দিলেন, "কিছু মনে করবেন না, আমরা আমাদের ছেলের জন্য একটি বেশ ফর্সা মেয়ে খুঁজছি। মানছি আপনাদের মেয়েকে মিষ্টি দেখতে। কিন্তু আমরা যেমনটা চেয়েছি, আপনাদের মেয়ে তো সেরকমটা একেবারেই না। আমাদের ছেলে ফর্সা। আর আপনাদের মেয়ে তো কালো। ওকে একদমই মানাবে না আমাদের ছেলের পাশে।"
এরকম একটি অপ্রত্যাশিত রুঢ় মন্তব্যের সঙ্গে সঙ্গেই ঘরে একরাশ নিস্তব্ধতা নেমে এল। হাতঘড়িতে একবার তাকিয়ে নিয়ে রুপাদেবী সুনির্মলবাবুকে বললেন -" চলো ওঠা যাক এবার।"
কন্যাদায়গ্রস্থ মেয়েটির বাবা বললেন -"আমার স্ত্রী মেয়ে কষ্ট করে এসব রান্না করেছে। একটু মুখে নিয়ে তো যান আপনারা।"
-"না দাদা। সাউথ থেকে নর্থে এতদূর আসতেই অনেক কষ্ট হয়েছে। রাস্তায় যা জ্যাম। আর আপনাদের বাড়িতে তো এসি ও নেই। আমাদের তো সারাক্ষণই এসিতে থাকা অভ্যাস। গরমের দিনে বুঝতেই তো পারছেন..."-বলে কোনোরকম তোয়াক্কা না করেই বেরিয়ে গেলেন সুনির্মলবাবু ও রুপাদেবী। মেয়েটির আর কোনো গুণের খবরও নিলেন না তাঁরা । অপমান আর লাঞ্ছনার পরেও এক বিন্দু অশ্রু দেখা দিল না শ্যামলা মেয়েটির চোখে।সে শুধু মনে মনে ভাবল,এর যোগ্য উত্তর একদিন সে দেবেই।
এরপর প্রায় তিনবছর কেটে গিয়েছে।দ্বৈপায়ন কলকাতায় এসেছে কয়েক দিনের জন্য খুড়তুতো বোনের বিয়ে উপলক্ষ্যে। নানান কারণে এখনও বিয়ে হয়ে ওঠেনি তার নিজের। বোনের বিয়ে বলে কথা, সকাল থেকেই খুব ব্যস্ত দ্বৈপায়ন। কিন্তু হাজার ব্যস্ততার মধ্যেও তার চোখ বারংবার চলে যাচ্ছে একটি শ্যামলা মেয়ের দিকে।একরাশ কালো চুল,ভাসা ভাসা দুটি চোখ আর মন ভোলানো হাসিতে সে যেন বশ করেছে দ্বৈপায়নকে। কে মেয়েটি?দেখেওনি ও কোনোদিন। মা এর সঙ্গে বরাবরই খুবই অকপট দ্বৈপায়ন। মা কে গিয়ে সোজা ও বলেই দিল, "মা,একটা মেয়েকে বড্ড ভালো লেগেছে আমার। তুমি গিয়ে একটু কথা বলো না। কে একটু খোঁজ নাও তো। চেনাজানাই হবে আমাদের।"
এতদিন পর ছেলের কাউকে মনে ধরেছে দেখে রুপাদেবী তো বেজায় খুশী।ছোটোবেলা থেকেই ছেলে যা চেয়েছে,তাই এনে হাজির করেছেন। কাকে পছন্দ হল ছেলের তা দেখার জন্য উৎসুক হয়ে পড়লেন রুপাদেবী। কিন্তু এ কী?এ তো সেই দুই বছর আগের প্রত্যাখ্যাতা মেয়ে। এত মেয়ে থাকতে শেষে একেই মনে ধরল ছেলের? কিন্তু ছেলের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে একে ছাড়া কাউকে বিয়ে করবেই না।কী করা যায়? রুপাদেবী মনে মনে ভাবলেন, তাঁর ছেলের মতন সুপুরুষ আর ইঞ্জিনিয়ার ছেলে আছেই বা কজন। একবার অনুরোধ করলেই রাজি হয়ে যাবে মেয়েটি নিশ্চই।
রুপাদেবী দীপের সঙ্গে গিয়ে মেয়েটিকে ডাকলেন, "শুনছো। একটা ব্যাপারে একটু কথা বলতে চাই তোমার বাবা মা এর সঙ্গে।"
একঝলক দৃষ্টিতেই রুপাদেবীকে মেয়েটি চিনতে পারল। মনে পড়ে গেল তার দুবছর আগের সেই অপমানের কথা। সে স্মীত হেসে বলল, "আমাকেই বলুন না"।
রুপাদেবী বললেন -"এই যে আমার ছেলে দ্বৈপায়ন মুম্বাইতে "সুইট ড্রীমস" নামের একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে পাঁচবছর চাকরি করে। বোনের বিয়ে বলেই এসেছে এখন ছুটি নিয়ে। এখানে এসে তোমাকে দেখে ওর ভালো লেগে গেছে। সেই নিয়েই কথা বলতাম তোমার বাবা মা এর সঙ্গে আর কি।"
-"তাই নাকি? কিন্তু আমায় ক্ষমা করবেন, আপনার ছেলেকে তো আমি বিয়ে করতে পারব না।"-দৃঢ়ভাবে জবাব দিল মেয়েটি।
দ্বৈপায়ন পাশ থেকে জিজ্ঞেস করে উঠল -"কেন?আপনার কি কোনো বয়ফ্রেন্ড আছে? "
-"আজ্ঞে একেবারেই না। যে বাড়িতে শুধু গায়ের রং দিয়েই ছেলের বউ নির্বাচন হয়,মেয়ের কী গুণ আছে না আছে, মেয়ের শিক্ষাদীক্ষা বা পরিবার কেমন তা একবারের জন্যেও দেখা হয় না,সেরকম মানসিকতা বা রুচিবোধসম্পন্ন বাড়ির বউ হতে আমি পারব না।"
-"কি বলছেন কি আপনি। আমি তো কিছুই বুঝছি না।" চেঁচিয়ে উঠল দ্বৈপায়ন।
-"আপনি কিছু না বুঝতে পারেন।কিন্তু আপনার মা সবই বুঝছেন। ওনাকেই জিজ্ঞেস করুন না"।
-"কি বলছে মা ও এসব?"-বিস্ময়ের সুরে দ্বৈপায়ন মাকে জিজ্ঞেস করতেই রুপাদেবী তাচ্ছিক স্বরে বললেন
-"বাদ দে না দীপ। তোর মতন ইঞ্জিনিয়ার ছেলের এর চেয়ে ঢের ভালো মেয়ে জুটবে।চল তো এখান থেকে।"
দ্বৈপায়ন মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করল -"কি ঘটেছে কিছুই আমি জানি না।কিন্তু সেটাই কি একমাত্র কারণ আপনার আমাকে বিয়ে না করার?"
-"আজ্ঞে না। এটা মুখ্য কারণ। তবে আর একটা গৌণ কারণও আছে। আমি কালই চলে যাচ্ছি মুম্বাই । আই.আই.টি থেকে পাশ করার সঙ্গে সঙ্গেই আমার কাছে জব অফারটা আসে। "সুইট ড্রিমস" কোম্পানির অ্যাসিস্টেন্ট ম্যানেজার। আপনি তো ওখানেই পাঁচবছর ধরে জেনারেল স্টাফ। কাল থেকে আমি আপনার বস।তাই আপনার মায়ের ভাষায় বলাই যায়, আমার মতন যোগ্যতাসম্পন্ন মেয়ের পাশে আপনাকে ঠিক মানাবে না। "-দৃপ্ত কন্ঠে বলে উঠল দু বছর আগের সেই প্রত্যাখ্যাতা শ্যামবর্ণা মেয়েটি।রুপাদেবী প্রত্যুত্তর দেওয়ার জন্য একটিও শব্দ পেলেন না আর।
-"আসি এখন,অনেক কাজ পড়ে আছে আমার"-বলে মেয়েটি চলে গেল অন্যদিকে।
মা আর ছেলে তখনও একে অপরের দিকে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে। বিয়েবাড়ির আনন্দ,হই হট্টগোলের মাঝেও যেন একরাশ নীরবতা, শূন্যতা বিরাজ করতে লাগল তাদের মুখে।
রাকেশ ঘোষাল
Comments
Post a Comment