মাই প্রিন্সেস
ফোনটা বেজে যাচ্ছে জানালার সামনে। স্থির হয়ে তাকিয়ে আছে নিবেদিতা। সামনেই একটা নারকেল গাছ, অল্প হাওয়াতেই নিজের মনে পাতা দুলিয়ে খেলছে সে। একে অপরের গায়ে পড়ে আদর করছে। যেন পৃথিবীতে কোনো দুঃখই নেই।
দাঁতে দাঁত চেপে নিজের ঠোঁটটাকে কামড়ে ধরলো নিবেদিতা। বাবা কলিং....নিবেদিতা কট করে ফোনটা কেটে দিলো। অহংকারী দাম্ভিক লোক একটা! ন্যাকামি করে ফোন করে চলেছে প্রমথ রায়।
পাশ থেকে সোনালীদি বলে উঠলো, ফোনটা ধর না রে। তোকে তো রোজ কেউ ফোন করার আছে রে। আমার অবস্থা দেখ, কেউ কোথাও নেই। কোম্পানি ছাড়া আর কেউ ফোন করে না। একুশ বছরের নিবেদিতা বয়েসের থেকেও গম্ভীর স্বরে বললো, যেটা জানো না, সেটা নিয়ে কথা বোলো না সোনালীদি। এই অহংকারী মানুষটাকে আমি বেঁচে থাকতে অন্তত ক্ষমা করতে পারবো না।
নিবেদিতা জানালার দিকে তাকিয়ে দেখলো, ভোরের আলো এসে পড়েছে উঠোনের মাঝে। এক চিলতে ভাঙা উঠোনেই নয়নতারা জেঠিমা দুটো পাতিলেবুর গাছ বসিয়েছে। বারোমাস এই গাছে লেবু হয়। সেই লেবু দিয়ে নয়নতারা জেঠিমা আচার বানায়।
ভাতের পাতে একটুকরো আচার লাগতোই নিবেদিতার। পদ্মাপিসি নিজের হাতে বানিয়ে দিতো সে আচার। বাবা আর নিবেদিতা একসঙ্গে খেতে বসতো। মাকে খাইয়ে এসে পদ্মাপিসি ওদের খেতে দিতো। সকাল দশটার সময় বাবা আর নিবেদিতা একসঙ্গে খেয়ে নিয়ে বেরোত। বাবা ওকে স্কুলে ড্রপ করে দিয়ে অফিসে চলে যেত। স্কুলে ঢোকার মুখে ওর গালে চুমু খেয়ে বাবা বলতো, দিতি গুড গার্ল হয়ে থাকবে। ক্লাস থ্রির নিবেদিতা দুদিকে ঝুঁটি নাড়িয়ে বলতো, ঠিক আছে বাবা। চকলেট নিয়ে যেও অফিস থেকে যাবার সময়।
দিতির বাবা ছিল যাকে বলে সুপুরুষ। লোকে তাকিয়ে দেখতো বাবাকে। ফর্সা, লম্বা, টিকালো নাক, দৃঢ় চিবুক, সুপুরুষ বলতে যাকে বোঝায়। না নিবেদিতা অত সুন্দরী হয়নি। ও হয়েছে মায়ের মত। ভিড়ে মিশে যাওয়া একটা চেহারার অধিকারিণী। মাকে ও শেষ কবে সুস্থ দেখেছে সেটা অবশ্য নিবেদিতার মনে নেই। ক্লাস ওয়ানে যখন পড়তো তখনও দেখতো মা অসুস্থ। রিওমেটিক আর্থ্রারাইটিসের পেশেন্ট ওর মা। কেন এত অল্প বয়সে এমন রোগ হলো সেটা অবশ্য অনেকের কাছেই বিস্ময়। তবে নিবেদিতা দেখতো, ওর মা আস্তে আস্তে পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে। হাতের জয়েন্টগুলো ফুলে ব্যথা হয়ে যেত। পায়ের হাঁটু ভাঁজ করতে পারতো না। তখন মা বিছানা ছেড়ে উঠতেই পারতো না। বাবা সারাদিন পরে অফিস করে ফিরে মাকে খাইয়ে দিতো। তারপরই একদিন পদ্মাপিসির আবির্ভাব ঘটলো এই বাড়িতে। বাড়ির সর্বময় কর্ত্রী হয়ে উঠলো পিসি। বিধবা মানুষ, নিঃসন্তান, তাই এই বাড়িটাই তার নিজের সংসার হয়ে উঠলো। বাবাকে ডাকতো দাদাবাবু, মাকে বৌদিমনি, আর নিবেদিতাকে মামনি। ভারী মিষ্টি স্বভাবের মানুষ।
অসুস্থ মায়ের করুণ মুখটা দেখতে দেখতে কেমন যেন বিরক্ত লাগতো নিবেদিতার। দিনরাত কাঁদতো মা। কষ্টও হতো নিবেদিতার। মাকে কত ডাক্তার দেখালো বাবা, বাইরেও নিয়ে গেল, কিন্তু মা আর সারলো না। ওই যন্ত্রণা আর ব্যথার ওষুধকে সঙ্গী করেই কাটছিল মায়ের নির্বান্ধব জীবন। বাবা নিবেদিতার সবটা ঘিরে ছিল ক্লাস ওয়ান থেকেই। বাবার সঙ্গে ব্রাশ করা, এক সঙ্গে ব্রেকফাস্ট করা, সব কিছু। বাবা বলতো, আমার হার্ট হলো আমার দিতি। বাবা শুধু দিতিকে নয়, মাকেও ভালোবাসতো। প্রায় বলতো, একটু বই পড়, গান শোনো, দেখবে জীবনটা এতটাও খারাপ নয়। লড়াই করতে ইচ্ছে করবে। কিন্তু মা এসব কিছুই শুনতো না। দিনরাত দরজা বন্ধ করে একটা ঘরে বসে থাকতো আর কাঁদতো। বাবা খুব বড় পোস্টে চাকরি করতো। সারাদিন অফিসের চাপে ক্লান্ত হয়ে ফিরত। এসেই শুনতো, মা বলতো, আমিই বোঝা, কেন যে ভগবান আমায় নিয়ে নেন না কে জানে!
দিতি চুপটি করে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে ভয়ে ভয়ে মা-বাবার কথা শুনতো। বাবা মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে বলতো, শিউলি, মাঝে মাঝে আমার কথাও একটু ভেবো। আমিও যে আর পারছি না।
মা চিৎকার করে বলতো, ঢুকবে না আমার ঘরে। তোমার চোখে করুণা দেখতে আমার ভালো লাগে না। বাবা অসহায় হয়ে বেরিয়ে আসতো। একটা দমবন্ধকর পরিবেশে বড় হচ্ছিলো নিবেদিতা। রবিবার দিনটা ছিল ওর কাছে সব থেকে প্রিয়। ওদিন বাবা সারাদিন ওর সঙ্গে কাটাতো। ওরা খেলা করতো ওদের বাড়ির লনে।
এই নিবেদিতা, তোকে ডাকছে নয়নতারা জেঠিমা।
সুধা এসে বিরক্ত মুখে ডাকলো। এই মেয়েটার মুখে কোনোদিন হাসি দেখেনি নিবেদিতা। সুধা নাকি তিন তিন বার সুইসাইড করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে এসেছে নয়নতারা হোমে।
নিবেদিতা বললো, কেন ডাকছে? সুধা মুখঝামটা দিয়ে বললো, তোকে রাজভোগ খাওয়াবে বলে!
নিবেদিতা নীচে নেমে দেখলো, সবাই পুঁথি, ছুঁচ, সুতো নিয়ে গোল হয়ে বসে গেছে। সামনেই পুজো। অনেক অর্ডার আছে। ওরা জনা আষ্টেক মেয়ে থাকে এই হোমে। নয়নতারা জেঠিমার বাপের বাড়ি এটা। মোট তেরোটা ঘরওয়ালা এল প্যাটার্নের বাড়ি।
নয়নতারা জেঠিমার বিয়ে হয়েছিল খুব অল্প বয়সে। স্বামীর অত্যাচারে সংসার করতে না পেরে বাড়ি ছেড়ে উঠেছিল বাপের বাড়িতে। ওরা দুই বোন। আরেক বোনের বিয়ে হয়েছিল বাইরে। সে কোনো সম্পত্তির ভাগ চায়নি। তাই নয়নতারার মা, এই দোতলা বাড়িটা লিখে দিয়েছিল মেয়ের নামে। নয়নতারা তখন থেকেই কিছু করার কথা ভেবেছিল। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য, আচার, বড়ি এসব তৈরি করে বিক্রি করতো। সেই থেকেই ব্যবসা শুরু। এখন নয়নতারার এই বাড়িতে মোট আট জন বসবাস করে। নয়নতারা তিনটে জিনিসের ব্যবসা করে। এক- কস্টিউম জুয়েলারি, দুই- আচার, তিন- শাড়ি-কুর্তিতে এমব্রয়ডারির কাজ। এই আট জনই গৃহহারা হয়ে এসে জুটেছে নয়নতারার আশ্রয়ে। বলতে গেলে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে এসে খাওয়া পরার বিনিময়ে কাজে লাগিয়েছে। না, এক পয়সা মাইনে দেয় না নয়নতারা। বিদ্রোহ করতে গেলেই বলে, দূর হয়ে যা এখান থেকে। তোদের খাওয়ানোর কোনো ইচ্ছে নেই আমার। এদের মধ্যে একমাত্র নিবেদিতাকে কোনোদিন মুখ করেনি নয়নতারা। কারণ নিবেদিতা কখনো কোনো দাবি করেনি। খাওয়ার সময় খেয়েছে, ঘুমানোর সময় ঘুমিয়েছে, কাজের সময় মুখ বুজে করেছে। জীবনের কাছে যেন কোনো চাহিদাই নেই ওর। মুখের রেখায় কখনো কোনো পরিবর্তন দেখতে পায়নি কেউ।
হাতে রঙিন পুঁতিগুলো নিয়ে সুতোয় গাঁথতে শুরু করলো নিবেদিতা। আজ প্রায় তিনবছর একই কাজ করতে করতে আঙুলগুলোও যেন অভ্যস্ত হয়ে গেছে। তাদেরও আর শেখাতে হয় না। সোনালী আর নিবেদিতা একটাই ঘরে থাকে। সোনালী ছুঁচে সুতো পরাতে পরাতে বললো, কারোর কারোর সুখে থাকতে ভুতে কিলোয়, বুঝেছো? লোকের যাওয়ার জায়গা নেই, আর কারোর বাবা রোজ ফোন করেও মেয়ের মান ভাঙাতে পারে না। নিবেদিতার আঙুলগুলো একটু ধীর হওয়া ছাড়া আর তেমন বিশেষ কোনো পরিবর্তন হলো না। এখানে ওকে বাদ দিয়ে বাকি সাতজন যে কেন নয়নতারার আশ্রয়ে আছে সেটার খবরও নিবেদিতা জানে না ঠিক মত। আসলে ওরা নিজেদের মধ্যে যে কথাগুলো বলে সেগুলো শোনে ঠিকই, কিন্তু কোনোটাই মনে রেখাপাত করে না বলে মনেও রাখে না ও। শুধু নামগুলোই জানে। সুধা, পলি, সোনালী, দেবী, রিক্তা, সুগন্ধা, মাধুরী, অষ্টমজন নিবেদিতা। এদের সকলের পরে এসেছে ও। গত তিনবছরে নয়নতারা আর কাউকে নিয়ে আসেনি হোমে।
নয়নতারা বলে, এই তো ছোট ব্যবসা, আর কজনকে বসিয়ে খাওয়াবো বাপু!
ছুঁচে একটা অক্সিডাইসের চৌকো পিস ঢোকাতে গিয়ে একবার তাকালো নিবেদিতা। ডার্ক ব্ল্যাক কালার, ঠিক এই রঙের একটা স্কার্ট ছিল নিবেদিতার। বাবার সঙ্গে পুজোর বাজার করতে গিয়েছিল নিবেদিতা, তখন ও ক্লাস সেভেনের ছাত্রী। কালোর প্রতি ওর একটা মারাত্মক আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ছোট থেকেই কালো কিনতে গেলেই ওর মনে হতো ও তো শ্যামলা কালো কি মানাবে ওকে? বাবাই ওকে জোর করে কালো স্কার্টটা কিনে দিয়ে বলেছিল, তুই পরে দেখিস তোকে দারুন মানাবে। সব রঙেরই কিছু নিজস্বতা আছে। তাই সব রং পরতে হয়। বাবার টকটকে ফর্সা রঙের দিকে তাকিয়ে দিতি বলেছিল, মা যে বলে কালো পরিস না, তোকে মানাবে না। বাবা ভ্রু কুঁচকে বলেছিল, কে বললো মানাবে না? গায়ের রঙের সঙ্গে পোশাকের রঙের কোনোদিন তুলনা করবি না দিতি। আসল রংটা থাকে মনে। তোর যা রং পরার ইচ্ছে সব পরবি। মন যা বলবে সব।
তারপর থেকে দিতি আর দ্বিতীয়বার ভাবেনি ওর প্রিয় কালো রং পরতে।
প্রমথ রায়ের কাছে তার মেয়ে ছিল সবচেয়ে আপন। কিন্তু তবুও বাবা ঢুকলেই মা কি সব দুর্বোধ্য ভাষায় ঝগড়া করতো। তখন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতো দিতি। মা বলতো, বয়েসের ধর্ম যাবে কোথায়? নীলা কে প্রমথ? শুধুই অফিস কলিগ? অসুস্থ বউকে আর কদিন মেনে নেওয়া যায় বলো? ঘরের এক কোনের আবর্জনা বৈতো নই। মাত্র চল্লিশেই তুমি কেন বুড়ো হতে যাবে! নীলাকে বলো, এবাড়িতে এসেই থাকতে। আসলে কি জানো প্রমথ, রুগী বউ হলো পুরোনো ফার্নিচারের মত, না যায় ফেলে দেওয়া, মায়া পড়ে যায় যে। আবার জায়গা জুড়ে থাকে বলে শৌখিন আসবাব ঘরে ঢোকানোও মুশকিল হয়ে যায়। জগদ্দল পাথরের মত অহেতুক জায়গা জুড়ে থাকে। বাবা তিতিবিরক্ত গলায় বলতো, বাড়িতে পা দিলেই যদি তুমি এসব বলতে শুরু কর শিউলি আমি কোথায় যাই বলতো? আমাকেও তো বাঁচতে হবে। সারাদিনের অক্লান্ত কাজের পরে এসব কথা আর ভালো লাগে না। জানি তোমার ব্যথা-যন্ত্রণার কথা, আমারও কষ্ট হয়। সব রকম চেষ্টা তো করলাম, ফিজিওথেরাপিস্ট আসছে বাড়িতে, তুমি চেষ্টা করো সুস্থ হওয়ার শিউলি। মা তীক্ষ্ণ চিৎকার করে বলতো, সেকি আমি সুস্থ হলে নীলার কি হবে? গত এক বছর ধরে তো নীলাই তোমাকে সাপোর্ট দিচ্ছে। বাবা আর কিছু না বলে বেরিয়ে আসতো মায়ের ঘর থেকে। তখন অবশ্য নিবেদিতা এসব দুরূহ শব্দের মানেই বুঝতো না। কে নীলা? মা কেন তার ওপরে রেগে থাকে। বাবা এত যত্ন করার চেষ্টা করলেও মা কেন তাকে এভাবে বলে, কিছুই বুঝতো না নিবেদিতা।
নিবেদিতা ওই ঝগড়ার পরে ঘরে ঢুকে দেখেছে মা আপনমনে অনেক কথা বলে চলেছে। কি পেল প্রমথ আমাকে বিয়ে করে? অসুস্থ একটা বউ, যে নিজের যন্ত্রণার কথা ছাড়া আর কিছুই বললো না মানুষটাকে। আমি জানি নীলা ওকে ভালোবাসে। প্রমথ বাসে কি? নাকি শুধুই বন্ধু? প্রমথর উচিত আমাকে কোনো হোমে পাঠিয়ে দিয়ে নীলাকে নিয়ে শুরু করা। এভাবে একটা মানুষ আর কতদিন চালাবে! অফিসে কাজের চাপ, বাড়িতে আমি। পাগল হয়ে যাবে মানুষটা। আমি জানি প্রমথ আমাকে ভালোবাসে, কিন্তু ওরও তো যত্নের দরকার, আমি তো পারি না। কিছুই পারি না। পঙ্গু হয়ে গেলাম। ডাক্তার বলেছিল, এই রোগে অনেকের নাকি তেমন কিছুই হয় না। কিন্তু আমার হলো। নীলাকে নিয়ে আঘাত করে প্রমথকে ক্ষতবিক্ষত করে আসলে আমি কি পাই? নিজের অক্ষমতা ঢাকার চেষ্টা কি? এসব বলে মা নিজেই চোখ দুটো বন্ধ করে বলতো, নীলা তুমি পাশে থেকো প্রমথর।
এমন জটিল সব কথা তখন বুঝতো না দিতি।
ও শুধু বুঝতো, বাবাই একমাত্র মানুষ, যে দিতির সব কথা মন দিয়ে শুনবে। মাকে বলতে গেলেই তো মা বলবে, আমি মরে গেলে যে কে তোকে দেখবে কে জানে। মায়ের জন্য কষ্ট হতো দিতির। মানুষটা কোথাও বেরোয় না। দিনরাত ঘরের মধ্যে শুয়ে থাকে। দিতির জীবন চলছিল বাবার আদরে আর পদ্মাপিসির যত্নে। কিন্তু আচমকাই মায়ের শরীর আরও খারাপ হতে শুরু করলো। দিতি যখন ক্লাস নাইনে পড়ে তখন মাকে প্রায় একমাস হসপিটালে ভর্তি রাখতে হয়েছিল। বাড়িতে এসে মা একেবারে চুপচাপ হয়ে গেল। যন্ত্রণায় কান্নাকাটি করা ছাড়া আর কিছুই বলতো না। বাবা মায়ের ঘরে হোমথিয়েটার সেট করে দিলো, মা যাতে গান শুনতে পায়। কিন্তু মা তার রিমোটটা আছড়ে ভেঙে দিলো।
অদ্ভুত দমবন্ধকর পরিবেশের মধ্যেই দিনগুলো কাটছিল দিতির। বাবাও যেন কেমন দূরে চলে যাচ্ছিল ক্রমশ। বাড়িতে খুব কম সময় কাটাতো বাবা। তবে দিতির সব প্রয়োজন মেটাতে কখনো ভুলতো না। পেরেন্টস মিটিংয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে দিতির পছন্দের খাবার কিনে আনাতে কোনো ভুল হোতো না বাবার। শুধু আগের মত হাসতো না বাবা। দিতি বুঝতে পারতো বাবাও ক্লান্ত।
ধীরে ধীরে ওদের সম্পর্কের মধ্যে একটা পাঁচিল তুলে দিলো মা। বাবার সঙ্গে বেশি কথা বলতে গেলেই মা চিৎকার করতো ঘর থেকে। বলতো, তোর আবার ভাই বোন হবে রে দিতি। তোকে তাড়িয়ে দেবে এ বাড়ি থেকে। বাবার থেকে দূরে থাক, দূরে থাক তুই। বাবাও রাতটুকু বাড়িতে থেকেই বেরিয়ে যেত। মায়ের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকতো অসহায় ভাবে।
দিতির দমবন্ধ হয়ে আসতো। এর মধ্যেই মাধ্যমিকে বেশ ভালো নম্বর নিয়েই পাশ করলো নিবেদিতা। বাবার ইচ্ছে ছিল দিতি ডাক্তার হোক। সেইমতোই কোচিং শুরু করেছিল ও।
ক্লাস ইলেভেন উঠতেই বড়সড় ধাক্কাটা এসে লেগেছিলো ওর জীবনে।
নয়নতারা এসে নিবেদিতার সামনে ওর ফোনটা ঠক করে নামিয়ে দিয়ে বললো, এ ঢং আর সহ্য হয় না বাপু। তোর বাপ কি বোঝে না, মেয়ে তার মুখদর্শন করতে চায় না। ন্যাকামি করে রোজ রোজ ফোনে করে কেন বাপু! আমার মরনটা হলে বাঁচি। এসব আদিখ্যেতা দেখতে হয় না। সুধা একটু মুখরা টাইপ। ও মুখটা বেঁকিয়ে বললো, তো নম্বর ব্লক করে দিলেও তো হয়। নিবেদিতাও নম্বর ব্লক করতে জানে। করে না, তার কারণ ওই মানুষটাকে অপদস্ত হতে দেখতে চায়। ওই মানুষটার জন্যই আজ ওর এই হাল। করুক যত ইচ্ছে ফোন। গত তিনবছরে ফোন না ধরার অভ্যেসটা তৈরি করে নিয়েছে নিবেদিতা। বরং একটা আত্মতৃপ্তি পায় ও।
পলি বললো, তিন তিনবার মরতে গিয়ে সুধাদি বিফল হলো, এর থেকেই বোঝা যায় নিয়তি না নিলে হয় না, বুঝলে জেঠিমা। তাই দিনরাত মরনটা হলে বাঁচি বললেও তোমায় কেউ ঘুরেও দেখবে না।
নয়নতারা ধমক দিয়ে বললো, আমায় যমে নিলে তোদের কি হবে রে! ঘর বর খুইয়ে তো এসেছিস সব। মুখে মুখে কথা না বলে হাতের কাজ সার। আজ রাখী বুটিক থেকে বিকেলে আসবে, অর্ডার গুলো নিয়ে যাবে বলেছে।
নিবেদিতা মনে মনে বললো, ঠিক, নিয়তি না নিলে কারোরই মৃত্যু আসে না। কিন্তু ওর মাকে নিয়তি এক চান্সেই নিয়ে নিয়েছিল।
ক্লাস ইলেভেনে আচমকাই পরিচয় হয়েছিল ঋষির সঙ্গে। ঋষির বয়েস আঠাশ, নিবেদিতার সতেরো। ঋষি অনেকটা বড় হলেও ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে খুব ভালো লেগেছিল নিবেদিতার। ওর মত সাধারণ চেহারার মেয়ের জীবনেও এমন সুপুরুষের আবির্ভাব ঘটে এ তো কল্পনার অতীত। ঋষি আগলে রাখতো নিবেদিতাকে। নিবেদিতার সবটুকু দুঃখকে আপন করে নিয়েছিল। পেশায় ইঞ্জিনিয়ার ঋষির যেন একটাই চিন্তা, নিবেদিতা কোনোভাবেই যেন কষ্ট না পায়। সদ্য প্রেমে পড়া দিতির তখন সবটা জুড়ে ঋষি। হোয়াটসআপের মেসেজের টুংটাং আওয়াজটাই যেন দিতির বেঁচে থাকার প্রেরণা। ঋষি ফোনে বলতো, সন্ধ্যামণি ফুল দেখেছো দিতি? পথের পাশে ফোটে, পুজোয় লাগে না। ঘর সাজাতেও নয়। সকাল হলেই নুইয়ে পড়ে। তবুও যেটুকু সময় থাকে ক্লান্ত পথিকের চোখদুটোকে আরাম দেয়। তুমি আমার সন্ধ্যামণি। উগ্রতা নেই, অহংকার নেই, অবসন্ন মনকে সতেজ করার দাওয়াই। ঋষির কথাগুলো শুনে দিতি প্রথম নিজের গুরুত্ব বুঝতে পারলো।
পড়াশোনার অতিরিক্ত টাইম ঋষির সঙ্গে গল্প করেই কাটতো ওর। যখন ওর ঠিক সতেরো, যখন ওর শরীর মনে বসন্ত বাতাসের তোলপাড়, ঠিক তখনই ওর মা ঘটিয়ে ফেললো সেই ঘটনাটা যেটার জন্য দিতি বা প্রমথবাবু কেউই প্রস্তুত ছিল না। ইলেভেনের এক্সামের শেষ দিন বাড়ি ফিরে দেখলো, মা চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে, সারা বাড়ি লোকে ভর্তি। বাবা অফিসের জামা পরেই স্থির হয়ে বসে আছে মায়ের মাথার কাছে।
মামা বেশ জোরে জোরে বলছে, এখন আর কেঁদে কি হবে? আমার বোনটাকে তো যত্ন করলে না কোনোদিন। বাপ-মা মরা বোনটাকে তোমার হাতে দিলাম প্রমথ আর তুমি অযত্ন করে করে মেরে ফেললে মেয়েটাকে। বাবা কোনো প্রতিবাদ করেনি। শুধু স্থির হয়ে বসে একটাই কথা বললো, আমাকে অপরাধী করে গেলে শিউলি?
পদ্মাপিসি তার নিজস্ব ঢঙে বললো, দেখুন মামাবাবু, দাদাবাবু চিকিৎসার কোনো কসুর করেননি। একথা বলবেন না। এবারে হসপিটাল থেকে ফিরে অবধি বৌদিমনি বলছিল, পদ্মা, আমি আর সইতে পারি না যন্ত্রণা। মরতে চাই। নিবেদিতা বুঝেছিল, তার মা যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে সুইসাইড করেছে। ঘুমের ওষুধ খেয়েছে মা। নার্সিংহোমে নিয়ে গিয়েছিল মাকে, কিন্তু তখন মা মৃত। মায়ের গর্তে ঢোকা চোখ আর বিবর্ণ মুখের দিকে তাকিয়ে নিবেদিতা ভেবেছিল, যাক মা মুক্তি খুঁজে নিয়েছে। দিনের পর দিন এমন পাথরের মত মানুষ বাঁচবে কি করে! সেই ক্লাস ওয়ান থেকে দেখছিল, মা অসুস্থ। আর কত সহ্য করবে একটা মানুষ।
বাবার ওপরে কোনো রাগ হয়নি দিতির। চোখের সামনে দেখেছিল, বাবা সবরকম চেষ্টা করেছে মায়ের জন্য। মায়ের মৃত্যু সেভাবে রেখাপাত করেনি দিতির মনে। সত্যি বলতে কি মাকে ও সেভাবে পেলোই কোথায়। তবুও ছিল আর নেইএর মাঝে যে পার্থক্যটা সেটা অনুভব করতে পারছিল নিবেদিতা। স্কুল বেরোনোর সময়ে মা প্রতিদিন ঘর থেকেই চেঁচাত, পদ্মা, ওর পাতে ঘি দিবি, মাছটা বেছে দিবি। স্কুল বেরনোর আগে দেখা করতে গেলে রোজ দাঁত দিয়ে আঙুল কামড়ে দিতো মা।
এগুলো হয়তো তখন আরও বেশি করে মিস করতো যদি না ঋষি থাকতো ওর জীবনে।
ক্লাস টুয়েলভের শেষের দিকে বাবা একদিন একজন মহিলাকে বাড়িতে এনে পরিচয় করিয়ে দিল, এটা হলো নীলা আন্টি। তোকে খুব ভালোবাসবে। দিতির মনে পড়ে গেল মা প্রায় এর নামই করতো। মহিলাকে দেখতে ভাল। ব্যবহারও খুব মিষ্টি। দিতি কোনো রাখঢাক না করেই বলেছিল, তোমরা কি রেজিস্ট্রি করে নিয়েছ? বাবা একটু অস্বস্তি নিয়েই বলেছিল, তোর মত পেলে তবেই করবো। দিতি পরিষ্কার বলেছিল, না আমার মত নেই। আমার মা মারা গেছে এটাই আমার জন্য বেশি সম্মানের। নীলাআন্টি শান্ত ভাবে দিতির মাথায় হাত বুলিয়ে বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিল।
বাবা তারপর থেকেই আর বেশি কথাই বলতো না নিবেদিতার সঙ্গে। বিরক্তিতে ভরে উঠেছিল ওর মন।
ঠিক তখনই, আঠেরোর দোরগোড়ায় ঋষি বলেছিল, আমায় বিয়ে করবে নিবেদিতা? আমাদের দুজনের একটা ছোট্ট বাড়ি হবে। তুমি আর আমি দুজনে থাকবো সেখানে। তুমি যতদূর ইচ্ছে পড়বে, আমি পড়াবো।
মনে একটু দ্বিধা থাকলেও ওই বাড়ি থেকে বেরোতে পারবে ভেবেই ঋষির প্রস্তাবে রাজি হয়ে গিয়েছিল দিতি। বাবাকে গিয়ে বলেছিল, তুমি নীলা আন্টিকে বিয়ে করতে পারো। তবে আমি কোনদিন মা বলে ডাকবো না। বাবা নিরুত্তর ছিল।
নিজের বইপত্র, পোশাক, প্রয়োজনীয় জিনিস গুছিয়ে নিয়ে নিবেদিতা বেরিয়ে এসেছিল ভর দুপুরবেলা। পদ্মাপিসি তখন ঘুমাচ্ছিল, বাবা অফিসে। ঋষি বলেছিল, আমি শুধু তোমাকে চাই, তোমার বাবার অর্থ নয়। তাই একটা টাকাও আনবে না তুমি সঙ্গে। ঋষির এমন পাগলকরা ভালোবাসা অস্বীকার করার ক্ষমতা ওর ছিল না। নিবেদিতার মনে হয়েছিল, এত দিনে ও সুখের মুখ দেখতে চলেছে। ঋষি ওকে আগলে রাখবে প্রদীপের শিখার মত, ঋষি ওকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে বন্যার দুকূল ছাপানো নদীর মত। হাওড়া স্টেশন থেকে যখন প্রথম ঋষির হাত ধরে ট্রেনে চেপে বসেছিল, তখন মনে হয়েছিল, এই মানুষটার জন্য গোটা পৃথিবী ছাড়া যায়।
ঋষি ওকে নিয়ে গিয়েছিল ওদের হলদিয়ার বাড়িতে। ওর মা, বাবা, কাকা,বোন সকলে আদরে ভরিয়ে দিয়েছিল নিবেদিতাকে। মন্দিরে বিয়ে করে ঋষি ওকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল আদরের বন্যায়। ওর গোটা পরিবারের দিল্লি ভ্রমণের টিকিট কাটাই ছিল। বিয়ের তিনদিন পরেই গোটা বাড়ি ফাঁকা। ঋষি ওর ঠোঁটটা কামড়ে বলেছিল, আমি আজ ফাঁকা বাড়িতে বন্য জন্তু হলে তুমি রাগ করবে? দিতির গোটা গায়ে আদর মাখিয়ে জড়িয়ে ধরেছিল ঋষি।
শিউরে উঠেছিল দিতি।
কি রে, সুতো হাতে বসে রইলি কেন? গালগুলো অমন লজ্জায় লাল কেন রে? পলি হারের দুটো লক ওর হাতে তুলে দিয়ে বললো, হ্যাঁ রে নিবেদিতা, তোর বাবার ওপরে এত রাগ কেন রে? তোর বাবা রোজ ফোন করে তাও তুই ফিরে যাস না কেন রে?
নিবেদিতা হারের পিছনে লকটা টাইট করে আটকে বললো, রাগ নেই তো, ঘেন্না আছে। একরাশ ঘেন্না।
ওর গলা শুনেই হয়তো আর প্রশ্ন করার সাহস পেলো না পলি।
প্রশ্নটা প্রথম করেছিল ঋষি। দিতি, তুমি অখুশি নও তো আমায় পেয়ে? তুমি বয়েসে অনেক ছোট আমার থেকে, তাই বুঝতে পারি না তুমি কি ভাবছো! দিতি কথা না বলে ওর বুকে মুখ গুঁজেছিলো।
ঋষির সঙ্গে বেড়াতে যাবার সব ঠিক হয়ে গিয়েছিল নিবেদিতার। ঋষি বলেছিল, তিনদিন হানিমুনে কাটিয়ে তারপর কলকাতা ফিরে যাব। তখন তুমি পড়বে আর আমি চাকরি করবো।
স্বপ্ন স্বপ্ন সত্যিগুলো চোখের সামনে ঘটে চলেছিল।
নিবেদিতার সামনে তখন রামধনু সাত রঙের আঁকিবুকি। ওই বাড়ির দমবন্ধ করা পরিবেশ থেকে একরাশ মুক্ত বাতাস প্রবেশ করছিল ওর অকেজো হয়ে যাওয়া ফুসফুসে।
বড় বড় নিঃশ্বাস নিয়ে ও সবটুকু আনন্দঘন বাতাস ভরে নিচ্ছিল বুকে। ঋষির যত্নে দিতি অতিষ্ঠ হয়ে যাচ্ছিল। যেন মাটিতে পা দিলেই ফোস্কা পড়ে যাবে দিতির পায়ে। দিতি বিরক্ত হয়ে বলেছিল, উফ, এত আদরে আমি মানুষ হইনি বাপু। রেহাই দাও।
ঋষির সঙ্গে বেড়াতে যাবার প্রস্তুতি নিতে নিতে নিবেদিতা বলেছিল, মায়েরা ফেরার আগেই কি আমরা ফিরে যাব? ঋষি মুচকি হেসে বলেছিল, তুমি যা ইচ্ছে ড্রেস নাও, আমার মা খুব লিবারেল। সেটুকু অবশ্য নিবেদিতাও বুঝেছিল। নাহলে ছেলে এমন আচমকা বিয়ে করার পরেও যে মা বৌমাকে সস্নেহে মেনে নিতে পারে, সেটা ভাবাই যায় না। নিজের ভাগ্যের দিকে তাকালে ওর গর্ব হয়।
দুটো ট্রলি ব্যাগে ওদের জিনিস গুছিয়ে নিয়েছিল নিবেদিতা। হলদিয়া স্টেশনে উঠতেই একদল পুলিশ নিয়ে হাজির হয়েছিল নিবেদিতার বাবা। ঋষি চায়ের দোকানে চা খাচ্ছিল। পুলিশ দেখেই হয়তো আন্দাজ করেছিল ব্যাপারটা। তাই নিবেদিতা ঘুরে দেখেছিল, ঋষি নেই।
বাবার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দিতি বলেছিল, তুমি এখানে কেন? প্রমথ রায় বিরক্ত গলায় বলেছিল, ওই ছেলেটি অত্যন্ত খারাপ ছেলে, ওর বদ মতলব আছে দিতি। আমি খবর নিয়েই এসেছি। ফিরে চলো। রাগে গা জ্বলে গিয়েছিল দিতির। চিরটাকাল নিজেকে ভালো প্রমাণ করার লড়াই চালিয়ে যাওয়াটা যেন নেশা হয়ে গেছে বাবার। তাই অকারণে ঋষির ওপরে এত বড় বদনাম লাগিয়ে দিচ্ছে।
ঋষির আলতো ছোঁয়া এখনও লেগে আছে দিতির গোটা শরীরে। দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে দিতি বলেছিল, ঋষির নামে আর একটাও নোংরা কমেন্ট তুমি করবে না বাবা। এনাফ হয়ে গেছে। নিজে নীলাআন্টির সঙ্গে থাকো, কে বিরক্ত করতে গেছে তোমায়? আমাদের মধ্যে ঢুকবে না তুমি।
পুলিশ দুটো বলেছিল, শুনুন ম্যাডাম, আপনি যেহেতু প্রাপ্তবয়স্ক নন, তাই আমরা ওই ছেলেটিকে অ্যারেস্ট করতে পারি। নিবেদিতা বুঝেছিল, পুলিশগুলোকে বাবা সবটুকু শিখিয়ে নিয়ে এসেছে।
ঋষির ফোনে ফোন করতে গিয়ে দেখেছিল সুইচড অফ।
বাবা যেমন ছক কষে এগোচ্ছে তাতে বিনা কারণে পুলিশ ঋষিকে জেলে ভরবে সেটা বেশ বোঝা যাচ্ছে। আঠেরো বছর হতে তিনমাস বাকি ছিল নিবেদিতার। সেই জোরেই প্রমথ রায়ের সঙ্গে কলকাতা ফিরতে হয়েছিল ওকে।
বাড়ি ফিরতে নীলাআন্টি আদর করে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, প্লিজ দিতি আমার জন্য তোমার বাবাকে ভুল বুঝো না, ও তোমায় বড্ড ভালোবাসে।
দাঁতে দাঁত চেপে রাতটুকু কাটিয়েছিলো নিবেদিতা। পরের দিন ভোরেই বেরিয়ে পড়েছিল ঋষিকে খুঁজতে। ওরা যে কফিশফে, পার্কে গিয়ে বসতো, সব জায়গায় ও খুঁজেছিলো ঋষিকে। কিন্তু কেউ কোনো খোঁজ দিতে পারেনি। নিবেদিতা বেশ বুঝেছিল, ওর বাবা নিজের অর্থ আর প্রতিপত্তি খাটিয়ে হয়তো ঋষিকে কোথাও মেরেই ফেলে দিয়েছে। কিন্তু তবুও কোথাও একটা বিশ্বাস ছিল, ঋষি ঠিক খুঁজবে ওকে। তাই আজও ফোন নম্বরটা বদল করেনি। এলোমেলো পায়ে পথ চলতে চলতেই দেখা হয়েছিল নয়নতারার সঙ্গে। নয়নতারা বড় বাজারে জিনিস কিনতে গিয়েছিল। নিবেদিতার মাথাটা ঘুরছিল তখন। ওর সামনেই অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল বোধহয়। জ্ঞান ফিরতে নয়নতারা বলেছিল, বাড়ি কোথায় রে তোর? নিবেদিতা দৃঢ় স্বরে উত্তর দিয়েছিল, নেই। কোনো বাড়ি নেই ওর। নয়নতারা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল ওর বাড়িতে। বাবা খুঁজে খুঁজে একবার এসে হাজির হয়েছিল নয়নতারার বাড়িতে। ততদিনে আঠেরো বছরের সাবালিকা ও। তাই বাবার জোর খাটনি। নিবেদিতা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিল, ও যাবে না।
বলেছিল, আর যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে নিজেকে শেষ করে দেবে নিবেদিতা। বাবার চোখে ভয় দেখেছিল সেদিন। চুপচাপ ফিরে গিয়েছিল প্রমথ রায়। জিতে গিয়েছিল নিবেদিতা। জিতিয়ে দিয়েছিল ঋষির ভালোবাসাকে।
যে মানুষটা ঋষিকে সরিয়ে দিয়েছে ওর কাছ থেকে তাকে ক্ষমা করবে ও?
কেন রে সোনালী, তোর দোষটা কিসের? তোকে ক্ষমা করলো না তোর নিজের বাবা-মা?
সোনালী ব্লু কালারের সিল্ক সুতোয় গিঁট দিয়ে বললো, এ সমাজে এখনো ধর্ষকের মূল্য আছে, ধর্ষিতার নেই। ধর্ষিতা মানেই সে চরিত্রহীন। আমার নিজের বাবা বলেছিল, আমি বাড়িতে থাকলে নাকি বোনের বিয়ে দিতে পারবে না। তাই ফিরিয়ে নেয়নি বাড়িতে। মরতে গেছি বার দুয়েক। কিন্তু যমে নিলো না। বিশ্বাস কর সুধা, যারা ধর্ষণ করেছিল, তাদের আমি চিনতাম না। কলেজ থেকে ফেরার পথে রাস্তাটা একটু ফাঁকা ছিল। শীতকালে সন্ধে হয়ে গিয়েছিল। কিছু বোঝার আগেই। মা-বাবা বিষয়টা বুঝেও বাড়িতে আর ঢুকতে দেয়নি। যেন যত অপরাধ আমার! অবাক হয়ে ভেবেছিলাম, এরা সব আমার আপনজন। সুধা বিকৃত মুখ করে বললো, আমি তো আবার ভালোবেসেছিলাম গো। প্রাণ দিয়ে। তাই ঠকিয়ে পালিয়ে গেল।
নিবেদিতা নিশ্চুপ হয়ে শুনছিলো। ও জানে ঋষি ঠিক আসবেই। তিনবছর হোক আর ত্রিশ বছর পরে হোক, ঋষি ওকে খুঁজে বের করবেই। কারণ ও জানে ঋষি ওকে কতটা ভালোবাসে। ঋষির সঙ্গে ওর সম্পর্ক এক বছর বা কিছু বেশি হলেও ওরা দুজনে দুজনকে ভালোবেসেছিল নিঃস্বার্থ ভাবে। দিতির টাকার লোভে ঋষি ওকে বিয়ে করেনি।
সুধা, পলি, স্বর্ণালীর কথা শুনতে শুনতে অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছিল নিবেদিতা। আবারও ফোনটা বেজে উঠলো ওর। আননোন নম্বর দেখলেই ওর মনে হয় এটা নিশ্চয়ই ঋষি। তিনটে বছর ও অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে ঋষির জন্য। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষাটা ওর দেওয়া হয়নি। হয়নি ডাক্তার হবার স্বপ্নপূরণ, তাতেও কোনো দুঃখ নেই দিতির। ও এক পরীক্ষায় বসেছে, দীর্ঘ অপেক্ষার পরীক্ষা। দেখা যাক কে জেতে। যেদিন ঋষি ফিরে আসবে ওর কাছে সেদিন ওকে নিয়ে প্রমথ রায়ের সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলবে, দেখো, তুমি মিথ্যেবাদী। আমার ঋষি নির্দোষ।
আননোন নম্বরটা দেখেই চট করে ফোনটা রিসিভ করলো নিবেদিতা। একজন মহিলা কন্ঠ, স্থির গলায় বললো, প্রমথ রায় আপনার ফাদার? কাল রাতে আমাদের নার্সিংহোমে এডমিড করা হয়েছে ওনাকে। আপনাকে দেখতে চাইছেন। ম্যাসিভ অ্যাটাক হয়েছিল, আপাতত আউট অফ ডেঞ্জার। আপনার মা সকাল থেকেই আপনাকে বহুবার ফোনে ট্রাই করেছেন। পারলে একবার আসবেন।
দিতি....চকলেট....ঘুমের ঘোরে এই ডাকটা শুনলেই বিছানায় উঠে বসতো দিতি। বাবা ওর দুটো গালে চুমু খেয়ে ওর ছোট্ট হাতের মধ্যে বড় চকলেটটা দিয়ে বলতো, ঘুমিয়ে পড় আমার প্রিন্সেস।
ডাকটা আবার বহুদিন পরে শুনতে পেল দিতি। ফোনটা কেটে দিয়ে শক্ত হয়ে বসে রইল। না যাবে না ও বাবাকে দেখতে।
টিভিতে এই সময় খবর দেখাটা নয়নতারার নেশা। জোরে সাউন্ড দিয়ে টিভিটা চালিয়ে বসলো। ওদের ইচ্ছে না থাকলেও নিউজ শুনতেই হবে ওদের। পলি মুখ বেঁকিয়ে বললো, উফ, একদিনও মিস করে না বাপু।
সুধা হঠাৎ আর্তনাদ করে উঠলো, ওই দেখো, ওই দেখো, ওই তো সুগতর মা, বোন। এরাই তো আমায় বেচে দিয়েছিল। আমি পালিয়ে এসেছিলাম।
নিঃস্পৃহ ভাবে তাকালো দিতি। চোখের সামনে ঋষির মা আর বোন। দিল্লি থেকে ধরা হয়েছে মেয়ে পাচারকারী চক্রের দুজন মহিলাকে। বাকিদের তল্লাশি চলছে। স্থবির হয়ে টিভির দিকে তাকিয়ে আছে নিবেদিতা। মনে পড়ে গেলো নতুন বউ হয়ে ঋষিদের বাড়িতে ঢোকার মুহূর্তটা। এই মহিলাই ওকে মুখে মিষ্টি খাইয়ে, বরণ করেছিল।
এই মহিলার আসল নাম সবিতা চতুর্বেদী। ঋষিরা তার মানে বসু নয়। এদের পাঁচজনের একটা চক্র আছে। নিবেদিতা সুধার সামনে ঋষির ছবিটা ধরে বললো, চেনো? সুধা ঝাঁপিয়ে পড়ে ফোনটা নিয়ে বললো, সুগত, এ তো সুগত চক্রবর্তী। তুমি কি করে চিনলে? আমায় বিয়ে করে বেচে দিয়েছিল।
নিবেদিতা ধীর পায়ে নিজের ঘরে গিয়ে পোশাক বদলে নিলো। নয়নতারাকে বললো, আমার বাবার শরীর খারাপ, তাই আমি আর ফিরবো না।
সকলকে চমকে দিয়ে বেরিয়ে এলো হোম থেকে।
বাবার ফোনে ফোন করতেই নীলা আন্টি ফোনটা রিসিভ করলো। নার্সিংহোমের অ্যাড্রেসটা চেয়ে নিলো দিতি।
কেবিনে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মুখে বসে আছে নীলাআন্টি।
নিবেদিতা হালকা স্বরে বললো, বাবা এখন কেমন আছে? নীলাআন্টি সাবধানে বললো, তোমায় দেখতে চাইছে শুধু। আমাকে বারবার রিকোয়েস্ট করছে তোমায় যেন একবার নিয়ে আসি।
বাবা চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। ঝুলপির চুলে সিলভার লাইন। নিবেদিতা অপলক তাকিয়ে দেখলো বাবার দিকে। সত্যিই তো, কি পেল মানুষটা গোটা জীবনটাতে! অসুস্থ স্ত্রীর সেবা করার পরেও ভর্ৎসনা, মেয়েকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসার পরেও তিরস্কার, একমাত্র নীলাআন্টিই ছিল এই দুঃসময়ে বাবার সঙ্গে।
কপালে হাতটা রাখতেই বাবা চোখ মেলে তাকালো। খুব ক্ষীণ স্বরে বললো, ওরা মেয়ে পাচারের চক্র ছিল। আমায় পুলিশ বলেছিল। আমি তোর থেকে ঋষিকে আলাদা করিনি।
নিবেদিতা শান্ত স্বরে বললো, আমি আবার পড়াশোনাটা শুরু করতে চাই। নীলাআন্টি অসহায় গলায় বললো, তুমি ফিরে এসো নিবেদিতা। আমি চলে যাব তোমাদের বাড়ি থেকে।
বাবার চোখের কোণে জল। দিতি বললো, আমরা তিনজনে এবার থেকে একসঙ্গে থাকবো বাবা। নার্স এসে ধমক দিয়ে গেলেন, রোগীর সামনে এত কথা না বলতে বলে গেলেন।
বাবা অস্থিরভাবে বললো, নীলা, আমি ভালো হয়ে গেছি। আমাকে রিলিজ কবে করবে? দিতি ফিরে এসেছে, আমি এখন সুস্থ। নিবেদিতা চোখ পাকিয়ে বললো, চুপটি করে শুয়ে থাকো। সুস্থ হলে আমরা তোমায় বাড়ি নিয়ে যাবো। নীলাআন্টি কৃতজ্ঞতার চোখে তাকিয়ে বললো, কদিন দেখো দিতি, আমি মানুষটা তেমন খারাপ নই।
দিতির খুব ইচ্ছে হচ্ছিল নীলাআন্টিকে মা বলে ডাকতে, কিন্তু নিজেকে সম্বরন করে বললো, আমিই একজন মুখোশধারীকে বিশ্বাস করেছিলাম, তোমরা কেউ দোষী নও।
নীলাআন্টি দিতির মাথায় হাত বুলিয়ে বললো, ভুল না করলে ঠিকটা শিখবে কি করে? অতীতের কথা না ভেবে সামনের দিকে তাকাও দিতি।
বহুদিন পরে আবার দিতির দু চোখ ছাপিয়ে জল নামলো। তিনটে বছরের জমে থাকা বরফ গলছে।
বাবার সেই আদুরে ডাকটা আবার শুনতে পেলো দিতি, মাই প্রিন্সেস।
রাকেশ ঘোষাল
Comments
Post a Comment