প্রতিদ্বন্দ্বী
না, কিছুতেই রাতুলকে ছুঁতে পারলো না অংশু। বছরের প্রথম থেকে পড়াশোনা করেও রাতুলের থেকে সাত নম্বর কম! সামনে হাসিমুখে থাকলেও ভিতরে ভিতরে কষ্টটা রক্তক্ষরণ করেই চলেছে। রাতুল আর ও ক্লাস ফাইভ থেকে একই স্কুলে আর একই ক্লাসে পড়েছে। সারাজীবন রাতুল অংশুকে পাঁচ-ছয় নম্বরের পার্থক্য করে বেরিয়ে যায়। ঐ পাঁচ-ছয় নম্বরের সেতুটাকে কোনোদিন হাজার চেষ্টা করেও পেরতে পারে না অংশু। এই ব্যবধানটুকু খুব সযত্নে লালিত হয় দুই বন্ধুর রেজাল্টে।
অংশুর বাবা নাম করা কার্ডিওলজিস্ট। একমাত্র সন্তান অংশুকে নিয়ে তাদের বিরাট স্বপ্ন। রাতুল একজন ছাপোষা কেরানীর ছেলে হয়ে অংশুকে প্রতিবার সেকেন্ড করে দেয় এটা মেনে নিতে একটু অসুবিধা হয় অংশুর ডাক্তার বাবার।
রাতুল কিন্তু কোনোদিন অংশুর অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগে না। অংশু তার সব থেকে প্রিয় বন্ধু। অংশুকে সে সমস্ত রকম উপকার করতে রাজি। আর রাতুলের এই উদারতা কোথাও যেন বাধা হয়ে দাঁড়ায় অংশুর শত্রুতা করার ইচ্ছেয়।
এভাবেই চলছিল .....
সমস্যাটা তৈরি হলো জয়েন্টের ঠিক আগে। অংশু একটা নামী সংস্থায় কোচিং নিতে শুরু করলো। যার মাসিক মাইনে প্রায় আট হাজার। ডাক্তারিতে চান্স পেতেই হবে।
না, এত বেশি দিয়ে কোচিংয়ের ক্ষমতা রাতুলের নেই। রাতুলের একটা ছোট বোনও আছে যে এবারে ক্লাস এইটে পড়ে। তার খরচ চালিয়ে বাবার পক্ষে এত খরচ করা সম্ভব নয়। তাছাড়া অংশু যখন ভর্তি হয়েছে তখন সমস্ত সাজেশন তো ও রাতুলকে দেবেই।
ভুলটা রাতুল তখনই করেছিল অংশুকে বন্ধু ভেবে। অংশু পরিষ্কার ভাষায় বলেছিলো, রাতুল! নিজের ক্ষমতা অনুযায়ী স্বপ্ন দেখা ভালো।
অংশুর কথাটা রাতুল একা শোনেনি, শুনেছিল আরেকজন ....সেটা সঞ্চারী।
পরেরদিন সকালে রাতুলদের বাড়ির বাইরে একজন কুরিয়ারের লোক এক বান্ডিল ঐ কোচিং সংস্থার কোশ্চেন, আনসার নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। রাতুল সই করে সেগুলো নিয়েই বুঝলো, সামনে লজ্জায় আর দিতে পারেনি বলে অংশুই বেনামে ওগুলো পাঠিয়েছে ।
সপ্তাহে একদিন কুরিয়ারের লোকটি আসতো রাতুলদের বাড়িতে। জয়েন্টের দিন ক্রমশ এগিয়ে আসছে।
সঞ্চারীর একটাই স্বপ্ন রাতুল কুড়ির মধ্যে র্যাঙ্ক করুক। সেদিন অংশুর কথায় রাতুলের বেদনা বিধুর চোখ দুটো গাছের আড়াল থেকে সঞ্চারী দেখেছিল।
সঞ্চারীর প্রতি অংশুর একটা দুর্বলতা আছে এটা কোচিংয়ের সবাই বোঝে। রাতুলের সাথে সঞ্চারীর পরিচয় হয়েছিল ওদের কমন ফ্রেন্ড ভ্রমরের বার্থ ডে পার্টিতে। রাতুলকে প্রথম দেখেই সঞ্চারীর মনে হয়েছিল, এ যেন সবার মত দলে মিশে যাওয়া পাবলিক নয়। হাজার ভিড়েও একে আলাদা করে চেনা যায়। সঞ্চারী নিজেই গিয়ে আলাপ করেছিল রাতুলের সাথে। রাতুল মাঝে মাঝে একটু অন্যমনস্ক হয়ে যায়। ওর গভীর চোখের দৃষ্টি হারিয়ে যায় সুদূরের প্রান্তরে। কল্পনা থেকে ফিরে এসে সঞ্চারীকে প্রশ্ন করেছিল, তুমি মহাভারত পড়েছো ? মহাভারতের কর্ণর জন্য কখনো কেঁদেছো? শুধু সাধারণ মানুষ নয়, রাজারাও বঞ্চিত হয়েছিল।
অদ্ভুত অদ্ভুত প্রশ্ন করে ছেলেটা ...
অংশুর মত অহংকারী নয়। নিজের এতো ভালো রেজাল্ট নিয়ে গর্বিতও নয় । সঞ্চারীর খুব ইচ্ছে ছিলো রাতুল মেডিক্যালের কোচিংয়ে ওদের সাথেই ভর্তি হোক। কিন্তু ....
পরীক্ষাটা ওদের হয়েই গেলো। আপাতত হাতে অখন্ড অবসর। সঞ্চারীর একটু গল্পের বইএর নেশা। সেদিনও আকাশ কালো করে মেঘ করেছে দেখে মা বারণ করলো লাইব্রেরিতে বই বদল করতে যেতে। ঝড় উঠবে কি উঠবে না ভেবেই সাইকেলটা নিয়ে বেরুলো সঞ্চারী। লাইব্রেরিতে ঢোকার আগেই কালবৈশাখী তার আধিপত্য বিস্তার করলো চারপাশে।কোনোমতে একটা চায়ের দোকানের শেড দেখে দাঁড়িয়ে পড়লো ও।
পাশে তাকাতেই একটা পরিচিত মুখের হাসি।
ঝড়ে পড়লে তো ?
রাতুলকে দেখে সঞ্চারীর মনে হলো ...ভাগ্যিস ঝড়টা ওর মনের কথা শুনতে পেয়েছিল !!
এলোপাথাড়ি শুকনো হাওয়ায় আলোথালো হচ্ছে সঞ্চারীর শ্যাম্পু করা রেশমী চুল। মাঝে মাঝে কাছে দাঁড়িয়ে থাকা রাতুলের মুখে এসে ঝাপটা দিচ্ছে। কিছু খরকুটো উড়ে এসে পড়ছে ওদের দুজনের মাঝে। উড়ে আসা সঞ্চারীর গোলাপী ওড়না এখন রাতুলের গোটা মুখকে আদর করছে সযত্নে।
সঞ্চারী লজ্জা পেয়ে টেনে নিল নিজের ওড়নাটা।ঝড় থামতেই শুরু হলো বৃষ্টি। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো টুপ টুপ আওয়াজ করছে চায়ের দোকানের টিনের চালে। নিশ্চুপ দুটো মুখের মনের কথা আদান প্রদানের চেষ্টা চালাচ্ছে যেন।
বৃষ্টি একটু কমতেই লাইব্রেরির বদলে নিজেদের বাড়ির দিকে চললো দুটো সাইকেল ...
পাশাপাশি।
রাতুলই প্রথম নিস্তব্ধতা ভেঙে বলে উঠলো ...একটা সত্যি কথা বলবে?
সঞ্চারী বুঝলো, ওর চুরি ধরা পড়ে গেছে।
আমাকে ঐ কোচিংয়ের নোটগুলো অংশু পাঠাতো না। আমি বুঝেছি। অংশুর হাতের লেখা আমার পরিচিত। নোটের এক কোনে মেয়েলী হাতের লেখায় রাতুল লেখাটা কার?
সঞ্চারী বললো, বৃষ্টি থেমে গেছে, আমি চললাম।
সঞ্চারী পিছন ফিরলে দেখতে পেত ডুব সূর্যের আলোয় রাতুলের মুখে বিশ্ব জয়ের হাসিটা।
রাতুল মেডিক্যালে 14th রাঙ্ক করেছে। অংশু 98। সঞ্চারীও চান্স পেয়েছে মেডিক্যালে।
রেজাল্ট আউটের পর সঞ্চারী এক মুখ হেসে বলেছিলো, আমি জানতাম, রাতুল ভিড়ে মিশে যাবে না।
রাতুলকে হারাতে না পারার আক্রোশে আর সঞ্চারীকে না পাওয়ার ক্রোধে অংশু সেদিন বিদ্ধস্ত।
রাতুলের মা পায়েস বানিয়েছিল। মায়ের হাতের পায়েস একটু সঞ্চারীকে খাওয়ানোর ইচ্ছে ছিলো রাতুলের। টিফিন কৌটো করে পায়েস নিয়ে সঞ্চারীর সাথে দেখা করার জন্য বেরুলো রাতুল। ফোনে সঞ্চারী বলেছিলো, বিকেল সাড়ে পাঁচটা ...মিলন কেবিন ।
মিলন কেবিন হলো মধ্যবিত্তের পার্ক হোটেল।
এখানে পঁচিশ টাকায় মোগলাই আর ত্রিশ টাকায় চিকেন রোল পাওয়া যায়।
ওদের আসার আগেই সেদিন সেখানে আরেকজন পৌঁছে গিয়েছিলো। সেটা অংশু।
বন্ধুদের সাথে সেলিব্রেটের ইচ্ছেয় নাকি রাতুল-সঞ্চারীর সম্পর্কটা হাতে নাতে প্রমান করে ওদের অপদস্ত করার জন্য সেটা বোঝা যায় না।
সঞ্চারীর জন্য আনা পায়েসে ভাগ বসিয়েছিল অংশু। নিজেও টিফিন কৌটো থেকে বের করেছিল চিলি চিকেন। ওটা নাকি স্পেশালি রাতুলের ভালো রেজাল্টের জন্য।
সঞ্চারী বা অন্যরা খেতে চাইলেও দেয়নি অংশু।
সঞ্চারীর খুব ভালো লেগেছিল ওদের বন্ধুত্বটা আবার ঠিক হয়ে যাচ্ছে দেখে।
সবাই মিলে আনন্দ করে বাড়ি ফেরার পথেই ঘটলো অঘটনটা। রাতুল পেটের অসহ্য যন্ত্রনায় মাটিতে বসে পড়লো।সঞ্চারী ফোন করে পরিচিত এম্বুলেন্স ডাকলো।
ধারেপাশে আর অংশু নেই।
রাতের দিকে যখন রাতুলের জ্ঞান ফিরলো, তখন ওর সামনে একজন পুলিশ অফিসার দাঁড়িয়ে আছেন ।সঞ্চারী ও অন্য বন্ধুদের বয়ান দেওয়া হয় গেছে, শুধু রাতুলের বয়ান পেলেই এরেস্ট হবে অংশু।
ওর পাকস্থলীতে ইঁদুর মারা বিষের অনেকটা পাওয়া গেছে।
রাতুল অবলীলায় বললো, অংশু নির্দোষ। ও নিজেই ভুল করে খেয়ে ফেলেছে। সঞ্চারীর শত বোঝানো সত্ত্বেও অংশুর এগেন্সটে কোনো শব্দ বললো না রাতুল।
ভোরের আলো চোখে পরতেই ঘুমটা ভেঙে গেল রাতুলের।
মুখটা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে অংশু। এখন কি ভাবে নার্সিংহোমে ঢুকলো? ভাবতে ভাবতেই অংশু বললো, বাবা ফোন করে দিয়েছিলো নার্সিংহোমের মালিককে তাই ..
আর কথা বলতে পারল না অংশু। চোখ দিয়ে অনবরত নোনতা জল এসে পড়ছে ওর গালে। রাতুল হাত বাড়িয়ে বন্ধুর হাতটা ধরে বলল, আমরা মানুষকে প্রাণ ফিরিয়ে দেবার ব্রত নিয়ে ডাক্তারী পড়তে শুরু করবো অংশু।
অংশু বললো ,আমি তোকে মারতে চাইনি, শুধু হিংসে আর রাগ ....
রাতুল হেসে বললো, আমি তো মরিনি রে। আবার আমরা একসাথে ক্যাম্পাসে হাত ধরে ঢুকবো।
সঞ্চারী ঠিকই বলে, রাতুল জনসমুদ্রে হারিয়ে যায় না, মেলার ভিড়েও ওকে পৃথক করে চেনা যায়। একঠোঙা জিলিপি নিয়ে রাস্তার ছেলেটার মুখের হাসিটাকে চুরি করে রাতুল।
রাকেশ ঘোষাল
Comments
Post a Comment