সহযাত্রী


আরে,আরে ঐ তো ট্রেন দিয়ে দিয়েছে,চলো চলো! 

ও বৌদি এদিকে আসুন,দিন আপনার সুটকেসটা আমি নিচ্ছি,সীমা তুমি মেয়েকে নিয়ে ওঠো।এই শম্পা তুই কাকিমার সাথে থাকবি! 

বলতে বলতে অরুণ কাকু দৌড়ল স্তূপাকৃতি মালের দিকে।

     বাবার অফিসের সহকর্মী দের সাথে সিমলা যাত্রা! সকাল নটার হাওড়া স্টেশনে ব্যস্ততার শেষ নেই!বড়ো ঘড়ির নীচে সকলের মীট করার কথা ছিল ।মোট পাঁচটা পরিবারের একসাথে ভ্রমণ।

শম্পার মা ,অর্থাৎ অরুণকাকুর বৌদি ব্যস্তবাগীশ মানুষ ,পাছে ট্রেন মিস হয় তাই সময়ের ঘণ্টা খানেক আগেই সকলকে তাড়া দিয়ে  স্টেশনে এসে হাজির।

অরুণ কাকু,সীমা কাকিমাও মেয়ে নিয়ে গড়িয়া থেকে এসে পড়েছে ।

সকলের পাহাড় প্রমাণ মাল ট্রেনে তুলে দিয়ে তবে অরুণকাকুর স্বস্তি।সে এই দলের কর্তাদের  মধ্যে বয়েসে সবচেয়ে ছোট ।দায়িত্ব তার ই বেশী।

সকলের সিট একসাথে পড়ে নি।শেষ মুহুর্তে টিকিট কাটা ।ছিটকে ছাটকে সিট পড়েছে ।

কারুর কারুর এস থ্রী তো বাকিদের এস ফোর।

সকলে যে যার জায়গায় বসার পর অষ্টাদশী শম্পা দেখল তার সিট মা,বাবা বোনের সাথে পড়ে নি,অরুণকাকুদের সাথে পড়েছে  ।মনে মনে খুশী ই হলো সে,যাক বাবা !অষ্টপ্রহর মায়ের কড়া নজরদারী থেকে সাময়িক মুক্তি! অপালা একটু অরাজী ছিলেন মেয়েকে কাছছাড়া করতে,কিন্তু অরুণ ফুৎকারে উড়িয়ে দিলেন!  --''আচ্ছা,বৌদি,মেয়ে কি শুধু আপনার একার,আমি ওর কাকা নই?আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন,মেয়ে সীমার সাথে থাকবে'।

       এরপরে আর কথা চলে না! তবুও মেয়েকে বার কয়েক সাবধান করে দিলেন,'একা কোথাও যাবি না'!! 

  সঙ্গে করে বিপুল খাবার আনা হয়েছিল,একেকজন একেকরকম।ভাত,মাছের ঝোল,লুচি,আলুর দম, মাংস ,মিষ্টি র সম্ভার দেখে মনে হচ্ছিল ট্রেন সুদ্ধু লোককে খাওয়ান যাবে ।লুচি আলুরদমের সদ্ব্যবহার আগেই হয়ে গিয়েছিল।দুপুরের খাবারের সময় সবাই আবার  একজায়গায় জড়ো হল।তারপর যে যার জায়গায় চলে গেল ।

শম্পাও এতক্ষণে সদ্য কেনা ম্যাগাজিনে মন দিল।

এমন সময় ওপরের ব্যাঙ্ক থেকে একটি অল্পবযেসী যুবক নীচে নামতেই তাকে দেখে শম্পা হাঁ!অবিকল অনিল কপুরের মত দেখতে,সীমা কাকিমা ও ছেলেটির দিকে তাকিয়ে! ছেলেটা হাওড়া থেকেই উঠেছে কিন্তু এতক্ষণ তাদের পুরো দল এইখানেই কলকল করছিল বলে বোধহয় নজরেই পড়েনি।

ছেলেটা বাথরুমের দিকে যেতেই শম্পা আর সীমা কাকিমা একসাথে বলে উঠল,'পুরো অনিল কাপুর'!!

ফিরে এসে ছেলেটা নীচেই বসল,তার লাঞ্চ প্যানট্রী থেকে এল,খেয়ে নিয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে হাসল।

সীমা নীরবতা ভাঙলো ! 'আপনি বাঙালী'? 

ছেলেটি ঘাড় নাড়ল।  'না,তবে চাকরি করি কলকাতায় বাংলা ভালই বুঝি।আমি পটনার ছেলে'।

 সীমা মুখর হলো,'আপনাকে অবিকল'...

ছেলেটা সশব্দে হেসে উঠল! -'অনিল কপুরের মতো দেখতে ,তাই তো'? 

শম্পা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল।এমনিতেই আঠারো বছর বয়েসে মানুষ একটু বেশীই বিস্মিত হয়,তার ওপরে স্বপ্নের নায়কের চেহারা নিয়ে কেউ যদি পাশে এসে বসে ,হেসে কথা বলে,তখন সে অভিভূত না হয়ে পারে কি!শম্পার মুগ্ধ দৃষ্টি ছেলেটির চোখ এড়ায় নি।সে ও তার সুন্দরী সহযাত্রীনীর মুগ্ধতা উপভোগ করছিল।আলাপ জমে উঠতে দেরী হলো না।হাতের বই হাতেই রইল।গল্প চলতে থাকল।কখন যে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেছে তা কারুর ই খেয়াল রইল না।

সীমার বয়েস বেশী নয়,বিয়ে হয়ে একটি সন্তানের মা হয়ে গেলেও ভিতরের রোম্যান্সটা এখনো মরে নি।এই দুই অল্পবযেসী ছেলে মেয়ের সাথে সেও মেমরি গেম ,গানের লড়াই এসব খেলতে লাগল।

শম্পার মা বাবা এই কামরাতে থাকলে যে এই আলাপচারিতা ব্যহত হতো সেকথা বলাই বাহুল্য।

শম্পার বাবা একবার এসে মেয়েকে দেখে গেছেন,মা কোমরের ব্যথায় কাবু,নিজে আসেন নি,কর্তা কে পাঠিয়েছেন।ছেলেটি ঐ সময় টুকু নীরবে কাগজ পড়ে কাটাল ।শম্পার বাবা চলে আবার যেতেই গল্প শুরু।

এর মধ্যেই ছেলেটির সব খবর শম্পার জানা হয়ে গেছে।ছেলেটি বিহারী ব্রাহ্মণ ,কলকাতায় ব্যাঙ্কে চাকরি করে।মা বাবা ভাই বোন পটনায়।নানী অসুস্থ তাই সে দুদিনের জন্য দেশে চলেছে।

শম্পা র কথাও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জেনে নিল অমিত! অনিল কপুরের সাথে নামেও বেশ মিল।

রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়ল,এই দুজন কিন্তু বিনিদ্র।ছেলেটি আর শম্পা দুজনেই ওপরের বাঙ্কে শুয়েছে।মুখোমুখি তারা একে অপরের দিকে চেয়ে রইল।কত কথা চার চোখে।

একেই কি প্রেম বলে!

কি ভালো হতো যদি এই নীলাভ দুলুনিময় যাত্রা  সারাজীবন চলত!

পরদিন একটু বেলাতেই শম্পার ঘুম ভাঙলো ।তাকিয়ে দেখল, উল্টদিকে র বাঙ্ক শূন্য।

নীচে নেমে হাত মুখ ধুয়ে বসল।অমিত কোথাও নেই।কাকিমা ওর দিকে তাকিয়ে হাসল,-'কাকে খুঁজছিস'?

লজ্জা পেল শম্পা! -কাকে আবার খুঁজব!!

বলতে বলতেই শালপাতায় কচুরি তরকারি নিয়ে অমিত হাজির।

'---'আপ কি সেবা মে,ধরুন ,ধরুন !ঠান্ডা হয়ে যাবে'!

কাকিমার আপত্তি ধোপে টিকলো না,অরুণকাকু তাস খেলতে পাশের কামরায় ।অতএব আবার সেই তিনজনের গল্প জমে উঠল।কাকিমা সন্দেশ বার করল।তখন এত অবিশ্বাস ছিল না মানুষের মনে,সবাই খাবার ভাগ করেই খেত।

কাকিমা মেয়ে কে নিয়ে হাত ধুতে যেতেই,অমিত একটা  নিজের ফোন নম্বর আর ঠিকানা লেখা একটা কাগজ শম্পার হাতে গুজে দিল।শম্পাদের ফোন ছিল না,তাই শুধু ঠিকানা টা বুঝিয়ে বলার আগেই কাকিমা এসে পড়ল।

পরের স্টেশন এ অমিত নেমে যাবে ।শম্পার মন ভারী হয়ে আছে।অমিত ও অন্যমনস্ক।

অনেক কথাই না বলা রয়ে গেল,নামার আগে এক ফাঁকে সকলের কান বাঁচিয়ে অমিত বলল,কলকাতায় ফিরে এই নম্বরে ফোন করো।

 স্টেশনে নেমেও সে চলে গেল না,জানলার কাছে এসে দাঁড়ালো।যতক্ষণ না ট্রেন ছাড়লো সে দাঁড়িয়েই রইল।ট্রেন টা হুইশেল বাজিয়ে ছেড়ে দেবার মুহুর্তে জানলার রডে রাখা শম্পার কোমল হাতে মৃদু চাপ দিয়ে দূরে সরে গেল অমিত।

শম্পার চোখটা জ্বালা করে উঠলো! সীমা বলল,'বাবা! তোকে ছেড়ে তো যেতেই পারছিল না রে! কি ভালো হতো যদি ছেলেটা বাঙালী হতো'! 

আরো কি সব কলকল করে বলে যাচ্ছিল সীমা,শম্পার কানে কিছুই ঢুকছিল না।


সেবার সমস্ত বেড়ানোটা কেমন ঘোরের মধ্যে কেটে গেল ।শম্পার মন শুধু উন্মুখ হয়ে রইল একটা কাগজে লেখা কয়েকটা নম্বরের ওপারের কন্ঠস্বরের জন্য!


কলকাতা ফিরে গিয়েই শম্পার জ্বর এল! সাতদিন ভুগে কাহিল হয়ে পড়ল মেয়েটা ।যেদিন জ্বর ছাড়লো তার পরেরদিন ই ক্লাস কামাইয়ের অজুহাতে কলেজে ছুটল শম্পা।দুপুর নাগাদ অফ পিরিয়ডে পাশের ফোনবুথে ঢুকল ! নিজের হার্টবীট নিজেই শুনতে পাচ্ছিল সে! 

নম্বর টা কাঁপা কাঁপা হাতে ডায়াল করল,রিং হচ্ছে।

ওপাশে একজন মহিলা ফোন ধরলেন,তাঁকে অমিতের কথা জিগ্গেস করতে তিনি বল্লেন,"সেতো এখন এখানে নেই,দেশে গেছে"! 

 এরপরে আরো দুদিন ফোন করে এক ই উত্তর পেল শম্পা।

 দিন সাতেক বাদে আবার যেদিন ফোন করল সেদিন শুনল অমিতের নাকি বিয়ে,তাই সে দেশে গেছে।

শম্পার মনে হল তার চেয়ে বোকা মেয়ে আর কেউ নেই জগতে,পথের আলাপ ,আর অচেনা মানুষের দেওয়া কথাকে কেউ এত গুরুত্ব দেয়!

কদিন সে মনমরা হয়ে রইল,তারপর আস্তে আস্তে জীবনের ছন্দে ফিরল ঠিক ই,কিন্তু প্রথম প্রেমের স্মৃতি টুকু সোনার কৌটো করে মনের ভেতরে সযত্নে রেখে দিল।

কেটে গেল অনেকগুলো বছর!


পড়াশোনা শেষ করে চাকরি পাওয়ার সাথে সাথেই বিয়ে হয়ে গেল শম্পার,বাবা মায়ের পছন্দ করা পাত্রের সাথে।না! প্রেমের প্রস্তাব এলেও তাকে আর আমল দেয় নি সে! 

তার বর খুব ভালো,বিচক্ষণ,

সংসারী,কর্তব্যপরায়ণ!কিন্তু একেবারেই রোমান্টিক নয়।কিসের যেন অভাব একটা!

রবীন্দ্র সঙ্গীত ভালোবাসে না,গানের

 লড়াই খেলার কথা তো ভাবতেও পারে না!

বছরে দুবার বৌ কে নিয়ে বেড়াতে যায়,বিবাহবার্ষিকীতে উপহার ও দেয়,কিন্তু কিসের যেন শূন্যতা!

কি জানি,এ হয়তো তার দুঃখবিলাস।

তার তো এখন স্বামী সন্তান নিয়ে পরিপুর্ণ জীবন।তবুও কিসের এই অভাববোধ! কেউb যদি তার গালের টোলটার আলাদা করে প্রশংসা না করে,তবে কি তাকে দোষ দেওয়া যায়!


সেবার পুজোর ছুটিতে প্লেনের টিকিট পাওয়া গেল না,অনেকদিন পর ট্রেনে করে  ভ্রমণ।দিল্লী আগ্রা ট্রিপ! শম্পার ব্যস্ত বরের ভুরুতে ভাঁজ,শম্পা কিন্তু ট্রেনে যাবে শুনে বেজায় খুশী।

রাজধানী তে খাবার দেয়,তবু শম্পা সঙ্গে একটু লুচি তরকারি মিষ্টি নিল।বর যদিও বলল,এসব সে খাবে না,তবুও নিল।দূর,গাড়ির খাবার তার ভালো লাগে না।

ট্রেনে গুছিয়ে বসতেই এক অবাঙালী ভদ্রমহিলা আর তার বাচ্চার দিকে নজর পড়ল,ভারী মিষ্টি c  মেয়েটা ! কর্তা টি কে দেখা গেল না,তিনি কি কিনতে গেছেন ।তার ও নাকি ট্রেনের খাবার পছন্দ নয়।ট্রেন ছাড়ার ঠিক আগে হাতে করে একরাশ খাবার নিয়ে ভদ্রলোক উঠলেন,এসে গিন্নীর সামনে দাড়িয়ে বল্লেন,"আপ কি সেবা মে"!

চমকে তাকাল শম্পা! এই স্বর তার চেনা,বহুদিন আগে শোনা ভুলে যাওয়া গানের কলির মতো লাগল।

না !কোনো ভুল নেই।মাথার চুল পাতলা হয়ে গেছে।ঈষৎ মোটা হলে ও মুখ টা সেই অনিল কপুরের মতই আছে।

নয় বছরের অদর্শন সেই মুখ কে ভোলাতে পারে নি!

অমিত শম্পা কে দেখেছে,চিনেছে কিনা বোঝা গেল না।ওরাও দিল্লী যাচ্ছে।অমিত এখন ওখানেই কাজ করে।কলকাতা য় মহিলার বাপের বাড়ি ।

এরপর আর কথা বেশীদূর এগোয় নি।


অমিত বেশির ভাগ সময় কুপের বাইরেই ছিল ।পরদিন ভোরে শম্পা টয়লেটের দিকে যাবার সময় মুখোমুখি দেখা! অমিত কিছু বলতে চাইল,শম্পা পাশ কাটিয়ে চলে গেল!কি ই বা শোনার আছে!বলার ও কিছুই নেই!


রাকেশ ঘোষাল

Comments

Popular posts from this blog

গ্রীষ্মের_ছুটিতে ছাত্রের লেখা খোলা চিঠি