চাবুক


ফোন খুলে বারবার মেসেজটা পড়ছিল আত্রেয়ী।আর যতবার পড়ছিল ততবার তার চোখ ভিজে উঠছিল জলে।

'আত্রেয়ী আই ওয়ান্ট টু ব্রেক আপ।আমার পক্ষে আর এই রিলেশনে থাকা সম্ভব হবে না।'

দু লাইনের এই মেসেজটা এক ধাক্কায় আত্রেয়ীর সব স্বপ্নগুলোকে তছনছ করে দিল যেন।কোনো রকমে নিজেকে সামলে কাঁপা হাতে ফোনটা নিয়ে সে কল করল অঙ্কুশকে।প্রথম দু বার রিং হয়ে হয়ে কেটে গেল।তৃতীয় বারে ফোনটা ধরল অঙ্কুশ।

-'হ‍্যালো অঙ্কুশ দা!'

-'হুম'

-'এটা তুমি কী মেসেজ পাঠিয়েছো!রিলেশন রাখবে না মানে?!'

-'রিলেশন রাখব না মানে রিলেশন রাখব না!'

-'কিন্তু কেন?হঠাৎ কি হল!!প্লিজ এরকম করো না!আমার খুব কষ্ট হচ্ছে!'

-'তুই কি চাস জোর করে এই রিলেশনটা আমি কন্টিনিউ করি?'

-'এখানে জোর করার ব‍্যাপার আসছে কেন!তুমিও তো আমাকে ভালোবাসো!বলো না গো কি হয়েছে?আমি কি এমন কিছু করে ফেলেছি যেটাতে তুমি খুব হার্ট হয়েছো?বলো না প্লিজ!'

-'দেখ আত্রেয়ী,খুব সমস্যার মধ্যে আছি আমি।এর মধ্যে মা একদিন তোকে আর আমাকে একসাথে দেখে ফেলেছিল।তারপর থেকে মা আমার সঙ্গে ভালো মতো কথাটুকুও বলছে না।'

-'কেন?!'

-'কেন মানে?!!আমি তো তোকে আগেই বলেছিলাম আত্রেয়ী।মা-বাবাকে সঠিক সময় এলে বোঝাব আমি।কিন্তু তার আগেই মা দেখে নিল তোকে।আর খুব স্বাভাবিক ভাবেই তোর চাপা গায়ের রঙ আর তোর মুখশ্রী মায়ের একেবারেই পছন্দ হয়নি।'

-'অঙ্কুশদা!'

-'আরেকটা কথা বলতে চাই আমি।তোর সাথে রিলেশনে আসার পর থেকেই বন্ধুদের অনেক টোন-টিটকিরি সহ‍্য করতে হয়েছে আমাকে।সবাই হাসে আর বলে আমার মতো একটা ছেলের তোর মতো একটা মেয়েকে পছন্দ হয় কী করে!মা-ও বলেছে তোকে বিয়ে করলে সেটা আমার জীবনের সবথেকে বড় ভুল হবে।তোর গায়ের রঙের জন‍্য আমাদের পরিবারে কেউই তোকে মেনে নেবে না।সেটা আগেই বুঝেছিলাম।কিন্তু ভেবেছিলাম কোনোভাবে রাজি করাবো।তবে এখন বুঝতে পারছি এতজনের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে তোর সঙ্গে রিলেশন রেখে খুশি হতে পারব না আমি!'

-'কিন্তু তুমি তো সবটা জেনেই এগিয়েছিলে!ভালোবেসেছিলে আমাকে!আজ তাহলে..'

-'অনেকদিন ধরেই তোকে আভাসে ইঙ্গিতে আমি বোঝাতে চেয়েছিলাম যে আমি তোর সঙ্গে হ‍্যাপি নই।কিন্তু তুই কিছুই বুঝতে চাস না।তাই স‍রাসরি বলতে হল আমাকে।আজকের পর থেকে আমাকে আর ফোন করিস না।'

-'আমার গায়ের রঙ আমার ভালোবাসাকে হারিয়ে দিল অঙ্কুশদা!!খুব ভালোবাসি তোমায়!তুমি পারবে আমাকে ছেড়ে চলে যেতে?এরকম করো না প্লিজ!'

-'আত্রেয়ী!ফোনটা রাখ।অ্যান্ড ডোন্ট ডিস্টার্ব মি এগেইন।তোর সঙ্গে থাকতে গেলে আমাকে এমব‍্যারাসড হতে হয়।অপমানিত হতে হয় সবার কাছে।'

কলটা কেটে দিল অঙ্কুশ নিজেই।


'বৌদি তোমার মেয়ের গায়ের রঙ তো ভীষণ কালো গো!ওর বিয়ে দিতে গিয়ে খুব সমস্যা হবে কিন্তু!মেয়ের জন‍্য ভালো ছেলে পাবে তো!!' আত্রেয়ীর পাঁচ বছরের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে পাড়ার এক মহিলার মুখে এমন কথা শুনে লজ্জায় রাগে মাটিতে মিশে গেছিল মা।তার সব রাগ গিয়ে পরেছিল ছোট্ট আত্রেয়ীর উপর।

'তোকে দেখে কে বলবে তুই আমার মেয়ে?ভগবান সব দিল কিন্তু গায়ের রঙটা এত ময়লা দিল কেন!!কিভাবে তোর বিয়ে দেব ভেবে ভেবেই চিন্তায় আধখানা হয়ে যাই আমি!' মায়ের কাছে বকা খেয়ে ফ‍্যালফ‍্যাল করে তাকিয়ে ছিল ছোট্ট মেয়েটা।কিছুই বুঝতে পারেনি সে মা হঠাৎ অমন রেগে গেল কেন!

'আহ্ বর্ণালী!অতটুকু বাচ্চাকে কি এসব বলা ঠিক হচ্ছে তোমার?ওর মনে কেমন প্রভাব পরবে ভেবে দেখো!' রাগে গজগজ করতে করতে আত্রেয়ীকে কোলে তুলে বারান্দায় চলে গেছিল বাবা।

'হ‍্যাঁ হ‍্যাঁ!আমার তো যেন খুব আনন্দ হচ্ছে ওকে এসব কথা বলতে!!আরে কিভাবে মেয়ের বিয়ে দেব ভাবলেই বুক কেঁপে ওঠে আমার বুঝেছো?' চিৎকার করতে থাকে বর্ণালী।আত্রেয়ী বিশেষ কিছু না বুঝতে পারলেও মায়ের কথাগুলো বড্ড আঘাত করেছিল তার ছোট্ট মনে।

সে কালো।সে সুন্দর দেখতে নয়।ছোটবেলা থেকেই মা-ঠাকুমা-পাড়ার কাকিমা-স্কুলের বন্ধু বান্ধব সকলের ব‍্যবহারে কথাগুলো মনের মধ‍্যে গেঁথে গেছিল তার।


'না না অত উজ্জ্বল রঙের জামা কিনো না।আত্রেয়ীকে মানাবে না একদম!'

'অ্যাই তুই কাল থেকে স্নানের আগে হলুদ-চন্দন বেটে লাগাবি তো গায়ে।দু দিনে ফর্সা হয়ে যাবি দেখিস।'

'ও বৌদি মেয়েকে গরুর দুধ খাওয়াবে ডেইলি।রঙ খুলবে কিছুটা হলেও!'

এসব কথা শুনতে শুনতে একপ্রকার অভ‍্যস্ত হয়ে গেছিল আত্রেয়ী।এর ওর কথা শুনে মেয়েকে ফর্সা বানানোর জন‍্য মা কিনে আনত একের পর এক বিউটি প্রোডাক্ট-ক্রিম-লোশন।সব সহ‍্য করে যেত সে।শুধু যখন খুব কষ্ট হত,কান্না পেত,তখন চুপচাপ বাবার কোলে মাথা রেখে শুয়ে থাকত।বাবা বোঝাত এসবে কষ্ট পেতে নেই।কাঁদতে নেই।কাঁদা মানেই হেরে যাওয়া।

কলেজেও বন্ধুরা আড়ালে-আবডালে বিভিন্ন অপমানজনক নামে ডাকত আত্রেয়ীকে।দমবন্ধ হয়ে আসত তার।সে ভালো গান গাইতে পারে।আঁকার হাতও মন্দ না।কিন্তু সব গুণগুলো যেন তার চাপা গায়ের রঙের তলায় চাপা-ই পরে গেছিল।

এমন সময়ে কলেজের সিনিয়র অঙ্কুশদা হঠাৎ একরাশ ঠান্ডা হাওয়ার মতো প্রবেশ করল আত্রেয়ীর জীবনে।সবার ব‍্যবহারের মাঝখানে অঙ্কুশদার ব‍্যবহার ছিল একদম আলাদা।নিজে থেকেই যেচে আলাপ করেছিল আত্রেয়ীর সঙ্গে কলেজ ফেস্টে তার গান শুনে।আত্রেয়ীর গানের গলার প্রশংসা করতে করতে দু চোখে মুগ্ধতা ঝরে পরছিল ছেলেটার।হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল বন্ধুত্বের।

কলেজের ক‍্যান্টিনে কখনো আত্রেয়ীর গান শোনার আবদারে, কখনো লাইব্রেরিতে তাকে পড়া বুঝিয়ে দিতে দিতে বা কখনো রাতবিরেতে আত্রেয়ীকে ফোন করে 'বোর হচ্ছি।গল্প করব!' বলে অঙ্কুশের বকবক করে যাওয়ার মধ্যে দিয়ে আত্রেয়ী-অঙ্কুশের বন্ধুত্বটা গাঢ় হচ্ছিল আস্তে আস্তে।একদিন আত্রেয়ীকে নিয়ে অঙ্কুশ একটা মিষ্টি কবিতা লিখে এনেছিল।পড়ে শুনিয়েছিল তাকে।লজ্জায় লাল হয়ে গেছিল আত্রেয়ী।বুঝতে পারছিল ধীরে ধীরে তার মনের একটা অংশ জুড়ে বাসা বাঁধতে শুরু করেছে চাপদাড়ি ছেলেটা।শেষে যেদিন আত্রেয়ীকে হাত ধরে এককোণায় টেনে নিয়ে গিয়ে তার চোখে চোখ রেখে অঙ্কুশ বলেছিল, 'ভালোবাসি তোকে খুব'! বুকের ভেতরে হাজার প্রজাপতির একসঙ্গে ডানা মেলার শব্দ অনুভব করেছিল আত্রেয়ী।সবকিছু স্বপ্ন মনে হচ্ছিল।কিন্তু তার হাতের মধ্যে অঙ্কুশদার হাতের ক্রমশ দৃঢ় হতে থাকা বাঁধনটা বুঝিয়ে দিচ্ছিল এসব স্বপ্ন নয়।সত‍্যি সত‍্যি সত‍্যি....


সারারাত ধরে ফোনের গ‍্যালারিতে অঙ্কুশ আর তার পুরোনো ফটোগুলো দেখতে দেখতে ভেতর থেকে ভেঙে চৌচির হয়ে যাচ্ছিল মেয়েটা।কয়েকদিন ধরেই অঙ্কুশের ব‍্যবহারটা খুব অদ্ভুত লাগছিল।কিন্তু এমন কিছু ঘটতে চলেছে তা ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি সে।ছবিগুলো দেখতে দেখতে আত্রেয়ীর মনে হচ্ছিল এভাবেও ভালোবাসার অভিনয় করা যায়?দু-দুটো বছর ধরে!!একবারও ভাবল না অঙ্কুশ আত্রেয়ীর কথাটা?এত সহজে হাতটা ছেড়ে দিয়ে চলে গেল!!

কয়েকদিন পর ফেসবুকে অঙ্কুশ আর পাশে তার নতুন গার্লফ্রেন্ডের ছবিটা এনে দেখাল এক বন্ধু।হাসি চেপে বলল,'একটা কথা বলি আত্রেয়ী,কিছু মনে করিস না।আসলে অঙ্কুশদার জীবনে তোর প্রয়োজন ফুরিয়েছে।কতদিন আর শুধুমাত্র গানের গলা দিয়ে কলেজের মোস্ট হ‍্যান্ডসাম ছেলেটাকে নিজের মুঠোয় ধরে রাখতিস বল!রূপটাও ম‍্যাটার করে বস্!'


আত্রেয়ীর দু চোখে এখন শুধুই গভীর শূন্যতা।জলটাও আসছে না আর।ঠকে গেছে।ঠকে গেছে সে ভীষণ ভাবে।সবকিছুর মতো ভালোবাসাতেও শেষ পর্যন্ত রূপটাই ম‍্যাটার করে তাহলে?

অঙ্কুশের জন‍্য আত্রেয়ীর হৃদয়টুকু নিংড়ে উজাড় করে দেওয়া অনুভূতিগুলো তাহলে কিছু না?কিচ্ছু না??কোনো দাম নেই তার??

অপমানে,ক্ষোভে,দুঃখে খুব অসহায় লাগছিল নিজেকে।সেদিন অনেক রাত পর্যন্ত জেগেছিল সে।বাবা এসে বসল মাথার কাছে।

-'মা,ঘুমোসনি এখনো?'

-'ঘুম আসছিল না বাবা!এবার ঘুমোবো।'

-'কিছু হয়েছে তোর?'

-'না বাবা!সব ঠিক আছে!'

-'মা,আমার কাছে লুকোবি!'

মাথায় বাবার হাতের স্প‍র্শ পেতেই আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না আত্রেয়ী।বাবার কোলে মুখ লুকিয়ে ভেঙে পরে কান্নায়।


অঙ্কুশদের বাড়িটা আজ আলোতে ঝলমল করছে।টুনিবাল্ব, ফুল, আল্পনা দিয়ে সুন্দর করে সাজানো হয়েছে বাড়িটাকে।অঙ্কুশ একটা লাল পাঞ্জাবি পরেছে।বাড়ি ভর্তি আত্মীয় স্বজন-প্রতিবেশী-কলেজের বন্ধু বান্ধব।বাড়ির উঠোনে মন্দিরটাকেও সাজানো হয়েছে লাইট দিয়ে।একটু পরেই পুজো শুরু হবে।

সবে ঠাকুরের গলায় মালাটা পরিয়ে পুজোর থালাটা হাতে তুলেছেন পুরোহিত,এমন সময় মন্দিরে ঢুকল আত্রেয়ী।কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে বলে উঠল, 'ঠাকুর মশাই এক মিনিট!পুজো শুরু করার আগে আমার কিছু বলার আছে।'

আশেপাশের লোকজন যাবতীয় কাজ থামিয়ে তখন অবাক চোখে দেখছে আত্রেয়ীকে।অঙ্কুশ আত্রেয়ীকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠল।অঙ্কুশের মা বলে উঠলেন,'এই সেই কালো কুচ্ছিত মেয়েটা না!কি যেন নাম বলেছিলিস!আত্রেয়ী!আমাদের বাড়িতে কেন এসেছে মেয়েটা?' অঙ্কুশ এগিয়ে এসে বলে,'আত্রেয়ী!তুই এখানে কী জন‍্য এসেছিস!আমি তো তোকে ডাকেনি!আমি তো আগেই বলে দিয়েছি আমার পক্ষে এই রিলেশন..'

-'এক মিনিট অঙ্কুশদা!একটু পরে কথা বলছি তোমার সঙ্গে।আগে ঠাকুর মশাইয়ের সঙ্গে কথাটা সেরে নিই!' আত্রেয়ীর এমন ঠান্ডা কঠিন গলা আগে শোনেনি অঙ্কুশ।বোকার মতো তাকিয়ে রইল সে। আত্রেয়ী এগিয়ে গেল পুজোর জায়গার দিকে।তারপর বলল, 'ঠাকুর মশাই!অঙ্কুশদের পরিবারে আপনি কতদিন ধরে এই পুজোটা করছেন?'

-'তা প্রায় বছর পনেরো ধরে হবে!' পুরোহিত বললেন।

-'এতদিন ধরে এই পরিবারে পুজো করছেন আর ঠাকুরের পুজোর নৈবেদ্যতে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটাই দিতে ভুলে গেছেন!'

এতদূর বলে ব‍্যাগ থেকে একটা ফেয়ারনেস ক্রিমের টিউব বের করে নৈবেদ্যর থালায় রাখল আত্রেয়ী।তারপর দু হাত জড়ো করে সামনে মা কালীর বিশাল মূর্তির দিকে তাকিয়ে বলল, 'পরের বার থেকে যখন এখানে আসবে,এমন শ‍্যামলা রঙ নিয়ে এসো না মা।গা ভর্তি টকটকে ফর্সা রঙ নিয়ে এসো!দেখো না,কালো গায়ের রঙ নিয়ে জন্মেছি বলে সকলের কাছ থেকে কেবলমাত্র অবহেলা, অশ্রদ্ধা পেয়েছি সারাজীবন।আমি কালো বলে যে সমাজে প্রতি মুহূর্তে আমাকে এত অপমান করা হয়,সেই সমাজের পক্ষে কী তোমাকে প্রকৃত শ্রদ্ধা নিয়ে পুজো করা সম্ভব গো মা?এই যেমন অঙ্কুশ, দু বছর ধরে ভালোবাসার অভিনয় করে শেষে আমার কালো গায়ের রঙের অজুহাত দিয়ে ছেড়ে পালিয়ে গেল,একটু পরে সে-ই হয়তো তোমার সামনে হাতজোড় করে ভক্তিতে গদগদ হয়ে বলবে, শ‍্যামা মা আমার কালো রূপে দিগম্বরী!তোমার এই ছেলেকে আশীর্বাদ করো মা! বা, এই যেমন ধরো অঙ্কুশের মা মানে কাকিমা এত আয়োজন করে তোমার পুজো করেন,আবার পুজো শেষে তোমার সামনেই তিনি প্রার্থনা করবেন অঙ্কুশের যেন ফর্সা, সুন্দরী বউ হয়!কারণ আশীর্বাদ পাওয়ার জন্য মা কালীর পুজো করা গেলেও কালো মেয়েকে বাড়ির বউ হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না!!এমন দ্বিচারিতায় ভরা ভন্ড মানুষদের মাঝে তুমি কেন আসো মা?কাদের থেকে পুজো নিতে আসো?এদের থেকে!!মানুষের প্রতি ভালোবাসাকে যারা গায়ের রঙ দিয়ে বিচার করে তারাই ধুমধাম করে লোক ডেকে সারা রাত জেগে তোমার পুজো করে!কী হাস‍্যকর না মা!?'


চারপাশে তখন এত নিঃস্তব্ধতা যে মেঝেতে একটা পিন পরলেও শোনা যাবে।সবাই তাকিয়ে আছে আত্রেয়ীর দিকে।আত্রেয়ী এবার অঙ্কুশের সামনে আসে।বলে, 'তোমাকে আর নতুন করে কি বলি বলো তো অঙ্কুশদা!তোমার প্রতি আমার করুণা হয়।সত‍্যি ভাগ‍্যের জোরে বেঁচে গেছি গো।তোমার মতো এত ছোট মনের মানুষ যে অন‍্যের ভালোবাসা নিয়ে এভাবে খেলতে জানে,সে যদি আমার জীবনে থেকে যেত তাহলে সত‍্যিই বড় ক্ষতি হয়ে যেত গো আমার!' তারপর অঙ্কুশের মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে, 'কাকিমা, হ‍্যাঁ আমি কালো।কিন্তু কুচ্ছিত নই।বরং আপনাদের সকলের থেকে অনেক বেশি সুন্দর।অনেক বেশি!অন্তত আমার মনটা আপনাদের মতো নোংরা নয়।আর আপনি বলেছিলেন না যে, আমাকে বিয়ে করাটা সবথেকে বড় ভুল হবে অঙ্কুশের?আমি বলছি কাকিমা আপনাদের মতো ফ‍্যামিলিতে বউ হয়ে আসাটা যে কোনো মেয়ের জীবনের সবথেকে বড় ভুল হবে।আরেকটা কথা,বিয়েটাই জীবনে শেষ কথা নয়।জোর গলাতে বলতে পারি আমার অনেক যোগ্যতা আছে।প্রতিভা আছে।সুন্দর ভাবে বেঁচে থাকার জন্য আমার কারো মুখাপেক্ষী হয়ে থাকার প্রয়োজন নেই।তবুও যদি কখনো জীবনে বিয়ে করতে চাই বা সম্পর্কে যেতে চাই তাহলেও এমন মানুষ আছেন যে মন থেকে ভালোবাসতে জানেন।তাই আমার জীবনে ভালোবাসার কমতি হবে না।কমতি অঙ্কুশের জীবনে হবে যেখানে গায়ের রঙ-রূপের মতো এত ঠুনকো অস্থায়ী বস্তুগুলোর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে থাকে ভালোবাসা!'

অঙ্কুশ আর তার মা পাথরের মূর্তির মতো বাকরুদ্ধ হয়ে দেখতে থাকে আত্রেয়ীকে।যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না এমন কিছুও ঘটতে পারে!যে বন্ধুরা এতদিন অপমান করে এসেছে আত্রেয়ীকে তার গায়ের রঙের জন‍্য,আজ তারা সবাই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।আর সবার সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা আত্রেয়ীর চোখেমুখে জ্বলজ্বল করে উঠছে আত্মবিশ্বাসের দ‍্যুতি।

মাকে প্রণাম করে আত্রেয়ী সবার অবাক হয়ে যাওয়া চোখের সামনে দিয়ে বেরিয়ে আসে মন্দির থেকে।তারপর রাস্তায় এসে ফোনটা বের করে বাবাকে কল করে বলে, 'বাবা!তোমার আত্রেয়ী আজ সব অপমান-অবজ্ঞা-তুচ্ছতাচ্ছিল্যর জবাবে সমাজের গালে কষিয়ে একটা থাপ্পড় মারতে পেরেছে!' 


মন্দিরে তখন মায়ের নৈবেদ্যর থালায় সমাজের মুখে ঘেন্নার দৃষ্টি হেনে পরে আছে একটা ফেয়ারনেস ক্রিমের টিউব।আর মা কালীর মুখে তখন ঝলমল করছে হাসি।আজ এক কালো মেয়ে নিজে জেতার সঙ্গে সঙ্গে তার কালো মাকেও জিতিয়ে দিয়ে গেল যে।।


রাকেশ ঘোষাল

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

গ্রীষ্মের_ছুটিতে ছাত্রের লেখা খোলা চিঠি