প্রাপ্তি



বিকাশ আর তিথি একসঙ্গে বড় হয়েছে, তিন বছর বড় হওয়ার কারণ স্বভাব সিদ্ধ অধিকার বোধ নিয়ে তিথির উপর তার সবসময় কড়া নজর। পাশাপাশি বাড়ি তে বড় হয়েছে দুজন। কিন্তু খেলার সঙ্গী দুজন দুজনার। আবার পড়াশুনায় সাহায্য করা, প্রয়োজনে দু এক ঘা মার ও খায় বছর ষোলোর তিথি। কাঁদতে কাঁদতে প্রত্যেক দিন সিদ্ধান্ত নেয় আর কোনোদিন যাবেনা বিকাশের বাড়ি। তিথির মা জানে সবটাই ক্ষণিকের।

"কি রে তিথি আজ আবার পড়া পারিসনি? বকা খেয়েছিস নাকি"

"ছাড়তো ওই জল্হাদটার বাড়ি কোনোদিন যাবনা। কি মনে করে নিজেকে? ভুল হতে পারেনা? জানো চুল ধরে টেনে দিল কি জোর!"


"উফঃ শুরু হল এক ভ্যানতাড়া। যা ইচ্ছা কর যা। আমি যেতেও বলিনা তোর ইচ্ছা হলে যাবি না হলে নয়। কে তোকে যেতে মাথার দিব্যি দিয়েছে? যত্তোসব!"


বেলা গড়িয়ে বিকাল হল কালবৈশাখি ঝড় উঠেছে বাইরে। তিথি দের বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ।তিথি যেন অপেক্ষা করছিল কারোর জন্য ছুট্টে গিয়ে দরজা খুলে দেখে বিকাশ, 

সজোরে একটা গাঁট্টা মেরে, " কী রে! পলাশ দের বাড়ির সামনে একটা আইস্ক্রিম ওয়ালা বসেছে খাবি চল, আমি খাওয়াবো।

"খালি মারবেনা তুমি। যাও কোথ্থাও যাবোনা"

"মা আমার রাগ করিসনা চল আর মারবোনা।" আর বিন্দু মাত্র বাক্য ব্যায় না করে দু জনে বেড়িয়ে গেল। বাইরে ঝড় হাতে আইসক্রিম নিয়ে গল্প করতে করতে বেমালুম ভুলে যাওয়া ওদের রোজকার ঝগরা।


তিথির বয়স এখন  তেইশ। বাড়ি থেকে বিয়ের জন্য ঝোলাঝুলি। তিথির ও আপত্তি নেই সেভাবে। কিন্তু কি যেন একটা হারিয়ে যাচ্ছে ওর থেকে ও বুঝে উঠতে পারছেনা। সন্ধে বেলা  বিকাশ এসেছে বিয়ের কথা বার্তায় মতামত দিতে। আসলে বিকাশের মত না হলে তিথির বিয়েই যেন হবেনা। তিথির বাবা নেই। মা একা হাতে কত কি করবে?

বিকাশ বড়দের সঙ্গে আলোচনা সেরে তিথির ঘরে এল।

তিথি এক দৃষ্টি তে বাইরের কদম গাছটার দিকে তাকিয়ে আনমনা হয়ে রয়েছে। একবার দুবার ডাকার পর সাড়া না দেওয়ায় জোড় একটা গাঁট্টা দিল তিথির মাথায়।

"কি রে কানটা কি বরের বাড়ি রেখে এলি নাকি?"

তিথি কেমন যেন শান্ত আজ কিচ্ছু বললোনা হঠাৎ মুখে হাত দিয়ে কি যেন লুকাচ্ছে!

বাব্বা ঢঙ দেখো মেয়ের! মুখ ঢাকছিস কেন? কই দেখি মুখ তোল! একি তুই কাঁদছিস? আহারে! মা র জন্য মন খারাপ করছে?"

তিথি নিজেকে বোঝার চেষ্টা করল, না এটা তার কাঁদার কারণ নয়। তবে কেন কাঁদছে ও? 


বিকাশ মনে মনে অনেক ছোটো থেকেই তিথি কে ভালোবাসে। বিকাশ কে দেখতে খুবই সুপুরুষ সেখানে তিথি সাদামাটা এক মেয়ে। বিকাশ কে যে অন্য কেউ ভালোবাসেনি তা নয় কিন্তু বিকাশের মনে গেঁথে আছে তিথি। বিকাশ অবশ্য এটা কখনো বোঝায়নি তা নয়। কিন্তু তিথির সরল স্বভাব আর বোকামো ওকে সবকিছুর থেকে অজ্ঞাত রেখেছে। 


আজ তিথি খুব ভয় পাচ্ছে তার কারণ ওর জানা নেই। তিথির বিয়ের দিন উপস্থিত। কেঁদে কেঁদে না খেয়ে ওর শরীরে আর কোনো জোর নেই। সব বুঝতে পেরেও ভাবে অনেক দেরি হয়ে গেছে আজ আর বিকাশ দা কে ও কিভাবে বলবে?

সকাল থেকে গায়ে হলুদ। বারবার হবু বর ফোন করছে কিন্তু সহজ হতে পারছেনা তিথি। এই তো দিন পনেরো আগে আলাপ ছেলেটির সঙ্গে। 

মা সারাদিন তিথির মনখারাপের কারণ বোঝেনা

"দেখ তিথি তোকে জিজ্ঞাসা করে সম্বন্ধ ঠিক করেছি তখন তো না করিসনি। হঠাৎ কি হল? লোকে ভাববেটা কি"

"কেন মা করছি তো বিয়ে তোমরা তো আমাকে বিদায় করলে বাঁচো"

নে বিকাশ ফোন করেছে কথা বল। দুদিন ধরে কথা বলছিসনা কেন? সব জোগাড় করা বিয়ের সমস্ত কেনাকাটা ছেলেটা একা দাঁড়িয়ে করল আর এমন একটা ভাব দেখাচ্ছিস যেন ও তোর শত্রু"

"শত্রুই তো। জন্ম জন্মান্তরের শত্রু ও আমার" বলে হাউ হাউ করে কাঁদতে কাঁদতে ফোন ধরল তিথি।

"বল কি বলবে বল, তোমার তো শান্তি এবার আর আমার ও। তোমার হাতে মার আর খেতে হবেনা আমায়। কি ক্ষতি করেছি আমি তোমার?"


ওই দেখ! ভালো করতে নেই কারো! এত ভালো একটা ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিচ্ছি তোর ভালোলাগবে কেন? পটলা দা কে ধরে তোর সঙ্গে বিয়ে দেওয়া উচিৎ ছিল। ওর চা এর দোকানে বসতিস, চা বেচতিস, দেখ এখনো সময় আছে"

"ভালো হবেনা বিকাশ দা! 


বিয়ের সন্ধ্যা। চারিদিকের সানাই অসহ্য লাগছে তিথির। বর এসেছে রব তুলে সবাই ছুট দিল। তিথির চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করছে "বিকাশ দা  please আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাও।' 

সব বুকে চেপে রাখলেও চোখের জল আজ আর বাঁধ মানছেনা তিথির। 

পানপাতার ঢাকায় কেউ দেখতে পাচ্ছেনা তিথির অশ্রু ভেজা গাল। 

পানপাতা আস্তে আস্তে সরালো তিথি চোখ তুলে তাকিয়ে ও প্রায় জ্ঞান হারাবার পর্যায়! 


"একি তুমি! তোমার সঙ্গে আমার....."

হ্যাঁ রে পাগলি! বলে ওঠা তোর আর হবেনা বুঝেছিলাম তাই কাকিমা আর আমি মিলে এই প্ল্যান করি। পাড়ার সবাই জানতো মোটামুটি। তুই বাদে।"

তিথি আজ আর ভয় লজ্জা ফেলে এই প্রথম দুমাদ্দুম মারতে লাগল বিকাশ কে। পাজি ছেলে করবনা তোমায় বিয়ে। এত কষ্ট কেউ দেয় কাউকে"

মালাবদল কখন হবে কে জানে! এখন তো বর কনে ঝগড়া আর মারপিঠ করতেই ব্যাস্ত। 


রাকেশ ঘোষাল

Comments

Popular posts from this blog

গ্রীষ্মের_ছুটিতে ছাত্রের লেখা খোলা চিঠি