অ্যাডভোকেট সুদেষ্ণা রায়

 নিজেই ড্রাইভ করছেন অ্যাডভোকেট সুদেষ্ণা রায়চৌধুরী। একসময় কিছুটা জেদ করে ড্রাইভিংটা শিখে রেখেছিলেন তিনি। তাই এই বিশেষ দিনগুলোতে খুব সুবিধা হচ্ছে তাঁর। দীপক নিজে আসতে পারবে না বলে, এই ক'টা দিনের জন্য অন‍্য একজন ড্রাইভার ঠিক করে দিতে চেয়েছিল। সুদেষ্ণা আপত্তি জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন― তুমি অত ভাবছো কেন? আমি যে ড্রাইভ করতে পারিনা, তা তো নয়। কোন কিছু শিখে যদি সেটাকে কাজে লাগাতেই না পারা যায়, তবে সেই শেখার মূল‍্য কি? এই ক'দিন আমি ঠিক চালিয়ে নিতে পারব।

টেলিফোনের অন‍্যপ্রান্ত থেকে দীপকের শঙ্কিত গলা শোনা গিয়েছিল―সাবধানে চালাবেন ম‍্যাডাম।

সুদেষ্ণা হেসেছিলেন―ডোন্ট বি ওয়ারিড।

দীপক ছেলেটা সত্যিই ভাল। ও শুধু সমীহই করেনা সুদেষ্ণাকে, আন্তরিকভাবে ভাল চায় সুদেষ্ণার। তাছাড়া খুব কর্তব‍্যসচেতন। বিশেষ অসুবিধায় না পড়লে, কোনদিন ডিউটিতে ফাঁকি দেয়না। পরশু রাত্রে ওর তিনবছরের মেয়েটা হঠাৎ খুব অসুস্থ হয়ে পড়ায়, মেয়ের জন্য সময় দিতে হচ্ছে ওকে। তাই আসতে পারছেনা। সুদেষ্ণা বলে দিয়েছেন, মেয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার পরই যেন ডিউটিতে আসে ও। তার আগে নয়।

      জ‍্যাম কাটতেই আবার গাড়িতে স্টার্ট দিয়েছেন  সুদেষ্ণা। সুদেষ্ণা রায়চৌধুরীকে এই নামে এখন আর কেউ চেনেনা। প্র‍্যাকটিস শুরু করার অনেক আগেই অ্যাফিডেভিট করে নিজের সারনেমটা বদলে নিয়েছেন তিনি। রায়চৌধুরী থেকে উনি হয়েছেন রায়। সুদেষ্ণা নামটাও খুব অল্প কয়েকজনই জানে। আইনজীবী মহলে বা মক্কেলদের কাছে তিনি এখন অ্যাডভোকেট এস রয় বলেই পরিচিত। কিছুটা এগিয়ে আসতেই দেখলেন, রাস্তাটা বেশ ফাঁকা। সাহস করে তাই গাড়ির স্পিডটা একটু বাড়ালেন সুদেষ্ণা। ড্রাইভ করতে করতে পুরনো দিনের অনেক কথাই মনেপড়ে যাচ্ছে আজ। না, সুখস্মৃতি কিছু নয়। সবটাই যন্ত্রণার। বুকের ভেতরটা হঠাৎ করে মোচড় দিয়ে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে চোখের সামনে ভেসে উঠল আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা চল্লিশোর্ধ মানুষটার ক্লান্ত, অবসন্ন মুখটা। ওই বিদ্ধস্ত চেহারা আর করুণ চোখের দৃষ্টিকে ছাপিয়ে উঁকি দিচ্ছে দুটো ক্রুর চোখের হিংস্র চাহনি। কানের কাছে এসে ধাক্কা দিচ্ছে উৎকট স্বরের সেই ব‍্যঙ্গের হাসি যা এতবছর পরও বিদ্ধ করছে সুদেষ্ণার অন্তরটাকে। দুটো মানুষের আচরণের মধ্যে আসমান জমিন ফারাক। দুজনের মধ্যে কোন তুলনাই চলেনা আজ। তবুও মনে মনে তুলনাটা না করে থাকতে পারলেন না সুদেষ্ণা। যে মানুষটা একদিন সুদেষ্ণার সরলতার সুযোগ নিয়ে চরম প্রতারণা করেছিল তাঁর সঙ্গে, অপমানে অপমানে ক্ষতবিক্ষত করেছিল তাঁর কোমল হৃদয়টাকে –সেই প্রতারকটার আজকের পরিনতি দেখে অনেকটাই যেন স্বস্তি পাচ্ছেন সুদেষ্ণা।

      সুকমল বসুর সঙ্গে আবার দেখা হওয়ার কথাটা মাকে এখনও ইচ্ছা করেই জানাননি সুদেষ্ণা। জানাবেন অবশ্যই। তবে আরও একধাপ এগিয়ে, তারপর। ভদ্রলোকের মুখোশধারী ওই ফ্রডটার পরিনতিটা ঠিক কতটা খারাপ হবে, সেসম্বন্ধে সঠিক ধারণা এখনো সুদেষ্ণার নিজেরও নেই। কিন্তু তিনি জানেন যে সুকমল বসুকে দগ্ধাতে দেখলে, তাঁর থেকেও বেশি খুশি হবেন তাঁর মা। তাই সেই দিনটার অপেক্ষাতেই রয়েছেন সুদেষ্ণা। জীবনে এতবড় সুযোগ যে কখনো আসবে, সেটা স্বপ্নেও কখনো ভাবেননি সুদেষ্ণা। সত্যি একেই বলে ডেস্টিনি। কার ভাগ্য যে কখন, কিভাবে,কোনদিকে টার্ণ নেয়– সেটা কেউই জানতে পারেনা আগে।

         *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *

    প্রফেসর সুকমল বসু যে তাঁকে চিনতে পারেননি, সেটা প্রথমদিনই বুঝতে পেরেছিলেন সুদেষ্ণা। তাঁর চেম্বারে এসেছিলেন সুকমল বসু, সুদেষ্ণারই একসময়ের ক্লায়েন্ট মিঃ বটব‍্যালের সঙ্গে। সুদেষ্ণাকে নিজের সমস‍্যার কথা জানাতে গিয়ে,  ইনিয়ে বিনিয়ে ঝুড়ি ঝুড়ি মিথ‍্যে কথা বলেছিলেন সুকমল বসু। বলেছিলেন― আমার স্ত্রী, চন্দ্রিমা বসু আসলে একজন সাইকো পেসেন্ট। ওর ভাইয়ের কথায় প্ররোচিত হয়ে ও কেসটা করেছে। আমি বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও কোনভাবে কেসটা তুলে নিতে রাজি হচ্ছেনা চন্দ্রিমা। আমি একজন অধ‍্যাপক। শিক্ষকতার সঙ্গে যে মানুষ যুক্ত, তার নামে এই মিথ‍্যা বদনাম দিয়ে ওর কিছু বিশেষ লাভ হয়তো হবেনা। কিন্তু কেসটা কোর্টে উঠলে আমার কতটা সম্মানহানি হবে, সেটা নিশ্চয় আপনি বুঝতে পারছেন মিস রয়? অথচ আমি অসহায়। তাই কোন উপায় না পেয়ে, মিঃ বটব‍্যালের সাহায্য নিয়ে আপনার দ্বারস্থ হয়েছি। আমি আমার বন্ধুর মুখে আপনার অনেক প্রশংসা শুনেছি। শুনেছি আপনার প্লীড করার ক্ষমতা অসামান্য।

    মনে মনে তৈরী হয়েই ছিলেন সুদেষ্ণা। চিরাচরিত পদ্ধতি মত টেবিলের তলায় সেট করে রাখা টেপরেকর্ডারটা অন করে দিয়েছিলেন ঠিক সময়ে। তারপর অত‍্যন্ত সহজ গলায় বলেছিলেন ―দেখুন মিঃ বসু! এই কেসে চন্দ্রিমা বসুর আইনজীবী আমি। ওনার ভাই আমাকে আগে নিয়োগ করেছেন‌। এখন আমি ওনার বিরূদ্ধে যাই কি করে বলুন তো? এটা তো এথিক্সের বাইরে পড়ে, তাইনা?

সকরুণ চোখে তাকিয়েছিলেন সুকমল―হ‍্যাঁ, সেটা ঠিক। তবে একটা উপায় রয়েছে। আপনি চন্দ্রিমাকে জানান যে বিশেষ কারণে ওর কেসটা নিতে পারবেননা আপনি। ও অন‍্য কোন ল-ইয়ার খুঁজে নিক। প্লিজ, এটুকু উপকার আপনি আমার করুন ম‍্যাডাম। আমি আপনার কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকব তাহলে।

― ওসব কৃতজ্ঞতা টিতজ্ঞতা বাদ দিন মিঃ বসু। এটা আমার প্রফেশন। আমাকে নিজের দিকটাও দেখতে হবে। কেসটা কোর্টে উঠলেই তো জানা যাবে, আমি আপনার কেসটা নেওয়ার জন‍্যেই ওকে না বলেছি। তখন ব‍্যাপারটা খুব খারাপ লাগবে।

―আপনি বলবেন যে আপনি আমার বিশেষ বন্ধু। তাই বাধ‍্য হয়ে আমার রিকোয়েস্টটা রাখতে হয়েছে আপনাকে।

হঠাৎ প্রয়োজনের অতিরিক্ত জোরে হেসে উঠেছিলেন সুদেষ্ণা―বন্ধু? দারুণ বলেছেন কিন্তু। তাহলে শুধুমাত্র প্রয়োজনের জন্য ক্ষণস্থায়ী বন্ধুত্ব করা যায় বলছেন?

ঘাবড়ে গিয়ে সুকমল বলেছিলেন―না, ঠিক তা নয় ম‍্যাডাম। আপনার মত একজন স্বনামধন্য আইনজীবীর বন্ধু হিসেবে পরিচয় দিয়ে স্পর্ধা দেখাতে চাইছিনা আমি। আসলে নিরুপায় হয়েই কথাটা বলছি আমি। প্লিজ ডোন্ট টেক ইট আদারওয়াইস।

সুদেষ্ণা মুহূর্তে স্বর পাল্টে নিয়ে বলেছিলেন

―আর একটা দিকও রয়েছে। চন্দ্রিমা বসুর ভাই আমাকে মোটা টাকা দিতে   চাইছেন পারিশ্রমিক হিসেবে। সেক্ষেত্রে......

সুদেষ্ণাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে, সুকমল বলেছিলেন―ওই নিয়ে ভাববেন না আপনি। আমি ওর দ্বিগুণ পারিশ্রমিক দেবো আপনাকে।

―তাহলে অবশ্য আমাকে নতুন করে ভাবতে হয় বিষয়টাকে নিয়ে।

মাটি নরম হয়েছে ভেবে, টেবিলের দিকে কিছুটা ঝুঁকে এসেছিলেন সুকমল ―আর ভাবাভাবির কিছু নেই ম‍্যাডাম। আপনি রাজি হয়ে যান।

মিথ‍্যার আশ্রয় নিয়ে, সুদেষ্ণা এবার মোক্ষম চালটা চেলেছিলেন― দেখুন মিঃ বসু! আপনার স্ত্রীর সঙ্গে এখনো তেমনভাবে কথা হয়নি আমার এইব‍্যাপারে। আপনার বিরুদ্ধে ওনার অভিযোগগুলো শোনা হয়নি এখনো। সেটা অবশ্যই আমার সময়ের অভাবে। ওনাকে আজ রাত আটটায় টাইম দিয়েছি আমি। এখন আপনার কথামত যদি আপনার হয়ে কেসটা লড়ি, তাহলে সবকিছু আপনার কাছেই জেনে নিতে হবে। সব কিছুই খুলে বলতে হবে আপনাকে। আমি যার কেস হাতে নিই, তার কাছে সবসময়ই আসল সত‍্যিটা জানতে চাই। তাতে কেসটা সাজানোর ব‍্যাপারে আমার সুবিধা হয়। আশা করি আপনি আমার কাছে কিছু লুকোনোর চেষ্টা করবেন না নিজের ব‍্যাপারে?

সুকমল উত্তেজিত হয়ে বলেছিলেন―নিশ্চয় না।আমি এতক্ষণ সত্যি কথাই তো সব বললাম আপনাকে ম‍্যাডাম।

ঠোঁটের কোনে হালকা হাসি টেনে সুদেষ্ণা বলেছিলেন― সরি মিঃ বসু। আপনার কথাটা আমি মেনে নিতে পারছিনা। ওকালতিটা আমি বেশ কবছর আগেই শুরু করেছি। এতগুলো বছরে  অভিজ্ঞতাও কিছু কম হয়নি। তাই সত্যি, মিথ‍্যে বুঝতে আমার খুব একটা অসুবিধা হয়না। আপনি যদি আমার কাছে কিছু লুকোনোর চেষ্টা করেন, তাহলে বোধহয় কেসটা নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব হবেনা। কারণ সেক্ষেত্রে আমার হেরে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। আর আমার অসাফল্যের তালিকায় আমি নতুন কিছু সংযোজন করতে রাজি নই এখনই। আপনি তাহলে আসুন মিঃ বসু।

ততক্ষণাৎ সু্র বদলে ফেলেছিলেন সুকমল। সুদেষ্ণার নানা প্রশ্নের ভিত্তিতে, একটু একটু করে অনেক সত‍্য উঠে এসেছিল এরপর। সব শেষে সুকমল বলেছিলেন―দাম্পত্য কলহ অল্পবিস্তর হয় সব পরিবারেই। তাবলে সেটাকে আদালত পর্যন্ত টেনে আনা কি উচিত? আপনিই বলুননা ম‍্যাডাম।

সুদেষ্ণা বলেছিলেন―সে তো বটেই। ঠিক আছে আমি দেখছি, কি করা যায়।

অ্যাডভান্স হিসেবে চেক লিখে দিতে গিয়েছিলেন সুকমল। তাতে আপত্তি জানিয়েছিলেন সুদেষ্ণা

―আমি কখনো অ্যাডভান্স নিইনা মিঃ বসু।

উঠে আসার সময় আরও একবার জোরহাত করে নমস্কার জানিয়েছিলেন সুকমল। 

        *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *

     সুকমল বসু চলে যাওয়ার পর নিজের মনেই খানিকটা হেসেছিলেন সুদেষ্ণা। সামানাসামনি বসে এতক্ষণ কথা বলার পরও সুকমল চিনতে পারেননি তাঁর একসময়ের ছাত্রীকে। অবশ্য না পারাটাই স্বাভাবিক। অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে সুদেষ্ণার চেহারায়। পরিবর্তন যে সুকমল বসুরও হয়নি তা নয়। সুদেষ্ণার থেকে ন'বছরের বড় সুকমলের ঝুলফির চুলে পাক ধরেছে। চেহারাটাও কিছুটা ভারী হয়েছে। তবে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি পরিবর্তন হয়েছে সুদেষ্ণার। সুকমল যে সুদেষ্ণাকে চিনতেন, সে ছিল এক আঠারো-ঊনিশ বছরের কৃশকায়া তরুণী। লাজুক, ভিতু, মানসিকভাবে দুর্বল সেই মেয়েটার সঙ্গে আজকের ব‍্যক্তিত্বময়ী, সুদর্শনা, পঁয়ত্রিশ উর্ত্তীনা এই দুঁদে উকিলের মিল খুঁজে পাওয়া সত্যিই কষ্টকর। ষোলোটা বছর তো কিছু কম সময় নয়? এই দীর্ঘ সময় ধরে ঘটে যাওয়া অনেক পরিবর্তনের মাঝেই লুকিয়ে আছে সুদেষ্ণার জীবন সংগ্ৰামের কাহিনী। চরম দুর্দিনেও কখনো ভেঙ্গে পড়তে দেখেনি কেউ সুদেষ্ণাকে। সর্বদা মেরুদন্ড সোজা রেখে এগিয়ে গেছেন তিনি নিজের লক্ষ্যের দিকে। কোন প্রতিকূলতার কাছেই নতি স্বীকার করেননি কখনো। তাঁর সেই লড়াকু মানসিকতাই তাঁকে আজ পৌঁছে দিয়েছে এই জায়গাটায়।

     স্কুলের গন্ডী পেরোনোর পরই মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাবে ভেবে যখন প্রচন্ড চিন্তায় পড়েছিলেন সুদেষ্ণার মা কনিকা রায়চৌধুরী, তখনই দেবদূতের মত তাঁদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন সুকমল বসু। স্বামীর অকালমৃত্যুতে দিশেহারা কনিকাকে সান্ত্বনা দিতে এসেছিলেন কনিকার বাল‍্যবান্ধবী আল্পনা বসু। ছেলে সুকমলকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন আল্পনা। আল্পনার ছেলের পরিচয় পেয়ে আর তার দুর্ধর্ষ রেজাল্টের কথা শুনে বিগলিত হয়ে গিয়েছিলেন কনিকা। বলেছিলেন―তুই তো রত্নগর্ভা রে আল্পনা। সত্যিই এমন ছেলে পাওয়া খুব ভাগ্যের কথা।

ঠোঁটের কোনে হাসি এনে, পুত্রগর্বে গরবীনি আল্পনা বসু বলেছিলেন ―বলছিস? তবে তোর মেয়েও তো শুনেছি পড়াশোনায় খুব ভাল। দেখবি একদিন ও তোর মুখ উজ্জ্বল করবে।

কনিকা বলেছিলেন― দাঁড়া, আগে ওকে পড়াতে পারব কিনা দেখি?

সুকমল বলেছিলেন―একি বলছেন আপনি আন্টি? পড়াশোনায় যে ভাল, তার পড়াশোনা বন্ধ করে দেওয়া কি উচিত? 

এই কথার কোন উত্তর না দিয়ে, অতিথিদের জন্য চা করতে উঠে গিয়েছিলেন কনিকা।

     নতুন অতিথিকে দেখে, লজ্জায় মুখ নীচু করে বসেছিলেন সুদেষ্ণা। আল্পনা বসু আগেও বেশ কয়েকবার এসেছিলেন। তাই তাঁর সঙ্গে সুদেষ্ণার পরিচয় থাকলেও, সেদিনই প্রথম দেখেছিলেন সুকমল বসুকে। তখনও উচ্চমাধ‍্যমিকের রেজাল্ট আউট হয়নি সুদেষ্ণার। সামনে একজন নবীর ভোচ অধ‍্যাপককে বসে থাকতে দেখে, যথেষ্ট সংকোচে ছিলেন তিনি। আলাপ হতে অবশ্য সময় লাগেনি বেশিক্ষণ। কথা শুরু করেছিলেন সুকমলই। পড়াশোনা নিয়েই বেশিরভাগ কথা হয়েছিল তাঁর সঙ্গে। সাতাশবছরের সুকমল তখন সবে অধ‍্যাপনা করতে শুরু করেছেন। সুদেষ্ণা বলেছিলেন― আমার রেজাল্টের কথা ভেবে বা পড়াশোনা নিয়ে আলোচনা করে কি হবে বলুন? আর তো মনেহয় পড়াশোনা হবেনা আমার। 

সুকমল বলেছিলেন― একথা বলছো কেন?

সুদেষ্ণা উত্তর দিয়েছিলেন বিষন্ন মুখে― কি করে পড়ব আমি? পড়াশোনার জন্যে অর্থব‍্যয় করার সামর্থ্য তো আমাদের এখন নেই। আমার বাবা কিছু রেখে যেতে পারেননি আমাদের জন্য। আর মায়েরও  কোন ক্ষমতাই নেই আমাকে পড়ানোর। তাই পড়াশোনার চিন্তা ছেড়ে, যাহোক কিছু করে এবার উপার্জনের চেষ্টা করতে হবে আমাকে।

সুকমল বলেছিলেন―তুমি যদি ইংলিশে অনার্স নিয়ে পড়তে চাও,তাহলে তোমার বইপত্রের ব‍্যবস্থা আমি করব। আর সপ্তাহে দু'তিন দিন পড়াতেও পারব আমি তোমাকে। 

চা নিয়ে তখনই ঘরে ঢুকেছিলেন কনিকা। কথাটা শুনে হাতে স্বর্গ পেয়েছিলেন তিনি। বলেছিলেন―তুমি যদি এতটা সাহায্য করতে পার, তাহলে অবশ্যই ও পড়বে। আমার প্রথম সন্তান বেঁচে থাকলে, এতদিনে তোমারই মতো হত সেও। সে থাকলে, আমার আজ এত চিন্তা থাকতো না। তাকে অসময়ে কেড়ে নিয়েছিলেন ঈশ্বর। তাই হয়তো আজ আবার তিনিই তোমাকে আমাদের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছেন।

আল্পনা বসু বলেছিলেন― ঠিকই বলেছে সমু। ওর উচিত পড়াশোনার ব‍্যাপারে সুদেষ্ণাকে সাহায্য করা। সুযোগের অভাবে মেয়েটার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেলে, আমারও খারাপ লাগবে খুব।

মায়ের বান্ধবী ও তাঁর ছেলের কথাবার্তা শুনে আপ্লুত হয়ে গিয়েছিলেন সুদেষ্ণা। নুতন করে মনের মধ্যে আশা জেগেছিল সুদেষ্ণার। সেদিন থেকেই শুরু হয়েছিল তাঁর স্বপ্ন দেখার।

         *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *

     মেয়েকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখতেন সুদেষ্ণার বাবা, অবনী রায়চৌধুরীও। কোর্ট থেকে বেরিয়ে বাড়ি যাওয়ার সময় প্রায়ই সুদেষ্ণার মনে পড়ে যায় বাবার কথা। মায়ের মুখে শুনেছে সুদেষ্ণা, ক্লাস থ্রী–তে পড়ার সময় দুদিনের জ্বরে মারা গিয়েছিল সুদেষ্ণার দাদা। তার দুবছর পরই নাকি সুদেষ্ণার জন্ম হয়েছিল। ছেলের মৃত্যুর পর মেয়েকেই আঁকড়ে ধরেছিলেন অবনী। বাবার কথাগুলো যেন এখনও কানের কাছে বাজে। বাবা সব সময় বলতেন―আমার মেয়ে যেভাবে যুক্তি দিয়ে কথা বলে, তা দেখে আমার একটা কথা মনে হয়। ওকে ‛ল’পড়ালে, ও নিশ্চয় বড় ব‍্যারিস্টার হতে পারবে। দেখো, একদিন ঠিক আমাদের মুখ উজ্জ্বল করবে আমাদের এই মেয়ে। 

ছেলের শোক ভোলানোর জন‍্যেই হয়তো মায়ের সামনে একথা বলতেন বাবা। কিন্তু কথাটা এত বেশিবার শুনেছিলেন সুদেষ্ণা, যে সেটা মনের মধ‍্যে গাঁথা হয়ে গিয়েছিল। একজন ল-ইয়ার হওয়ার ইচ্ছাটা তখন থেকেই বাসা বেঁধেছিল সুদেষ্ণার মনের মধ্যে। নিজের প্রচেষ্টাতেই ল-ইয়ার হয়েছেন সুদেষ্ণা। কিন্তু সেটা দেখে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি  তাঁর বাবার।   

     ছোটখাটো একটা প্লাস্টিক-ফ‍্যাক্টরিতে ম‍্যানেজারের কাজ করতেন অবনী রায়চৌধুরী। উল্লেখযোগ্য স‍্যালারি ছিল না ঠিকই, তবে তাঁর সংসারটা চলে যাচ্ছিল ভালভাবেই। সুদেষ্ণা যখন ক্লাস এইটে পড়তেন, তখনই বিনা নোটিশে লক আউট হয়ে যায় সেই প্লাস্টিক-কারখানায়। ফ‍্যাক্টরি খোলার আসায় মাসখানেক বসে থাকেন অবনী। কিন্তু ক্রমে সংসার চলা দুর্দায় হয়ে পড়ে। অনোন‍্যপায় হয়ে একটা ইনসিওরেন্স কোম্পানির এজেন্ট হন অবনী। ওই  ইনসিওরেন্স কোম্পানিটার তখন রমরমা। বেশ মন দিয়ে কাজও করছিলেন অবনী। এজেন্ট থেকে একটা টিমের সাব-অরগানাইজার হয়ে যান তিনি। পরের বছরই হন ওই টিমটার অরগানাইজার। ক্রমে  বড়সর একটা টিম তৈরী হয় তাঁর আন্ডারে। ফলে কমিশন ভালই পাচ্ছিলেন অবনী রায়চৌধুরী। বছর চারেক বেশ ভালই চলেছিল। কিন্তু ভাগ্য বিরূপ হলে যা হয়। হঠাৎ করেই সাংঘাতিকরকম বদনাম ছড়িয়ে পড়ে ইনসিওরেন্স-কোম্পানিটার। যারা ইনসিওরেন্স করেছে, পলিসি ম‍্যাচিওর হয়ে যাওয়ার পরও টাকা ফেরত পাচ্ছিলনা তারা। এর ওপর আবার অবনীর তৈরী করা টিমের এজেন্টরাও পলিসির টাকা ঠিকমত জমা দেননি বলেও জানা যায়। যারা ইনসিওরেন্স করিয়েছেন, তারা বাড়িতে এসে হাঙ্গামা করতে শুরু করেন। সবমিলিয়ে রীতিমত জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে, শেষপর্যন্ত আত্মহত্যার পথই  বেছে নেন অবনী রায়চৌধুরী। 

     সেই দিনটার কথা মনে পড়লে, আজও বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে সুদেষ্ণার। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ঠিক একমাস আগে ঘটেছিল সেই মারাত্মক ঘটনাটা। টিউশন নিয়ে রাত আটটার সময় বাড়ি ফিরে সুদেষ্ণা দেখেছিলেন, বাড়িতে লোকে লোকারণ্য। ভিড় ঢেলে এগিয়ে যেতেই চোখে পড়েছিল, উঠোনে শায়িত বাবার ফুলে যাওয়া ডেডবডিটা। মা অচৈতন্য অবস্থায় পড়েছিলেন একটু দূরেই। মায়ের জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা চলছিল। পাড়ার লোকেদের কাছেই  শুনেছিলেন সুদেষ্ণা আসল ঘটনাটা। সন্ধ‍্যেবেলায় বাড়ির পিছনের একটা আমগাছে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন অবনী রায়চৌধুরী। ঘন্টাখানেক আগে চোখে পড়ে একজনের। তৎক্ষনাৎ নামানো হয় তাঁকে। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। বাবার ডেডবডির দিকে না তাকিয়ে, মায়ের কাছে ছুটে গিয়েছিলেন সুদেষ্ণা। মাকে জড়িয়ে ধরে এত চিৎকার করে ডেকেছিলেন তিনি, যে সেই ডাকেই জ্ঞান ফিরে এসেছিল কনিকা রায়চৌধুরীর। তবে সেদিন আর একটা ঘটনাও ঘটেছিল। সতেরোবছর আটমাস বয়সে হঠাৎ করেই প‍রিনত হয়ে উঠেছিলেন সুদেষ্ণা রায়চৌধুরী। নিজের কষ্টকে বুকের মধ্যে চেপে রেখে, দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হয়েছিলেন সেদিন থেকেই।

      *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *

     মুখে যতই নিজের সম্বন্ধে সাফাই গেয়ে থাকুন না কেন সুকমল বসু, এতগুলো বছরেও তাঁর চরিত্রটা যে এতটুকু বদলায়নি–সেটা বেশ ভাল করেই বুঝতে পারছিলেন সুদেষ্ণা। পূর্ব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সুকমল বসুর চরিত্র সম্পর্কে অনেকটাই ওয়াকিবহাল তিনি। নিজের স্বার্থে যেকোন ধরনের জঘন্য কাজ করতে যে পিছপা হননা অধ‍্যাপক সুকমল বসু, সেব‍্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন সুদেষ্ণা। তাই তাঁর স্ত্রী তাঁর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ এনেছেন, সেটাকে প্রমাণ ছাড়াই বিশ্বাস করেছেন সুদেষ্ণা। মিসেস চন্দ্রিমা বসুর পরিচয় জানার পর, তাঁর কেসটা নেওয়ার ব‍্যাপারে কোন দ্বিধা করেননি সুদেষ্ণা। তাঁর নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অন‍্যায়ের জবাব দিতেই যে কেসটা হাতে নিয়েছেন সুদেষ্ণা, তা নয়। সমাজের বুক থেকে এইসব মুখোশধারী মানুষদের আগাছার মত উপড়ে ফেলতে চিরদিনই ইচ্ছা হয় তাঁর। সেটা সম্ভব নয়। তাই হয়তো সেইসব মানুষদের উপযুক্ত শাস্তি দিতে পারলেই তৃপ্তি পান।

     নিজের চেম্বারে বসে চন্দ্রিমা বসুর মুখে শুনেছিলেন সুদেষ্ণা, সুকমল বসুর বিরুদ্ধে আনা তার অভিযোগগুলো। বিয়ের বছরখানেক পর থেকেই স্ত্রীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতে শুরু করেন সুকমল। কারণে অকারণে চন্দ্রিমার বিরোধিতা করা, তার প্রতিটি কাজের ত্রুটি খুঁজে বার করা, তার সব কথায় সবসময় বিশ্রীরকম রি-অ্যাক্ট করা–এগুলো চলতেই থাকে দিনের পর দিন। তবু সব সহ‍্য করে মানিয়ে নিয়ে চলার চেষ্টা করেছেন চন্দ্রিমা দুটো দিক ভেবে। যেহেতু চন্দ্রিমা বসু নিজে উপার্জনক্ষম নন, সেহেতু সুকমলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে গেলে তাঁকে পাকাপাকিভাবে বাপেরবাড়িতে চলে যেতে হত। ভাইয়ের ওপর এই চাপটা দিতে চাননি চন্দ্রিমা। তাছাড়া নিজের সন্তানের ভবিষ‍্যতের কথা ভেবেও মুখবুজে থেকে গেছেন সুকমলের সংসারে। বারোবছরের ছেলেটাকে হঠাৎ করেই দূরের একটা স্কুলে ভর্তি করে, স্কুল-হস্টেলে রেখে আসেন সুকমল। তারপর থেকে ফাঁকা বাড়িতে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। সুকমলের সঙ্গে একজন মহিলার সম্পর্কের কথা জেনেছিলেন চন্দ্রিমা বিয়ের বছরদেড়েক পরই। মাঝেমধ্যে বাড়িতে তাকে নিয়ে আসতেন সুকমল। ছেলে কিছু জানতে পারবে, সেই ভয়ে ছেলেকে নিয়ে অন‍্যঘরে ঢুকে যেতেন চন্দ্রিমা বসু। ক্রমশ সেই মহিলার সঙ্গে সুকমলের ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে। প্রায় রোজই সঙ্গে করে সেই মহিলাকে নিয়ে আসতে শুরু করেন সুকমল। শুধু তাই নয়, দরজা বন্ধ করে দুজনে কাটিয়ে দিতেন ঘন্টার পর ঘন্টা। এত অসম্মান সহ‍্য করে একই ছাদের তলায় থাকতে হত চন্দ্রিমাকে।

     যে ঘটনার পর বাড়ি ছাড়তে বাধ‍্য হয়েছিলেন চন্দ্রিমা, সেই মারাত্মক ঘটনাটা ঘটেছিল গত তেইশে ডিসেম্বর। ছেলেকে হস্টেল থেকে বাড়িতে আনতে নারাজ সুকমলের সঙ্গে কথা কাটাকাটি চলছিল চন্দ্রিমার। চন্দ্রিমা চাইছিলেন ছেলেকে নিয়ে ছুটির দিনগুলো বাপের বাড়িতে থাকতে। সেই কারণেই হস্টেল-সুপারকে ফোন করার চেষ্টা করছিলেন চন্দ্রিমা। চন্দ্রিমাকে ফোন করতে না দিয়ে তাঁর হাত থেকে মোবাইলটা কেড়ে নিয়ে বাড়ির ছাদে উঠে যান সুকমল। চন্দ্রিমাও সুকমলের পিছু পিছু ছাদে উঠে যান মোবাইলটা আনতে। ঠিক তখনই ধাক্কা দিয়ে, চন্দ্রিমাকে নিচে ফেলে দিতে চান সুকমল। চন্দ্রিমা আপ্রান চেষ্টায় সুকমলকে উল্টোদিকে ফেলে দিয়ে প্রানে বাঁচেন। সুকমলকে উঠে দাঁড়ানোর সুযোগ না দিয়ে, সেই অবস্থাতেই নিজের  মোবাইলটা তুলে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন চন্দ্রিমা। কারণ তিনি খুব ভাল করেই বুঝতে পেরেছিলেন, আর ওখানে থাকাটা তার পক্ষে আদৌ নিরাপদ নয়। সোজা বাপেরবাড়িতে গিয়ে ওঠেছিলেন সেদিন চন্দ্রিমা। তারপর থেকে এই কয়েকদিন বাপের বাড়িতেই রয়েছেন তিনি।

    কথাগুলো বলতে বলতে কেঁদে ফেলেছিলেন চন্দ্রিমা‌। সুদেষ্ণা তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করতেই চন্দ্রিমা বলেছিলেন, আমি নিজেকে সামলে নিতে পারবো ম‍্যাডাম। আপনি শুধ এটুকুইু দেখবেন, যাতে ওই অমানুষটার কোন বড়সর শাস্তি হয়। ওর মতো মুখোশধারী শয়তান মানুষেরা দেশের জঞ্জাল। আমার মনে হয়, সেই জঞ্জাল সাফ করলে দেশের ভাল হবে।

সুদেষ্ণা প্রশ্ন করেছিলেন―আপনার ছেলে আপনার পক্ষে কথা বলবে তো?

চন্দ্রিমা বলেছিলেন―অবশ্যই বলবে। আমার ছেলে,তমজিৎ আমাকে ভীষণ ভালবাসে। আর বাবাকে মোটেই পছন্দ করেনা ও।

চন্দ্রিমার মুখে সব কথা শুনে মনে মনে ঈশ্বরকে ধন‍্যবাদ জানিয়েছিলেন সুদেষ্ণা, তাঁর সঙ্গে সুকমল বসুর শেষপর্যন্ত কোন বৈধ সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি বলে। তবে এখন সুদেষ্ণা অন‍্যভাবে ভাবছেন বিষয়টা। কেসটাকে তিনি এমনভাবে সাজিয়েছেন, যাতে কোনভাবেই শাস্তির হাত থেকে নিস্তার না পায় সুকমল বসু। 

          *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  

     সুকমল বসু ও ভার্সেস চন্ন্দ্রিমা বসুর কেসটার তৃতীয়দিন আজ। আজ সুদেষ্ণা দু'জন বিশেষ সাক্ষীকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন। নিজের কাজের ব‍্যাপারে চিরদিনই খুব সিরিয়াস সুদেষ্ণা রায়চৌধুরী। সবসময় নিট এন্ড ক্লিন কাজ করতে ভালবাসেন তিনি। তাই সেদিন সুকমল বসু তাঁর চেম্বার থেকে চলে যাওয়ার ঘন্টাদুয়েক পরই নিজে ফোন করে তাঁকে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে বিশেষ কারণে সুকমলের কেসটা নিতে পারছেননা তিনি। 

সুকমল হতাশগলায় বলেছিলেন―আপনি আমাকে যে এভাবে বিপদে ফেলবেন, সেটা স্বপ্নেও ভাবিনি। কথা দিয়ে়, কথা না রাখাটা নিশ্চয় আপনার এথিক্সের মধ্যে পড়েনা? 

সুদেষ্ণার কাছ থেকে কোন রেসপন্স না পেয়ে, বেশ রাগতস্বরে বলেছিলেন সুকমল― আপনার ওই বিশেষ কারণটা কি তাহলে অজ্ঞাতই থেকে যাবে মিস রয়?

সুদেষ্ণা বলেছিলেন―দেখুন মিঃ বসু, এইব‍্যাপারে আমি আর একটা কথাও বলতে চাইনা। তবে আশাকরি আপনার কেসের রায় বেরোনোর আগেই, বিশেষ কারণটা পরিষ্কার হয়ে যাবে আপনার কাছে। হয়তো এমন কোন চমপ্রদ তথ‍্য উঠে আসবে, যেটা আপনি স্বপ্নেও ভাবতে পারছেননা।

      এজলাসে আজ মানুষের সংখ্যা অনেকটাই বেশি। প্রফেসর সুকমল বসুর কলেজ থেকে আজ তাঁর সাত-আটজন কলিগও এসেছেন। এস রায়ের পরামর্শ মত এদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন চন্দ্রিমা বসু। দ্বিতীয় দিনে সুকমলের বারো বছরের ছেলের জবাববন্দী অনেকটাই কাজে লেগেছে। চন্দ্রিমার সঙ্গে দিনের পর দিন সুকমলের দুর্ব‍্যবহারের কথা এবং অন‍্য একজন মহিলার সঙ্গে তাঁর অবৈধ সম্পর্কের কথা যতটুকু বুঝেছে, সবই জানিয়েছে সুকমল বসুর ছেলে তমজিৎ। তবুও বিবাদী পক্ষের ল-ইয়ার মিঃ দিনেশ মহাপাত্র লড়ে যাচ্ছেন সমানে। তমজিতের কথাগুলোকে চন্দ্রিমা বসুর বা সুদেষ্ণা রায়ের শেখানো কথা বলেই দাবি করছেন তিনি। তাই আজ কেসটাকে নতুন করে সাজিয়েছেন সুদেষ্ণা।

     অর্ডার... অর্ডার...জজসাহেবের হাতুরির শব্দে সচকিত হল বাদী, বিবাদী উভয়পক্ষের আইনজীবীরা। গলায় খানিকটা শ্লেষ ঝরিয়ে মিঃ মহাপাত্র বললেন― মহামান্য আদালত! আমার লার্নেড ফ্রেন্ড অ্যাডভোকেট এস রয় গত দুদিন ধরে অনেক যুক্তি দেখিয়েছেন, আমার মক্কেলকে দোষী সব‍্যস্ত করতে। আমি মনে করি সেগুলো সবই ভিত্তিহীন। কারণ আমার মক্কেল অধ‍্যাপক সুকমল বসু তাঁর স্ত্রীকে হত‍্যা করার চেষ্টা করছিলেন বলে যে অভিযোগ করা হয়েছে, তার সমর্থনে কোন প্রমাণ এখনো আদালতে পেশ করতে পারেননি তিনি। আমি মনে করি মিসেস চন্দ্রিমা বসু ব‍্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করতে সুকমল বসূর মত একজন উচ্চশিক্ষিত, ভদ্র, বিনয়ী ও সজ্জন মানুষের বিরুদ্ধে মিথ‍্যা অভিযোগ এনে তাঁকে হেনস্থা করতে চাইছেন। কারণ মিঃ বসুকে দোষী প্রমাণ করতে পারলে, ডিভোর্স ফাইল করার সুবিধা হবে তাঁর। আর তারপর তাঁর পছন্দের কোন মানুষের সঙ্গে অনায়াসে ঘর বাঁধতে পারবেন তিনি। 

সুদেষ্ণা বসু দৃঢ় কন্ঠস্বরে প্রতিবাদ করলেন ―অবজেকশন মি লর্ড। আমার বিরোধী পক্ষের উকিল অন‍্যায়ভাবে একজন ভদ্রমহিলার সম্বন্ধে অশালীন উক্তি করে চলেছেন গতকাল থেকে। আমার লার্নেড ফ্রেন্ড একটা হাস‍্যকর যুক্তি দেখিয়েছেন। সুকমল বসুর ছাদে বা বাড়িতে কোন সিসিটিভি ছিলনা। তাই বাড়ির ছাদ থেকে যখন তিনি তাঁর  স্ত্রীকে ঠেলে ফেলে দিচ্ছিলেন, তখন তার কোন প্রমাণ থাকা যে সম্ভব নয়, তা একটা শিশুও জানেন। আর যেহেতু তাঁদের সম্পর্কটা স্বামী-স্ত্রীর, সেহেতু সন্দেহের চোখেও তাদের দেখবেননা কোন আশপাশের মানুষেরাও। তাই তাঁদের ছাদে দেখলেও কোন গুরুত্ব দেবেনা কেউই। তাহলে এই ব‍্যাপারে প্রমাণ দেওয়া কি সম্ভব? তবে প্রফেসর সুকমল বসু যে একজন হীন চরিত্রের মানুষ সেটা আমি এখুনি আপনার সামনে প্রমাণ করে দেব। আমার আজকের সাক্ষী শ্রীমতি কনিকা রায়চৌধুরীকে আসতে দেওয়ার জন‍্য আমি অনুমতি জানাচ্ছি মহামান্য আদালতের কাছে।

      *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *

      ঈষৎ নুব্জ, শীর্ণ শরীরটাকে টেনে নিয়ে সাক্ষীর  কাঠগড়ায় দাঁড়ালেন কনিকা রায়চৌধুরী। ছেষট্টি বছর বয়সটা তেমন কিছু বেশি নয়। কিন্তু জীবনভর একটার পর একটা আঘাতে শরীরটা ভীষণভাবে ভেঙ্গে গেছে তাঁর। তাঁকে চিনতে কিছুটা অসুবিধা হলেও, নামটা কানে আসতেই চমকে উঠলেন সুকমল। এই মহিলার সন্ধান কি করে পেলেন মিস রায়?

কনিকার শপথবাক‍্য পাঠ শেষ হলে, সুদেষ্ণা শুরু করলেন সাক্ষ‍্য গ্ৰহণ।

―আপনার নাম?

―কনিকা রায়চৌধুরী।

―সুকমল বসুকে আপনি কি চেনেন?

―হ‍্যাঁ, যথেষ্ট ভালভাবেই চিনি।

―কিভাবে চেনেন ওনাকে?

―সুকমল বসু আমার একসময়ের ঘনিষ্ঠ বান্ধবী আল্পনা বসুর সন্তান।

―সুকমল বসুর সঙ্গে আপনার এখনও কি কোন যোগাযোগ আছে?

―না, ওইরকম একজন নোংরা চরিত্রের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার কোন প্রশ্নই ওঠেনা।

ততক্ষণাৎ মিঃ মহাপাত্র প্রতিবাদ করে উঠলেন

―অবজেকশন মি লড। কোন প্রমাণ না দেখিয়ে, আমার মক্কেলের সম্পর্কে এমন অশালীন মন্তব্য করতে পারেননা উনি।

সুদেষ্ণা বিরক্তগলায় প্রতিবাদ জানালেন

―মি লর্ড! আমার বিরোধীপক্ষের আইনজীবী অযথা বাঁধার সৃষ্টি করছেন আমার সাক্ষ‍্য গ্ৰহনের কাজে। 

জজসাহেব ওয়ার্নিং দেওয়ায় বসে পড়লেন মি মহাপাত্র।

সুদেষ্ণা বললেন―মিসেস কনিকা রায়চৌধুরী!আপনি এবার বলুন সুকমল বসুর সম্বন্ধে আপনি এমন আপত্তিকর মন্তব্য ক‍রলেন কেন?

কনিকা রায়চৌধুরী বলতে শুরু করলেন

―আজ থেকে ষোলোবছর আগে আমার স্বামীর আকস্মিক মৃত্যুর খবর পেয়ে, আমার বাড়িতে এসেছিল আল্পনা বসু তার ছেলে সুকমলকে সঙ্গে নিয়ে। আমার স্বামীর মৃত্যু হয়েছিল তার দু'মাস আগেই। আল্পনা ওইসময় হায়দারাবাদে তার দাদার কাছে ছিল। বাড়ি ফিরে খবরটা পেয়ে ছুটে এসেছিল ও। আমার মেয়ের তখনও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার রেজাল্ট আউট হয়নি। সেদিনই সুকমল আমার মেয়েকে ইংরেজি অনার্স নিয়ে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেয়। আমি আমার অক্ষমতার কথা জানালে, স্বেচ্ছায় বিনা পারিশ্রমিকে আমার মেয়েকে পড়ানোর দায়িত্ব নেয়। আমার মেয়ে ইংরেজি অনার্স নিয়ে ভর্তি হওয়ার পর, প্রত‍্যেক শনিবার ও রবিবার বাড়িতে এসে পড়াতো সুকমল। সপ্তাহের এই দুটোদিন আমি বাড়িতে থাকলেও বাকি দিনগুলোতে ছোটদের একটা প্রাইভেট স্কুলে পড়াতাম ও সন্ধ‍্যেয় দুটো বাড়িতে টিউশনি করতাম। কিছুদিন পর থেকে সুকমল শনি, রবিবারের পরিবর্তে সপ্তাহের অন‍্য দিনগুলোতে সন্ধ‍্যের দিকে পড়াতে আসতে শুরু করে। আমি মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয়ে কিছু বলতে পারতাম না। এর মধ্যে সুকমল আমার মেয়েকে জানায় যে ও তাকে ভালবাসে। তাকে জীবনসঙ্গিনী করে খুব তাড়াতাড়ি নিজের বাড়িতে নিয়ে যেতে চায়। তারপ‍র ও যতদূর ইচ্ছা পড়তে পারবে। প্রস্তাবটা শুনে খুব খুশি হয় আমার মেয়ে। আমি বাড়ি ফিরতেই কথাটা মেয়ে জানিয়েছিল আমাকে। মিথ্যা কথা বলবনা। ওমন সুপাত্র হাতে পেয়ে আমিও খুশি হই। তার মাসদুয়েক পর জানতে পারি, আমার মেয়ে প্রেগনেন্ট। আমি সেদিনই সুকমলকে বিয়ের প্রস্তাব দিই। ও নিজের দায় অস্বীকার করে। শুধু তাই নয়। অত‍্যন্ত রূঢ় ভাষায় অপমান করে আমাকে। সুকমল বলে ও কখনো বিয়ে করার প্রসঙ্গ তোলেনি। আমার মেয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মেশেওনি। সবই আমার মেয়ের বানানো কথা। ওর প্রেগন্যান্সির জন‍্য অন‍্য কেউ দায়ী। সুকমল আরো বলে যে এই কথা তার মাকে জানালে, তারাই উল্টে অপমানিত হবে। 

এই ঘটনার পর আমার মেয়ে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ে। লোকলজ্জার ভয়ে আমি ওকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে অ্যাবরশন করাই। একটা বছর গ‍্যাপ দিয়ে আমার মেয়ে আবার নতুন করে পড়াশোনা শুরু করে।

কনিকা রায়চৌধুরীর কথা শেষ হতেই, উঠে দাঁড়ালেন মিঃ মহাপাত্র― মি লর্ড! কনিকা রায়চৌধুরী যে কথাগুলো এতক্ষণ বললেন, সেগুলো যে সত্যি–তার কোন প্রমাণ কিন্তু নেই। এমনকি যে মেয়ের নাম করে আষাঢ়ে গল্প ফাঁদলেন কনিকা রায়চৌধুরী–সেই মেয়ের আদৌ কোন অস্তিত্ব আছে কিনা,তা কিন্তু জানা যায়নি।

সুদেষ্ণা রায়চৌধুরী ব‍্যাঙ্গের হাসি হাসলেন―আমার লার্নেড ফ্রেন্ডের ধৈর্যের দেখছি বড়ই অভাব। একটু অপেক্ষা করুন। তাহলেই সেই মেয়ের সাক্ষ‍্যও শুনতে পাবেন।

জজসাহেব হাতুড়ি ঠুকলেন। অর্ডার... অর্ডার। মিস এস রয়, আপনার আর কোন সাক্ষী আছে কি?

সুদেষ্ণা সচেতন হলেন― মি লর্ড! আমার দ্বিতীয় সাক্ষী শ্রীমতি আল্পনা বসু। তাঁকে আসতে অনুমতি দেওয়া হোক।

      *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *

      সাক্ষীর কাঠগড়ায় নিজের মাকে দেখে রীতিমতো চমকে উঠেছেন প্রফেসর সুকমল বসু।

আল্পনা জানালেন, সুকমল বসুর মা হিসেবে পরিচয় দিতে একসময় গর্ববোধ করলেও, আজ সেই পরিচয়ে পরিচিত হতে তিনি লজ্জা পান। তাঁর বান্ধবী শ্রীমতী কনিকা রায়চৌধুরী অত‍্যন্ত সৎ ও ভালমানুষ। তিনি এতক্ষণ যা বলেছেন, সবই সত্যি। এমনকি তাঁর পুত্রবধূ ও নাতি যা অভিযোগ করেছে তার ছেলের বিরুদ্ধে, সেগুলো সত্যি বলেই মনে করেন তিনি। ছেলেকে তিনি বিশ্বাস করেননা। ছেলের স্বভাবচরিত্র সম্বন্ধে বারবার অনেক কথা তিনি শুনেছেন। ছেলের এইসব কার্যকলাপকে কোনদিনই সমর্থন করেননি তিনি। তাই স্বামীর মৃত্যুর পর ছেলের কাছে না থেকে, তিনি ভাইপোর আশ্রয়ে থাকেন। 

সুদেষ্ণা বললেন―মি লর্ড! আপনি যদি অনুমতি দেন তাহলে আমার ও মিঃ সুকমল বসুর কিছু কথোপকথন শোনাতে পারি। 

অনুমতি পেয়ে টেপরেকর্ডার আদালতে পেশ করলেন সুদেষ্ণা। সুইচ অন করতেই শোনা গেল সুকমল বসুর কন্ঠস্বর―দেখুন মিস রায় রাগের মাথায় আমি সেদিন চন্দ্রিমার মোবাইলটা কেড়ে নিয়েছিলাম একটাই কারণে। আমার বারণ না শুনে ও ছেলের হস্টেলে ফোন করতে চেয়েছিল। এটা কি উচিত হচ্ছিল চন্দ্রিমার? ওই অবাধ‍্যতা কি সহ‍্য করা যায়?

―কিন্তু আপনি বললেন, মিসেস চন্দ্রিমা বসু আপনার বিরুদ্ধে এ্যাটেম টু মার্ডারের কেস করেছেন। সেটা কিভাবে?

―ও জানিয়েছে যে আমি ওকে ছাদ থেকে ফেলে মেরে ফেলতে চেয়েছি। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমি তেমন কোন কিছু করতে চাইনি। ছাদে গিয়ে মোবাইলটা নিয়ে ধাক্কাধাক্কি সেদিন হয়েছিল আমাদের মধ্যে। তাবলে ওকে ঠেলে ফেলে দেওয়ার ইচ্ছা আমার ছিলনা।

টেপ রেকর্ডারের সুইচ বন্ধ হলে সুদেষ্ণা বললেন ―মহামান্য আদালত! আসামী সুকমল বসু এতক্ষণ বলেছিলেন, যে এই ধরণের কোন ঘটনাই নাকি ঘটেনি। সবটাই বানানো গল্প। তার মানে এটাই প্রমাণিত হয় যে মিথ‍্যাকথা বলাটা সুকমল বসুর মজ্জাগত। তাই শপথবাক্য পাঠ করেও আদালতে দাঁড়িয়ে এভাবে মিথ‍্যাকথা বলেছেন উনি।

জাজের আসনে আসীন মিঃ মহীতোষ আঢ‍্য  বললেন―আপনার আর কোন সাক্ষী আছে?

―ইয়েস মি লর্ড। আমার শেষ সাক্ষী আমি নিজেই।কথাটা বলতে বলতে সাক্ষীর কাঠগড়ায় দাঁড়ালেন সুদেষ্ণা।

দীনেশ মহাপাত্র বললেন―মি লর্ড! আমার বিরোধী পক্ষের আইনজীবী বালখিল‍্য প্রদর্শন করে আদালতের মহামূল‍্য সময় নষ্ট করতে চাইছেন।

জাস্টিস মহীতোষ আঢ‍্য বললেন―মিস এস রায়! আপনি ঠিক কি করতে চাইছেন?

মি লর্ড! আমার বিরোধী পক্ষের আইনজীবী মিঃ দীনেশ মহাপাত্র সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন কনিকা রায়চৌধুরীর মেয়ের অস্তিত্ব আদৌ আছে কিনা, সেই নিয়ে। আমি আজ এই বিচারকক্ষে দাঁড়িয়ে সেই সত‍্যিটাই প্রমাণ করতে চাইছি। হ‍্যাঁ, আমিই কনিকা রায়চৌধুরীর সেই মেয়ে যে শিকার হয়েছিল সুকমল বসুর প্রতারণার।

আদালত কক্ষে একটা গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল।

আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা সুকমল বসুর মাথাটা ঝুলে গেল। 

অর্ডার... অর্ডার.... 

মুহূর্তে নিশ্চুপ হল বিচারকক্ষ।

জাস্টিস মহীতোষ আঢ‍্য রায় ঘোষনা করলেন―

সমস্ত সাক্ষ‍্য প্রমানের ভিত্তিতে, শ্রীমতী চন্দ্রিমা বসুকে হত‍্যার চেষ্টার অপরাধে ভারতীয় দন্ডবিধির 307 ধারা অনুসারে, মিঃ সুকমল বসুকে দশবছরের সশ্রম কারাদন্ড ও পঞ্চাশ হাজার টাকা জরিমানা ঘোষণা করা হইল।

     চরম মানসিক তৃপ্তি নিয়ে এজলাস থেকে বেরিয়ে এলেন সুদেষ্ণা রায়চৌধুরী। নিজের ফাইলপত্র গুছিয়ে নিয়ে কোর্টের বাইরে পা রাখতেই তাঁকে মুখোমুখি হতে হল অ্যাডভোকেট ঋতেশ চক্রবর্তীর। আজ এজলাসে অ্যাডভোকেট ঋতেশ চক্রবর্তীর উপস্থিতি, লক্ষ‍্য করেছিলেন সুদেষ্ণা। কালো কোর্ট ছিলনা তাঁর গায়ে। সাধারণ পোশাকে দর্শকের আসনে বসেছিলেন তিনি। ঋতেশ তাঁর ভীষণ ভাল বন্ধু। একই সঙ্গে ‛ল’ পড়েছিলেন দুজনে। তবে এর বাইরেও একটা সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন ঋতেশ পাঁচবছর আগেই। কিন্তু সেই ব‍্যাপারে ঘোরতর আপত্তি ছিল সুদেষ্ণার।  কথা প্রসঙ্গে ঋতেশকে একদিন জানিয়েছিলেন সুদেষ্ণা, তাঁর জীবনের একটা অন্ধকার দিক আছে। সেটা তাঁকে তাড়া করে বেড়ায়। এর বেশি কিছু বলেননি। আজ নিশ্চয় সবটুকু পরিষ্কার হয়েছে ঋতেশের কাছে। বুকটা আজ অনেকটা হালকা লাগছে সুদেষ্ণার।   

পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে ঋতেশ বললেন―কনিকা আন্টি চাইছিলেন তাঁর বান্ধবীকে আজ বাড়িতে নিয়ে যেতে। আর আমি চাইছিলাম আজ তোকে আমার গাড়িতে নিয়ে যেতে। তাই তোর ড্রাইভার দীপককে দিয়ে ওদের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি। তুই আবার রেগে যাবিনা তো?

কোন কথা না বলে, পূর্ণ দৃষ্টি মেলে ঋতেশের দিকে তাকালেন সুদেষ্ণা।

নিজের গাড়িতে উঠে, আর এক ধাপ এগোলেন ঋতেশ ― আজকে আমারও খুব ভাললাগছে, সুকমল বসুর মত মুখোশধারী শয়তানটা শাস্তি পাওয়ায়। তবে আজ তোর কাছে আমার একটাই অনুরোধ, এভাবে দূরে সরিয়ে রেখে, আর মানসিক শাস্তি দিসনা আমাকে।

মিষ্টি করে হেসে ঋতেশের দিকে নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিলেন সুদেষ্ণা। মনে মনে তৈরী হয়েই ছিলেন ঋতেশ। নিজের দুহাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরলেন সেই হাতদুটোকে।

                

রাকেশ ঘোষাল

Comments

Popular posts from this blog

গ্রীষ্মের_ছুটিতে ছাত্রের লেখা খোলা চিঠি