আনন্দম
সুমি দিনের পর দিন খাওয়া,ঘুম এমনকি কারো সাথে কথা বলাও বন্ধ করে দিচ্ছে।এ নিয়ে ভীষণ চিন্তিত সুমির বাবা,মা,জেঠু জেঠিমা,দাদারা সবাই।এই ঘোষ বাড়ির একমাত্র মেয়ে সুমি।তার এমন কষ্ট দেখে সবার মন খারাপ।সুমির তিন দাদা বিভিন্ন ভাবে চেষ্টা করছে সুমির মুখে হাসি ফোটানোর কিন্তু তারাও ব্যর্থ।
মাস ছয়েক আগে মহা ধুমধাম করে বিয়ে হয়েছিল সুমির,শহরের এক ব্যবসায়ী বনেদি পরিবারে।লাজুক,স্বল্পভাষী সুমি তার বাবা,মা,জেঠু,জেঠিমার পছন্দ করা ছেলেকেই স্বামী হিসাবে গ্ৰহণ করেছিল।বেশ সুখে ছিল সুমি,বিয়ের পর প্রথম কয়েকটা দিন।কিন্তু সে সুখ বেশিদিন টেকেনি।বিয়ের তিন মাসের মধ্যেই একটা ভয়ঙ্কর পথ দুর্ঘটনায় মারা যায় সুমির স্বামী।শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সব রাগ গিয়ে পড়ে সুমির উপর।সুমি বোঝার চেষ্টা করেছে যে সে কি তার স্বামীর মৃত্যুর জন্য দায়ী?যে সবাই তাকে দোষারোপ করছে। কিন্তু সে পারেনি।একে সদ্য বিবাহিত স্ত্রীর স্বামী হারানোর যন্ত্রণা তার উপর পরিবারের লোকের অপমান,দুর্ব্যবহার সুমিকে অস্থির করে তুলেছিল।সুমির স্বামীর মৃত্যু সংবাদ পেয়ে ছুটে এসেছিল ঘোষ বাড়ির তিন ছেলে আর সুমির তিন দাদা।শ্রাদ্ধের নিয়ম-কানুন সব শেষ হলেই তারা বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে গেছিল তাদের আদরের মেয়েকে।
কিন্তু পুরো ব্যাপারটা এতোটা যন্ত্রনাদায়ক ছিল সুমির কাছে।সুমি দিনের পর দিন অসুস্থ হয়ে পড়তে লাগলো।ত্যাগ করলো নাওয়া,খাওয়া।সুমির ঠাকুমা মল্লিকা দেবীর বয়স আশি ছুঁইছুঁই।তিনিও খুব চিন্তিত সুমিকে নিয়ে।হাসিখুশি মেয়েটা দিনের পর দিন কেমন যেনো হয়ে যাচ্ছে।এ ঘরে আর আসেই না।নিজেকে বন্দী করে রাখে নিজের ঘরে।মল্লিকা দেবীর চার নাতি নাতনিই খুব আদরের।তাদের কষ্ট দেখে আর চুপ থাকতে পারলেন না তিনি।বড় বৌমাকে বললেন-"আমার তিন নাতি রাতে বাড়ি ফিরলে খাওয়ার পর যেনো আমার ঘরে আসে।আমার তাদের সাথে কথা আছে।"
সেদিন রাতে খাওয়াদাওয়ার পর তিন নাতিই এলো ঠাকুমার ঘরে।এসে বললো-"ঠাম্মা আমাদের ডেকেছিলে?"
মল্লিকা দেবী বললেন-"হ্যাঁ।এবার যাও তোমরা তিনজন মিলে তোমাদের বোনকে নিয়ে এসো এই ঘরে।"
তিন নাতি কিছু সময় পর সুমিকে নিয়ে এলো এই ঘরে।মল্লিকা দেবী বললেন-"এবার সবাই আমার কাছে এসে বসো।"
নাতিরা বললো-"ঠাম্মা ছোট বেলায় মতো গল্প শোনাবে নাকি আজ?"
মল্লিকা দেবী বললেন-"হ্যাঁ দাদুভাই শোনাবো,আমার জীবনের গল্প।"
সুমির মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন-"সোনা মা তুই আর আমার কাছে আসিস না।ঠাম্মি বলে ডাকিস না।তোর কষ্ট দেখে এই বুড়িটার কতো কষ্ট হয় বুঝিস না?"
সুমি কাঁদতে কাঁদতে বললো-"ঠাম্মা ওরা বলে অনিমেষের মৃত্যুর জন্য আমি দায়ী। তুমি বলো ঠাম্মা আমি নিজের স্বামীর মৃত্যু কখনো চাইতে পারি?জানো ঠাম্মি সেদিন শুনলাম বাবা আর জেঠু বলছে আমাকে আবার বিয়ে দেবে আমার।"
সস্নেহে কাপড়ের আঁচল নিয়ে নাতনির চোখের জল মুছিয়ে মল্লিকা দেবী বললেন- "না কখনোই কেউ তার স্বামীর মৃত্যু চায় না আর তুমি অনিমেষের মৃত্যুর জন্য দায়ী নও এটা তো তুমি জানো সোনা মা।তাও অন্যের কথা শুনে কষ্ট কেনো পাবে?আর তোমার জীবনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সবচেয়ে বেশি অধিকার তোমার।বাবা জেঠুরা হয়তো তোমার ভবিষ্যত ভেবে এসব বলেছেন।আমি ওদের সাথে কথা বলবো।"
সুমিকে বললেন-"আমার কোলে মাথা রেখে শুয়ে থাক।আজ আমি শোনাবো আমার জীবনের গল্প তারপর তুমি ঠিক করবে তোমার সিদ্ধান্ত।"
চার নাতি নাতনী উৎসুক হয়ে তাকিয়ে আছে মল্লিকা দেবীর দিকে।মল্লিকা দেবী বলতে শুরু করলেন-
"গ্ৰামের উচ্চবিত্ত ব্রাহ্মণ পরিবারের মেয়ে আমি।বাবা মারা গেছিলেন ছোটবেলায়। অসুস্থ মা আর দুই দাদার সংসার।বড় দাদা বিয়ে করে বৌ এনেছিল সংসারে। জায়গা জমি সম্পত্তির জোরেই গ্ৰামে বেশ বিত্তশালী ছিল আমাদের পরিবার। ছেলেবেলায় পাঠশালায় পড়তাম আমি সেখানেই প্রথম দেখেছিলাম তোদের দাদুকে।বয়সে পাঁচ ছয় বছরের বড় ছিল আমার চেয়ে।
তখন আমার বয়স চোদ্দ।প্রথম চিঠি পেয়েছিলাম তোমাদের দাদুর বোন মানে আমার সই বকুলের হাতে।চিঠিতে প্রথম ভালোলাগা আর ভালোবাসার কথা জানিয়েছিল তোমাদের দাদু।আমিও ভালোবাসার প্রথম প্রস্তাবে মনে মনে সম্মত্তি দিয়েই দিয়েছিলাম। তারপর থেকে চলতো চিঠি পাঠানো দু তরফ থেকে।চিঠি দেওয়া নেওয়া হতো আমার সই বকুলের হাত ধরেই।তোমাদের দাদুকে সামনে দেখলেই ভীষণ লজ্জা পেতাম কোনো কথাই বলতে পারতাম না আমি।ততদিনে বিয়ের জন্য দেখাশোনা শুরু হয়ে গেছে আমার।বড় বৌদিকে মনের কথা জানালাম।বৌদি দাদাকে জানাতেই দুই দাদা চরম অশান্তি শুরু করলো।বললো এই মেয়ে আমাদের বংশের মান সম্মান ডোবাবে।ব্রাহ্মণের মেয়ে হয়ে কায়স্থর ছেলেকে নিয়ে ঘর করার স্বপ্ন!
তড়িঘড়ি তারা আমার জন্য পাত্র দেখতে শুরু করলো। বন্ধু বকুলের বাড়িতে আসা বন্ধ হল।দাদারা জমিদার বাড়ির আত্মীয় হয়ে সম্মান পাওয়ার আশায় আমার বিয়ে ঠিক করলো জমিদারের অসুস্থ ছেলের সাথেই।ছোট থেকেই সে কথা বলতে বা হাঁটাচলা করতে অসমর্থ।আমি খুব কেঁদেছিলাম।অসুস্থ মায়ের কোনো কথাই দাদারা না শুনে আমার বিয়ে দিয়ে দিল জমিদারের ছেলের সাথে।
বিয়ের কয়েক মাসের মধ্যেই জমিদারের অসুস্থ ছেলে মারা গেল।আমাকে তোমার চেয়ে অনেক বেশী কথা শুনতে হয়েছিল দিদিভাই।তখনকার সমাজ তো অনেক পিছিয়ে।শেষে আমার ঠাঁই হলো দাদাদের সংসারে।দিনের পর দিন আমি পালন করছিলাম কঠোর বৈধব্য।আস্তে আস্তে ভুলতে বসেছিলাম আমিষ খাবারের স্বাদ।একটা বছর কাটলো ততদিনে মা স্বর্গলাভ করেছেন ছোট দাদাও বৌদি এনেছে বাড়িতে।
মায়ের মৃত্যুর পর মনে হতো ওই সংসারে আমি কেবল একটা বোঝা।বড় বৌদি বদলে গেল।প্রতিনিয়ত শুনতে হতো অপমান।মাঝে মাঝে মনে হতো কি হবে বেঁচে থেকে শেষ করে দিই নিজেকে। তারপর বছর দেড়েক পরে পাশের বাড়ির এক ছোট ভাইপোর হাত থেকে আবারো একটা চিঠি পেলাম।তোমাদের দাদুর চিঠি।
লেখা ছিল - "আজ ভোরে তোমাদের বাগানের দক্ষিণের পুকুর পাড়ে অপেক্ষা করবো তোমার জন্য।"
তখন তো আমার বুক দুরুদুরু।বিধবার একবার বদনাম হলে আর রক্ষা নেই।দাদাদের সংসারেও আর জায়গা হবে না আমার।স জীবনের প্রথম ভালোবাসার মানুষের ডাককে উপেক্ষা করতে পারলাম না আমি।সেদিন সারারাত ঘুমাইনি।ভোরে সবার অজান্তে নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে দেখলাম তোমাদের দাদুকে।বললো বসো পাশে।আমি ইতস্তত করছি দেখে বললো বসোই না।তারপর বললো-"অনেক চেষ্টা করেছিলাম বাড়িতে বোঝাতে কেউ বোঝেনি।তোমাকে একটিবার দেখার জন্য সারাদিন ঘুরেছি তোমাদের বাড়ির আশেপাশে,পাইনি দেখতে।একটা চিঠিও পৌঁছে দিতে পারিনি তোমার কাছে।তারপর শুনলাম জমিদারের ছেলের সাথে বিয়ে হচ্ছে তোমার।আর সহ্য করতে পারিনি শহরে পড়তে চলে গেছিলাম।তারপর আর গ্ৰামে ফিরিনি। বকুল তার স্বামীর সাথে আমার মেস বাড়িতে গিয়ে তোমার ব্যাপারে সবকিছু জানায়।আর থাকতে না পেরে ছুটে এসেছি তোমার কাছে।আমরা কি আবার নতুন করে শুরু করতে পারি না?"
আমি আঁতকে উঠে বলেছিলাম-"আমি যে বিধবা।সমাজ কি বলবে?"
তোমার দাদু বলেছিল-"তোমার যন্ত্রনায় ভাগ কি নিয়েছে সমাজ?যে নিতে চায় তাকেও তুমি ফিরিয়ে দেবে?আমি কাল ভোরে ঠিক এইসময় আসবো যদি সব ছেড়ে আমার হাত ধরতে পারো তো এসো। তোমাকে নিয়ে চলে যাবো এই দুঃখের জীবন থেকে অনেক দূরে।এখন বাড়ি যাও ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে।"
সারাটা দিন আমি ভেবেছিলাম সেদিন।রাতে মনস্থির করে নিজের কয়েকটা জামাকাপড় একটা পুঁটুলিতে নিয়ে তোমাদের দাদুর হাত ধরে আমি চলে আসি শহরে।এখানেই নতুন করে সংসার পাতি।তোমাদের দাদুর ছোট্ট ব্যবসাটাই আজ এ বাড়ির ছেলেরা আর শ খানেক কর্মচারী মিলে সামলাতে হিমশিম খায়।আমি কিন্তু জীবনে সুখি হয়েছি।মা হয়েছি,ঠাকুমা হয়েছি।তোমাদের দাদুর বাড়ি থেকেও একসময় মেনে নিয়েছিলেন আমাকে।কিন্তু আমার দাদারা কোনো খোঁজ নেয়নি আমার কখনো।শুনেছিলাম আমাকে সমাজের লোক অনেক খারাপ কথা বলেছে।বিধবা5 মেয়ের ভালোবাসা কে কেউ ভালো চোখে দেখেনি।"
চার নাতি নাতনি হাঁ করে শুনছিল এতো সময়।ছোট নাতি বললো-"দাদু তো তাহলে হিরো ছিল আমাদের।"
মল্লিকা দেবী চোখের কোণের জল মুছে বললেন-"হ্যাঁ দাদুভাই তোমাদের দাদু হিরোই ছিলেন।এই হাতটা একবার ধরে কখনো ছাড়েননি।এমনকি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন আমার হাত দুটো ধরে। আমার জীবনের এতো গল্প আমার তিন ছেলেরও অজানা।কিন্তু আমি আজ তোমাদের সব কিছু বললাম আর দিদিভাই তুমি বুঝলে তো?তখনকার সমাজে থেকে আমি যদি পারি তুমি কেনো পারবে না?"
সুমি তার ঠাম্মার দিকে তাকিয়ে আছে চোখে তার জলে ভরা।মল্লিকা দেবী বললেন-"তুমি শিক্ষিত মেয়ে তুমি কেনো হেরে যাবে জীবনের কাছে?এমন কোনো ব্যাপার নেই যে ভালো থাকতে গেলে তোমাকে কোনো পুরুষের হাত ধরতেই হবে।কিন্তু তোমাকে ভেঙে পড়লে চলবে না নিজেকে স্বাবলম্বী হয়ে বাঁচতে হবে।আর জীবনের কোনো সময় যদি তোমার একটা পরিবারের বাইরে আরো একটা শক্ত হাতের প্রয়োজন হয় তুমি অবশ্যই তা ধরবে সেটা কোনো অন্যায় বা খারাপ কাজ নয়।তোমার বাবা মা তোমার কষ্ট লাঘব করতে ওরকম ভেবেছে যাতে তুমি খুশি থাকো,সুখী থাকো।তুমি না চাইলে কখনো তারা জোর করতে পারে না।এবার যাও নিজেদের ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো।নাতি নাতনিরা ঠাম্মার জীবনের গল্প শুনে খুশি মনে যে যার ঘরে ফিরে গেল।
পরের দিন সকালে দেখা গেল সুমি একটা সুন্দর সালোয়ার পরে তৈরি। কাঁধে একটা ব্যাগ। দাদাদের পাশে বসে খেতে খেতে বললো-"দাদা আমাকে আগে যে কোচিং সেন্টারে পড়তাম কম্পিটিটিভ সেখানে ছেড়ে দিয়ে যাস তো।স্যারকে কাল রাতে ফোন করেছিলাম আজ থেকে যেতে বলেছে।"
খাওয়া শেষে সুমি বেরিয়ে গেল দাদাদের সাথে। সুমির মা,জেঠিমারা চোখের জল মুছলেন।এ যে আনন্দের অশ্রু।
রাকেশ ঘোষাল
Comments
Post a Comment