সুখ

 



শপিং মল থেকে বেরিয়ে বিল গুলো ভালো করে একবার দেখে নিচ্ছিল অদিতি। হিসেব মেলাচ্ছিলো ঠিকই কিন্তু বার বার চোখ চলে যাচ্ছিল রাস্তার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার দিকে। কী ভীষণ চেনা মুখ! আবার পুরোটা মিলছেও না মনে ভেসে ওঠা মুখটার সাথে। অনেকক্ষণ স্মৃতির সাথে লড়াই চালিয়ে সটাং রাস্তা পেরিয়ে মেয়েটার কাঁধে হাত রেখে বললো, "সুমি না? "

সঙ্গে সঙ্গে চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো সামনের জনেরও, "আরে অদিতি! ...কেমন আছিস? সেই তো কলেজের পর বিয়ে করে বেপাত্তা..."

-"আমি ভালোই আছি কিন্তু তোর চেহারার এই দশা কেন? আমি তো প্রথমে চিনতেই পারিনি..."

-"আর চেহারা...এই ঠিক আছে, তারপর আর কি খবর বল, কোথায় এসেছিলি? এখন থাকিস কোথায়?"

-"সব কথা এখানেই হবে নাকি? চল ঐপারে আমার গাড়ি দাঁড়িয়ে, যেতে যেতে কথা হবে, সামনেই ভাল ক্যাফেটেরিয়া আছে , বসি গিয়ে?"

-না রে আজ না অন্যদিন , আজ তাড়া আছে...এই যে বাজার করলাম , বাড়ি গিয়ে রান্না চাপাবো, ওদিকে কত্তামশাই দাঁড়িয়ে থাকবে। 

-উফফ ! আচ্ছা তুই কোন দিকে যাবি?...

-আমি তো চৌমাথা থেকে হেঁটে চলে যাবো... ঐদিকেই আমার বাড়ি।

-ওকে ওকে, আমিও ওদিক হয়েই যাবো। চল নামিয়ে দি। 

সুমিকে ভালো করে জরিপ করেই বুঝে গেছে অদিতি, ওর অর্থনৈতিক অবস্থা মোটেই ভালো নয়। গায়ে একটা পাতি সেমিসিল্ক শাড়ি, চুল রুক্ষ, স্কিন দেখে বোঝা যাচ্ছে দীর্ঘ দিন কোনো  পরিচর্যা নেই অথচ এই মেয়েটা কলেজ কাঁপাত গলার আওয়াজ দিয়ে, কী অসাধারণ আবৃত্তি করতো!  তেমন ছিল ডিবেটে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। বেশ অহংকারী ছিল , সেই আন্দাজে অদিতি চুপসে থাকতো। 

তবে আজ অদিতির নিজেকে খুব জাহির করতে ইচ্ছে হচ্ছিল , কেমন যেন নিজেকে জিতে যাওয়া মনে হচ্ছিল। নিজের দামি ব্র্যান্ডেড কুর্তি , রিস্ট ওয়াচ বার বার ঠিক করছিল, হাত নাড়িয়ে চাড়িয়ে দামি ফোনটা যেন দেখানোর জন্যই ধরে ছিল। কথায় কথায় নিজের স্বামীর মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানির মোটা অংকের মাইনের কথাটাও শুনিয়ে দিলো,  বিশাল থ্রি-বি-এইচ-কে ফ্ল্যাটের কথা, ইয়ারলি বিদেশে বেড়াতে যাওয়া, নামি পার্লারে ফেসিয়াল করা, গাড়ি ছাড়া না চলতে পারার অভ্যাস ... সব মিলিয়ে সে যে সুমির চেয়ে অনেক সুখী তার ছোটখাটো একটা প্রদর্শনী সাজিয়ে ফেললো। 

-চৌমাথা এসে গেছে রে, আমি নামি? ওই যে আমার উনি দাঁড়িয়ে আছেন...আসি রে। 

সুমি নেমে গিয়ে রাস্তা পার হয়ে তার স্বামীর কাছে এগিয়ে গেলো। রাস্তার পাশে একটা ফুচকার দোকানে দাঁড়িয়ে পড়লো দুজনে। সুমির ফেসিয়ালবিহীন মুখটাই কী ভীষণ চকচক করছিল! এতক্ষণ ধরে তৈরি করা তার রংচঙে সুখের বৃত্তান্তকে  কিভাবে হেলায় ঠেলে চলে গেল সুমি!  বালির বাড়ির ওপর অবহেলায় বয়ে যাওয়া একটা ঢেউএর মত লাগছিলো সুমিকে। নাঃ, আজও সেই কলেজের মতই রয়েছে সুমি, অপ্রতিদ্বন্দ্বী। জানলার কাঁচ নামিয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো অদিতি , সুমির সত্যিকারের "সুখের" দিকে। 


রাকেশ ঘোষাল

Comments

Popular posts from this blog

গ্রীষ্মের_ছুটিতে ছাত্রের লেখা খোলা চিঠি