থাক তবু স্মৃতিটুকু
গোল্ডেন-ফ্রেমের হাই পাওয়ারের চশমাটা চোখ থেকে সামান্য নামিয়ে, চোখের কোনায় এসে যাওয়া জলের কণাটা আঙ্গুলের ডগায় মুছে ফেললেন মিসেস মল্লিকা সেন।একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল বুকের ভেতর থেকে। রথযাত্রার এই বিশেষ দিনটায় যে বিশেষ মানুষটার কথা স্মৃতিপটে আজও ভেসে ওঠে,সে মল্লিকার শৈশবের ভাললাগার একজন নিতান্ত সাধারণ ষাটোর্ধ্ব মানুষ।তার নাম,পদবী কোনটাই জানা ছিলনা।সারা পাড়ার আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সবাইকার কাছে ওর একটাই পরিচয় ছিল,ব্যানার্জীদের মালি।শুধু ‛মালি’বলেই ডাকতো সবাই।সবাইকার দেখাদেখি মল্লিকাও মালি বলেই ডাকতেন ওকে।ব্যানার্জীদের বাড়িটা মল্লিকাদের বাড়ির লাগোয়া থাকলেও, বাগানটা ছিল একটু দূরে।নারকেল,আম,পেয়ারা, জাম,জামরুলের গাছে ভরা একটা ছোটখাট বাগান।বাগানটায় কোন বাউন্ডারী-ওয়াল না থাকায় পাড়ার ছেলে-মেয়েদের খেলার জায়গা ছিল ওটা।অবশ্য শুধু খেলা নয়,তার সঙ্গে চলতো বাগানের গাছগুলোর ওপর অত্যাচার।
মল্লিকা তখন সবে স্কুল যেতে শুরু করেছেন। শিশুশ্রেণীতে ভর্তি হয়েছেন কমাস আগেই।প্রাইমারীতে ইউনিফর্মের তখন কোন বালাই ছিল না।নিজের পছন্দের একটা লাল ফ্রক পরে কজন বন্ধুর সঙ্গে স্কুল থেকে ফিরছিলেন মল্লিকা।ফেরার পথে নিত্যদিনের মতো ঢুকে পড়েছিলেন বাগানে।গাছ থেকে তখন টোপাটোপা জাম মাটিতে পড়ছে।কে কতগুলো কুড়ুতে পারে, রোজই চলতো তার কম্পিটিশন।কিন্তু সেদিন ঢুকতে গিয়েই বাধা পেতে হল।কোথা থেকে এক পাকানো গোঁফওয়ালা বলিষ্ঠ চেহারার মানুষ এসে সামনে দাঁড়াল। বলল―হামি ই বাগানের মালি আছে।
ওকে দেখে সকলের আত্মারাম তো খাঁচাছাড়া।মনে হয়েছিল―যা বাবা, এ আপদ আবার কোথা থেকে জুটলো?ভয়ে সবাই ছুটে পালিয়ে আসছিলো।মালি ঝট করে এসে মল্লিকার হাতটা চেপে ধরেছিল।দৃশ্যটা দেখে শিউলি কিছুটা দূর থেকে চ্যাঁচাচ্ছিল―পালিয়ে আয় মলি।
বর্তমান যুগের মতো সেসময় মানুষের মনের মধ্যে এতটা কলুষতা প্রবেশ করেনি।অচেনা মানুষ দেখলে ছোট ছেলে বা মেয়েরা তাদের ভয় পেতো ছেলেধরা ভেবে। অন্য কোন ভয় ছোটদের ছিলনা। এই ছেলেধরাদের নিয়ে সেসময় মানুষের মুখে মুখে অনেক রকম গল্প ফিরতো।
সবাই পালাতে পারলেও পালাতে পারেননি মল্লিকা। একা বন্দী হয়ে গিয়ে ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলেছিলেন।মালি বলেছিল―ম্যায় হুঁ মালি।তুম ভি মালি?
ভয় করলেও মনে সাহস আনার চেষ্টা করেছিলেন মল্লিকা।কাঁপা কাঁপা গলায় বলেছিলেন―তুমি মালি।আমি মালি নয়,মলি।আমায় ছেড়ে দাও।
তাঁকে শান্ত করতে ভাঙাভাঙা বাংলায় যা বলেছিল মালি তার অর্থ এই ছিল যে ও মল্লিকাকে কিছু বলবে না।আর ওই লাল জামাটা পরে ওখানে গেলে,পরদিন মল্লিকাকে পেয়ারা দেবে, জাম দেবে।তবে একা যেতে হবে।আর সে মল্লিকাকে গুড্ডি নামে ডাকবে
ছোট্ট থেকেই খুব সাহসী ছিলেন মল্লিকা।পরদিন সবাই স্কুল থেকে বেরোনোর আগে একছুটে বাগানে চলে এসেছিলেন।মালি ওর কথা রেখে পেয়ারা আর জাম দিয়েছিল।কিন্তু ওগুলো ওই বাগানের ছিল না। জি টি রোডের ধারে ছাগল চরাতে গিয়ে ও নিয়ে এসেছিল ওগুলো।বাগানের ফল দিতে না পারার জন্য যে যুক্তি ও দেখিয়েছিল, তার গুরুত্ব তখন না বুঝলেও বড় হয়ে বুঝেছিলেন মল্লিকা।আর তখন ওকে আদর্শবান একজন মানুষ বলে মনে হয়েছিল।
বাগানের একপ্রান্তে দুটো টালির চালের ছোট ছোট ঘর ছিল।ওই ঘর দুটো নিয়ে মালি একা থাকতো।না,একা বললে ভুল হবে।আসার সময় ও সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল চার-পাঁচটা ছাগল আর দুটো রামছাগল।রামছাগলগুলোর গা দিয়ে বিশ্রী গন্ধ বেরুতো।তবু মল্লিকা সুযোগ পেলে প্রায় দিনই মালির ঘরের সামনে দাঁড়াতেন।মালি তাঁর জন্যে সংগ্ৰহ করে রাখতো কয়েতবেল,পেয়ারা, কুল কি কামরাঙ্গা।
শুধু যে কুল,পেয়ারার লোভে ওখানে যেতে ইচ্ছা করতো তাঁর তা নয়।নিজে না খেয়ে অনেক সময় বন্ধুদের মধ্যে বিলিয়েও দিতেন।তবু যেতেন কিসের এক টানে।ওই ছোট্ট বয়সেই মল্লিকা বুঝতে পারতেন মালি মানুষটা খুব দুঃখী।মল্লিকার ফিতে বাঁধা চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে কেঁদে ফেলতো মালি।একদিন না গেলে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতো মানুষটা মল্লিকার জন্যে।
* * * * * * * * * * *
বেশ লম্বা-চওড়া চেহারা ছিল মালির। গায়ের রঙ ছিল তামাটে ফর্সা।একটা খেটো ধুতি পরতো।আর গায়ে থাকতো গামছা।তবে মাঝে মাঝে গায়ে একটা ফতুয়া ধরনের জামা পড়তো।একটা একটা করে দিন মাস যতই পেরিয়ে যাচ্ছিল,ততই মালির প্রতি ভালোলাগা বাড়ছিল মল্লিকার।
মধ্যবিত্ত রুচিশীল একটা বাড়ির মেয়ে হয়ে, মল্লিকার মালির কাছে যাওয়াটা খুবই দৃষ্টিকটূ ব্যাপার ছিল।লোকের মুখে মালির মল্লিকার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করার খবরটা পেয়ে গিয়েছিলেন মা। খুব বকাবকি করেছিলেন মল্লিকাকে। বলেছিলেন―উটকো একটা লোকের কাছে যাস কেন? ও যদি কোনদিন তোকে লুকিয়ে নিয়ে পালায় আর তারপর বিক্রি করে দেয়, কি করবি তখন? ওর আদর খাওয়া, পেয়ারা ,কুল খাওয়া তখন বেরিয়ে যাবে।
সেদিন মিষ্টি গোলগাল চেহারার মলি গাল ফুলিয়ে বলেছিলেন―আমাকে তো রাস্তায় দেখলে সবাই আদর করে গাল টিপে দেয়।তাহলে মালি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলে কি হবে?
মুখে মুখে তর্ক করার জন্যে মা চড় মেরে ছিলেন।বাবা অবশ্য মাকেই বকেছিলেন।বলেছিলেন―আমি জানি মালি খুব ভালো মানুষ।ও গরীব বলে কি একটা বাচ্ছা মেয়েকে একটু ভালবাসতে পারবে না?
বাবার সাপোর্ট থাকার জন্যে, মালির কাছে যাওয়া বন্ধ হয়নি মল্লিকার।
দেখতে দেখতে দুবছর পেরিয়ে গিয়েছিল।মল্লিকার তখন ক্লাস-টূ।তখনই একদিন মল্লিকার কাছে নিজের জীবনের কষ্টের কথা বলেছিল মালি।উত্তরপ্রদেশের কোন এক পাহাড়ি গ্ৰামে বাড়ি ছিল মালির।মহামারীতে মারা যায় মালির বৌ,দুই ছেলে আর ছোট্ট মেয়েটা।তার নাম ছিল গুড্ডি।সে মাথায় লাল ফিতে বাঁধতো।তার একটা লাল জামা ছিল।সেটা পরলে তাকে মল্লিকার মতোই সুন্দর লাগতো।ওরা সবাই মারা যাওয়ার পর আর ঘরে থাকতে পারেনি মালি।তখন থেকেই সে যাযাবর।এসব শুনে খুব কষ্ট হয়েছিল মল্লিকার।
* * * * * * * * *
সেদিন ছিল রথ।গ্ৰামে রথের বেশ বড় মেলা বসতো। দুবছর ওখানে থাকার দরুন মেলার খবরটা জানতো মালি।রথের দিন ভোর বেলা থেকে রাস্তায় বারবার ঘুরঘুর করছিল মালি, শুধু মল্লিকাকে ডাকার জন্যে।জানালা দিয়ে মালিকে দেখতে পেয়ে, ইশারায় তাকে চলে যেতে বলেছিলেন মল্লিকা।কিছুক্ষণ পরই নিজে হাজির হয়েছিলেন মালির কাছে।মালি তার ন্যাকড়ার ছোট্ট তবিল থেকে একটা আধুলি বার করে মল্লিকার হাতে দিয়েছিল।মল্লিকা মায়ের ভয়ে পয়সাটা নিতে সাহস পাচ্ছিলেন না।কিন্তু মালির চোখে জল দেখে, না নিয়ে পারেননি।তবে পয়সাটা খরচ করতে পারেননি সকলের চোখ বাঁচিয়ে।বইয়ের ব্যাগে লুকিয়ে রেখেছিলেন।
মাসখানেক পরই ব্যানার্জী-পরিবার পৃথক হল।বাগান কেটে ওখানে বাড়ি তৈরী হওয়ার তোড়জোড় শুরু হল।অনেক লোক এল গাছ কাটতে।শোনা গেল মালির ঘর ভেঙ্গে দেওয়া হবে।তাই মালিকে চলে যেতে হবে ওখান থেকে।খবরটা শুনেই মল্লিকা ছুটেছিলেন মালির কাছে।মালি তখন পোঁটলা-পুঁটলি বাঁধছিল।কাঁদতে কাঁদতে মল্লিকার মাথায়, গালে মুখে হাত বুলিয়ে বলেছিল―গুড্ডি বেটি!তুমি ভালো থাকবে।পড়া-লেখা করে বহুত বড়া হোবে।
মল্লিকা মালির চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বলেছিল―তুমি আর আসবে না মালি?
মালি ভাঙ্গা গলায় বলেছিল―জরুর আসবে বেটি।
না আর কোনদিন ফিরে আসেনি মালি।ছাগলগুলোকে বিক্রি করে দিয়েছিল যাওয়ার আগে।বিকেল বেলায় কাঁধে দুটো বড় পুঁটলি আর হাতে একটা শক্ত লাঠি নিয়ে স্টেশনের রাস্তা ধরে যখন হাঁটছিল মালি, তখন বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠেছিল মল্লিকার।বাড়ি ফিরে বইয়ের ব্যাগ থেকে আধুলিটা বার করেছিলেন।সেটা হাতের মুঠোয় ধরে অনেক কেঁদেছিলেন।
বড় হয়ে যখন রবীন্দ্রনাথের ‛কাবুলীওয়ালা’ পড়েছিলেন মল্লিকা, তখন কাবুলীওয়ালার চরিত্রে মনে মনে মালিকে বসিয়েছিলেন।আর নিজেকে বসিয়েছিলেন মিনির জায়গায়।
এরপর পেরিয়ে গেছে অনেক অনেক বছর।মিসেস মল্লিকা সেন এখন অভিজাত পরিবারের সর্বোময় কত্রী। তাঁর ব্যাঙ্ক-ব্যালেন্স যথেষ্ট উঁচু সীমায়। তবুও তাঁর ব্যক্তিগত আলমারির লকারে আজও সযত্নে রক্ষিত আছে মালির দেওয়া সেই আধুলিটা,তাঁর প্রিয় মানুষটার স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে।
রাকেশ ঘোষাল
Comments
Post a Comment