অ্যাক্সিডেন্ট
ব্যাপার সেক্সি, লিফ্ট চাই? রাস্তায় দাঁড়িয়ে এমন কাঁপছো কেন বেবি?
আমার বাইকের পিছনের সিটে উঠে আমায় জড়িয়ে ধরে বসো।
ভয়ে ভয়েই ছেলেটার দিকে তাকালো সমাপ্তি।
ব্রাউন চুল, চোখে নীলচে সানগ্লাস, কানে দুল...
জিভ দিয়ে নিজের ঠোঁটটা চাটছে ছেলেটা।
আর কুৎসিত গলায় বলছে, চলে এসো সোনা, এখুনি সিগন্যাল গ্রীন হয়ে যাবে।
রেড সিগন্যালের দিকে তাকিয়েই আরেকবার রাস্তাটা পেরোনোর চেষ্টা করলো সমাপ্তি। এই নিয়ে তিনবার হলো। রাস্তার এপারে দাঁড়িয়ে সিগন্যালের রেড হয়ে যাওয়া দেখলো সমাপ্তি। প্রতিবারই আপ্রাণ চেষ্টা করলো রাস্তাটা পেরোনোর, কিছুতেই পারলো না। ওদিকের গাড়ির গতিশীল অবস্থা দেখেই থমকে যাচ্ছিলো ও।
ছেলেটা আবার বললো, চলে এসো বেবি...
সমাপ্তি দিগ্বিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে আবার উল্টো দিকে ছুট দিলো। হাঁপাতে হাঁপাতে বাড়ির বেলটা বাজলো।
ও জানে এখন মা থাকবে না, মা স্কুলে বেরিয়ে গেছে। তাপসীপিসি দরজাটা খুলেই বললো, আজকেও কলেজ যেতে পারলে না?
এভাবে কলেজ কামাই করলে তুমি পড়াশোনা করবে কি করে সমী?
তখনও হাঁপাচ্ছিলো সমাপ্তি, কাঁপতে কাঁপতেই বললো, আমি রাস্তা পেরোতে পারিনি। একদিক থামছে তো অন্যদিকে চলছে...
গাড়ির হর্ন, চাকার পিষে দেওয়ার শব্দ...উফ:।
তাপসীপিসি বললো, কিন্তু তুমি যে ট্যাক্সি নিয়েছিলে?
হ্যাঁ, ট্যাক্সি আমায় কলেজের এদিকে নামিয়ে দিয়েছে। ওদিকে ওয়ান ওয়ে বলে গেল না, আর আমি কিছুতেই রাস্তাটা পেরোতে পারলাম না।
সমাপ্তির চোখে জল।
তাপসীপিসি নিজের আঁচল দিয়ে ওর চোখ দুটো মুছিয়ে দিয়ে বললো, তুমি তো আমার হাত ধরেও পেরোতে পারছিলে না পরশুদিন। শেষে ফিরে আসতে হলো।
সমাপ্তি ভেঙে পড়া গলায় বলল, আমি পারবো না। কিছুতেই আর রাস্তায় বেরুবো না আমি।
শুধু মনে হচ্ছে অনেক গাড়ি আমাকে ধাক্কা দিতে আসছে।
দুটো হাত দিয়ে নিজের চোখ দুটো চাপা দিল সমাপ্তি। তাপসীপিসি মাথায় হাত রেখে বললো, বেশ আর কটা দিন যাক, সব ঠিক হয়ে যাবে।
সমাপ্তি প্রায় চিৎকার করে বললো, কি ঠিক হয়ে যাবে তাপসীপিসি? বাবাই ফিরে আসবে?
নাকি মা আমাকে দোষারোপ করা ছেড়ে দেবে?
আফটার অল অ্যাক্সিডেন্টটা আমার স্কুটিতে ঘটেছিল। আমি যদি সেদিন বাবাইকে অফিসে না পৌঁছাতে যেতাম তাহলে হয়তো কিছুই হতো না।
তাপসীপিসি সান্ত্বনার সুরে বললো, ওসব কথা রোজ রোজ বলতে নেই সমী। প্রায় একমাস হয়ে গেল দাদাবাবু মারা গেছেন, বৌদিমনি স্কুল জয়েন করেছে, কিন্তু তুমি কিছুতেই কলেজ, টিউশন এসব করতে পারছো না, এবারে তো তোমার ফাইনাল পরীক্ষা, রেজাল্ট খারাপ হবে যে!
সমাপ্তি হাল ছাড়া গলায় বলল, তাপসীপিসি আমি আর পারবো না।
কেন আমি সেদিন ক্রসিংটা দেখে পেরোলাম না?
কেন আমার দোষে বাবাইকে প্রাণ দিতে হলো?
সেদিন যদি আমি মরে যেতাম তাহলে এই যন্ত্রণা ভোগ করতে হতো না।
তাপসীর চোখে জল এসে গেল সমাপ্তির কান্না ভেজা চোখ দুটো দেখে।
মেয়েটাকে ওর কোলে দিয়ে বৌদিমনি বলেছিলো, চব্বিশঘন্টা সামলাতে হবে, পারবে তো? কামাই চলবে না, এখানেই থাকতে হবে। আমাদের ঠিকে ঝি আছে, শুধু মেয়ে সামলালেই হবে।
তাপসী তখন সদ্য সন্তানহারা। পেটের মধ্যেই মরে গিয়েছিল ওর পাঁচ মাসের সন্তান। ডাক্তাররা বলেছিলেন, বাচ্চা নিতে গেলে নিজেই মরবে তাপসী। ওর স্বামী সুবলের তো কাজের ঠিক নেই। তারপরে আবার কানাঘুষো শুনেছিল সুবল নাকি আলাদা সংসার বসিয়েছে। তাপসী জিজ্ঞেস করলে সুবল বলেছিল, পুরুষ মানুষের অমন একটু থাকে।
তাপসী মুখ ঝামটা দিয়ে বলছিল, নিজের পেটে ভাত জোটে না, আবার পুরুষ মানুষের দুটো সংসার! ঝাঁটা মারি অমন সংসারের মুখে।
বাচ্চাটা নষ্ট হয়ে যাওয়ার পরে কাজের সন্ধানে বেরিয়েই রঞ্জনা বৌদিমনির বাড়িতে বাচ্চা সামলানোর কাজটা পেয়েছিলো ও। তখনই ভেবেছিলো সুবলের সংসারে আর ফিরবে না ও। সংসার, স্বামী, গর্ভের সন্তান হারানোর বেদনা ভুলেছিলো কচি হাতের ছোঁয়ায়। নরম ,কচি দুটো হাত ওকে জড়িয়ে ধরেছিল।
ওই স্পর্শটুকুই ওকে মাতৃত্বের স্বাদ দিয়েছিল।
ঠিক সেইদিন থেকেই ও সমাপ্তির আয়া নয়, মা হয়ে গিয়েছিল। রঞ্জনাবৌদির স্কুলের চাকরি, নিজের এনজিওর কাজ সামলে মেয়েকে সময়ই কতটুকু দিতে পারতো। মায়ের কাছে সময় কম পেয়েই তাপসীকে আঁকড়ে ধরেছিলো সমাপ্তি সেই কচিবেলা থেকে। তাপসীই একমাত্র সমীর সবটুকু বোঝে। ক্ষিদে পেলে ও কি করে, মনখারাপ থাকলে তার অভিব্যক্তি কেমন? আনন্দের হাসি কোনটা! সব বোঝে তাপসী।
পড়াশোনাটা বেশিদূর করেনি ও ,তাই সমীকে পড়াতে বসতে পারে নি ঠিকই, কিন্তু ও যখন মাধ্যমিকের আগে রাত জেগে পড়তো, তখন ওর পাশে বসে নিস্তব্ধে রাত জাগত তাপসী। সমী বলতো, তাপসীপিসি, তুমি গিয়ে শুয়ে পড়ো। তবুও তাপসী ঢুল ঢুল চোখে বলতো, না, আমি তোমার সাথে ঘুমাবো, তোমার একা একা যদি রাতে ভয় করে।
সমাপ্তি হেসে বলতো, মাঝে মাঝে তোমাকে খুব মা বলে ডাকতে ইচ্ছে করে জানো!
তাপসী ঘুম জড়ানো গলায় বলতো, মা না ডাকলেও আমি তোমার মা। এখন পড়ো দিকি।
সমাপ্তি অপলক তাকিয়ে বলতো, তাপসীপিসি, তুমি আমায় এত কেন ভালোবাসো গো?
আমার জন্মদিনের তারিখটা আমার মা ভুলে যায়, কিন্তু তোমার কি করে সব মনে থাকে?
তাপসী মুখে আঙুল চাপা দিয়ে বলতো, অমন বলতে নেই। মা তো মা-ই হয় সমী।
বৌদি পাঁচ কাজের মানুষ, তাই হয়তো মনে রাখতে পারেন না।
সমাপ্তি ক্লান্ত হেসে বলতো, আর বাবাই?
বাবাইও তো ভুলে যায়।
তাপসী রাগ করে বলতো, কে বলেছে ভুলে যায়?
দাদাবাবু তো কালরাতেই আমায় বললো, আগামীকাল সমীর জন্মদিন, তাপসী ওর পছন্দের খাবার যেন সব রাঁধা হয় বাড়িতে।
মুচকি হেসে সমাপ্তি বলতো, আর কত মিথ্যে বলবে তুমি তাপসীপিসি? বাবা তো কাল রাতে বাড়িই ফেরেনি। মাকে ফোনে বললো, হঠাৎ ট্যুরে ব্যাঙ্গালোর যাচ্ছে, প্রিপারেশন ছাড়াই।
তাপসী জিভ কেটে বলতো, অত প্রশ্ন করো না তো।
সবার মনে থাকে তোমার জন্মদিনের কথা।
সেই কোন ছোটবেলা থেকেই সমাপ্তি বুঝেছিলো, হাত, পা কেটে গেলে, বায়না করতে হলে তাপসীপিসির কাছেই করতে হবে। মায়ের কাছে বলতে গেলেই মা বিরক্ত মুখে বলতো, তাপসী...থাকো কোথায়? দেখো সমীর কিছু একটা হয়েছে। আমি স্কুলের এক্সামের খাতা দেখছি, এই সময় ও বিরক্ত করছে।
সমাপ্তি খুব ছোট থেকেই জেনে গিয়েছিল, ও বাবা-মাকে শুধু বিরক্ত করে।
বাবাইয়ের ঘরে ঢুকলেই বাবাই বলতো, কি চাই সমী? কিছু প্রবলেম হলে তাপসীকে বলো বেবি।
ইউ আর এ গুড গার্ল।
সমাপ্তি কাউকে বলতে পারতো না, তার কিছু চাই না, শুধু বাবাই আর মায়ের একটু স্পর্শ চাই, একটু আদর চাই। সমাপ্তি বুঝেছিলো, আদর চাইলেও সেটা তাপসীপিসিই দেবে বাবা-মায়ের বদলে।
সমাপ্তিকে তাপসীপিসির কাছ থেকে অবশ্য কখনো চাইতে হয়নি আদর। বাবা, মায়ের ঘর থেকে মন খারাপ করে বেরোলেই দরজার চৌকাঠের এদিকে আঁচল পেতে ওকে সর্বশক্তি দিয়ে রক্ষা করার জন্য অপেক্ষা করতো তাপসীপিসি।
আলতো করে বলতো, ওরা তো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে, তাই....না হলে কিন্তু ওরা দুজনেই তোমাকে খুব ভালোবাসে।
ওদের দুজনের ভালোবাসার খামতি পূরণ করার জন্য সদা ব্যস্ত মানুষটাকেই সবচেয়ে আপন মনে হত সমাপ্তির।
এমনকি বয়ঃসন্ধির সব গোপন কথাও সমাপ্তি তাপসীপিসিকেই বলতো। ক্লাস সিক্সের অ্যানুয়াল এক্সামের আগেই বিকেলে পার্কে গিয়ে ওর ফ্রক ভিজে ছিল লাল রক্তে।
ভয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেছিলো সমাপ্তি।
বাড়ি ফিরে মাকে জড়িয়ে ধরেছিলো। একটু আশ্রয় খুঁজছিলো ওর আতঙ্কিত মনটা।
মা আদর করে বলেছিল, তাপসীর সাথে বাথরুমে যা, ও বলে দেবে কি করতে হবে।
মা তুমি চলো ....
ততক্ষনে তাপসী....বলে ডাকা হয়ে গিয়েছিল মায়ের।
তাপসী পিসিই প্রথম বলেছিল, এটা নাকি প্রতি মাসে হবে। এটা কোনো রোগ নয়। মেয়ে থেকে নারী হয়ে উঠেছে ও। প্রতি মাসে এই রক্তক্ষয়ই প্রমান করবে মেয়েদের জীবনের লড়াইয়ের গল্প।
মেয়েদের মা হয়ে ওঠার গল্প।
সমাপ্তি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে বলেছিল, তাপসীপিসি তোমার এমন হয় না?
তাপসী ঘাড় নেড়ে বলেছিল সব হয়, সব মেয়ের হয়।
সমাপ্তির দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর দিতে থমকে গিয়েছিল তাপসী।
ও জিজ্ঞেস করেছিল, তাহলে তোমাকে কেউ মা বলে ডাকে না কেন? আমি কেন পিসি বলে ডাকি?
তাপসীপিসি কষ্টভেজা গলায় বলেছিল, ভগবান সব নারী শরীরকে মা হতে দেন না যে।
সমাপ্তি বিজ্ঞের মত বলেছিল, আমি যদি তোমায় মা বলে ডাকি তাহলে কি ভগবান রাগ করবেন?
তাপসীপিসি চোখের জলটা আলতো করে মুছে বলেছিল, তোমার মা রাগ করবে।
পিরিয়ড হলে কি করে সামাল দিতে হবে তার শিক্ষাও ও পেয়েছিলো তাপসীপিসির কাছ থেকেই।
প্রথম প্রেমপত্র সমাপ্তি ওর বেষ্টি প্রিয়াঙ্কাকে দেখিয়েছিল। স্কুল ছুটির পরে ক্লাস টেনের একদম লাস্ট বেঞ্চে বসে দুজনে কাঁপা হাতে পড়েছিলো, ফার্স্ট লাভ লেটার। যেখানে ছেলেটা বার দুয়েক লিখেছিল, সে নাকি ভীষন ভালোবাসে সমাপ্তিকে।
সেই প্রথম ভালোবাসা শব্দে লজ্জা পেতে শুরু করেছিল সমাপ্তি। প্রিয়াঙ্কা বলেছিল, ছেলেটাকে নাকি ও চেনে!
ক্লাস টুয়েলভের সৌরনীল বসু।
তারপর থেকে স্কুল ছুটি আর শুরুর আগে সৌরনীলের সাথে ওর চোখাচোখি হতো। আলতো লজ্জা ছুঁয়ে যেত সমাপ্তিকে।
গুনে গুনে ঠিক সাতদিন পরে ওদের ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সমাপ্তির চুল বেঁধে দিতে দিতে তাপসীপিসি বলেছিল, সৌরনীল ছেলেটা কেমন সমী?
তুমি কি ওকে ভালোবাসো?
চমকে উঠেছিলো সমাপ্তি। প্রিয়াঙ্কা বলেছিল, দেখিস আন্টি ঠিক বুঝে যাবে তোর আর সৌরনীলের রিলেশনের কথা। না, মা বোঝেনি কিছুই। কিন্তু ওর মনের দোলাচলের খবর তাপসীপিসি ঠিক পেয়ে গিয়েছিল।
ওকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, আমি পড়াশোনা জানি না, ওই একটু আধটু। আমার স্বামী নিরুদ্দেশ, তোমার জন্যই এই বাড়িতে থাকতে পারছি। নিশ্চিন্ত আশ্রয় পেয়েছি। এমন কিছু কোরো না যাতে তোমার বাবা, মা আমাকে বাক্স গুছিয়ে এবাড়ি থেকে বের করে দিয়ে বলে, তাপসী আমাদের মেয়ের রেজাল্ট খারাপ হয়েছে তোমার জন্য, তাই তুমি এবার ঠিকানা বদলাও।
সেই প্রথম সমাপ্তি বুঝেছিলো, সে একজন মানুষের আশ্রয়দাতা। তার মুখের দিকে চেয়ে আছে নিঃস্ব একজন মানুষ। যে তার মনের সব খবর রাখে। তাপসীপিসি এবাড়ি থেকে চলে গেলে সমাপ্তিও নিঃস্ব হয়ে যাবে।
সমাপ্তি আস্তে করে বলেছিল, কিন্তু আমি তো সৌরনীলকে ভালবাসি তাপসীপিসি!
তাপসীপিসি ঠান্ডা গলায় বলেছিল, ভালোবাসা দোষের নয়, তবে সেটা যেন তোমার পড়াশোনার ক্ষতি না করে।
সমাপ্তি শান্ত স্বরে বলেছিল, আমি যত দিন এ বাড়িতে থাকবো, তুমিও ততদিন এ বাড়িতে থাকবে তাপসীপিসি। তুমি ছাড়া আমি খুব একা।
সৌরনীলের সাথে তাপসীপিসির পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল সমাপ্তি। তখন ও ক্লাস টুয়েলভ আর সৌরনীল কলেজের স্টুডেন্ট।
তাপসীপিসিকে পায়ে হাত দিয়ে প্রনাম করতে গিয়েছিল সৌরনীল। তাপসীপিসি হাত দুটো ধরে বলেছিল, থাক বাবা, আমি প্রণামের যোগ্য নই।
সৌরনীল সমাপ্তিকে অবাক করে দিয়ে বলেছিল, আপনি সমাপ্তির বায়োলজিকাল মাদার নন ঠিকই, কিন্তু সমাপ্তির আসল মা। মায়েদের যোগ্যতা লাগে না। তাপসীপিসির দু চোখ জলে ভেসেছিলো, আর সৌরকে আরও বেশি করে ভালোবেসেছিল সমাপ্তি।
বাড়ি ফিরে তাপসীপিসি বলেছিল, মরন, পাগলী মেয়ের একটা পাগলা প্রেমিক জুটছে। এক বাজার লোকের সামনে কি না পায়ে হাত দিয়ে প্রনাম করলো।
সমাপ্তির চোখের ভাষা যেমন তাপসীপিসি বুঝতে পারতো তেমনি, তাপসীপিসির হঠাৎ আসা নোনতা জলের অর্থও সেদিন বেশ বুঝেছিলো সমাপ্তি। একেই বোধহয় সাহিত্যে আনন্দাশ্রু বলে।
সমাপ্তি যত বড় হয়েছে তত বাবা, মায়ের সাথে দূরত্ব বেড়েছে। এক অদ্ভুত আন্ডারস্ট্যান্ডিং। ওর পড়াশোনা, বিলাসিতার যাবতীয় খরচ ওরা দেবে তার বদলে সমাপ্তিকে ভালো রেজাল্ট করে সমাজে ওদের মুখ উজ্জ্বল করতে হবে। উচ্চমাধ্যমিকের রেজাল্টের পর মাকে ফোনে বলতে শুনেছিল, হ্যাঁ সমী যে আমার মেরিটটা পেয়েছে সেটা এতদিনে বুঝলাম। আবার বাবাইকেও বলতে শুনছে, হ্যাঁ, আমার মেয়ে আমার মতই ব্রিলিয়ান্ট হয়েছে।
মুখ টিপে হেসেছে সমাপ্তি। কবে যে একটা ছোট্ট মেয়ে মান-অভিমান লুকিয়ে রাখতে রাখতে, চোখের জলকে হাসিতে বদল করতে করতে বড় হয়ে উঠলো সেটাই জানতে পারলো না যে বাবা-মা, ও নাকি তাদের মেরিট পেয়েছে!
সৌরনীল বলেছে, সমাপ্তি আমি তো আছি তোমায় ভালোবাসার জন্য, এক আকাশ ভালোবাসবো তোমায়, এক পৃথিবী হাঁটবো একসাথে।
সমাপ্তি আবেগে ভেসেছে, কষ্টের ওপরে প্রলেপ পড়েছে।
কত নম্বর পেলে ভালো রেজাল্ট বলা যায় সেটাও বোঝে না যে মহিলা, সে কালীঘাটে পুজো দিয়ে এসে সমাপ্তির কপালে প্রসাদি ফুল বোলাতে বোলাতে বলেছে, শুনিয়ে এলাম মজুমদার গিন্নিকে।
সেদিন খুব টেরিয়ে টেরিয়ে বলছিল, দেখলাম তোমাদের সমীকে, টিউশনি থেকে ফেরার পথে একটা ছেলের সাথে গল্প করছে।
আজ বাগে পেয়ে শুনিয়ে এলাম, আমার সমী উচ্চমাধ্যমিকে প্রথম হয়েছে গো!
বিছানায় ধপ করে বসে পড়ে সমাপ্তি মাথায় হাত দিয়ে বলেছে, তুমি এ কি করলে তাপসীপিসি?
আমি তো সব সাবজেক্টে লেটার পেয়ে, স্টার পেয়ে পাশ করেছি। ফার্স্ট হওয়া কি মুখের কথা?
তুমি কেন ভুলভাল বলছো লোককে?
লোকে তো আমায় ব্যঙ্গ করবে!
তাপসীপিসি সঙ্গে সঙ্গে বলেছে, ওই হলো, স্টার পাওয়াও যা, ফার্স্ট হওয়াও তাই।
বাধ্য হয়ে সমাপ্তিকে বোঝাতে হয়েছে ফার্স্ট আর স্টারের মধ্যে পার্থক্য কি!
তাপসীপিসির এ হেন গর্ব ওকে বারবার বিপদে ফেলেছে। সৌর তো শুনে হেসেই অস্থির। বহুদিন পর্যন্ত সমাপ্তিকে দেখলেই ফার্স্ট গার্ল বলে রাগাতো সৌর।
শেষে সমাপ্তি বলেছিলো, একবার যদি তাপসীপিসি জানতে পারে যে তুমি আমার লেগপুল করছো তাহলে কিন্তু সোজা তোমার কলেজে ঢুকে তোমায় অপমান করে আসবে।
সৌর একমুখ হেসে বলেছিলো, তা পারে, তোমার তাপসীপিসি সব পারে তোমার জন্য।
সত্যিই তাপসীপিসি সব পারে ওর জন্য। নিজের মাইনের টাকা থেকে ওর জন্য পছন্দের কুর্তি কিনতেও পারে।
সমাপ্তি বকাবকি করায় রাতে না খেয়ে শুয়ে পড়েছিলো পিসি। শেষে পিসির রাগ ভাঙাতে মাঝরাতে ওর দেওয়া কুর্তিটা পরে ঘুম ভাঙিয়ে দেখাতে, মুখে হাসি ফুটেছিল। বলেছিল, বড়রা কিছু দিলে বকতে নেই, আনন্দ করে নিতে হয়।
কি হলো, এখনো চোখে হাত চাপা দিয়ে বসে আছো? তাপসীপিসির কথায় সম্বিত ফিরেছিল সমাপ্তির। কত কত বছরের পুরনো স্মৃতির ঘরে হানা দিয়েছিল ওর মন। সেখানে কত মিষ্টি মিষ্টি ঘটনা জমে ছিল ওর জন্য। আজকের তিক্ত বাতাসটাকে মুহূর্তে মিঠে করে দেওয়ার সরঞ্জামও ছিল। কিন্তু তবুও কিছুতেই স্বাভাবিক থাকতে পারছে না সমাপ্তি। অ্যাক্সিডেন্টের দিনের সকালটা বারবার টেনে নিয়ে যাচ্ছে ওকে জনবহুল, যানবহুল রাস্তার মাঝে।
যেখানে ওর স্কুটি থেকে ছিটকে পড়ে গেলো বাবাই। মুহূর্তের মধ্যে সব শেষ হয়ে গেল।
সমাপ্তির একটা পা ভেঙে যাওয়া ছাড়া আর কিছুই হলো না।
সৌরনীল এখন বাইরে, এম.বি.এ পড়ছে। তবুও রোজ ফোনে শুধু একটাই কথা বলে চলেছে, সমাপ্তি, অ্যাকসিডেন্ট এভাবেই হয়, প্ল্যান ছাড়া, অকস্মাৎ। তাই ওর নাম অ্যাকসিডেন্ট। তাই নিজেকে দোষারোপ করাটা ছাড়ো। স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসো। সমাপ্তি শুধু কান দিয়ে শুনেছে ওর কথা। কিন্তু পারেনি সেদিনের রক্তাক্ত সকালটা ভুলতে।
গত সপ্তাহেই সৌর এসেছিল কলকাতায়। এসেই সমাপ্তির সাথে দেখা করতে এসেছিল। তাপসীপিসিকে সঙ্গে নিয়ে রাস্তায় বেরিয়েও ছিল সমাপ্তি, কিন্তু চৌরাস্তার মোড়ে গিয়ে চারিদিক থেকে
ছুটে আসা গাড়ি দেখেই ফুটপাথে বসে পড়েছিলো সমাপ্তি। তাপসীপিসি হাত ধরে টানলেও কিছুতেই রাস্তা পেরোতে পারেনি সমাপ্তি। শুধু মনে হচ্ছিল আবার একটা লরি আসছে, ঠিক যেমন এসেছিল সেদিন। গাড়িগুলো কিছুতেই থামেনি, তাই সমাপ্তির রাস্তা পার হওয়াও হয়ে ওঠেনি। শেষে সৌর এসেছিল ওদের বাড়ির কাছে।
মিনিট দশেক চেষ্টা করেও আগের মত স্বাভাবিক হতে পারেনি সমাপ্তি। এমনকি সৌরর বাইকেও চাপেনি আর। বাধ্য হয়ে হাল ছাড়া গলায় সৌরনীল বলেছিল, আমি আমার আগের সমাপ্তিকে ফেরত চাই। প্লিজ...
একটু দূরেই দাঁড়িয়েছিল তাপসীপিসি। সৌরনীলের কাঁধে হাত রেখে তাপসীপিসি বলেছে, তুমি পরেরবার এসে তোমার আগের সমাপ্তিকেই ফেরত পাবে, আমি কথা দিলাম।
একবুক হতাশা নিয়ে ফিরে গেছে সৌরনীল। তারপরেও কেটে গেল অনেকগুলো দিন। কিছুতেই সমাপ্তি ফিরতে পারছে না আগের জীবনে। ওই দুর্ঘটনাটাই ওকে রাতভোর জাগিয়ে রাখছে। বুকের মধ্যে অনবরত চলছে রক্তক্ষরণ। আর তার থেকেও যেটা সব থেকে ভয়ানক হয়েছে, সেটা হলো যান চলাচল করলে সে রাস্তা পেরোতে পারছে না কিছুতেই।
বারবার চোখের সামনে ভাসছে সেই মর্মান্তিক সকালটা। সকালটা শুরু হয়েছিল অন্য আর পাঁচটা দিনের মতোই। বাবাই টিভির সামনে বসে খবরের কাগজ পড়ছিলো আর টিভিতে খবর চালিয়ে শুনছিল। মা রোজকার মত যোগা ম্যাট পেতে ব্যায়াম করতে ব্যস্ত ছিল। তাপসীপিসি ব্রেকফাস্ট বানাচ্ছিলো রান্নাঘরে। একটু দেরি করেই ঘুম থেকে উঠেছিলো সমাপ্তি। কলেজ যাবার খুব তাড়া ছিল না। ফার্স্ট পিরিয়ডটা করবে না ঠিক করেছিল। তাছাড়া রাত পর্যন্ত সৌরনীলের সাথে হোয়াটস আপে কথা হয়েছে। পাশের ঘরেই মা শোয় বলে রাতে কথা বলতে পারে না সমাপ্তি। অগত্যা হোয়াটস অ্যাপই ভরসা। তবে এটাও মন্দ লাগে না সমাপ্তির। কথার পিঠে কথা; ওপরে টাইপিং যখন ওঠে তখন সমাপ্তি ভাবে, এবার কি বলবে সৌর! এই ভাবনাটুকুই বড্ড মিষ্টি লাগে সমাপ্তির। সৌরর কথায় কখনো ঠোঁটটা কেঁপে ওঠে, কখনো গালদুটো লাল হয়ে যায়। কখনো ভারী হয়ে আসে নিঃশ্বাস।
কালো অক্ষরের আদর মাখতে মাখতেই ঘুমিয়ে পড়ে সমাপ্তি। তেমনই ঘুম ভেঙে সকাল সকাল উইন্ডো খুলে গুড মর্নিং পাঠিয়েই সমাপ্তি শুরু করতো ওর নতুন দিনটা।
সেদিনও ঘুমঘুম চোখেই ড্রয়িংয়ে এসে বসেছিলো,
হঠাৎই বাবাই বলেছিল, সমী, তুই কেমন স্কুটি চালাস আমার তো দেখা হয়নি। উচ্চমাধ্যমিকের রেজাল্টের পরে বাবাই ওকে স্কুটিটা গিফ্ট করেছিল। তারপর থেকে সমাপ্তির বাসে-ট্রেনে চাপা প্রায় বন্ধ। সব জায়গাতেই ও ওর সিলভার কালারের স্কুটি নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। এমনকি সৌরনীলকেও চাপিয়েছিলো সমাপ্তি। সৌর হেসে বলেছিল, তুমি গাড়ি চালাও, না ওড়াও সমাপ্তি? সেদিন থেকেই সমাপ্তির খুব ইচ্ছে ছিল বাবাই, আর মাকে একদিন করে অন্তত স্কুটিতে চাপানোর। তাপসীপিসি অনেকবার চেপেছে। বাজারে একটু দরকার হলেই তাপসীপিসি বলে, কই গো তোমার ময়ূরপঙ্খীটা একবার বের কর দিখি, আমাকে সবজি বাজার করতে যেতে হবে।
বাড়িতে এমন ড্রাইভার থাকতে আর কেন অটো, টোটোতে চাপি!
সমাপ্তিও পৌঁছে দিয়েছে তাপসীপিসিকে। তাপসীপিসি কোমরটা শক্ত করে ধরে বলেছে, আস্তে চালাও না বাপু। মাকেও একদিন স্কুলে পৌঁছে দিয়েছে সমাপ্তি। মা পিছনে বসেই বলেছে, দেখিস ফেলিস না। বুড়ো বয়েসে হাড় ভাঙলে আর ঠিক হবে না। কিন্তু বাবাই আজ অবধি চাপেনি। কারণ বাবাই চারচাকা করেই অফিস যায়। তাই সমাপ্তির ছোট্ট যানটাতে চাপানোর সৌভাগ্য হয়নি ওর।
ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই বাবাই বললো, সমী আজ আমায় ঠিক টাইমে অফিস পৌঁছে দিতে পারবি? আর গাড়ি গ্যারেজে রয়েছে। যদি তোর সময় না হয় তাহলে উবের ডেকে নেবো।
সমী হাতে আকাশের চাঁদ পাওয়ার মত গলায় বলেছিল, তুমি একবার আমার বাইকে চেপে দেখো, মনে হবে ঘোড়ায় চেপেছি। বাবাই মিষ্টি করে হেসে বলেছিল, তুই কেমন বড় হয়ে গেলি।
সমাপ্তি সেদিন ভীষন খুশি ছিল। বাবাই আর মা বরাবরই ওর কাছে অন্য গ্রহের বাসিন্দা ছিল। ইচ্ছে করলেই ওদের ধরা যেত না। আজ অতটা রাস্তা বাবাই ওকে স্পর্শ করে থাকবে, গল্প করবে ...এগুলো ভাবতে ভাবতেই বাথরুমের দিকে গিয়েছিল সমাপ্তি। রেডি হয়ে বেরিয়ে তাপসীপিসিকে বলেছিল, তাড়াতাড়ি খেতে দাও, বাবাইয়ের দেরি হয়ে যাবে। মা বেরিয়ে যাওয়ার সময় বলেছিল, সাবধানে যেও। এটা মা রোজই বলে।
বাবাই সেদিন সুট টাই পরে সমাপ্তির স্কুটির পিছনে এসে বসেছিলো। পৃথিবীর সবটুকু খুশি যেন একটু একটু করে কৃপন হাতে খরচ করতে চাইছিলো সমাপ্তি। বাবাই আমায় ধরে থাকো কিন্তু। বহুদিন পরে বাবাই আবার ওর কাঁধে হাতটা রেখে বলেছিল, পাগলী। হেলমেটের মধ্যে দিয়েই শুনেছিল সমাপ্তি বাবাইয়ের আদরের ডাকটা। তারপরেই সব অন্ধকার। শুধু বাবাইয়ের আর্ত চিৎকার কানে এসেছিল। আর একটা বড় লরিকে মনে আছে, যে ওদের দিকে ছুটে এসেছিল। সিগন্যাল রেড না সবুজ ছিল সেটা অনেক কষ্ট করেও মনে করতে পারেনি সমাপ্তি। আর কিছু মনে নেই সমাপ্তির। যখন জ্ঞান ফিরেছিল, তখন দেখেছিল, হসপিটালের বেডে ও শুয়ে আছে, পায়ে অসহ্য যন্ত্রনা। মায়ের চোখে জল। তাপসীপিসি হাউমাউ করে বলেছিল, একি সর্বনাশ করলে গো! সমাপ্তি শুধু বলেছিল,বাবাই কোথায়?
বাবাই যে আর নেই, এটা বুঝতেই বেশ কিছুক্ষণ সময় লেগে গিয়েছিল। বুঝেছিলো তখন যখন মা ঠান্ডা গলায় বলেছিল, নিজের বাবাকে এভাবে মেরে ফেলতে তোর বাধলো না? বাবাই তো তোকে বিশ্বাস করেছিল! মায়ের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েছিল সমাপ্তি। সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত মায়ের দৃঢ় ধারণা.. ওর রাফ ড্রাইভিংয়ের জন্যই অ্যাকসিডেন্ট ঘটেছে। তাই বাবাইকে হারানোর দায়টা আজও ওর কাঁধেই রয়ে গেছে। ইদানিং তাই ব্যস্ত রাস্তায় সমাপ্তি কিছুতেই হাঁটতে পারছে না। বুকের ভিতরের একটা অজানা ভয় অদ্ভুত ভাবে চেপে বসে আছে। ওর সব শক্তিকে অকেজো করে দিচ্ছে।
লনে যাবে? চলো আমার সাথে, ঘরে বসে বসে ওই একই ভাবনা না ভেবে চলো....
তাপসীপিসি লনে যাচ্ছে, হাতে খাবারের বাটি। ওর এই এক স্বভাব, পাখি, বেড়াল, কুকুরদের খাওয়াতে ভালো বাসে খুব। কুকুর, বেড়ালরা ওকে দেখলেই লেজ নাড়ে। কয়েকটা আবার সমাপ্তিকেও চেনে। ওরও বেশ মজা লাগে ওদের খুনসুটি করে খাবার কাড়াকাড়ি করে খাওয়া দেখতে, কিন্তু এখন আর কিছুই ভালো লাগছে না ওর।
সমাপ্তি দু হাত দিয়ে মুখটা ঢেকে বললো, আমি কোথাও যাবো না তাপসীপিসি, তুমি যাও।
তাপসীপিসি মাথায় হাত বুলিয়ে বললো, সৌরকে একটা ফোন করো, ওর সাথে গল্প করো। সমাপ্তি উদাস চোখে বললো, আমাদের সম্পর্কটা বোধহয় আর থাকবে না জানো!
আমার মত মেন্টাল পেশেন্টকে সৌর কেন ভালোবাসবে বলো? আমিও চাই না, ওর জীবনটা এভাবে শেষ করতে। সৌরকে বলে দেব, ও নিজের মত বাঁচুক। তাপসীপিসি থমকে দাঁড়িয়ে বললো, ভুলভাল কথা বোলো না তো। কাল তুমি কলেজ বেরোবে, আমিও যাবো তোমার সাথে। দেখি তুমি পারো কিনা!
সমাপ্তি আলগা হেসে বললো, সব কিছু তোমার হাতে নেই তাপসীপিসি। তাই কিছু কিছু ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দাও। তাপসীপিসি কোনো কথা না বলেই এগিয়ে গেলো...
মায়ের সাথে বরাবর খুব কম কথাই হতো সমাপ্তির, ইদানিং আরো কমে গেছে। সন্ধ্যেবেলা মা হঠাৎই বললো, তুমি কলেজ, টিউশন কোথাও যাচ্ছ না?
সামনে ফাইনাল এক্সাম, অনার্সে ভালো রেজাল্ট না করতে পারলে এম. এস.সি ভর্তি হতে পারবে না। আমার কলিগদের কাছে আমাকে ছোট না করলে তো তোমার চলছে না! বাবাই তো চলেই গেল এভাবে, তারপর আবার তুমি শুরু করলে?
মা বেশ মানিয়ে নিয়েছে ঘটনাটাকে, কিন্তু সমাপ্তি পারছে না কিছুতেই।
আচমকা তাপসীপিসি বললো, কাল থেকে ও কলেজ যাবে।
মা আড়চোখে তাকিয়ে বললো, বাইকে না চাপতে পারো, বাসে করে যাও। তোমার বাবাই চলে যাওয়ার পরে বাড়ির গাড়িটা আমি বেচে দেব ঠিক করেছি। সমাপ্তি এখানে নীরব শ্রোতা। ওর সত্যিই কিছু বলার নেই।
সৌরর ফোন ধরতে ইচ্ছে করে না ওর, বন্ধুদের সাথে গল্প করতেও ভালো লাগে না। তাপসীপিসি বা মা জানেই না, ও বহুবার চৌরাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে চেষ্টা করেছে রাস্তা পেরিয়ে ওদিকের অত্যন্ত পরিচিত রেস্টুরেন্টটায় যেতে, যার মটন কবিরাজি ওর ভীষন পছন্দের। প্রায় দিন কলেজ ফেরত ঢুঁ মারত দোকানটায়। কবিরাজির স্বাদটা হাতছানি দিয়ে ডেকেছে কিন্তু যানবাহনের আওয়াজে থমকে গেছে ও। অপেক্ষা করেছে কখন গাড়িগুলো থামবে, কিন্তু দুপ্রান্তের গাড়ি থামেনি কিছুতেই। তাই ও আর পৌঁছাতে পারেনি। একদিকের সিগন্যাল রেড হয়েছে তো অন্যপ্রান্তের গ্রীন...ফিরে এসেছে সমাপ্তি।
তাপসীপিসি সকাল সকাল রেডি। হাতে একটা বড় ব্যাগ নিয়ে বলল, তোমাকে কলেজে পৌঁছে দিয়ে আমি বাজার করে ফিরবো। অগত্যা আবার নতুন উদ্যমে উঠতেই হলো সমাপ্তিকে।
মা বেরিয়ে গেছে কিছুক্ষন আগেই। যাওয়ার সময় বলেছে, দয়া করে সম্মান ডুবিও না। সামনে এক্সাম সেটা মনে রেখো। এক্সামটা দিতে গেলে ওকে কলেজ, টিউশন যেতেই হবে। এ কদিনের অনুপস্থিতি পূরণ করে আবার শুরু করতেই হবে।
সমাপ্তি বাইরে বেরিয়ে বললো, তোমাকে যেতে হবে না তাপসীপিসি, আমি ঠিক চলে যাবো।
তাপসীপিসিও আলতো হেসে বললো, আজকে আমিও যাই, কাল থেকে তুমি একাই যেও।
সমাপ্তি দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার পাশে, একটার পর একটা গাড়ির তীব্র আওয়াজ।
তাপসীপিসি বললো, এবার যাও...
কথাটা বলতেই সমাপ্তি দেখলো কোনো কারণ ছাড়াই থেমে গেলো সাইকেল, বাইক, গাড়ির চাকা...
দুপ্রান্তের যানবাহন থেমে রয়েছে, তাপসীপিসি বললো, ছুটে পেরিয়ে চলো।
হ্যাঁচকা টান দিলো তাপসীপিসি।
অবশেষে প্রায় একমাস পরে কালো পিচের যানবাহন ভর্তি রাস্তা পেরোলো সমাপ্তি। ও পেরোতেই সবাই আবার চলতে শুরু করলো যেন।
অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে সমাপ্তি বললো, কি হলো বলো তো? হঠাৎ আমাদের জন্য এরা থমকে গিয়েছিল কেন?
আর দেরি করো না, ট্যাক্সিতে উঠেও কৌতূহল কমছিলো না সমাপ্তির।
কলেজের সামনে নেমেও একই ভাবে থমকে গেল চলন্ত রাস্তাটা। সমাপ্তি আবারও ছুটে পার হলো রাস্তাটা। ওপ্রান্তে দাঁড়িয়ে তাপসীপিসি হাসছিল, চোখে টলটল করছিল জল। জোরে চেঁচিয়ে বললো , তুমি পেরেছ!
সমাপ্তি যেন প্রাণ ফিরে পেল বহুদিন পরে চেনা ক্যাম্পাসের ভিতরের মুখগুলো দেখে। বন্ধুরা সবাই ওকে ঘিরে ধরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বললো, তুই ছিলিস না, সব যেন কেমন থমকে ছিল।
বাড়ি ফেরার সময়ও কলেজের সামনে বেরিয়েই দেখলো তাপসীপিসি দাঁড়িয়ে আছে।
সমাপ্তি অবাক চোখে বললো, তুমি কেন এসেছো কষ্ট করে? আমি পারতাম তো।
তাপসীপিসি হেসে বললো, জানি তুমি পারতে। তবুও ইচ্ছে হলো বলেই এলাম।
সমাপ্তি রাস্তা পেরোচ্ছে, দুপ্রান্তের গাড়ি আবারও অলৌকিক উপায়ে থেমে গেছে। ও পেরোনোর পরেই একই রকমভাবে চলমান হলো সবকিছু।
দিন দুই তাপসীপিসিও যাচ্ছিল ওর সাথে।
সমাপ্তি বললো, তাপসীপিসি আমি একা যাবো প্লিজ।
তাপসীপিসি একটু গম্ভীর স্বরে বললো, আজ কিন্তু গাড়ি থামবে না, পারবে তো একা পার হতে?
সমাপ্তির কাছেও বিষয়টা বিস্ময়। কেন থামে গাড়িগুলো। তাপসীপিসি কি জানে সবটা?
সমাপ্তি জিজ্ঞেস করতেই বললো, রোজ রোজ যদি না থামে তখন কিভাবে পার হবে সেটাই জিজ্ঞেস করলাম আর কি।
তার মানে এই রহস্যের হদিস তাপসীপিসি কিছুতেই দেবে না সমাপ্তিকে!
সমাপ্তি আদুরে স্বরে বললো, তাহলে বরং আজও তুমি চলো।
চৌরাস্তার মোড়ে সমাপ্তি পিছন ফিরে দেখলো, বড় ঝোলা ব্যাগটা থেকে বেরিয়ে আসছে তাপসীপিসির খুব প্রিয় বেড়াল রঘু। ওকে ওই নামেই ডাকে তাপসী পিসি। গায়ের রং কালো, মাঝারি চেহারার একটা বেড়াল। কমপ্লেক্সের লোকেরা কেউ পছন্দ করে না রঘুকে,বলে নাকি অপয়া, যাত্রা খারাপ করে কালো বেড়াল। বাবাকেও বহুবার দেখেছে, এই বেড়ালটা রাস্তা দিয়ে পেরেলেই গাড়ির চাকা থামিয়ে দিতো। আরেকজন কেউ না পেরোনো পর্যন্ত অপেক্ষা করতো ফ্ল্যাটের ভিতরের চত্বরে। কমপ্লেক্সের সবাই বিরক্ত রঘুর ওপরে। তাপসীপিসিই প্রতিদিন লুকিয়ে খেতে দেয় ওকে। তাই হয়তো রঘু এখনো ওদের কমপ্লেক্সের মধ্যেই রয়েছে।
রঘু পেরোতেই থেমে যাচ্ছে যান চলাচল, আর তাপসীপিসি সেই সুযোগে সমাপ্তিকে রাস্তা পার করাচ্ছে। এতদিন উত্তেজনা এতটাই বেশি ছিল সমাপ্তির, যে ও বুঝতেই পারেনি ব্যাপারটা।
রাস্তা পেরোতেই রঘু আবার এসে ঢুকে যাচ্ছে বড় ব্যাগটাতে। তাপসীপিসির চোখের ইশারায় রঘু রীতিমত অভ্যস্ত।
আজও একই ভাবে রঘু পেরোতেই থমকে গেল সব কিছু। তাপসীপিসি চিৎকার করে বললো, সমী... পেরিয়ে যাও...
সমাপ্তি মুচকি হাসছিল।
রঘু পেরিয়ে যেতেই দু সেকেন্ডের মধ্যেই স্বাভাবিক হলো যানবাহন। তাপসীপিসির চোখে হতাশা..
সমাপ্তি ওই চলন্ত জীবনের সাথে মিশে গিয়ে ব্যস্ত রাস্তাটা পেরোলো। ওপারে গিয়ে হাত নেড়ে বললো, রঘুকে নিয়ে বাড়ি যাও।
আস্তে আস্তে বললো, কেন যে ছোট থেকে তোমাকে মা না ডেকে পিসি ডাকলাম!
দূর থেকেই দেখলো তাপসীপিসি আঁচল দিয়ে চোখ মুছছে আর হাতজোড় করে ঈশ্বরকে ডাকছে, পায়ের কাছে রঘু দাঁড়িয়ে রয়েছে মাথা নিচু করে।
সমাপ্তি ভিড়ে মিশে যেতে যেতে অস্ফুটে বললো, মা...
রাকেশ ঘোষাল
Very good story
ReplyDelete