হাত ধোয়ার গল্প
আজ একটা অদ্ভুত গল্প শোনাবো। জানেন কি প্রথম যিনি সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার কথা বলেছিলেন, তাঁকে পাগলাগারদে যেতে হয়েছিল এবং সেখানে তাকে কার্যত খুন করা হয়েছিল !
হ্যাঁ, হাত ধোয়ার পরামর্শ দেবার জন্য তৎকালীন প্রতিষ্ঠিত ডাক্তারবাবুরা তাঁকে পাগলা গারদে পাঠিয়েছিলেন, এটা এক ঐতিহাসিক সত্য কাহিনী।
'করোনা ভাইরাস' সংক্রমণের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার পর 'World Health Organization' প্রতিটি মানুষকে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার উপর জোর দিতে বলেছে। এবং এখন মানুষ সেটা মন দিয়ে করছেও।
ডাক্তার Ignaz Phillipp Semmelweis ছিলেন হাঙ্গেরি র একজন ডাক্তার এবং বিজ্ঞানী।
1 জুলাই ,1818 সালে তাঁর জন্ম। 1847 সালে ভিয়েনার হসপিটালে কাজ করার সময় তিনি হাত ধোয়ার গুরুত্ব উল্লেখ করেন। কিন্তু সেই সময় তাঁকে পাগল প্রতিপন্ন করা হয়।
পাগলা গারদে থাকার সময় কিছু দুষ্কৃতির হাতে তিনি মারাত্মক জখম হন। তাঁর ডান হাতে গ্যানগ্রিন হয়। রক্তের বিষক্রিয়া হয়ে শেষে তিনি 13আগস্ট,1865 সালে মারা যান।
অতীতে হাত ধোয়ার বিষয়ে কেউ তেমন অবগত ছিল না। হাত না ধুলে তাতে থাকা ব্যাকটেরিয়া যে সহজেই খাবারের মাধ্যম পেটে যেতে পারে, এ বিষয়ে তখন তেমন কেউ মাথা ঘামাত না! সে সময় হাত ধোয়ার প্রচলনটা ছিলো সেরেমোনিয়াল। বাথরুম থেকে এসে, খাবার আগে, কোনো নোংরা জিনিস ধরার পরে, এমনকি ডাক্তাররাও হাত ধুতো না কোনো ক্লিনিক্যাল প্রসিডিউর কিংবা ওটির আগে।
হাঙ্গেরিয়ান ডাক্তার ইগনাজ স্যামেলওয়াইজ তিনিই প্রথম এ বিষয়ে ভাবতে শুরু করেন। এই ডাক্তার পিউপেরাল ফিভার, যেটা চাইন্ড বেড ফিভার নামে পরিচিত ছিলো, সেটা নিয়ে ভাবতে শুরু করলেন। ১৮৪৬ সালে তিনি একজন ফিজিশিয়ানের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং পিউপেরাল সেপসিস এর মধ্যে কানেকশন খোঁজার চেষ্টা করেন। তিনি দেখেন, যেসব ডাক্তাররা পারসোনাল হাইজিন মেনে চলছেন তাদের অধীনে থাকা গর্ভকালীন মায়ের মৃত্যুর হার কমছে।
ইগনাজ স্যামেলওয়াইজ তার ইন্টার্নদের জানিয়ে দিলেন, সবার হাত ধুয়ে নিতে হবে যে কোনো ডেলিভারির আগে। আর ডেলিভারিতে ব্যবহৃত ইন্সট্রুমেন্ট ক্লোরিনেটেড লাইমে ধুতে হবে। ব্যাপারটা এখন খুব সিম্পল লাগছে শুনতে। হয়তো মনে মনে ভাবছেন, কী এমন করেছেন তিনি, সামান্য হাত ধুতেই তো বলেছেন!
কিন্তু না, তিনি এর থেকেও বড় কিছু করেছেন। কারণ তখনও জীবাণু তত্ত্ব সেভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সায়েন্টিফিক সোয়াসিটির লোকজন তখনও বিশ্বাস করতো রোগ বালাই হয় খারাপ আত্মা দিয়ে। সেখানে ডাক্তার ইগনাজ স্যামেলওয়াইজ শুধু তার ডাক্তারদের হাত ধুইয়ে গর্ভকালীন মৃত্যুর হার ১০ থেকে ১ শতাংশে এ নামিয়ে ফেললেন।
ডাক্তার ইগনাজ স্যামেলওয়াইজ চাইল্ড বেড ফিভারে মায়ের মৃত্যু ১ পারসেন্টে নামিয়ে আনলেন।
কি আশা করছেন, তাকে খুব সম্মান দেওয়া হয়েছে তারপর ? ভূষিত করা হয়েছে কোনো হায়েস্ট অনারে ? না, তাকে পাঠানো হয় মেন্টাল এসাইলামে, মাত্র ৪৭ বছর বয়সে। অপরাধ ?
তিনি মরিয়া হয়ে সকল গাইনি এন্ড অবসের ডাক্তারদের চিঠি লিখতে শুরু করেছিলেন যেন তারা হাত ধুয়ে, ইনস্ট্রুমেন্টস ধুয়ে কাজ করেন। এতে জীবন বাঁচবে।
হাত ধোয়ার কথা বলার কারণে তখনকার সব চিকিৎসকেরা তাঁকে 'পাগল' বলে আখ্যা দেন।
তাঁর হাত ধোয়া নিয়ে হাসাহাসি করা লোকজনদের তিনি 'ইরেসপনসিবল মার্ডারার' বলতেন। যেকোনো আড্ডাতে ডাক্তার বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তিনি এই হাত ধোয়ার থিওরির কথা তুলতেন। সবাই বিরক্ত হত। আস্তে আস্তে তিনিও ডিপ্রেশনে পড়তে লাগলেন। সবাই তাকে পাগল মনে করেছিল। তাঁকে দেয়া হলো 'মেন্টাল এসাইলামে'। কেউ বললো তাঁর 'নিউরো সিফিলিস' হয়েছে, কেউ বললো 'বদ আত্মা' ভর করেছে।
মাত্র ১৪ দিন পর, মেন্টাল এসাইলামের গার্ডরা তাঁকে প্রচন্ড পেটালো। পেটানোর ফলে তাঁর হাতে-শরীরে ক্ষত থেকে পচন ধরে। সেখান থেকে তার মৃত্যু হয় মাত্র ৪৭ বছর বয়সে।
তাঁর কাছে হাত ধোয়া ছিলো ক্রুসেডের মত। আজ আমরা স্ক্রাব নেই ওটির আগে, এই কথা বলতেই তিনি পাগল প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন ও মৃত্যুবরণ করেছেন।
তাঁর মৃত্যুর পর দুই থেকে তিনজন তার শেষকৃত্যে আসেন। তাঁর মৃত্যুর কথা 'হাংগেরিয়ান মেডিক্যাল সোসাইটি' তাদের ঐতিহ্য অনুযায়ী প্রকাশও করেনি তাদের নিউজ লেটারে।
জীবাণু তত্ত্ব, অর্থাৎ রোগের উৎপত্তি জীবাণু থেকে হতে পারে আবিষ্কারের অনেক বছর পর তাঁর স্বীকৃতি মেলে। তাঁর স্মৃতিতে অনেক বড় বড় স্তম্ভও গড়া হয়েছে আজ।
তৎকালীন রীতিনীতির বাইরে গিয়ে ভাববার ক্ষমতাই তাকে অনন্য করেছে। হাত ধোয়া, কতটা সাধারণ ব্যাপার আজ। এই কথাটা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে একজন জীবন বিসর্জন দিয়ে গেছেন, ভাবতেই মনটা কেমন যেন খারাপ হয়ে যায়।
রাকেশ ঘোষাল
Comments
Post a Comment