জীবন যুদ্ধ



সুজাতা যেদিন মা হয়েছিল সেদিন ওর বয়েস মাত্র সাত বছর। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরতেই ওর মা ওকে একটা ছোট্ট পুতুল ধরিয়ে দিয়ে বলেছিল, তুই মেলা থেকে চোখ নাড়া পুতুল কিনতে চেয়েছিলিস না? এই নে, আজ থেকে একে নিয়ে খেলবি। মা তার মানে ওর জন্য পুতুল কিনতেই দিন পাঁচেক বাড়িতে ছিল না। তবে যে কাকিমা বলেছিল, তোর ভাই হবে, তোকে আর তোর মা আদর করবে না। ইস, কাকিমা শুধু ফালতু কথা বলে। মা ওকে কত ভালোবাসে, ওর পুতুল কিনতেই মা বাইরে গিয়েছিল। সুজাতা অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখেছিল ফুটফুটে পুতুলটার দিকে। একমাথা কালো কুচকুচে চুল, লালচে ঠোঁট, আঙুলগুলো অবধি নড়ছে। সুজাতার পুতুলের সংসারে সবচেয়ে সুন্দরী হলো মেঘমালা। যার নীলচে চোখ, মেমদের মত গাউন পরানো। ওর পাত্র খুঁজতে খুঁজতে সুজাতা হয়রান হয়ে গিয়েছিল। এমনকি সুজাতার কাকার মেয়ে শোভনার ছেলের সঙ্গেও বিয়ে দিতে রাজি হয়েছিল। কিন্তু শোভনা বিয়েতে বরপণ হিসাবে চেয়েছিল ওর একমাত্র ঘোড়ার গাড়িটা। তাই মেঘমালার আর বিয়ে দেওয়া হয়ে ওঠেনি। 
বিয়ে ব্যাপারটা সুজাতার ভারী মিষ্টি লাগে। কি সুন্দর বেনারসি পরে, গয়না পরে সাজে। মাথায় থাকে ফুলের মুকুট। সবাই কত কি ভালো ভালো খায়, তাই বিয়েটা ওর খুব পছন্দের। দিনরাত পুতুলের বিয়ে দেয় ও। বাবা বলেছে, খুব তাড়াতাড়ি সুজাতারও নাকি বিয়ে দিয়ে দেবে। বেশ মজা হবে। ও বরকে কত কি রান্না করে দেবে। বালি দিয়ে ভাত রাঁধবে, পাতার তরকারি করবে, হাজার কাজ থাকবে তখন ওর। কোলের পুতুলটাকে বসাতে যেতেই মা হা হা করে উঠে বলেছিল, এখুনি নয় সুজি, আর দুদিন পরে বসবে ও। মনখারাপ হয়ে গিয়েছিল ওর। শোয়া আর ট্যা ট্যা করে কাঁদা বরকে কি বিয়ের পিঁড়িতে বসানো যায় নাকি? ভেবেছিল আজই শোভনাকে নিমন্ত্রণ করবে মেঘমালার বিয়েতে। আরেকটা কারণেও মনখারাপ হয়েছিল, বাড়িতে যেই আসছে সেই এমন চোখ নাড়া, কাঁদা পুতুলটাকে দেখে বলছে, কি রে সুজি, তোর ভাই কেমন আছে? তোকে দিদি বলে ডাকছে? কি মুশকিল রে বাবা। দিদি কেন বলবে, ওকে তো মা বলে ডাকবে ওর পুতুল। বিরক্ত হচ্ছিল মনে মনে। মায়ের পেটের দিকে তাকিয়ে দেখছিল, কদিন আগেই বেশ বড় মত ছিল, এখন আর নেই। তাহলে কি এরাই সত্যি বলছে, এটা মায়ের পেটের মধ্যে ছিল? এ সত্যিকারের মানুষ? ধুর, এত ভেবে লাভ নেই। এটা সুজাতার পুতুল। আর সুজাতার ছেলে। সেদিন থেকে প্লাবনের মা হয়েছিল সুজাতা। প্লাবন যেদিন বসতে শিখেছিল সেদিনই তড়িঘড়ি ওর বিয়ে দিয়ে দিয়েছিল মেঘমালার সঙ্গে। বাবা সেদিন, লুচি, তরকারি, মিষ্টির ব্যবস্থা করেছিল মেয়ের আবদারে। 
প্লাবন বড় হচ্ছিল। বুদ্ধিও বাড়ছিল সুজাতার। ধীরে ধীরে ও বুঝতে শিখেছিল প্লাবন পুতুল হলেও ওর মানুষের মতো প্রাণ আছে। যখন তখন ওর চুল আঁচড়াতে গেলে, জামা পরাতে গেলে ও ভীষণ রেগে যায়। তবে সুজাতার ইচ্ছে মতোই ওকে প্লাবন দিদি না ডেকে মাম্মাম বলে ডাকে। ছোট্ট প্লাবনকে দিনরাত ঘিরে থাকে সুজাতা। প্লাবনও মায়ের থেকে বেশি দশ বছরের দিদির কাছে থাকতে ভালোবাসে। বছর তিনেকের প্লাবন যখন কেঁদে গোটা বাড়ি মাথায় তুলে ফেলে, যখন কেউ ওকে ভোলাতে পারে না তখন একমাত্র ভরসা সুজাতা। মা বলে, প্লাবন তো আমার থেকে বেশি সুজির কোল চিনেছে। নিজের স্কুল আর পড়াশোনার অতিরিক্ত সময় সুজাতার কাটে ওই জীবন্ত পুতুলটাকে নিয়ে। সে যখন মাম্মাম বলে ডাকে মনে হয় যেন সব ভুলে যাবে সুজাতা। 

কি হলো রে সুজি, সকাল থেকে ঘরের কাজগুলো না সেরে এখনও বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছিস? তোরা ভাই-বোন মিলে কি আমাকেই খাটিয়ে মারবি? ওদিকে রিক্তাকে দেখে আয়। তোর থেকে কত ছোট। কেমন গুছিয়ে সংসার করছে দেখ। 
অন্যমনস্ক সুজাতার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একটা হাসি ফুটে উঠলো, সংসার...সেটা তো ও সেই সাত বছর বয়স থেকেই সামলাচ্ছে। প্লাবনের জন্মের পর থেকেই মা ক্রমাগত অসুস্থ হয়ে পড়ছিল। প্লাবনের যখন মাত্র চার বছর বয়স, তখনই মায়ের ওভারিতে ক্যানসার ধরা পড়লো। অপারেশন হলো, ট্রিটমেন্ট হলো, কিন্তু মাকে বাঁচানো গেল না। এগারো বছরের সুজাতার হাতে সংসারের দায়িত্ব দিয়ে মা চলে গেল। আত্মীয়স্বজনরা সকলেই বললো, দুটো ছেলে মেয়ে নিয়ে অরূপ একা একা কি করবে? বিয়ে করা আবশ্যক। বাবা নিমরাজি হয়ে সুজাতা আর প্লাবনের মুখের দিকে তাকিয়ে বিয়েটা করেই নিলো। 
সুজাতার বারোতে নতুন মা ঢুকলো বাড়িতে। কি সুন্দর দেখতে সেই মাকে। ঠিক যেন দুর্গা প্রতিমার মত। সুজাতার খুব ইচ্ছে করতো নতুন মাকে একটু ছুঁয়ে দেখে। কিন্তু ভয়ে কখনো মায়ের আঁচল ধরেনি ও। চোখের নিমেষে বদলে যাচ্ছিল বাবা। সুজি আর প্লাবন কিছু বলতে গেলেই বলতো, উফ এত বিরক্ত করিস না তো। নতুন মাকে দিনরাত জ্বালাস না। সুজাতার সেই বাবাটা যে বলতো, মেয়েটা আমার বড় লক্ষ্মী সেও কেমন যেন পাল্টে গেল। দুঃখ নেই সুজাতার, ওর সেই ছোট্ট পুতুলটা এখন বেশ বড় হয়েছে। দিদি কাঁদলে চোখের জল মুছিয়ে দিতে শিখেছে। প্লাবনই ছিল ওর আনন্দের একমাত্র উৎস। 
আবারও ঘর থেকে ডাক দিল মা, কি রে সুজি তোর আজ হলো কি? দুটো আনাজ কাটতে যে বেলা গড়িয়ে দিবি? 
আজ সুজির অনেক কিছু হয়েছে। তাই তো কেবল ফিরে যাচ্ছে ফেলে আসা দিনে। নেড়ে ঘেঁটে দেখে নিচ্ছে ওর বিয়াল্লিশের জীবনটাকে। আয়নার সামনে দাঁড়ালে এখন দেখতে পায় হাঁসের পায়ের ছাপ পড়ছে চোখের নিচে। ঝুলপিতে সিলভার লাইন তর্জনী উঠিয়ে বলছে, বয়েস আর নদীর জল কোনোটাই বাঁধ দিয়ে আটকে রাখা যায় না। এতগুলো বছরের দেওয়া নেওয়ার হিসেবটা নিজের কাছে পরিষ্কার রাখা খুব জরুরি। ফুলকপিটা কাটতে কাটতেই ভাবছিল সুজাতা, শীতের দিনে মা ফুলকপির সিঙ্গারা করতো। সুজাতার খুব প্রিয় ছিল। নতুন মা আসার পরই সুজাতা বুঝতে পেরেছিল, ছোট বলে যদিওবা প্লাবন একটু আধটু আদর পায়, ওর কপালে একটা বড় শূন্য। মাধ্যমিকের পর থেকেই অদ্ভুতভাবে গোটা সংসারের দায়িত্বটা এসে পড়লো ওর ওপরে। 
নতুন মা মানে কমলিনীদেবী মুখ মিষ্টি হলেও নিজের ব্যাপারে খুব সচেতন ছিল। বাবার সরকারী চাকরি হলেও ঠিকে ঝি ছাড়া আর কোনো কাজের লোক ছিল না বাড়িতে। কমলিনীদেবী প্রথম দিন থেকেই সুজাতাকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন ওর দায়িত্ব। প্লাবনকে স্নান করানো, খাওয়ানো সব ওর কাজ। মাধ্যমিকের পর সকালের চা, নিজেদের জামাকাপড় কাচা এগুলোও ওর ভাগেই এসে পড়েছিল। কারণ কমলিনী তখন সন্তানসম্ভবা ছিলেন। প্লাবনের দায়িত্ব, সংসারের কাজকর্ম সামলে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে বেশ অসুবিধাই হচ্ছিল সুজাতার। ওর কিশোরীবেলাটা কেমন যেন খুব তাড়াতাড়ি ছুটে চললো প্রাপ্তবয়স্কের দিকে। কলমের গাছের মত, দ্রুত ফল দেওয়ার শর্তেই যেন বাগানে স্থান দেওয়া হয় ওদের। ফলনে দেরি হলেই বাড়ির কর্তা বেশ বিরক্ত মুখে বলেন, কলমের গাছেও যদি এত দেরিতে ফল হয় তাহলে আর যাই কোথায়? তেমনিই মাত্র পনেরোতেই সকলে আশা করছিল সুজাতা প্রাপ্তবয়স্কা হয়ে যাক। শুধু দায়িত্ব শব্দের বানান নয়, দায়িত্ব শব্দের অর্থও বুঝে যাক। সুজাতা প্রানপন চেষ্টা করছিল বড় হওয়ার। নিখুঁতভাবে সকলের মন রাখার। ওর কোনো কাজে যেন কোনো ত্রুটি না থাকে সেই চেষ্টায় প্রাণপাত করতো ও। তারপরেও দিনের শেষে সকলের মুখে বিরক্তি। বাবা বলতো, অনেক তো বড় হলি সুজি, এখনও পারলি না?
কমলিনীদেবী ব্যঙ্গাত্মক হেসে বলতো, অলস মায়ের মেয়েরা বোধহয় এমনই হয়। 
ওর আবারও একটা বোন হলো। রিক্তা। এবারে আর বোনটাকে পুতুল বলে গুলিয়ে ফেলেনি সুজি। প্লাবন আর রিক্তার নামের আগে ছোট শব্দটা সবাই বসাতো। শুধু সুজাতার নামের আগে কখনো বাচ্চা মেয়ে শব্দটার উপস্থিতি টের পেলো না কেউই। প্লাবনের স্কুলের টিফিন গোছানো, রিক্তার কান্না ভোলানো, বাবার অফিস টাইমে রুমাল-ব্যাগ গুছিয়ে দিয়ে স্কুলে ছুটতো সুজাতা। সাইকেলের প্যাডেলে জোরে জোরে চাপ দিয়েও পৌঁছাতে পারতো না নির্দিষ্ট সময়ে। রোজই ক্লাস টিচার এক দফা অপমান করে ঢুকতে দিতেন। 
এরই মধ্যে কবে যে সুজাতার গুণমুগ্ধ তৈরি হয়েছিল ও জানতেই পারেনি। ওর ব্যস্ত সময়ের চাপে বসন্তের প্রবেশ ও টেরই পায়নি। হঠাৎই একদিন খেয়াল করেছিল, রানীদিঘির ধারে স্কুলের ঠিক বাঁদিকের গলিতে একটা ছেলে রোজ দাঁড়িয়ে থাকে। ও স্কুলে ঢুকে গেলেই সেও চলে যায়। সুজাতার কাছের বান্ধবী অনুরাধা বলেছিল, ওই দ্যাখ, তুই আসবি বলে তমালদা কখন থেকে ওয়েট করছে। তুই স্কুলে ঢুকে যাবি আর তমালদাও চলে যাবে কলেজে। বিস্মিত হয়েছিল সুজাতা! ওর জন্য অপেক্ষা করে, কেন কি দরকার ওকে? প্রয়োজন ছাড়া তো সুজিকে কেউ ডাকে না। বাবা, নতুন মা, ভাই, বোন এমনকি ওদের কাজের মাসি পর্যন্ত সুজিকে ডাকে কোনো না কোনো প্রয়োজনে। বিনাপ্রয়োজনে কেউ তো ওকে মনেই করে না। 
অনুরাধাকে জিজ্ঞেস করেছিল, কেন রে আমায় কি প্রয়োজন ওই ছেলেটার? অনুরাধা বিরক্ত মুখে বলেছিল, তুই ক্লাস টুয়েলভে পড়িস না টুতে? তমালদা তোকে ভালোবাসে। আমাকে বলেছে। আমাদের পাশের পাড়াতেই তো বাড়ি। দারুন ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট। 
নরম দাড়ি আর টিশার্টের মাঝে সংকোচ মাখানো চাউনিটা আড়চোখে দেখেছিল সুজাতা। 
তারপর থেকে রোজ দেখতো ওর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটাকে। এইচ এস শেষে একদিন তমালের সাইকেলটা ধীরে ধীরে এগিয়ে এসেছিল ওর দিকে। ভয়ে আধমরা হয়ে দাঁড়িয়েছিল সুজাতা। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অনুরাধার হাতটা শক্ত করে ধরে রেখেছিল। তমাল সামনে দাঁড়িয়ে নিঃসংকোচে বলেছিল, অনু তুই একটু ওদিকে যা ওর সঙ্গে আমার একটা কথা আছে। সুজাতার হাতের মুঠো আলগা করে সরে গিয়েছিল অনু। মাটির দিকে তাকিয়ে ধুলোকনা গুনতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল ও। তমালের গলাও সেই প্রথম শুনেছিলো সুজাতা। আমি কেন রোজ কলেজ যাওয়ার আগে তোমাদের স্কুলের গেটে দাঁড়িয়ে থাকি সেটা নিশ্চয়ই অনুর কাছ থেকে শুনেছো। তাই আর দ্বিতীয়বার বললাম না। অন্যের হবার আগে প্লিজ একবার আমায় জানিও। তোমার অপেক্ষায় থাকবো। সুজাতা কাঁপা গলায় বলেছিল, বাবা জানতে পারলে খুব বকবে, পড়াশোনা ছাড়িয়ে দেবে। তমাল দীর্ঘশ্বাস গোপন করে বলেছিল, কেউ জানবে না। শুধু তুমি জানলে একজন তোমার প্রতীক্ষায় থাকবে। নিজের পায়ে শক্ত করে দাঁড়িয়ে তোমার দিকে হাত বাড়িয়ে দেবে। যদি বিশ্বাস করো তাহলে হাত ধরবে। 
তমাল চলে গিয়েছিল। একটা নরম স্নিগ্ধ বসন্ত বাতাস ঘিরে ধরেছিল সুজাতাকে। গলার কাছে জমাট বাঁধছিলো অনেকটা না পাওয়ার কষ্ট আর একটুরো প্রাপ্তির সুখ। ওকেও কেউ ভালোবাসতে পারে, ওর জন্য কেউ অপেক্ষা করতে পারে এটাই তো কল্পনাতীত। 
সাইকেলের প্যাডেলে জোরে প্রেশার না দিয়েও সেদিন যেন উড়ছিল সুজাতা। দমকা হাওয়ার মতোই যৌবন ওর সম্মুখে উপস্থিত হয়ে বলেছিল, তুমি তোমার সুন্দরী পুতুল মেঘমালা নও, তুমি তোমার মেম পুতুল রুশা নও তবুও একজন আছে যে চিনিয়ে দিলো তুমি অনন্যা। 
বাড়ি ফিরেছিল ঈষৎ গোলাপি হয়ে যাওয়া মনটা নিয়ে। ফিরেই দেখেছিল হুলুস্থুল কান্ড। রিক্তার গায়ে প্রবল জ্বর। বাবা অফিসে, প্লাবন কাঁদছে, মা একা ওকে কোলে নিয়ে ঘরে বাইরে করছে। 
স্কুল ড্রেস না ছেড়েই রিক্তাকে কোলে নিয়ে ছুটেছিলো অমিয় ডাক্তারের কাছে। ডাক্তারবাবু বলেছিলেন, বুকে সর্দি বসে নিমোনিয়া। নেবুলাইজড করতে হবে। নার্সিংহোমে ভর্তি করতে হবে। রিক্তাকে নার্সিংহোমে ভর্তি করে বাড়ি ফিরেছিল সুজাতা। মা আর বাবা ততক্ষণে রেডি হয়েছিল বেরোবে বলে। ওকে দেখেই মা প্রায় চিৎকার করে বলেছিল, কোথায় মেরে দিয়ে এলি রিক্তাকে? নিজের বোন নয় বলে এই সুযোগে ওকে মেরে দিবি? 
বুকের ভিতরটা ভেঙে গুঁড়িয়ে গিয়েছিল সদ্য আঠেরোর মেয়েটার। বাবা এসে গালে সপাটে একটা চড় মেরে বলেছিল, এত হিংসা তোর মনে? তোর মা বলতো বটে খেতে বসে তুই রিক্তার পাতের দিকে তাকিয়ে দেখিস তোকে কম দেওয়া হলো কিনা, কিন্তু আমি বিশ্বাস করিনি। অসুস্থ মেয়েটাকে কোথায় ফেলে দিয়ে এলি তুই?
বিধস্ত গলায় সুজাতা বলেছিল, নিরাময় নার্সিংহোমে ভর্তি করেছি। অমিয়বাবু ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। টাকা লাগবে, আর রাতে মাকে ওর সঙ্গে থাকতে হবে। তাই বাড়ি এসেছিলাম এগুলো বলতে। 
বাবা আর মা বাবার বাইকে চেপে ছুটেছিলো নিরাময়ে। নিজের বিছানায় শুয়ে অনেকক্ষণ কেঁদেছিল সুজাতা। বুঝেছিল ভালোবাসা বলে কিছু হয় না। সবটুকুর নাম প্রয়োজন। 
প্লাবন এসে ওর গলা জড়িয়ে ধরে বলেছিল, মাম্মাম, কাঁদিস না, আমি থাকবো তোর সঙ্গে। 

গরম সর্ষের তেলের মধ্যে ফুলকপিগুলো ছেড়ে দিতেই চড়বড় আওয়াজে তীব্র প্রতিবাদ জানালো। এই প্রতিবাদটুকুও কখনো জানাতে পারেনি সুজাতা। কেবল মনে হয়েছে ওর জন্য যদি কেউ কষ্ট পায়, থাক। কষ্ট, যন্ত্রণা, দুঃখরাও যেন নিশ্চিন্তে বসবাস শুরু করেছিল সুজাতার অন্তরের অন্তঃস্থলে। ওরা হয়তো বুঝেছিল, এখান থেকে ওদের কোনোদিনই উৎখাত করতে পারবে না কেউ। আনন্দের প্রবেশ নিষিদ্ধ এ দুয়ারে। 
কলেজে ভর্তি হবার পর থেকেই শুরু হয়েছিল নতুন অশান্তি। মা দিনরাত বলেই যেত, এত পড়ে ও করবে কি? ঘরের কাজ করুক। তবুও জেদ ধরেই সুজাতা বলেছিল, ঘরের কাজ করেই আমি কলেজ যাব। বেশিরভাগ দিন ঠিক কলেজ বেরোনোর আগেই মা ইচ্ছে করে ওকে সময়সাপেক্ষ কাজ দিতো। কোনোমতে কলেজ আর টিউশন চালাচ্ছিল ও। প্লাবন পড়াশোনায় খুবই ভালো ছিলো। আর ছেলে বলেই হয়তো বাবা-মা দুজনেই ওকে পড়ানোর ব্যাপারে কার্পণ্য করেনি। 

তমালের চোখের করুণ চাউনিকে উপেক্ষা করেই নির্দয়ভাবে সুজাতা বলেছিল, প্লিজ আমায় ভুলে যাও, অযথা সময় নষ্ট করো না। আমি ভালোবাসতে পারবো না। আমার কাছে ভালোবাসা বলতে আমার ভাই প্লাবন। বাকি সব ভীষণ কেজো প্রয়োজন। তাই অপেক্ষা করো না। তমাল তখন সদ্য চাকরি জয়েন করেছে। বলেছিল, তাও, তুমি সময় নাও সুজাতা। আমি অপেক্ষা করবো। 

কি রে, তরকারিটা হলো? প্লাবন টেবিলে এসে বসে আছে তো? ওকে তো অফিসে যেতে হবে। কত কাজ ওর অফিসে। তাছাড়া রূপালীও তো যাবে অফিসে। 
প্লাবন আর রূপালী একই সঙ্গে বেরোয় অফিসে। দুজনে একই ডিপার্টমেন্টে কাজ করে। সেখান থেকেই ওদের প্রেম আর বিয়ে। প্লাবনের বিয়ের আগের দিনও ওর প্রিয় মাম্মাম জানতে পারেনি যে ও বিয়ে করতে যাচ্ছে। আচমকাই রূপালীকে সঙ্গে নিয়ে বাড়িতে ঢুকেছিলো ও। পরিষ্কার জানিয়েছিল ওরা রেজিস্ট্রিটা করে নিয়েছে পার্টি থ্রো করবে কদিন পরে। মা, বাবা বোধহয় জানতো। তাই মা একটুও অবাক না হয়ে রূপালীকে বরণ করেছিল। 
অপলক তাকিয়ে ছিল সুজাতা। মেঘমালার মতই সুন্দরী রূপালী। কিন্তু সেদিন ও নিজে দাঁড়িয়ে বিয়ে দিয়েছিল ওদের। প্লাবন এসে স্পষ্ট গলায় বলেছিল, তোকে জানানো হয়নি রে মাম্মাম, হঠাৎই হয়ে গেল। মুখে হাসি টেনে সুজাতা বলেছিল, ভারী মিষ্টি বউ হয়েছে তোর। চিরকালের সংসারী সুজাতা গুছিয়ে দিয়েছিল ভাইয়ের ঘরদোর। 
প্লাবন আর রূপালীকে গরম ভাত, ফুলকপির তরকারি, মাছের ঝাল সাজিয়ে দিয়ে রান্নাঘরে যেতে যেতে বলে গেল, তোদের আর কিছু লাগলে বলিস। অন্যদিন ওদের সামনেই দাঁড়িয়ে থাকে সুজাতা। রান্নাঘরে ঢুকতে ঢুকতেই শুনতে পেল, মা বলছে, ভুতে পেয়েছে নাকি রে তোর দিদিকে? সকাল থেকেই দেখছি কাজে মন নেই। 
না নেই মন সুজাতার কাজে। আজ শুধুই ফিরে দেখতে চায় ও জীবনটাকে। 
বহুদিন অপেক্ষা করছিল তমাল ওর জন্য। 
রিক্তার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল কলেজের সেকেন্ড ইয়ারে। মা-বাবাই সুপাত্র দেখে বিয়ে দিয়েছিল রিক্তার। সুজাতার বিয়ের কথা কেউ তোলেনি। সুজাতা শুধু একটা কথাই শুনতো, ও ছাড়া নাকি সংসার অচল। ও নাকি ওদের সংসারের খুঁটি। বাবা বলতো, সুজির বিয়ে হলে এ সংসার অচল হয়ে যাবে। কমলিনীদেবীও মুখে না বললেও এটাই বিশ্বাস করত, সুজি ছাড়া তার দুদন্ড চলবে না। প্লাবন ওকে জড়িয়ে ধরে বলতো, মাম্মাম তুই যেন অন্য বাড়িতে চলে যাস না, তাহলে আমি কি করে বাঁচবো। অফিস থেকে ফিরে তোকে না দেখলে চলে। ওর ইঞ্জিনিয়ার ভাই ওকে আবদার করে বলতো, তুই হলি আমার ধ্রুবতারা। তোকে ছাড়া আমি দিকভ্রষ্ট। রিক্তার বিয়ের পরে তমালের মুখোমুখি হয়েছিল সুজাতা। তমাল বলেছিল, আর কত বছর প্রতীক্ষা করবো তোমার? তোমার থেকে কত ছোট বোনের বিয়ে হয়ে গেল, আর তুমি?
সুজাতা নির্দ্বিধায় বলেছিল, আমি ছাড়া আমার সংসার অচল তমাল। তুমি সংসার পাতো। 
মাস পাঁচেক পরে শুনেছিলো তমালের বিয়ে। 
আর সকলের মত কালীমন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল সুজাতা, তমালের বউ দেখবে বলে। 
ঠিক ওর মেম পুতুলটার মত বউ হয়েছে তমালের। চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল তমালের সাজানো সংসার। যেমন ও ছোটবেলায় গুছিয়ে সংসার পাততো তেমনই। 
'একজন আছে ওর অপেক্ষায়' এই অনুভূতিটুকুকে বিসর্জন দিয়েছিল রানীদীঘির জলে। রং চটে যাওয়া সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দিয়ে ছুটেছিলো টিউশনি পড়াতে। রেবতীদের বাড়িতে গোটা ছয়েক ছেলেমেয়েকে পড়াতো ও। বাবার রিটায়ারমেন্টের পরে নিজের হাত খরচটুকু জুটিয়ে নেবার জন্যই শুরু করেছিল টিউশনি। এখন এইটুকুই যেন ওর মুক্ত বাতাস। যেখানে তমাল দাঁড়িয়ে থাকতো ওই রাস্তাটা দিয়ে রেবতীদের বাড়িতে গেলে একটু বেশি সময় লাগে, তবুও সুজাতা ওই রাস্তাটাই বেছে নেয়। ঠিক ঐখানে দাঁড়িয়ে খুব জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে বলে, তমাল ক্ষমা করো। আমার পরিবার যে আমায় ছাড়া একেবারে অচল, ওদের ছেড়ে যাই কি করে। বড্ড স্বার্থপর লাগবে নিজেকে। 

দিদি আরেকটু তরকারি দিও তো। রুপালীর গলা শুনে কড়াই থেকে একটি তরকারি বাটিতে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো সুজাতা। ওর দিকে তাকিয়ে প্লাবন বললো, কি ব্যাপার তোর? হঠাৎ এত মনমরা? চিন্তা নেই ভাবনা নেই, তোর মনখারাপ দেখলে সত্যিই অবাক লাগে জানিস?
সেই কচি কচি হাতের ছোঁয়াটা নিজের গলার কাছে আরেকবার অনুভব করার চেষ্টা করলো সুজাতা। 
অনেক চেষ্টা করেও বৃথা হলো। রূপালী বললো, আসলে দিদির তো তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ নেই, তাই অলস মস্তিস্ক, সেই জন্যই মনখারাপ লাগে। তুমি এক কাজ করো দিদি, আমার ঘরের দুটো আলমারি গুছিয়ে রেখো, দেখো নানারকম পোশাক দেখতে দেখতে তোমার মন ভালো হয়ে যাবে। প্লাবন হেসে বললো, রুপালীর এই একটা গুন জানো মা, ও সকলের কথা ভাবে। মা সিরিয়ালের রিক্যাপ দেখতে দেখতেই বললো, রূপা আমাদের লক্ষ্মী মেয়ে। রিক্তাও বলে, দাদার একটা গুণী বউ হয়েছে। 
প্লাবন আর রূপালী বেরিয়ে গেল গাড়ি করে। 
সুজাতারা আর মধ্যবিত্ত নেই। দোতলা বাড়ি হয়েছে, গাড়ি হয়েছে। ভাই আর ভাইয়ের বউ এই জন্যই মা-বাবার কাছে বড্ড কাছের। 
তমালের বউকে সুজাতা দেখেছিল দুর্গাপুজোর অষ্টমীর দিন। এক গা গয়না পরে চওড়া হেসে ঘুরছিল তমালের সঙ্গে। না ওকে তমাল দেখতে পায়নি। মুহূর্তের জন্য তমালের বউয়ের মুখটা সরিয়ে দিয়ে নিজের মুখ বসিয়ে লজ্জায় লাল হয়েছিল।  
পরক্ষণেই বাস্তবের মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়েছিল ওর ক্ষণিকের কল্পনা। 
ধুমধাম করে বিয়ে হয়েছিল রিক্তার, প্লাবনও বেশ বড়সড় গেট টুগেদার দিয়েছিল লজে। সব কিছুর ব্যবস্থাপনায় অবশ্যই ছিল সুজাতা। সে যে বড্ড দামি, সকলের তাকে প্রয়োজন। আত্মীয়রা সকলে এসে বলতো, তোমাদের বড় মেয়ের যেন দশটা হাত। মা দুর্গার মত সামলাচ্ছে সব। গর্বে বুক ভরে যেত ওর। সমস্তটুকু নিখুঁত করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়তো। দায়িত্ববান মেয়ে হবার লড়াইয়ে জেতার আকুল প্রচেষ্টা ছিল সুজাতার। এভাবেই চলতে চলতে কবে যে ও বিয়াল্লিশের দোর গোড়ায় পৌঁছে গেল নিজেও জানে না। রিক্তার একটা ছেলে হয়েছে। বাবা-মা নাতির গল্পে মশগুল। রূপালী আর প্লাবনের বিয়েরও হয়ে গেল বছর পাঁচেক। রূপালী বলে, ওই তো আমার সন্তানকে মানুষ করবে দিদিভাই। আমি তো অফিসে যাবো। দিদিভাইই ভরসা। প্লাবন মুচকি হেসে বলে, মামাম্ম, দুই প্রজন্মকে মানুষ করবি তুই। 
সুজাতা সেই সাত বছর বয়সে প্রথম মা হয়েছিল, আবারও হয়তো এই বয়সে মা হবে সুজাতা, ভাইয়ের সন্তানের মা। 
আবার একটা কচি হাত ওকে জড়িয়ে ধরবে। এই সুখেই কাটছিল দিন। ইদানিং রাতে ওর ঘুম হয় না ভালো। ঘরের মধ্যে কেমন একটা দমবন্ধ লাগে। 
বাইরের বারান্দায় এসে দাঁড়ায় মধ্যরাতে। 
মাসখানেক আগেও বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল সুজাতা। রূপালী বেশ জোরে জোরেই বলছে, আমি দেখেছি দিদি আমাদের ঘরে আড়ি পাতে। বোঝো না কেন, বিয়ে হয়নি, সেক্সসুয়াল চাহিদা যাবে কোথায়? এগুলো আসলে মানসিক রোগ বুঝলে। তবে এখন যেন আবার দিদির পাত্র খুঁজতে যেও না। দিদির বিয়ে হয়ে গেলে আমার ছেলে মেয়ে মানুষ থেকে বাকি যাবতীয় প্ল্যান ভেস্তে যাবে। মা তো দিনরাত বাতের ব্যথায় শুয়েই থাকে। দিদি আছে বলেই চলে সংসারটা স্মুদলি। তবে আমি বলছি শোনো, দিদির কিন্তু সমস্যা আছে। আমি দুদিন জানালা খুলতে গিয়ে দেখেছি দিদি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে ভূতের মত। তখনই বুঝলাম, কান পাতে। আমি একটা পত্রিকাতে পড়ছিলাম, এই বয়সে নাকি এসব প্রবলেম হয়। প্লাবন বললো, তাহলে জানালাগুলো ভালো করে বন্ধ করে এসি চালিয়ে দিও। 
তাড়াতাড়ি নিজের ঘরের দিকে ছুটছিলো সুজাতা। এসব কি বলছে ওর ভাই, ভাইয়ের বউ। ওর যদি শারীরিক চাহিদা তৈরিই হয়ে থাকে কখনো সেইজন্য ভাইয়ের ঘরে কান পাতবে? ওরা ওকে এত নিকৃষ্ট ভাবে! 
বাবা,মায়ের ঘরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়েও শুনতে পেল দুজনে সুখ দুঃখের গল্প করছে। নিঃস্ব রিক্ত বিছানায় একা শুয়ে ভাবলো, দিনের শেষে ও একা, বড্ড একা। 
মোবাইলটা খুলে সেদিনই ম্যাট্রিমনি সাইটে বিজ্ঞাপন দিয়েছিল, একলা মনের সঙ্গী চাই। বয়েস বিয়াল্লিশ। ঘোর সংসারী। কেউ কোনো দিন সুন্দরী বলেনি, একমাত্র আয়না ছাড়া। শারীরিক তাগিদে নয়, মনের সঙ্গী চাই। 
বেশ কয়েকজন যোগাযোগ করলেও সুজাতার ভালো লাগেনি তাদের। কিন্তু বছর পঁয়তাচল্লিশের রঞ্জনকে ওর মন্দ লাগেনি। স্ট্রেইট কথা বলেন ভদ্রলোক। প্রথমেই বললেন, আমি ডিভোর্সি। আমার ওয়াইফ আমার নামে চার্জ এনেছিল আমি নাকি তাকে মারধর করি। যদিও আমি নিজে কোনোদিন তার গায়ে হাত তুলিনি। আমার ওয়াইফ আরও চার্জ এনেছিল, আমি নাকি তার স্ত্রীধন হাতিয়ে নিয়েছি। যদিও আমি বিনাপনে, সব খরচ করে বিয়ে করে এনেছিলাম তাকে, তবুও এগুলো আমার নামের আগে বসানো হয়েছিল। এরপরেও যদি বিশ্বাস করেন, তাহলে সঙ্গী হতে রাজি। আমি একজন ব্যাংকার। একলাই থাকি ফ্ল্যাটে। দিনশেষে বড্ড একলা লাগে। চট করে কারোর সঙ্গে বন্ধুত্ব করে উঠতে পারি না। 
সুজাতার বেশ লেগেছিলো রঞ্জনের এই পরিষ্কার মুখোশবিহীন কথাগুলো। বাবা,মা, প্লাবন, রূপালীর মুখোশের আড়ালের মুখটা দেখতে দেখতে কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল এ সংসারে ওর জায়গাটা। দুলে উঠেছিল ভালো মেয়ে হয়ে থাকার আপ্রাণ প্রচেষ্টাটা। তাই দিন সাতেক আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে ও, রঞ্জনের সঙ্গেই কাটাবে বাকি জীবনটুকু। এর থেকে আর কি খারাপ হবে?
এ সংসারে ও কাজের লোক বৈ তো নয়। 
আজকেই ওদের রেজিস্ট্রির দিন। তাই সকাল থেকেই অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছে ও। স্মৃতির পাতা উল্টে বারবার মিলিয়ে নিতে চাইছে জমা-খরচের হিসেবটুকু। 
হালকা গোলাপি রঙের বাঁধনি প্রিন্টের পিওর সিল্কটা পরে খুব অল্প একটু প্রসাধন সেরে বেরোনোর মুখেই মা বললো, বিকেলে ফিরে এসে লিস্ট করে দিবি। রিক্তা আসছে। কতদিন পরে আসবে বলতো মেয়েটা। কি কি বাজার থেকে আনতে হবে টাকা নিয়ে নিয়ে আসবি। বাবার স্পন্ডেলাইটিসটা বেড়েছে বোধহয়। তুইই বাজারটা করে আনিস। 
খুব শান্ত গলায় সুজাতা বলেছিল, আমার ফিরতে দেরি হবে। ওর মুখে কোনোরকম না শুনতে যে এবাড়ির মানুষ অভ্যস্ত নয় সেটা ও বেশ বুঝতে পেরেছে। সঙ্গে সঙ্গে বাবা ঘর থেকে বলেছিল, কেন কি রাজকার্য করতে চললে তুমি? ওই তিনহাজার টাকার টিউশনি না পড়ালেও এ সংসার আটকে থাকবে না। বহুদিন তো বলেছি, প্লাবনের কাছ থেকে তিনহাজার চেয়ে নিও। আমার পেনশনের টাকা থেকেও দিতে পারি কিন্তু ওটা আমাদের ওষুধপত্র কিনতেই চলে যায়। 
সুজাতা এই প্রথম আবার শান্ত গলায় বলল, প্লাবন ফিরলে ওকে বলো ও বাজার করে আনবে। মা যেন আকাশ থেকে পড়লো, কি বললে? প্লাবন বাজারে যাবে! অত বড় পোস্টে চাকরি করে, সারাদিন খেটে এসে বাজারে যাবে? অদ্ভুত ভাবনা তোর সুজি। 
সুজাতা বুঝেছিল, ওরা সকলের না শুনতে অভ্যস্ত হলেও সুজাতার মুখের না শুনতে মোটেই অভ্যস্ত নয়। 
রঞ্জনের সঙ্গে এটা ওর দ্বিতীয় সাক্ষাৎ। প্রথম সাক্ষাৎ করেছিল স্টেশনে। খুব কম সময়ই ছিল সুজাতা। একটু ভয় ভয়ই করছিল। এভাবে এই বয়সে কারোর সঙ্গে আলাপচারিতা করলে যদি কেউ কিছু ভাবে, কেউ যদি বলে সুজাতা খারাপ মেয়ে! তাই দুর্ভাবনাতেই বেশীক্ষণ দাঁড়ায়নি সুজাতা। রঞ্জন হেসে বলেছিল, ভয় পাচ্ছেন? যে মানুষটার সংগে সারাজীবন কাটাবেন তাকে চিনে নেবেন না? যদি আমার আগের ওয়াইফের আনা অ্যালিগেশনগুলো সত্যি হয়, ভয় করছে না আপনার? সুজাতা শান্ত গলায় বলেছিল, যার কিছুই নেই তার আর হারাবার ভয় কিসের? উত্তাল সমুদ্রের মাঝে ডিঙিতে চেপে যাওয়াও যা, জাহাজে চেপেও তাই। ভাগ্যের দোহাই দিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। তাই এক-আধঘন্টা বেশি দেখে কি মানুষ চেনা যায়? যাকে সেই সাত বছর বয়স থেকে মানুষ করলাম তাকেই চিনলাম না। জন্মদাতা পিতাকেই বুঝলাম না। মা ডেকেও যাকে কোনোদিন আপন করতে পারলাম না, বোনকে ভালোবেসেও দিদি হতে পারলাম না, সেখানে সম্পূর্ন অপরিচিত একজন মানুষকে চিনে নেব মাত্র একঘন্টায়? এত দুঃসাহস কি আমার আছে? রঞ্জন আলগোছে বলেছিল, বড্ড ভালো লাগলো আপনাকে। অকপট বলেই। বহুবছর মুখোশ পরা মানুষের সঙ্গে সংসার করেছি, ডিভোর্সের পরে তিনবছর শুধু আত্মবিশ্লেষন করেছি, ভুলটা কোথায় ছিল? তারপর বুঝলাম, মিসম্যাচ ছিলাম। মনে হচ্ছে আপনার আর আমার জুটিটা ক্লিক করে যাবে। সুজাতা হেসে বলেছিল, দেন ট্রাই। বললাম না, আমার হারানোর কিছু নেই। আত্মার টান নামক অলীক কিছুর পিছনে ছুটতে ছুটতে আমি ভীষণরকমের ক্লান্ত। একটু বিশ্রাম চাই, একজন নির্ভরযোগ্য সঙ্গী হলেই চলবে। 
আরেকটা কথা, আমি যদি হোমসার্ভিস করি ফুডের, তাহলে আপনার অসুবিধা নেই তো? বেশ কিছু টাকা জমিয়েছি, ভেবেছিলাম একটা বিজনেস স্টার্ট করবো। লোকে আমার হাতের ঘরোয়া রান্না খেয়ে বলে, মন্দ নয়। সেই ভরসাতেই শুরু করবো। রঞ্জন হেসে বলেছিল, আপনার জীবনটা শুধুই আপনার, সেখানে কয়েক দন্ড সময় দেবেন আমায়, ব্যস, বাকি আপনার। 

কি হলো, এত দেরি হলো যে তোমার? অনেকক্ষন ধরে দাঁড়িয়ে আছি। হালকা হেসে সুজাতা বললো, আজকেও ওই বাড়ির প্রয়োজনটুকু মিটিয়ে দিয়ে এলাম। আগামীকাল যেন শূন্যতাটুকু উপলব্ধি করে। বিয়াল্লিশ বছরের পরিশ্রমের এটুকু মূল্য তো দাবি করে মন, তাই না? রঞ্জন অপলক তাকিয়ে বললো, আমরা অকারণে অসাধারণের পিছনে ছুটে মরি। অথচ নিতান্ত সাধারণের মধ্যে কত কোহিনুর লুকিয়ে আছে তাকিয়েও দেখি না। যখন দেখতে পাই তখন জীবনের অনেকগুলো বসন্ত শুধু বিবাদ করেই কেটে যায়। যাকগে শেষটুকুকেই আগলে রাখার চেষ্টা করি। সুজাতা বললো, কাঁচকে কোহিনুর ভাবছো না তো? রঞ্জন হেসে বললো, সেটা তো জহুরী বলবে। 
রেজিস্ট্রিটা মিটতেই সুজাতা বললো, চলো বাড়িতে দেখা করে তারপর যাবো নতুন সংসারে। আর কয়েকটা জিনিস নেবার আছে আমার। একটা ব্যাগে কিছু জামা কাপড় আছে। এছাড়া আমার মেঘমালা আর মেমপুতুলটাকে নিয়ে নেব সঙ্গে। আমার বহু রাত জাগার সঙ্গী ওরা। ওদের কাছেই জমা রাখতাম যন্ত্রণার ঝুলিটা। 
রঞ্জন বললো, তোমার বাবা-মা তো জানেন না, যদি অপমান করেন? সুজাতা মুচকি হেসে বললো, কোহিনুরের জন্য একটু সহ্য করে নিও। 
বাড়িতে পা দিয়েই দেখলো ওকে নিয়েই আলোচনা চলছে। এখনও কেন বাড়ি ফেরেনি ও! প্লাবন আর রূপালী বিরক্ত মুখে বললো, এই ফিরেছি অফিস থেকে, চা না খেয়ে কি বিয়াল্লিশের দিদিকে খুঁজতে যাব? দিদির তো আর প্রেম করার বয়েস নেই, যে কারোর সঙ্গে পালিয়ে যাবে! গেছে হয়তো কোথাও, চলে আসবে এখুনি। যাওয়ার জায়গা আর তো নেই। 
সুজাতার সিঁথিতে সিঁদুর দেখে চমকে উঠলো বাবা। অদ্ভুত গলায় মা বললো, কি সর্বনাশ হলো! এসব কি? প্লাবন আফসোসের গলায় বললো, সম্মান বলে কিছু রইলো না। 
সুজাতা আলতো করে বললো, আমার বাবাও আমার বয়েসেই দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলেন, আমার ভাইও আমায় না জানিয়েই আচমকা বিয়ে করে বাড়ি ঢুকেছিলো, আমিও জাস্ট ওদের ফলো করলাম মাত্র। রঞ্জন বাবা-মাকে প্রণাম করতে গেলে ওরা বিরক্তিতে সরে গেল। সুজাতা নিজের ঘর থেকে ওর ব্যাগ আর পুতুলের সংসার গুছিয়ে নিয়ে বেরিয়ে এলো। মা কাতর গলায় বললো, তুই যে বিয়ে করবি আগে বললে একটা সবসময়ের কাজের মেয়ের ব্যবস্থা করতাম, এখন বিশ্বাসী মেয়ে কোথায় পাই? রূপালী চিন্তান্বিত স্বরে বললো, আজকেই টেস্ট করেছি, আমি কনসিভ করেছি, এখন কি হবে? প্লাবন বললো, অভাবটা কি হচ্ছিল এই বাড়িতে তোর? বাবা অসন্তোষের গলায় বললো, আমার যাবতীয় কাজ এখন করবে কে? এমন বিনানোটিশে চলে যাওয়ার মানে কি?
সুজাতা বললো, এই তো এটুকুই প্রাপ্তি আমার। তোমাদের প্রয়োজনটুকু থাকতে থাকতে বিদায় নিলাম। 
রঞ্জন গাড়িতে উঠেই ওর হাতটা ধরে বললো, মেঘমালা আর মেমকে আমায় দাও, আমি ওদের মায়ের কষ্টটুকু চেয়ে নিই ওদের কাছ থেকে। 
সুজাতার শুকনো চোখে জল ডাকলো অনেক দিন পরে। বুকের মধ্যে একটা একটা করে দরজা খুলে যাচ্ছে, ভিতরে জমাট হয়ে থাকা যন্ত্রণার পাহাড়ে বহু বছর পরে একটু আনন্দের বাতাস বইলো। 
রানীদিঘি, স্কুল, পুরোনো স্মৃতি পেরিয়ে এগিয়ে চলেছে সুজাতা।

রাকেশ ঘোষাল

Comments

Popular posts from this blog

গ্রীষ্মের_ছুটিতে ছাত্রের লেখা খোলা চিঠি