শুচিস্মিতা
ভোরের আলো ফোটার আগেই খবর এল, কৌশিক চলে গেছে। অহনা আজ বহুদিন পর কৌশিকের ঘরটায় ঢুকল। চারদিকে এলোমেলো ভাবে ছড়ানো ছিটানো রয়েছে আঁকার জিনিসপত্র। কয়েকটা রঙের শিশির ঢাকা এখনও খোলা, তুলিগুলো রঙে মাখা। আঁকতে আঁকতে উঠে গেলে যেমন সবকিছু পড়ে থাকত, ঠিক সেইরকম। বিয়ের পর প্রথম প্রথম ঘরটাকে গুছিয়ে রাখতে চাইত অহনা। কৌশিক বিরক্ত হত, শিল্পীর ঘর নাকি অমন অগোছালোই হয়। ঘরময় শুধু ছবি, কৌশিকের সারাজীবনের সৃষ্টি। এই ছবিগুলোকে ও যা ভালোবাসত, নিজেকেও বোধহয় কখনও অতটা ভালোবাসতে পারেনি কৌশিক। ঘরটার প্রতিটা ধূলোতেও যেন কৌশিকের গন্ধ পাচ্ছে অহনা। ক্যানভাসে আঁকা ছবিটা একটা সমুদ্রের। সমুদ্রের গভীর থেকে যেন উঠে আসছে সূর্যটা। সূর্যের আলোটা রঙ-তুলির ছোঁয়ায় এখনও সেভাবে ছড়িয়ে পড়েনি সমুদ্রের জলে। সূর্যোদয়টা অসম্পূর্ণ রেখেই অস্তাচলে চলে গেল কৌশিক। হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে নাকটা মুছে নেয় অহনা। চোখের জলের সাথে কীভাবে যে সর্দির এমন ওতপ্রোত সম্পর্ক বুঝতে পারে না অহনা।
মাত্র তেতাল্লিশে কৌশিক যে এইভাবে হঠাৎ করে চলে যেতে পারে, ভাবতেও পারেনি অহনা। বন্ধুবান্ধব, হৈ-হুল্লোড় আর নিজের কাজ নিয়েই তো মেতে থাকত সারাটা দিন। শিল্পীমহলে কৌশিক দস্তিদার এখন তো জনপ্রিয় একটা নাম। কৌশিকের ছবি তো দেশের গন্ডী ছাড়িয়ে বিদেশেও পাড়ি দিচ্ছিল। গত সপ্তাহেই তো একটা ছবির প্রদর্শনী উদ্বোধনের জন্য দিল্লি গিয়েছিল। ফিরেছে চার-পাঁচদিন আগে। এত কিছুর মধ্যে মানুষটার হৃৎপিন্ডটা যে ভেতর ভেতর বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল, কৌশিক কি বুঝতেও পারেনি !!! না কি বুঝেও এড়িয়ে গেছিল কষ্টটাকে। কিচ্ছুটি জানা হল না অহনার। যদিও অহনার সাথে কৌশিকের সম্পর্কটা ভাঙতে শুরু করেছিল বছর চারেক আগে থেকেই। তখন সদ্য সদ্য শিল্পীমহলে নাম করছে কৌশিক। আঁকার জন্য আজ এখান কাল ওখান যেতেই আছে। অহনার জন্য এতটুকু সময় নেই তখন কৌশিকের হাতে। অথচ তখনই বোধহয় কৌশিককে বেশি পাশে দরকার ছিল অহনার। বিয়ের সাতবছর পরে, বহু চিকিৎসার পর সন্তান এসেছিল অহনার গর্ভে। কিন্তু সে খুশি বেশিদিন থাকেনি, খুশিটুকু সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই নিভে গিয়েছিল খুশির প্রদীপ। অহনা প্রাণে বেঁচে গেলেও মা হওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিল চিরতরে। হতাশায় জীবনটাই অর্থহীন মনে হচ্ছিল অহনার কাছে, আরও বেশি করে আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিল কৌশিককে। তখনই কাজের অজুহাতে যেন নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিল কৌশিক। আজ মনে হচ্ছে সত্যিই হয়তো কাজের জন্যই যেতে হত কৌশিককে। কিন্তু তখন মনে হত অহনার অক্ষমতার জন্যই হয়তো অহনাকে এড়িয়ে চলছে কৌশিক। অনেক অশান্তি - অনেক ভুল বোঝাবুঝির পর ওদের সম্পর্কটা আর যেন আগের মতো হয়নি। কৌশিক বহুবার বোঝাতে চেয়েও বোঝাতে পারেনি অহনাকে। ওকে বাদ দিয়ে কৌশিক যদি সুখী হতে চায় হোক। ইচ্ছা করেই যেন কৌশিকের থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছে অহনা। একটা অদৃশ্য দেওয়ালের দু’পাড়ে চলে গেছে দু’জনে। দিনে দিনে নাম-যশ-খ্যাতি বেড়েছে কৌশিকের। সেই খুশিটুকু কতবার অহনার সাথে ভাগ করে নিতে এসেছে কৌশিক। কিন্তু নিস্পৃহ ভাবে বারবার কৌশিককে দূরে ঠেলে দিয়েছে অহনা। এইভাবে কখন যে সত্যিসত্যি কৌশিক দূরে চলে গেছে বুঝতেও পারেনি অহনা। দু’বছর আগে কৌশিকের “শুচিস্মিতা” ছবিটার জন্য জাতীয় পুরষ্কার পাওয়ার খবরটা যখন খবরের কাগজ পড়ে জানতে হয়েছিল অহনাকে, সেদিনই বুঝেছিল ওদের সম্পর্কের শেষ উষ্ণতাটুকুকেও অভিমানের শীতলতা গ্রাস করে ফেলেছে।
কাল সন্ধ্যেবেলা যখন কৌশিকের বন্ধুরা ওর হার্ট-অ্যাটাকের খবরটা দিল, ভয়ে আঁতকে উঠেছিল অহনা। উদভ্রান্তের মতো ছুটে গিয়েছিল হাসপাতালে। কৌশিক তখন আই.সি.ইউ-তে। কাঁচের দরজার এপাড় থেকে দেখেছিল কৌশিকের নিথর দেহটা, শুধু মাথার কাছে যন্ত্রতে ওঠানামা করছে জীবনের লেখচিত্র। বাহাত্তর ঘন্টা না কাটলে ডাক্তারবাবু কোনও ভরসা দিতে পারেননি, শুধু আপ্রাণ চেষ্টার প্রতিশ্রুতিটুকু দিয়েছিলেন। বহুবছর পর অনুভব করেছিল এখনও কৌশিকের জন্য সব অনুভূতিগুলো মরে যায়নি। অনেকটা ভালোবাসা লুকানো আছে হৃদয়ের গভীরে। রাতে হাসপাতালেই থাকতে চেয়েছিল অহনা। কিন্তু কৌশিকের বন্ধুরাই ওখানে থাকার দায়িত্ব নিয়েছিল বলে বাড়ি ফিরে আসতে হয়েছিল অহনাকে। তবু মনটা যেন পড়েছিল কৌশিকের কাছেই। বাড়ি ফিরেই মঙ্গলাকে জানিয়ে দিয়েছিল রাতে কিছু খাবে না। বিয়ের পর থেকেই মঙ্গলা সবসময় এ বাড়িতে রয়েছে। অহনার সাথে কৌশিকের সম্পর্কের ওঠাপড়া সব দেখেছে নিজের চোখে। তবু অহনার শরীরের কথা ভেবে অল্প কিছু খেতে অনুরোধ করেছিল। অহনা পারেনি কিছু খেতে, গলা দিয়ে খাবার তখন তার নামত না। কৌশিক সুস্থ হয়ে ফিরে এলে দু’জনের মাঝের অভিমানের মেঘটুকু মুছে না ফেলা অবধি স্বস্তি নেই অহনার। কিন্তু সেই সুযোগটুকুও অহনাকে দিল না কৌশিক।
কৌশিকের আঁকার ঘরের ছোট ডিভানটাতে হেলান দিয়ে এটা-সেটা ভাবতে ভাবতে কখন যেন চোখটা লেগে গিয়েছিল অহনার। কপালে আলতো হাতের ছোঁয়াতে জেগে ওঠে। দিদি-জামাইবাবু দু’জনেই এসেছে। নিশ্চই মঙ্গলা খবর দিয়েছে। দিদির হাতটা চেপে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে অহনা। বেলা বাড়ার সাথে সাথে আসতে শুরু করে আত্মীয়স্বজন-প্রতিবেশী-কৌশিকের পরিচিত মানুষজন। “শুচিস্মিতা”-র শিল্পী কৌশিক দস্তিদারের অকাল প্রয়াণের খবর ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। বাড়ির সামনে ভিড় করেছে মিডিয়ার লোকজন। শুধু কৌশিক এখনও এসে পৌঁছায়নি। এতটা দেরি তো হওয়ার কথা নয় ওর আসতে, তবু কেন জানি না দেরি হচ্ছে আজ। কৌশিকের নিজের হাতে গড়া স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান “চিত্রলেখা”-র সমস্ত ছাত্রছাত্রী এসে গেছে।
কৌশিক শুয়ে আছে, সাদা চাদরে ঢাকা শরীর। মুখটাতে এখনও যেন ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। কতবছর পর যেন কৌশিককে দু’চোখ ভরে দেখছে অহনা। সবসময় তো হাসিমুখেই থাকত কৌশিক, এতটা ক্লান্ত আগে কখনও লাগেনি ওকে। অহনার প্রত্যাখ্যান-ই কি ভেতর ভেতর এতটা ক্লান্ত করে তুলেছিল কৌশিককে !!! আজ সবকিছুর জন্য নিজেকে দায়ী মনে হচ্ছে অহনার। এত বছরের জমাট অভিমান দু’চোখের ধারায় নেমে আসছে অহনার দু’চোখ বেয়ে। জলের ফোঁটায় ভিজে যাচ্ছে কৌশিকের গায়ের সাদা চাদর। কৌশিকের মাথার দিকের হলঘরের দেওয়ালে জ্বলজ্বল করছে ওর “শুচিস্মিতা”।
ছবির নিচে ছোট্ট একটা লাইন, “তুমি এমনই থেকো চিরকাল”।
লাইনটা হয়তো অহনাকেই লিখেছিল কৌশিক...
রাকেশ ঘোষাল
Comments
Post a Comment