মন ডুবুড়ি


আমার মা যখন মারা গেল তখন আমি চার বছরের বাচ্চা। সবসময় মায়ের পায়ে পায়ে ঘোরা কোনোদিনই হয়ে ওঠেনি। বাবা-মা দুজনকেই কাছে পেতাম ওই রোববারের কয়েকঘন্টা। তাও তো বাবা সকালে চা খেয়েই ছুটতো সারা সপ্তাহের বাজার করতে, মা সেদিন ওয়াশিং মেশিনে কাপড় কাচা, ঘরের অন্যান্য কাজ করতে ব্যস্ত থাকতো। আমায় দেবার মত সময় কারোর ছিল না ছোট থেকেই।


 একজনই আমায় একটু সময় দিত, সেটা হলো বাবার কম্পিউটারটা। বাবা রোজ ইউটিউবে কার্টুন চালিয়ে দিয়ে চলে যেত অফিস। আমি বাড়িতে বসে বসে সেটা দেখতাম। 

খুব ছোটবেলার স্মৃতিও আমার অদ্ভুতভাবে সব মনে আছে। কেন কে জানে ভুলিনি কিছুই! সকালে রোজই দেখতাম বাবা-মা দুজনেই হুটোপাটি করে স্নান সেরে রিনা আন্টির রান্না করা খাবার খেয়ে ছুটে বেরিয়ে যেত অফিসে। তারপর রিনা আন্টি চলে যাবার আগেই ঢুকত আমায় সব সময় সামলে রাখার জন্য শ্যামলী আন্টি। মা-বাবা না ফেরা পর্যন্ত থাকতো শ্যামলী আন্টি। আবার শ্যামলী আন্টি চলে যাবার আগেই রিনা আন্টি এসে রান্নাটা করে দিয়ে যেত। মা-বাবা দুজনেই খুব ক্লান্ত হয়ে যেত সারাদিন পর বাড়ি ফিরে। আমি একটু দুষ্টুমি করলেই মা টিভিটা চালিয়ে দিয়ে বলতো, প্লিজ টুটুল বিরক্ত করো না। শ্যামলী আন্টি যতক্ষন বাড়িতে থাকতো ততক্ষণ টিভিতে সিরিয়াল দেখতো, আমায় কম্পিউটারে কার্টুন চালিয়ে দিয়ে। আমারও ঘাড় গুঁজে ওইসব দেখা অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল। শ্যামলী আন্টি সিরিয়াল দেখতো, বাবা-মা বাড়ি ফিরে নিজেদের মত থাকতো, তাই কথা বলার সুযোগ হতো না আমার। আমি প্রায় চার বছর বয়েস পর্যন্ত বাবা, মা, মামা, কাকা ছাড়া একটাও পূর্ণ বাক্যে কথা বলতে পারতাম না। তারপরেই ওই  চূড়ান্ত আঘাতটা এসে সামনে দাঁড়ালো আমার। মা কার এক্সিডেন্টে মারা গেল।


 বাবা অল্পতেই মেজাজ হারাত। রিনা আন্টি নিজের পছন্দমত রান্না করে রেখে যেত, শ্যামলী আন্টি প্রায়ই আমার মারত। স্নান করতে গিয়ে একটু জল ঘাঁটলে মারত, খেতে বসে দেরি করলে মারত। আমারও খুব ইচ্ছে করতো সবার সঙ্গে কথা বলি, কিন্তু কেউ বলতো না কথা। সেই জন্যই বোধহয় আমি কথা শিখিনি। আমায় স্কুলেও ভর্তি করতে পারেনি বাবা। প্লে স্কুলে ভর্তি করেছিল মা বেঁচে থাকতেই, কিন্তু তারাও দুদিন পরে আমায় বাড়িতে বসিয়ে দিয়ে গিয়েছিল, বলেছিল অ্যাবনরম্যাল চাইল্ড। হ্যাঁ, ওই নামেই পরিচিত হয়েছিলাম আমি আত্মীয়স্বজন সকলের কাছে। আমি নাকি আর পাঁচটা বাচ্চার মত নই। কত রকম রোগের নাম বলতো সবাই, অটিস্টিক, মেন্টাল ডিজঅর্ডার, ওয়ার্ড ডেফিসিয়েন্সি, ওসিডি, আরো কত কি। কোনটা যে ঠিক আমার, সেটাই তো কেউ বুঝে উঠতে পারছিল না! আমি সব শুনতাম, বাবার কপালে দুশ্চিন্তার লক্ষণ দেখতাম। বাবা আমায় দেখলেই রেগে যেত। বিরক্ত হয়ে ফোনে সকলকে বলতো, বেঁচে গেছে টুটুলের মা, এই অ্যাবনরম্যাল ছেলের জন্য আমার জীবনটা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। কোনো মতেই কথা বলে না এই ছেলে। শুধু ঘাড় গুঁজে বসে থাকে। আর বোকা বোকা তাকায় মাঝে মাঝে। এই বয়েসে বাগচীদার ছেলেটা স্টেজে উঠে কবিতা আবৃত্তি করছে, আমার ছেলে দেখো, শুধু বাবা,মা, কাকা আউরে যাচ্ছে। বিলিভ মি, আমি রিয়েলি টায়ার্ড। শর্মিষ্ঠা মারা যাবার পর আর কিছু ভালো লাগে না রে। তারপর একজনকে যে জড়িয়ে ধরে বাঁচার চেষ্টা করবো সেটাও হবার নয়। টুটুল যে কেন এমন হলো? আমাদের জিনে তো এমন কোনো রোগ নেই, মা বলেছে আমায়। শর্মিষ্ঠার মা বলেছেন, ওদের বংশেও নাকি এমন হিস্ট্রি কারোর নেই। অথচ লোকে আঙুল দেখিয়ে বলে, অমরেশ সেনগুপ্তর ছেলেটা নরম্যাল নয়। কেমন ফিল হয় বুঝতে পারিস! 


আমারও আরেকটা পোশাকি নাম আছে, টুটুল তো আমার আদরের নাম, যদিও আমার মনে হতো এটা শুধু ডাকার সুবিধের জন্য সহজ একটা নাম। আমার সেই পোশাকি নামটা হলো অমলেন্দু সেনগুপ্ত। সে নামে আমি পরিচিত হবার সুযোগ পাইনি তখনও, কারণ প্লে স্কুল থেকে বিতাড়িত হবার পরে বাবা আর আমায় স্কুলে ভর্তি করেনি। মাকে আমার মাঝে মাঝেই মনে পড়ে, মা আমায় সন্ধেবেলা খাইয়ে দিত আর ফোনে কথা বলতো বন্ধুদের সঙ্গে। কিন্তু কখনো শ্যামলী আন্টির মত মেরে মেরে খাওয়াতো না। আমি মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। মা চলে যাবার পরে আমার খুব কান্না পেতো, আমি লুকিয়ে কেঁদেছিলাম। কি জানি কেন নির্বাক কার্টুন ক্যারেক্টারগুলো আমার খুব ভালো লাগতো। ঠিক যেন আমার মত। ঠিক আমাদের বাড়ির মতোই।  বাড়িতে কেউ বেশি কথা বলতো না। সবাই যে যার কাজ করতো মুখ গুঁজে। আমিও মুখ বুজে কম্পিউটারে কার্টুন দেখতাম। 


মা চলে যাবার পরে বাবা সবসময় আমার ওপরে খুব রেগে থাকতো। আমায় দেখলেই যেন জ্বলে যেত। তাই আমি বাবা অফিস যাওয়া পর্যন্ত বিছানায় মড়ার মত পড়ে থাকতাম। ঘুমের অভিনয় করতাম। আমায় দেখলেই বাবা প্রায় মারতে আসতো, আর বলতো, বল কথা বল....মুখ বন্ধ করে থাকবি তো মেরে শেষ করে দেব। আমি লুকিয়ে পড়তাম বাবার আড়ালে। আমাকে অনেক ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিল বাবা। তারা নার্ভের কিছু ওষুধও দিয়েছিল। খেয়ে আমার শরীর খারাপ করছিল বলে বাবা বন্ধ করে দিয়েছিল সেসব ওষুধ। বলেছিল, কিছু হবে না, টুটুল কোনোদিন কথা বলবে না। এভাবেই কাটছিল আমার দিনগুলো। না, কথা আমি বলতে পারতাম না। মানে বলার চেষ্টাও করিনি কোনোদিন।  ওই বাবা,মা ,দাদা ছাড়া আর কিছুই বলতে পারতাম না। 


হঠাৎই একদিন একজন মহিলাকে নিয়ে বাবা আমাদের বাড়িতে ঢুকলো। তারপরেই বললো, কাল থেকে শ্যামলী আর আসবে না। শ্যামলীর বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। তাই এই যে কল্পনা পিসি এই তোর দেখা শোনা করবে টুটুল। দয়া করে একটু শান্তি দে আমায়। বাবা অফিস থেকে ফিরে ড্রিঙ্কের গ্লাস নিয়ে বসে যেত। কারোর সঙ্গে কথা বলতো না। ফোনেও বলতো না। শুধু ড্রিংক করতো আর ল্যাপটপ ঘাঁটত।

কেউ একজন বাবাকে বুদ্ধি দিয়েছিল, স্পিচ থেরাপিতে নাকি আমি কথা বলতেও পারি। বাবা বাধ্য হয়ে অফিসে ছুটি নিয়ে আমাকে নিয়ে গিয়েছিলো একজন স্পিচ থেরাপিস্টের কাছে। সেই ডক্টরকে আমার খুব ভালো লেগেছিল। সে আমার চোখের সামনে চকলেট ধরে বলেছিল, বলো তো টুটুল এটা কি? যদি বলতে পারো, এটা তোমার। আমি বলার চেষ্টা করেছিলাম ওটা চকলেট। কারণ আমি জানতাম ওটা চকলেট। মা অফিস ফেরত আমার জন্য নিয়ে আসত চকলেট। আমি খুব বলতে চেষ্টাও করেছিলাম, কিন্তু কেমন যেন ভয় করছিল। যদি ঠিক উচ্চারণ না করতে পারি? যদি গোঙানি বেরোয় গলা দিয়ে, তাহলে! আবার তো ডক্টরের সামনেই বাবা মারবে। এমন অনেক কিছু দেখিয়ে দেখিয়ে ডক্টর জিজ্ঞেস করছিলেন। নাক চেপে ধরে চেষ্টা করছিলেন, জিভ বের করে দেখেছিলেন। ডক্টর বলেছিলেন, মিস্টার সেনগুপ্ত, ওর যেহেতু বয়েসটা চার ক্রস করে গেছে তাই ওর সিটিং একটু বেশি লাগবে। অন্তত সপ্তাহে দিন চারেক আনতে হবে ওকে এখানে। বাবা কিছু না বলেই আমায় নিয়ে বাড়ি চলে এসেছিল। বলেছিল, বোবা ছেলে একটা। কিছু করতে পারবে না স্পিচ থেরাপিস্ট। বাবার একটা অব্যক্ত রাগ ছিল আমার ওপরে। আমায় নিয়ে হেরে যাওয়ার রাগ। 


কল্পনা পিসি বাড়িতে ঢুকেই আমার কাছ থেকে আমার কম্পিউটারটা কেড়ে নিয়েছিল। আমি বাটি, গ্লাস সব ভাঙচুর করেছিলাম। রিনা আন্টি বলেছিল, এসব করো না গো। ও ছেলে বোবা হলে কি হবে, রাগ খুব। কোনো রান্নায় নুন কম হলে আমায় ছুঁড়ে মারে। দিনরাত তো ওই মেশিনটাই ওর সঙ্গী। দাদাবাবু, বৌদিমনিও দেখেছি এই মেশিনের সামনে ওকে বসিয়ে দিয়েই নিজেদের কাজ সারতো সেই কোন ছোট থেকে। ছেলেও দুষ্টুমি না করে হাঁ করে বসে দেখতো। তাই ওই যন্ত্র কেড়ে নিলে ওই দস্যি ছেলেকে তুমি সামলাতে পারবে না কল্পনাদি এই বলে দিলাম। আমার আর কি, রান্নাটুকু করেই পালাবো। তোমায় তো ওই ছেলের সঙ্গে থাকতে হবে গোটা দিন। টিভির রিমোটটা কল্পনাদির হাতে দিয়ে রিনা আন্টি বলেছিল, শ্যামলীও এই সিরিয়াল দেখেই টিকে ছিল এ বাড়িতে। তুমিও ওই ছেলেকে কম্পিউটারের সামনে বসিয়ে নিজে সিরিয়াল দেখো। দেখবে ওই ছেলে রা কাটবে না। ওকে ওটা ফেরত দিয়ে দাও কল্পনাদি। নাহলে গোটা বাড়ি ভেঙে তছনছ করে দেবে। দাদাবাবু এসে খুব বকবে। কল্পনা পিসি মুচকি হেসে বলেছিল, বকুক। আমি বাপু বরাবরই এমন। তাই তো কোনো প্লে স্কুলেই টিকতে পারলাম না। সব স্কুলের নিয়মেই কিছু না কিছু গাফিলতি দেখলাম, সেই জন্যই ছেড়ে দিলাম তিনটে স্কুল। এখন ভেবেছি নিজেই একটা প্লে স্কুল খুলবো। তাই টুটুলকে নিয়েই আমি এক্সপিরিমেন্ট করতে চাই, আদৌ আমি ঠিক, নাকি অন্যরা। রিনা আন্টি বলেছিল, তুমি স্কুল টিচার ছিলে? মরণ ধরলো তোমার নাকি? তা এর খবর তুমি পেলে কোথায় গো?

কল্পনা পিসি হেসে বলেছিল, আমার ভাই আর তোমার দাদাবাবু একই অফিসে চাকরি করে। ভাইয়ের কাছ থেকেই শুনলাম টুটুলের কথা। তাই কাজে লেগে পড়লাম। শুরু তো করতে হবে কাউকে দিয়ে! রিনা আন্টি মুখ বেঁকিয়ে বললো, কত মানুষ যে দেশে পাগল আছে, কে জানে। ভদ্র বাড়ির শিক্ষিত, সুন্দরী মহিলা, বিয়ে থা না করে লোকের ছেলে ধরতে শুরু করেছে। কালে কালে আর কত কি দেখবো!!


কল্পনা পিসি আমায় ডেকে বলেছিল, এতদিন তো ওই একঘেয়ে কম্পিউটার দেখলে টুটুল, এবারে আমরা অন্য কিছু করবো। আমি রাগে ফেটে পড়েছিলাম। কল্পনা পিসির চুলের মুঠি ধরে জোরে টানছিলাম। পিসির চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছিল। বোধহয় লাগছিলো খুব। কল্পনা পিসি বলতে শুরু করে ছিলো....জানিস টুটুল এমন করেই ডাইনি বুড়ি কেশবতীর চুল ধরে ধরে ওপরের ঘরে উঠতো। ডাইনি বুড়ি তো খুব দুষ্টু ছিল, কিন্তু টুটুল তো রাজকুমার, তাই তো কেশবতীর চুল না টেনে ওকে বাঁচাবার চেষ্টা করবে। কি যে বুঝেছিলাম আমি কে জানে। কল্পনা পিসির চুল ছেড়ে দিয়েছিলাম। পিসি আমায় নিজের কোলের মধ্যে বসিয়ে নিয়েছিল। তারপর এক গরাস করে ভাত মুখে ভরে দিচ্ছিল আর বলছিলো, এটাও কিন্তু টুটুল খেলো না, এটা খেয়ে নিল একটা হরিণ ছানা। টুটুলের খুব মজা লেগেছিল। খাচ্ছে ও আর পিসি বোকার মত বলছে হরিনে খাচ্ছে, বাঘে খাচ্ছে! পিসিটা তো ওর থেকেও অ্যাবনরম্যাল। টুটুল হেসে গড়িয়ে পড়েছিলো। কল্পনা পিসি পরের ভাতের গ্রাসটা মুখের থেকে একটু দূরে ধরে বলেছিল, না বাঘ-সিংহ অনেক খেয়েছে, এবারে একটু পাখিদের ডাকি। আয়রে আমার টিয়া...আমি পিসির চোখ বন্ধের সুযোগে পিসির কোল থেকে উঠে গিয়ে খেয়েছিলাম ভাতটা। পিসি চোখ খুলে বলেছিল, ওমা পাখিটা এটাও খেয়ে গেল, তাহলে আমার টুটুল সোনা কি খাবে? তার পেট ভরবে কি করে? যাই আমি আরেক থালা ভাত নিয়ে আসি। তখন আমি বলে ফেলেছিলাম, আম্মি থেয়েছি। সেই প্রথম বাবা, মায়ের বাইরে একটা কথা বলেছিলাম আমি। পিসি সেদিকে গুরুত্ব না দিয়ে বলেছিল, ওরে দুষ্টু পিসিকে বোকা বানানো! আমার তখন একটাই কাজ ছিল পিসিকে কি করে বোকা বানানো যায়। 


পিসি আমার ড্রয়িং বুকে একটা নৌকা আঁকছিলো এমন সময় পিসির কিছু কাজ মনে পড়ে গিয়েছিল। খাতা ছেড়ে উঠে যাওয়ার সময় পিসি বলেছিল, টুটুল দেখিস তো, কোন টুনটুনি পাখি এসে যেন আমার নৌকাটা এঁকে না দিয়ে যায়। একটু পাহারা দিবি কিন্তু। আমি রান্নাঘর থেকে ফিরে আঁকবো। যেমনি পিসি উঠে যেত, আমি পিসিকে বোকা বানাবো বলে নৌকার বাকি অংশটা এঁকে দিতাম। 

পিসি এসে কাঁদো কাঁদো হয়ে বলতো, এমা টুনটুনিটা ঠিক আমার নৌকাটা এঁকে দিয়ে গেল? আমি একবার ধরতে পারি টুনিকে তারপর তুই দেখিস টুটুল আমি ওর কি করি!

এমনি করেই চলছিল পিসিকে বোকা বানানোর খেলাটা। 

পিসিকে রোজ রোজ নতুন নতুন পদ্ধতিতে বোকা বানাতে বানাতে কবে যেন কম্পিউটার নামক বস্তুটাকে ভুলে গেলাম আমি। তখন আমি গোটা বাড়িময় ছুটে বেড়াতাম। বাগানে গিয়ে গাছে কটা ফুল ফুটেছে গুনতে শেখাত পিসি। আমিও এক, দুই করে গুনে ফেলতাম সবগুলো ফুল। পিসি বলতো, ধর আরও চারটে ফুল কালকে ফুটলো, তাহলে কটা হবে, টুটুল বাবা তো জানেই না। আমি রেগে গিয়ে বলতাম, জানি, ফরটি প্লাস ফোর, অনলি ফরটি ফোর। পিসি হাততালি দিয়ে বলতো, ওমা, আমি কিছুতেই পারতাম না এই শক্ত অঙ্কটা, টুটুল বাবা পেরে গেল। আমি খুশিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠতাম। আমি জানতে চাইতাম, বাবা পারে? পিসি ঘাড় নেড়ে বলতো, বাবা তো পারেই না, শুধু টুটুল বাবাই পারে। পিসি আমার সামনে কবিতা বলতো, "আমি যদি দুষ্টুমি করে চাঁপার গাছে চাঁপা হয়ে ফুটি"...

এই যা রে টুটুল, একেবারে ভুলে গেলাম। 

আমি তখন বলে উঠতাম, "তবে তুমি আমার কাছে হারো, তখন কি মা চিনতে আমায় পারো?"

কখনো পিসি বলতো, এই রে টুটুল দেখবি আয়, তোর বইয়ে কি হয়েছে দেখ। দেখতাম পিসি বি ফর বয়টা হাত চাপা দিয়ে বলছে, এ এর পরই সি কেন হলো টুটুল? 

আমি বলে উঠতাম, বোকা, ওখানে তো বি ফর বয় আছে। 


হঠাৎই বাবা খেয়াল করলো, আমি দিনরাত পিসির সঙ্গে বকবক করছি। বই পড়ছি, গান করছি, কবিতা বলছি। 

আমার প্রায় মদ্যপ বাবা আমায় জড়িয়ে ধরে বলল, তুই বোবা নোস? তুই এত সুন্দর কবিতা বলতে পারিস? আর কেউ ফিসফিস করে আমায় দেখিয়ে বলবে না, অমরেশ সেনগুপ্তর ছেলেটা জানিস তো নরম্যাল নয়। 

কল্পনা পিসি বলেছিল, এবারে ওকে স্কুলে ভর্তি করতে হবে। পাঁচবছর হয়ে গেল ওর। তবুও আমি বলবো, ওয়ানে নয়, ওকে লোয়ারে ভর্তি করুন। 

আমাকে ভর্তি করা হলো স্কুলে। পিসিটা বড্ড বোকা। লোয়ারের সব পড়া ততদিনে আমার কমপ্লিট। তাই সবাই যখন শুরু করছে, আমি তখন সেটা শেষ করছি। যথারীতি ক্লাসে আমি ফার্স্ট হয়ে গেলাম। 


বন্ধুরাও আমার সঙ্গে গল্প করত। পিসি রোজ স্কুল থেকে ফেরার পরে আমায় জিজ্ঞেস করত, স্কুলে কি হলো? আমায় বকিয়ে বকিয়ে সব গল্প শুনত, কত যে প্রশ্ন করতো পিসিটা কি বলবো। উফ, কথা বলতে বলতে আমি হাঁপিয়ে যেতাম। হঠাৎই একদিন শুনেছিলাম, পিসি নাকি চলে যাবে আমাদের বাড়ি থেকে। আমি হাউমাউ করে কেঁদেছিলাম। মা মারা যেতেও আমি কাঁদিনি এত। বাবা বলেছিল, কল্পনা, জানি আমি অন্যায় আব্দার করছি তোমার কাছে। তবুও যদি সম্ভব হয়, আমার স্ত্রী নয় টুটুলের মা হয়ে কি থাকা যায় এবাড়িতে? তাহলেও কি তোমার কোনো সমস্যা হবে? মানে সমাজের কাছে পরিচয় দিতে কি অসুবিধা হবে তোমার?

পিসিকে জড়িয়ে ধরে আমি বলেছিলাম, যেতে দেব না। তুমি চলে গেলেই আমি মায়ের মত মরে যাবো। পিসি জড়িয়ে ধরে বলেছিল, এমন কথা কোনোদিন বলবি না টুটুল। 


ওই জন্যই কল্পনা পিসি আমার মা হয়ে গিয়েছিল। বাবা রেজিস্ট্রি করে বিয়ে করেছিল পিসিকে। যদিও পিসি বাবার থেকে বছর খানেকের বয়েসে বড়ই হবে। তারপর থেকে আমি কল্পনা পিসিকে মা বলে ডাকি। আমার মা এখন আমাদের পুরো বাড়ির নিয়ন্ত্রণ করে। বাবা ড্রিংক করা ছেড়েছে। ছুটির দিনে আমি, মা আর বাবা এক সঙ্গে বেড়াতে যাই। আমি নাকি এত বকবক করি, বাবা বলে টুটুল একটু চুপ কর, গলায় ব্যথা করবে যে! মা একদিন বাবাকে বলেছিল, আমার স্বপ্ন ছিল একটা প্লে স্কুল খুলবো। না, নরম্যাল বাচ্চাদের জন্য নয়, যারা একটু অন্যরকম তাদের জন্য। 


বাবা আমাদের বাড়ির এক তলাটাকে সাজিয়ে দিয়েছিল। মা স্কুলের নাম দিয়েছিল, 'টুটুলের খেলাঘর'। 

কয়েকদিনের মধ্যেই সেই স্কুলে ছোট ছোট বাচ্চা ভর্তি হতে শুরু করলো। তখন আমার আর সময় কোথায়! আমি তখন রীতিমত ক্লাস ফোরের ফার্স্ট বয়। কত চাপ আমার। আঁকা শিখি আমি, কবিতা বলি আমি.. আমি স্কুলে বেরোনোর সময় বাচ্চারা আসতে শুরু করত। আবার আমি স্কুল থেকে ফেরার সময় দেখতাম ওরা সব চলে গেছে। 


এভাবেই আমার মা বাচ্চাদের সঙ্গে মিশে থাকতো, আবার আমি এলেই মা তখন পুরোটা আমার দখলে। মা প্রায়ই বাবাকে বলতো, ছেলেটা আমার বড্ড হিংসুটে। স্কুলের বাচ্চাগুলোকেও হিংসে করে। আমায় জিজ্ঞেস করে, তুমি কি ওদের আমার মত খাইয়েও দাও? মাঝে মাঝে মা বলতো, টুটুল তুই ওদের একদিন ক্লাস নে না রে। আমি বড্ড টায়ার্ড আজ। আমি তখন ক্লাস সেভেন পড়ি। আমিও ঠিক মায়ের টেকনিকেই বাচ্চাগুলোকে বলেছিলাম, শিগগির রং ভরে নাও, নাহলে বাবুই পাখি এসে সব রং ভরে দিয়ে যাবে। এমা, বাচ্চাগুলো কি বোকা। সবাই ঝটপট রং ভরে দিয়েছিল। এমন মাঝে মাঝে আমিও ক্লাস নিতাম ওদের। 'টুটুলের খেলাঘর' এখন আর ছোট প্লে স্কুল নয়। রীতিমত দেড়শো জন স্টুডেন্ট আর প্রায় কুড়ি জন টিচার নিয়ে গড়ে উঠেছে।

বাবা বলেছে, একটা বাড়ি ভাড়া করতে হবে, শুধু একতলাতে নাকি আর হবে না। 

........


ওহ, আমি অনেকক্ষন ধরেই স্মৃতির সরণী বেয়ে পৌঁছে গিয়েছিলাম আমার শিশু বেলায়। আজ যেটা বলতে আমি এই মঞ্চে উঠেছি সেটা হলো, আমি আমার মায়ের ইচ্ছে মত সাইকোলজিস্ট হতে চাই। শুধু পাশ করা বিদ্যে দিয়ে নয়, আমার মায়ের মত সমস্যার গভীরে গিয়ে মনের সব কটা অলিন্দের দরজা ভেঙে খুঁজে দেখতে চাই, মূল সমস্যাটা কি! অ্যাবনরম্যাল দাগিয়ে দেওয়ার আগে শেষ চেষ্টা করতে চাই। 

আপনাদের অনেকের কাছেই আমি হয়তো প্রেরণা, কারণ আমি জয়েন্টে র‍্যাঙ্ক করেছি। মেডিকেলে ভর্তি হতে চলেছি। সেই জন্যই আজ পাড়ার ক্লাবের মঞ্চে আমায় পুরস্কৃত করা হবে, পাড়ার গর্ব বলে, কিন্তু আপনারা অনেকেই জানতেন না, আমার জীবনের শুরুটা আর পাঁচটা নরম্যাল বাচ্চার মত হয়নি। 

আমি মঞ্চে একবার অন্তত ডেকে নেব আমার বাবা-মাকে। যারা না থাকলে আমি হয়তো অ্যাবনরম্যাল বলে পরিচিত হয়ে যেতাম। আমার বাবা আমার জন্য অনেক খরচ করেছে, আমায় ভালো রাখার জন্য দ্বিতীয় বিয়ে করতে রাজি হয়েছে, আমার জন্য ড্রিংক করা ছেড়ে দিয়েছে। সব সময় বলেছে, ক্ষমা করিস টুটুল, তোকে ভুল ভাবে আমিই মানুষ করতে চলেছিলাম। 

আর আমার মা, যার কথা যতই বলি না কেন কম হয়ে যাবে। আমার মা পেশাদার ডক্টর নন, একজন মনের চিকিৎসক। যিনি মনের ভিতরে ডুবুড়ির মত ডুব দিয়ে খুঁজে আনেন সমস্যার মূলকে। 

আমিও মনোবিদ হতে চাই, আপনারা সকলে আশীর্বাদ করুন। 


কল্পনা কানে কানে বললো, দেখো, মঞ্চে তোমার টুটুল এতক্ষন ধরে কথা বললো। অমরেশবাবু বললেন, ও শুধুই তোমার। তুমিই ওকে নবজন্ম দিয়েছো কল্পনা। 


হাততালির আওয়াজে কল্পনার গলাটা চাপা পড়ে গেলো। কল্পনা কান্না জড়ানো গলায় বলল, আমার টুটুল। 

রাকেশ ঘোষাল

Comments

Popular posts from this blog

গ্রীষ্মের_ছুটিতে ছাত্রের লেখা খোলা চিঠি