আক্ষেপ

 

       


১.  অনেক বছর পর অর্ণার সাথে দেখা। আমার প্রথম লেখা কবিতার বই হাতে আমি ওর সামনে দাঁড়িয়ে। হুট করেই যেন দেখাটা হয়ে গেল। এতগুলো বছর পর....


 ও আমার স্কুলের পরিচিত। লেখালেখির খাতিরে ওর সাথে আমার আলাপ। ও খুব বই পড়তে ভালোবাসত। ট্রাজেডি ধরনের লেখা তার খুব পছন্দের। আর আমি বই পড়তে একদমই পছন্দ করতাম না তবে লিখতে ইচ্ছে হতো খুব। সদা হাস্যজ্বল মেয়েটিকে দারুণ লাগতো আমার।  


সবসময়ই বলতো, লিখে যাও অর্নব । ভালোই তো লেখো।  একদিন বই বের করো। সবাইকে বলতে পারবো আমার পরিচিত কেউ বই লিখেছে।


আমি ফিক করে হেসে ফেলতাম আর বলতাম 

--" যতটুকু জ্ঞান থাকলে কবি কিংবা লেখক হওয়া যায় ততটুকু জ্ঞানের ভান্ডার আমার মধ্যে নেই "


ও হাসতে খুব ভালোবাসতো। সবসময়ই হাসিমুখে বলতো

-- আরো বেশি পড়ো। আস্তে আস্তেই জানবে অনেককিছু।


আমি উদাস হয়ে বলতাম

-- জানবো হয়তো।


২.


তখন আমি সবে একটু আধটু ভালো লিখতে শুরু করেছি। যতটা না ভালো লিখতে পারি তার চেয়ে চারপাশের উৎসাহই আমাকে যেন আরেকটু ওপরে তুলেছে। ভাবে আমি তামাক পোড়া ধোঁয়া ফুসফুসে নেওয়া শুরু করেছি। হঠাৎ একদিন সে আমার ডায়েরির পাতা উল্টোতে উল্টোতে আনমনে বলল.. 

--" শুনেছি, ছ্যাঁকা না খেলে নাকি ভালো লেখক হওয়া যায় না?" 


চঞ্চল, স্পষ্টভাষী মেয়েটার একথার কোনো ব্যাখ্যা ছিল না আমার কাছে। বললামঃ 

-- কি জানি। হবে হয়তো।


৩.


আমরা তখন কলেজে পড়ি। দুজনের আলাদা কলেজ। মেয়েটা আমার মুগ্ধতা ছিল। আর লেখালেখির খাতিরে কথা হতো সবসময়। সেও একটু আধটু লিখতো। কবিতা লিখতো। 

একদিন আমাদের মতোই একজন লেখক মন্তব্য করেছিল---

-- "কবি আমি তোমার কবিতা হতে চাই"


তা নিয়ে কত মজা করেছি ওর সাথে। কত জ্বালিয়েছি। বলেছি, রিলেশনটা এবার করেই ফেলো না। উদীয়মান লেখক। খুব ভালো হবে। 


সে আনমনে বলেছিল--- 

-- "যে ছেলে কবিতা কিংবা গল্পের নেশায় পড়ে আমাকে ছাড়িয়েও হাজারটা মেয়ের মাঝে মুগ্ধতা খুঁজে নেবে। হাজারজনকে ভালোবেসে শরীরি ভাষা বিনিময় করবে  সে শুধু আমার মুগ্ধতাই ছুঁতে পারবে। আমার মনটা নয় ৷ আমি তাকেই ভালোবাসবো যে একান্ত আমার আর তার কল্পনা জুড়ে শুধুই আমি। "


আমি বুঝেছি লেখার প্রতি তীব্র আকর্ষণ থাকলেও লেখকদের প্রতি তার খুব একটা আকর্ষণ নেই। 


তারপর কোনো এক সন্ধ্যায় 


একদিন জিজ্ঞেস করে বসলামঃ 

-- তোমার কাছে প্রেমের সংজ্ঞা কি? 


তার কন্ঠে শব্দের মেলা-

-- " প্রেম বলতে আমি সেটাই বুঝি যে, দুটো মানুষ সমান্তরালে চলবে। দুজন দুজনকে খুব বুঝবে, একজন আরেকজনের ইচ্ছেকে সম্মান করবে। কখনোবা কাছে আসবে কখনও বা মিলবেই না। দুদিক ধরে হারিয়ে যাবে একে অন্যের থেকে। শরীর ছুঁয়ে যাবে না কেউ, বরং মন ছুঁয়ে যাবে।  


তারপর নানান ব্যস্ততায় তার সাথে আর দেখা হয়নি। দুজন দু শহরে চলে গেছি। সেভাবে আর এক সাথে বসে আড্ডাও দেওয়া হয়নি। মাঝেমধ্যেই একটা ছেলের কথা শুনতাম। "চঞ্চল" ওর নাম। নামের মতোই সেও নাকি দূরন্ত, চঞ্চল আর রাগী। ভালোবাসাবাসি হয়নি তখনও। সবেমাত্র দুজনের মধ্যে প্রথম বাক্যালাপ চলছিল।  এরপর আর তার বিষয়ে কথা হয়নি।


লোকমুখে শুনেছি অর্ণার বিয়ে হয়ে গেছে। একটা বাচ্চাও আছে। 


৪.


আজ অনেক বছর পর অর্ণার সাথে দেখা। আগের চেয়ে আরও বেশি সুন্দর হয়ে গেছে। আমাকে দেখেই হাসিমুখে এগিয়ে আসতে আসতে বলল

-- কেমন আছো, অর্নব ? কতদিন হলো দেখা হয় না। 


আমিও হাসিমুখে বললাম

-- এই তো ভালো। তোমাদের আশীর্বাদে আজ একটা বই ছাপাতে পেরেছি। 


-- সময় হবে তো? চলো কোথাও একটা বসি। একটু গল্প করা যাক। 

সে সম্মতি দিলো। গঙার ধারে খালি জায়গায় গিয়ে বসলাম আমরা।


বইটা নিয়ে খানিকক্ষণ পাতা ওল্টালো । লক্ষ্য করলাম তার মধ্যে আগের সেই চঞ্চলতা নেই।হাসিমুখেও কেমন যেন নিস্তব্ধতা। যেন একরাশ কষ্ট,যন্ত্রণা বুকের মাঝের হাড়গুলোকে পিষে মারছে।


নিরবতা কাটাতে বললাম -

-- পড়া হয়নি বুঝি?


আমার চোখের দিকে তাকিয়ে ওর শান্ত দুচোখ।বলতে শুরু করলো-

--" না এখন আর বইয়ের প্রতি আগ্রহ পাই না" 


-- কেন! ট্র্যাজেডি বই পড়া হয় না বুঝি?  একসময় তো খুব পছন্দ করতে। 


খানিকক্ষণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে খানিকটা বিদ্রুপের সুরেই বললো

--" জীবনটাই যখন ট্র্যাজেডির তখন আর নতুন করে ট্র্যাজেডির বই পড়ার দরকার কি বলো? "


মনে হল ও যেন আমার সামনে অবাধ্য চোখের জল লুকোনোর মিথ্যে চেষ্টা করলো। মেয়েদের ছলছল চোখ দেখলেই কেমন যেন গোমড়া হয়ে যায় মনটা। 


সে, হাসি বাক্যে,সাংসারিক কথাবার্তা আর টুকিটাকি এই সেই আলাপে প্রসঙ্গ ঘোরাতে চাইলো। 


হুট করে কি যেন ভেবে জিজ্ঞেস করে ফেললাম... -- একটা ছেলের কথা না শুনেছিলাম..  কি যেন নাম...? কি খবর ছেলেটার?

  ঠাট্টার ছলেই বললাম, 

-- ভেবেছিলাম ওর সাথেই তোমার.....? 


-- ....হয়নি প্রেম। 

ওর ছলছল চোখের ভাষা কাবু করে ফেললো আমায়। 


তবুও কেন জানি প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে বসলাম... 

-- কেন?  শুনেছিলাম ছেলেটা খুব ভালো?  হঠাৎ?  


পূর্ব পরিচয়ে আমি যে তাকে একটু বেশিই প্রশ্ন করছি তা যেন সে বুঝেই গেল। মেকি হাসিতে শুধু বোঝালো... হলো না। 


( সেই বোঝানোর মধ্যেও যেন কত বিষন্নতা, আক্ষেপ ) 


কষ্টের পূর্বাভাষ পেয়েও অহেতুক প্রশ্ন করে মানুষের মনকে বিষিয়ে ফেলতে নেই। 


প্রসঙ্গ ঘোরানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু নিশ্চুপ সে নদীর দিকে এক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললো... 

-- শুনবে না কি হয়েছিল?


কয়েকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজে থেকেই বলতে শুরু করল.....

-- " ও না আমার কাছে সময় চেয়েছিল। ক'টা বছরের। আমি দিইনি। চিনি না, জানি না। ক'টা দিনের পরিচয় মাত্র তাতেই তাকে এতটা সুযোগ দেওয়া ঠিক হবে না। পরিবারের কাছেও তো আমার একটা দায়বদ্ধতা আছে।


কিছুদিন কথা বলার শেষে তাকে বলেছিলাম- 

-- "কখনো যদি আমাকে পান তবে সেটা হবে অনাকাঙ্ক্ষিত। আর না পেলে একদম কষ্ট পাবেন না। ধরে নেবেন সেটাই তো নির্মম বাস্তব। চাইলেই কেউ কাউকে পাবে না। কখনো যদি আমার জন্য আমার পরিবারের সামনে দাঁড়ান বিন্দুমাত্র সাহায্যের প্রয়োজন হলেও আমি সেই সাহায্যটুকু আপনাকে করবো। একদম হতাশা নিয়ে ফিরিয়ে দেবো না আপনাকে। "


তারপর টুকিটাকি এই সেই বিষয় নিয়ে এক দুটো কথা হয়। সময় কাটছে। সে তার মতো পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত। বাড়িতে আমার বিয়ের কথা চলছে। সে সবটাই জানে। বাড়ি থেকে বিয়ের জন্য চাপ দিতে শুরু করলো। এদিকে তার কিচ্ছু করার নেই। আমিও তাকে খুব বেশি চিনি না,তবে তার জন্য মিছিমিছি কেন অপেক্ষা করবো! মন কেন জানি অপেক্ষা করতে বলছিলো। শেষে আর পারলাম না। পরিবারের পছন্দের ছেলের সাথে দেখা করলাম আর প্রথম দেখাতেই বিয়ের কথা পাকা। 


চঞ্চলকে জানিয়েছিলাম সবটা। শুনে ফোনের ও পাশ থেকে সে বলেছিল.... 

-- "এ জন্মে তো আর তোমাকে পাওয়ার সাধ্য আমার নেই। শুধু একটিবার বলবে কি, ভালোবাসো আমায়?"


ছেলেটাকে খুব পছন্দ করতাম আমি। কিন্তু ভালোবাসতাম কিনা জানি না। আমার বিয়ে হবে অন্য ছেলের সাথে  তাই তাকে ভালোবাসাটাই বিধি বৈধ। আমি অন্য একটা ছেলেকে কেন ভালোবাসি বলতে যাবো! ছেলেটার জন্য আমার খুব খারাপ লাগছিল ঠিকই কিন্তু আমি তার হবো না জেনেও তাকে ভালোবাসি বলে মিথ্যে আশ্বাস দেওয়াটা তো রীতিমতো পাপ। 


ছেলেটা প্রায়ই ফোন করে আকুতি করতো। " ভালোবাসি " শব্দটা শোনার যে কি তীব্র বাসনা ছিল তার মনে। আমি সবটাই বুঝতাম। তার আকুতির কাছে হেরে "ভালোবাসি" বলতে গিয়েও চুপ হয়ে যেতাম। যদি কখনো ও সবাইকে বলে বেড়ায় যে আমি তাকে ভালোবাসি। পাছে না আমার সংসারটা গড়ার আগেই ভেঙে যায়। পরিবারের সামনে তখন কি জবাব দেবো! তার আকুতির চেয়েও পরিবারের মানুষগুলোর মূল্য আমার কাছে অনেক বেশি দামী।


শেষবার ও বলেছিল.....

--" শেষবেলাতেও  তোমাকে একটুখানির জন্যও না পাওয়ার আক্ষেপটা রয়ে যাবে চিরকাল । ভালো থেকো। "


বিয়ের দু দিন আগে খবর পেলাম কি যেন একটা রোগে আক্রান্ত হয়ে খুব খারাপ অবস্থা ওর। মুমূর্ষু প্রায়। কয়েকদিন ধরেই নাকি অসুস্থ। একবারও জানায়নি আমায়। চোখদুটো কেন জানি জলেতে ভরে গেল। খুব ইচ্ছে হলো ওকে একবার দেখার। কতদিন দেখা হয় না ওর সাথে। 

হবু বরকে জানালাম, সে ওর বিষয়ে জানতো। আপত্তি করলো না একটুও।  


হাসপাতালের বেডে শুয়ে মুমূর্ষু চঞ্চল । ওয়েটিং রুমে বসে আছি আমি ৷ একজনকে জানালাম, আমি ওকে দেখতে চাই। উনি প্রশ্ন করলেনঃ 

-- "আপনি রোগীর কে হোন? "


আমি বললাম... 

--" কেউ না। তার জীবনের কাঙ্খিত কেউ একজন ছিলাম আমি। যার মুখে শুধুমাত্র একটা শব্দ শুনতে কোনো এক সময় সে আকুল ছিল।" 


কি যেন ভেবে উনি আমাকে যেতে দিলেন। আমি ওর বেডের পাশে বসে। 


এ দুনিয়ায় আপন বলতে ওর কেউ ছিল না।আমাকে খুব আপন করতে চেয়েছিল কিন্তু আমিও ওর আপন হইনি।


ওর চোখ বোজা ছিল। হাতে স্পর্শ করে ডাক দিলাম... 

-- চঞ্চল ... 

আস্তে করে চোখটা খুললো। ওর এ অবস্থা দেখে চোখের অবাধ্য জলকে ধরে রাখতে পারিনি আমি।অথচ আমার তো কখনো মনে হয়নি আমি ওকে ভালোবাসি। আমার হাতের উপর হাত রেখে কোনোরকমে উঠে বসে জড়িয়ে ধরলো আমাকে। তার চোখের জল আমার পিঠে টুপটাপ পড়তে লাগলো। সেই মুহূর্তে আর অতো কিছু ভাবতে ইচ্ছে করেনি। বলতে লাগলাম

-- ভালোবাসি। খুব ভালোবাসি আপনাকে

 এরপর...

অর্ণা চুপ হয়ে গেল। কান্না থামছেই না। 


খানিক বিরতি দিয়ে বললাম -

-- তারপর? 


চোখের জল মুছে অর্ণা বলতে শুরু করলো.... 

--" জানো তো, এরপর ওর একটা শান্ত নিঃশ্বাস পড়লো আমার পিঠে। একদম অসাড় হয়ে গেল মানুষটা। বারবার না,নিজেকে খুব বেশি অপরাধী মনে হচ্ছিল। " ভালোবাসি " কথাটা যদি এত তাড়াতাড়ি না বলতাম তাহলে হয়তো মানুষটা আরও কয়েক মুহূর্ত বেঁচে থাকতো। 


আমার শেষ প্রশ্ন....

--" সত্যিই কি ভালোবাসতে ওকে?"


উদাস অর্ণা নদীর অস্থির নৌকোর পালের দিকে তাকিয়ে বলল

-- হয়তো....

রাকেশ ঘোষাল

Comments

Popular posts from this blog

গ্রীষ্মের_ছুটিতে ছাত্রের লেখা খোলা চিঠি