অবুঝ ইচ্ছেরা
ইচ্ছে তো অনেক কিছুই করে অঙ্কিতের, এই ধরাবাঁধা চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে উন্মুক্ত বিহঙ্গের মতো রাস্তার চায়ের দোকানে বসে পাবলিককে ফ্রয়েডিও থিওরি বোঝাতে।
অথবা পাশের বাড়ির ঝিনচ্যাক মিলিবৌদিকে দেখে রবিঠাকুরের 'হঠাৎ দেখা' কবিতা আওড়াতে।
রামগরুরের ছানার মতো মুখ করে থাকা বস মিস্টার বাগচীর ঝুলপিটা ধরে জোরসে টান মেরে বলতে ইচ্ছে করে, আইটি সেক্টর মানে কোর্ট-টাই পড়ে অফিসে ঢুকে ফেরার পথে প্যান্টটুলুনটা খুলে নেওয়া নয়।
মায়ের এই সঞ্জীব কাপুর স্টাইলে 'কি খাবি একবার বল?' বলে রোজই টিফিনে মুড়ি, রুটি খাওয়ানোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতেও ইচ্ছে করে।কিন্তু মায়ের অভিমানী নাকী কান্নার ভয়ে নিশ্চুপ থাকে অঙ্কিত।
একটা মিষ্টি করে হামি খেতে গেলেই শালিনীর শালীনতা উথলে ওঠে, ধ্যাৎ বলে যখন সরে যায় তখন হোয়াটসআপে শালিনীর পাঠানো শখানেক লিপের স্টিকারের কথা মনেপড়ে নিজের মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করে অঙ্কিতের।
বাবা যখন বাড়ি ফিরে শুধুমাত্র ওকে শোনানোর অভিপ্রায়ে বলে, বুঝলে অঙ্কিতের মা, "আজ মনোময় বাবুর ছেলের সাথে দেখা, বড়ো ডাক্তার হয়েছে, সামনের মাসেই বোধহয় আমেরিকা যাবে।আমাদের ছেলেরই ক্লাসমেট ছিল না?"
সব জেনেও বাবার এই না জানার ভান করার সময় মনে হয় নিজের বাবা নয়, মিডিয়া যেন অঙ্কিতের সম্মান হানি করছে।
এত কষ্ট লুকিয়ে ও যখন গানেতেই হৃদয়ের লুকোনো ব্যথা কমানোর চেষ্টা করে তখন, ঠিক তখনি "তুই অন্য কারোর সঙ্গে বাঁধিস ঘর" শুনে মনটা এতটাই উদাস হয়ে যায় যে বস মিস্টার বাগচীর মুখটা মৃত অমরেশ পুরীকে মনে করিয়ে দেয়।
Fb তে অ্যান্টি ডিপ্রেশন পেজে গিয়ে দেখে, যদি আপনার লাভার অন্য কারোর বাইকে করে আপনার সামনে দিয়ে চলে যায় তখন কি করবেন?
উত্তর : আপনি ওই ছোট্ট স্কুটিটি বাদ দিয়ে ধুম 3 মার্কা পিছন ওঠা লাখ তিনেকের বাইক কিনুন, দেখুন গার্লফ্রেন্ড আবার ব্যাক টু প্যাভিলিয়ন।
এই যদি সলিউশন হয় তাহলে তো ব্যাঙ্ক ডাকাতির অপশনটাও ভেবে দেখতে হচ্ছে অঙ্কিতকে।
অঙ্কিতের এত ডিপ্রেশন কাটানোর জন্য পৃথিবীর পুঁজিবাদীদের ধ্বংস করার মানসিকতাকে আপাতত সীমিত করে গোল্ড ফ্লেকের দুটো সুখটানে।
"স্মোকিং ইজ ইঞ্জুরিয়াস টু হেলথ"
আর হেলথ! গ্রিন ভেজিটেবলে কীটনাশকের ব্যবহার তো দেখোনি গুরু, সকালে দেখলে সবে পেট থেকে বেরোলো, বিকালে দাঁড়িপাল্লায়।
এত সবের মধ্যেও যখন শালিনী আদুরে বেড়ালের মতো সোহাগী গলায় বলে "ডার্লিং আজ রাতে পার্ক স্ট্রিটে ডিনারে যাবো"
ওয়ালেটটা কঁকিয়ে উঠলেও অঙ্কিত না বলতে পারে না।
"মা যখন বিশ্বাসের গলায় বলে, আজ একটু শীতলা মায়ের পুজো দিতে নিয়ে যাবি"? তখন আইপিএল ম্যাচ ছেড়ে বাইকটা স্টার্ট দিতে বাধ্য হয়।
অথবা বাবা যখন রেশনের তেলচিটে ব্যাগটা ধরিয়ে দিয়ে রুমাল দিয়ে নিজের কপালের ঘাম মোছে তখন অঙ্কিত বাধ্য হয় ডেনিম জিনসের সাথে ওই বেমানান থলি নিয়ে রেশনের দোকানে লাইন দিতে।
এটাই অঙ্কিত। আধুনিকতা যাকে ছুঁয়ে গেলেও অনুভূতিরা মনের চোরাগলিতে এখনো বর্তমান।
ওর এই সব অবুঝ ইচ্ছেরা তখন চুপটি করে মনের মধ্যে লুকিয়ে পড়ে।
তারপরেও রাস্তাঘাটে শোনে, এখনকার ছেলেগুলো না.... মানবিকতা বলতে কোনো বস্তু নেই। কতবার অঙ্কিত এমন বলা বয়স্ক মানুষটাকেই ট্রেনে, বাসে সিট ছেড়ে দিয়েছে। কতবার ব্লাড ডোনেশন ক্যাম্পে গিয়ে রক্ত দেওয়ার পরে ডিমসিদ্ধ আর কলাটা হাওড়া স্টেশনের পাগলিটার হাতে দিয়ে দিয়েছে, তারপরও শোনে.... এখনকার ছেলেগুলো না.....
ইচ্ছে তো অনেক কিছুই করে অঙ্কিতের, তছনছ করে দিতে ইচ্ছে করে এই যাঁতাকলে ঘোরা একঘেয়ে জীবনটাকে।
ঠিক তখনই মা ডেকে ওঠে, কি রে কি খাবি বল? মুচকি হেসে মায়ের দেওয়া রুটি আর আলুর তরকারিতে মনোনিবেশ করে ও।
রাকেশ ঘোষাল
Comments
Post a Comment