ভাঙা ও গড়া
তুমিই বুঝি পাত্র? তো কী নাম তোমার?
এমন বোকা বোকা ভাবে তাকিয়ে না থেকে যেটা প্রশ্ন করছি চটপট তার উত্তর দাও। আমিই পাত্রী। কুমারী চৈতালী বিশ্বাস। নিজেকে আমি মিস বলতেই বেশি পছন্দ করি। ওইসব কুমারী টুমারী শুনলে নিজেকে রাবীন্দ্রিক যুগের নায়িকা মনে হয়। যাইহোক, তুমি কথা না হয় বলতে পারো না, শুনতে তো পাও? মন দিয়ে শোনো, আমি একজনকে ভীষণ ভালোবাসি। আমার কলেজেই পড়ে। বিয়ে করলে আমি তাকেই করবো। আরেকটা কথা, এই গোপন কথাটা যদি বাবা জানতে পারে তাহলে ঐ যে বাগানের ধারের ইট দেখছো, ওই দিয়ে ঠুকে ঠুকে তোমার মাথা ফাটাবো। তাই চুপচাপ হাসি হাসি মুখে মিষ্টি, লুচি খাবে আর বাড়ি ফিরে বলবে, তোমার মেয়ে পছন্দ হয়নি, বুঝতে পারলে?
এই চৈতু তুই কার সাথে বকবক করছিস রে!
পাত্রপক্ষ ফোন করেছিল, ওরা ঘন্টা খানেকের মধ্যেই ঢুকবে। তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নে।
কথাটা বলতে বলতেই ইন্দিরাদেবী দরজার সামনে এলেন। বিস্ময় নিয়েই তাকিয়ে বললেন, তুমি কে বাবা? কাকে চাইছো?
ছেলেটি এতক্ষনে নিঃশ্বাস নেবার ফুরসৎ পেয়ে বললো, মাসিমা, আমি বিশ্বনাথ রায়ের বাড়ি খুঁজছি। একজন বললেন, এটাই নাকি ওনার বাড়ি।
ইন্দিরাদেবী বললেন, না বাবা, তুমি একটু ভুল করেছ। বিশ্বনাথ রায়ের বাড়ি আমাদের ঠিক পাশের সবুজ গেটের বাড়িটা। একই পাঁচিল বলে অনেকে দেখাতে গিয়ে ভুল দেখায়।
ছেলেটি কাঁচুমাচু মুখ করে বললো, ওহ, দুঃখিত, কিছু মনে করবেন না।
ছেলেটি পিছন ঘুরতেই চৈতালী বললো, তুমি কথা বলতে যখন পারো তখন নিজের নামটাও বলে যাও।
আর কোন ক্লাস হলো খোকা?
ছেলেটা বাগানে থাকা থান ইটগুলোর দিকে ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে বলল, আমার নাম অরিত্র চৌধুরী। আমি পি এইচ ডি করছি হিস্ট্রিতে।
চৈতালী একটু ভড়কে গিয়ে বলল, বুঝলে মা, অনেকেরই মেঘে মেঘে বেলা হয়, কিন্তু বোঝা যায় না।
অরিত্র পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলো বিশ্বনাথবাবুর বাড়ির দিকে।
বিশ্বনাথকাকু একা মানুষ। বিয়ে থা করেন নি। তার আবার আত্মীয় জুটলো কোথা থেকে সেটাই ভাবছিল চৈতালী। এত বছরে ভদ্রলোকের বাড়িতে কাউকে আসতে দেখেনি। এমনকি পাশাপাশি থাকলেও ওদের পরিবারের সাথে তেমন সদ্ভাব নেই। ভদ্রলোকের বয়েস পঁয়ষট্টির কোঠার দিকে ছুটছে। অথচ এতটুকু নমনীয় নন। পাড়ার পুজোয় চাঁদা নিতে এলে একশো টাকার বেশি চাঁদাই কোনোদিন দেন না। পাড়ার ছেলেরা ওকে সেলফিস জায়েন্ট বলে ডাকে। বিশাল তিনতলা বাড়িতে ভুতের মত একা একা থাকেন। দুটো কাজের লোক থাকে একতলায়। সবাই বলে, বুড়ো সব সম্পত্তি বুকে নিয়ে মরবে। চৈতালী আচমকা বলে বসলো, উনি আপনার কেমন আত্মীয়?
অরিত্র থমকে দাঁড়িয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে বললো, আমার মামা হন। নিজের মামা নয়, তবে ঘনিষ্ঠতায় তার থেকেও কাছের।
বিশ্বনাথবাবুর বাড়িতে নতুন রিলেটিভ এসেছে কথাটা পাড়ার মধ্যে বেশ আলোচনার বিষয়। তিনকুলে তো কেউ ছিল বলে জানে না কেউ। মাঝে মাঝে ব্যাগপত্তর নিয়ে দিন পাঁচেকের জন্য কোথাও একটা যেতেন। আজ বছর কুড়ি এই পাড়ায় বাড়ি করে আছেন ভদ্রলোক, কাউকে কখনো আসতে দেখেনি তার বাড়িতে। তবে ভদ্রলোক কোনো একটা কলেজের প্রফেসর ছিলেন। এখন রিটায়ার্ড ম্যান। কাজের লোকগুলোও হয়েছে তেমনি বদ, বাড়ির ভিতরের একটা খবরও বাইরের লোককে বলবে না।
তাই রায়বাড়ির চৌহদ্দির খবর নিয়ে লোকজন বেশ ইন্টারেস্টেড।
চৈতালী ভাবছিলো, ছেলেটাও বোধহয় বিশ্বনাথ কাকুর মতই পাগল আছে। সে পাত্র নয় জেনেও অকারণ চৈতালীর কথা সহ্য করে যাচ্ছিল! তবে ছেলেটি যে অত ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট সেটা অবশ্য বুঝতে পারেনি চৈতালী। আপাতত ওর একটাই চিন্তা, নিজের বিয়েটা ভেস্তে দিতে হবে। কলেজের থার্ড ইয়ারের সৌনককে প্রথম দিন দেখেই প্রেমে পড়েছিল ও। ক্রাশ বলা যায়। সৌনকের সাথে সামনা সামনি কথা হলেও কখনো বলা হয়নি চৈতালী ওকে ভালোবাসে। তাছাড়া হায়ার স্টাডি করার ভীষণ ইচ্ছা ওর। তাই কলেজের সেকেন্ড ইয়ারে বিয়ে করে জীবনটা অন্যের হাতে সঁপে দিতে পারবে না ও। একদিকে নিজের পড়াশনা, অন্য দিকে সৌনক...তাই এখন বিয়ে জাস্ট নৈব নৈব চ।
আজকের পাত্রপক্ষকে যেভাবেই হোক ক্যানসেল করতে হবে। বাবা-মা টের পেলে চলবে না। সাবধানে কাজটা সারতে হবে। কিন্তু কিভাবে!
বিশ্বনাথকাকুর এদিকের ঘরের জানালাটা অনেকদিন পরে হাট করে খোলা। চৈতালীর ঘরের সামনা সামনি জানালা বলেই চব্বিশ ঘন্টা বন্ধ পাল্লাগুলো চোখে পড়ে বেশি। আজ খোলা দেখেই তাকালো চৈতালী, চোখে পড়ে গেলো অরিত্রকে। জানালা ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
চৈতালীর পরণে আজ লাল হলুদের ঢাকাই। মায়ের শাড়ি, পাত্রপক্ষ আসবে বলে জোর করে পরিয়েছে মা।
চোখাচোখি হতেই লজ্জা পেল চৈতালী। ইস, একটা অপরিচিত ছেলেকে কিসব বলে ফেললো।
চৈতালীর বাবা প্রায় বলে, এমন একটা প্রতিবেশী জুটলো যার মুখে কথা নেই, হাসি নেই, রামগরুরের ছানা। দরকারে ডাকলেও কোনোদিন পাবো না ওই লোককে।
তাই বিশ্বনাথকাকুর বাড়ির সাথে কোনোদিনই ওদের কোনো সদ্ভাব গড়ে ওঠেনি। আসলে ভদ্রলোক নিজেই শামুকের মত গুটিয়ে রাখতে পছন্দ করেন নিজেকে। বাবা এখানে বাড়ি করার পর প্রথম প্রথম ছাদে উঠলে বা বাজারে দেখা হলে কথা বলার চেষ্টা করে দেখেছে, কিন্তু ভদ্রলোকের দিক থেকে কোনো সাড়া নেই। তাই বিরক্ত হয়ে বাবাও আর কথা বলে না।
চৈতালীর সাথে হাতে গুনে তিনদিন কথা বলেছেন ভদ্রলোক। একদিন জিজ্ঞেস করেছিলেন, ও কোন সাবজেক্ট নিয়ে ভর্তি হয়েছে!
সায়েন্স শুনে নাক কুঁচকে বলেছেন, কি করবে বিজ্ঞান শিখে! অতীত ঘেঁটে দেখো, ভারতের ইতিহাসে কত মনিমানিক্য ছড়িয়ে আছে ভাবতেই পারবে না।
সবাই ওই সায়েন্স নিয়ে পড়ে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হবে বুঝলে, আর মাটির নিচে চাপা পড়ে যাবে আমাদের ঐতিহ্য।
কলেজে ভর্তির পরেই ভদ্রলোকের চ্যাটাং চ্যাটাং কথা শুনে বিরক্ত লেগেছিল চৈতালীর। আরেকদিন ভদ্রলোক আচমকা জিজ্ঞেস করেছিলেন, হ্যান্ডসাম ছেলে পছন্দ নাকি গুণী? বিয়ে না হায়ার এডুকেশন?
সেদিন থেকেই আর ভদ্রলোকের বাড়ির দিকে ভুলেও তাকায় না চৈতালী। আজকাল প্রায়ই খবরের কাগজে পড়ে বয়স্ক লোকেদের চরিত্রের দোষ। এ তো অবিবাহিত বুড়ো, এর তো দোষ থাকা খুব স্বাভাবিক।
মাও বলেছিল, বাড়িতে একা ডাকলে যাবি না কখনও।
আজ বহুদিন পরে ওনার বাড়ির দক্ষিণের সব জানালা দরজা খোলা রয়েছে। অরিত্র নামক ছেলেটিও চৈতালীর ঘরের দিকের জানালার সামনের বারান্দার ইজি চেয়ারে বসে একটা বই ওল্টাচ্ছে।
ঠিক তখনই মা হাঁক দিলো, চৈতু, ওরা এসে গেছে।
পাত্রের মা, মাসি, আর পাত্র তিনজনে বেশ জাঁকিয়ে বসেছে ওদের ড্রয়িংয়ের সোফায়।
কয়েকটা কথার পরেই পাত্রের মাসি বললো, ওরা এখনকার ছেলে মেয়ে, নিজেরা নিজেদের মধ্যে একটু কথা বলে নিক।
চৈতালী ছেলেটাকে নিজের ঘরে নিয়ে এসে বসিয়েছে।
হঠাৎই বিয়ে ভাঙার একটা জবরদস্ত প্ল্যান ওর মাথায় খেলে গেল।
অরিত্র একমনে বই পড়ছিল বারান্দায়। সেদিকে তাকিয়ে একটু গলা চড়িয়ে চৈতালী বললো, সরি অরিত্র, সকালের ব্যবহারের জন্য। প্লিজ আমার ওপরে রাগ করো না।
অরিত্র বই থেকে চোখ তুলে বললো, না না, রাগ কেন করবো, ইটস ওকে।
পাত্র একটু সন্দেহের চোখে বললো, উনি কে?
মানে আপনার জানালার সামনেই লাগোয়া ওনার বারান্দা, কে উনি?
চৈতালী একটু মুচকি হেসে বললো, জানি না কে। তবে অনেক কিছু।
দেখুন, আমাদের রিলেশনশিপটা কিন্তু বাবা জানে না। প্লিজ আমার বাড়িতে কিচ্ছু বলবেন না। সে আপনার আমায় পছন্দ না হতেই পারে, আপনি রিজেক্ট করতেই পারেন, কিন্তু অরিত্রর আর আমার বিষয়ে প্লিজ বাড়িতে কিছু বলবেন না।
করুণ চোখে তাকিয়ে চৈতালী বললো, প্লিজ, এটা আমার রিকোয়েস্ট।
ছেলেটা একটু বিরক্ত হয়ে বলল, এনগেজড যখন তখন অকারণ লোকজনকে হ্যারাস করা কেন!
গুনে গুনে তিনদিন পরে খবর এলো, পাত্রপক্ষের চৈতালীকে পছন্দ হয়নি।
নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে একটু নেচে নিলো ও।
তারপরেই দেখলো, জানালা দিয়ে অরিত্র ওর দিকে তাকিয়ে ইশারায় বললো, তুমি কি তার কাটা!
এই অরিত্র ছেলেটা মাত্র দিন চারেক এসেছে পাড়ায়। রোজ সকাল এগারোটায় বাসস্ট্যান্ড থেকে বাস ধরে কোথায় যেন যায়। বোধহয় ইউনিভার্সিটি। পি এইচ ডি করছে বলেছিল যে। এর মধ্যেই পাড়ার মেয়েগুলো নিজেদের যাতায়াতের টাইম পাল্টে ফেলেছে। সেদিন ছাদ থেকে চৈতালী দেখলো, রিয়া, দেবিকা এরা অকারণেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে অরিত্রর পিছন পিছন বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত গেল, অরিত্র বাসে উঠে যেতেই যে যার বাড়ি ফিরে এলো। পরপর দুদিনই একই দৃশ্য।
আজকেও কলেজ যাওয়ার জন্য রাস্তায় বেরোতেই পাশের বাড়ির নূপুরদি চৈতালীকে বেশ আগ্রহের সাথে জিজ্ঞেস করলো, এই চৈতালী তোদের বাড়ির পাশের বাড়িতে একটা ছেলে এসেছে নতুন, চিনিস রে! বিশ্বনাথবাবুর কেমন রিলেটিভ রে। যেমন হ্যান্ডু, তেমনি পার্সোনালিটি, ছেলেটার একটু খোঁজ দে না রে!
চৈতালীর মহা বিরক্ত লেগেছিল। সাধারণত ছেলেগুলোই মেয়েদের পিছনে ঘোরে, এ দেখছে উলটো পুরান। ওই ভ্যাবলা টাইপ অরিত্র, বইপোকা অরিত্রর পিছনে পাড়ার স্টাইলিশ মেয়েগুলো লাইন দিয়ে ঘুরছে। অসহ্য রকম লাগছে। চৈতালীরও তো ক্রাশ আছে সৌনকের প্রতি, তাই বলে কি ও সৌনককে দেখলেই হ্যাংলামি করে! আজ অবধি যেচে কথাও বলেনি, প্রোপোজ তো দূরের কথা।
বিরক্ত হয়েই বললো, না গো, নুপুরদি, আমি চিনি না।
নূপুরদি তবুও ছাড়ার পাত্রী নয়, শোন না চৈতি, তোর ঘরের জানালা দিয়ে তো ওই বাড়িটা দেখা যায় রে, ছেলেটা সারাদিন কি করে রে!
সকালে জিম টিম করে নাকি রে! এমন সল্লুভাই মার্কা বডি কিনা তাই বলছি।
চৈতালী পাশ কাটানোর জন্যই বললো, আমি সকালে ঘুম থেকে উঠি না গো।
গত সাতদিনে চৈতালীর জীবন দুর্বিষহ হয়ে গেছে। এমনকি ওর বেস্টফ্রেন্ড, সেই ছোটবেলার ফ্রেন্ড প্রান্তিকা অবধি ওদের বাড়িতে এসেই প্রথম প্রশ্ন করলো, এই চৈতি, ওই হ্যান্ডুটা কে রে! আরিব্বাস, কি পারসোনালিটি রে। একেই বলে বিউটি উইথ ব্রেন।
কে জানে বাবা, ওই ছেলের মধ্যে লোকজন এত কি খুঁজে পাচ্ছে। চৈতালীর তো তেমন কিছুই মনে হয়নি।
প্রান্তিকা তো যতক্ষন ছিল, চৈতালীর নতুন কুর্তি, কানের দুল না দেখে দক্ষিণের জানালা দিয়ে উঁকি মেরেই গেল।
প্রান্তিকা যাওয়ার সময়েও বললো, আজ তো দেখতেই পেলাম না রে অরিত্রকে। ব্যাড লাক।
চৈতালী বিরক্ত হয়ে বলল, এক কাজ কর, ওদের বাড়িতে গিয়ে দেখে আয় ওকে।
প্রান্তিকা নির্লজ্জের মত হেসে বললো, এটা গুড আইডিয়া। একদিন যাবি ওই বাড়িতে?
চৈতালী ঘাড় নেড়ে বললো, জীবনেও না।
সেদিন অরিত্র ওকে রাস্তায় ধরে বলেছিল, বুঝলে চৈতালী, তোমাদের পাড়ার মেয়েগুলো বড্ড হ্যাংলা টাইপ, তোমার মত নয়। এই যে আমি তোমার পাশের বাড়িতে আছি অথচ তুমি সেভাবে কথা বলতেও এলে না, কিন্তু তোমার কয়েকজন বান্ধবীকে দেখি আমি বেরোলেই কেমন সব অঙ্গভঙ্গি করে!
চৈতালী মুখ বেঁকিয়ে বলেছিল, ওরা হয়তো কখনও ছেলে দেখেনি অথবা বোকা হাবা পাবলিক ওদের বেশি পছন্দের।
অরিত্র মুখ কাঁচুমাচু করে পালিয়েছিলো।
বেশ কয়েকমাস কেটে গেছে, হঠাৎই একদিন কলেজে দেখলো, সৌনক একটা মেয়ের হাত ধরে ক্যান্টিনে ঢুকছে। ক্যান্টিনে যারা বসেছিলো তাদের সবার সাথেই ওপেনলি মেয়েটাকে ইন্ট্রোডিউস করিয়ে দিল সৌনক। মিট তৃষা, মাই গার্লফ্রেন্ড, মাই হার্টথ্রব। তারপর মজার ছলেই বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলল, ওকে প্রোপোজ করে হ্যারাস করিস না তোরা।
সবটাই চেয়ারে বসে দেখলো চৈতালী। ভিতরে একটা চিনচিনে ব্যথা অনুভব করছিল। সেই প্রথম দিন থেকে সৌনককে ওর ভালো লাগত, হয়তো বলা হয়ে ওঠেনি কোনোদিন, তাই বলে কি মনের কথা বুঝতেও পারলো না সৌনক। এনগেজড হয়ে গেল অন্য কারোর সাথে।
অদ্ভুত একটা কষ্ট নিয়েই কঙ্গো জানিয়েছিল সৌনককে। সৌনক হেসে বলেছিল, থ্যাংক ইউ।
কলেজের থার্ড ইয়ারে দেখতো রোজই তৃষা সৌনকের বাইকে চেপে কলেজে আসছে, ওকে নামিয়ে দিয়ে বেরিয়ে যেত সৌনক। ও তখন কলেজ ছেড়েছে। আস্তে আস্তে একটু একটু করে মনের দুয়ারটা বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করছিল চৈতালী, সৌনকের জন্য যে জায়গাটা এতদিন নির্দিষ্ট করে রেখেছিল,সেটার দুয়ারে চাবি ঝোলাতে বাধ্য হয়েছিল।
ফাইনাল এক্সামের কিছু দিন আগেই বাবা আবার একটা পাত্রের সন্ধান নিয়ে হাজির হলো। চৈতালীর কোনো কথাই কোনোদিন বাবা শোনেনি। বরং এটাই বলে, তোর জন্য আমি যেটা করবো সেটাই জানবি পারফেক্ট হবে।
মাকেও কোনোদিন বাবার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে দেখেনি চৈতি, বরং মা বাবার সব মন্ত্যব্যেই ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়েছে। এ বাড়িতে তাই বাবার কথাই শেষ কথা। তবুও চৈতালী শেষ চেষ্টা করতে গিয়েছিল, বাবা, সামনেই আমার এক্সাম, ওটা হয়ে গেলে নাহয়....
ওর কথা শেষ করতে না দিয়েই বাবা বলেছিল, তোমার এক্সাম শেষ হওয়া পর্যন্ত তো ভালো পাত্র বসে থাকবে না, তাই একদিন বিকেলে এসে দেখে গেলে এমন কিছু মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না।
চৈতালী নিজের মনেই ভাবছিলো, বেশ তবে তাই হোক। সৌনকের স্বপ্নটা তো ভেঙেই গেছে। এভাবে বাবার সাথে যুদ্ধ করে পড়াশোনাটাই বা কতদূর এগোতে পারবে ও! বরং বিয়ের পরে যদি ঐ বাড়ি থেকে ওকে পড়ার সুযোগ দেয় তবে মন্দ হয় না। ওর দুটো পরিচিত মেয়ে তো বিয়ের পরে এম এস সি কমপ্লিট করেছে, হায়ার স্টাডি করেছে।
হাল ছাড়া ভাবেই মেনে নিয়েছিল বাবার সিদ্ধান্তকে।
না, আর বিয়ে ভাঙার নাটক করতে হবে না ওকে।
পাত্রপক্ষ এক কথায় চৈতালীকে পছন্দ করে চলে গেল। পাত্রও দেখতে শুনতে ভালো, ওয়েল এস্টাবলিশড্। চৈতালীদের বাড়ি থেকেও আগামী সপ্তাহেই দেখতে যাবে, এমনই কথা হলো।
তারপরই কোথা থেকে যে কি হয়ে গেল, পাত্রপক্ষ ফোন করে বললো, না মেয়ে তাদের পছন্দ নয়। পাত্র নাকি বাড়ি গিয়ে আপত্তি জানিয়েছে!
এম এস সি ভর্তি হয়েছে চৈতালী। বাবার চেষ্টায় আরও তিন দল পাত্রপক্ষের সামনে শাড়ি পরে সেজে বসেছিলো ও, হাসি মুখেই চা, কফি পরিবেশনও করেছিল, তারপরেও যথারীতি পাত্রপক্ষ পছন্দ নয় ঘোষণা করেছিল ফোনে।
পাড়ায় একটা হাসির রোল শুরু হয়েছিল। বন্ধুরা পর্যন্ত কৌতূহলে জানতে চাইতো, এই চৈতি, এবারেও বাতিল করলো নাকি রে!
তোকে দেখতে এত সুন্দর, শিক্ষিত, তোকেও বাতিল করে!
সেদিন রাস্তায় আচমকাই অরিত্রর সাথে দেখা। এর আগেও কয়েকবার দেখা হয়েছে চৈতির, কিন্তু অরিত্র হাসলেও চৈতি সেভাবে পাত্তা দেয়নি।
সেদিন চৈতিকে দেখে অরিত্রই আগ বাড়িয়ে বললো, কি ব্যাপার এখনো কি পাত্রপক্ষ এলে মাথায় ইট ঠোকার ভয় দেখাও নাকি!
প্রায়ই দেখছি একদল করে আসছে আর যাচ্ছে। তো তোমার ক্রাশ সৌনকের খবর কি!
চৈতালী বিরক্ত হয়ে বলল, তাতে তোমার কি দরকার! সৌনক তৃষা নামের একটা মেয়ের সাথে প্রেম করে, ও আর আমার ক্রাশ নয়, বুঝলে!
অরিত্র অবাক চোখে তাকিয়ে বলল, যা বাবা: তাহলে পাত্রপক্ষ পালাচ্ছে কেন!
পাড়ার সবার আলোচনার বিষয় তো এখন তুমি চৈতালী, তাই শুনবো না মনে করলেও কাজের লোকও এসে বলে যায়।
চৈতালী ক্লান্ত হেসে বলল, খুব মজা লাগছে বুঝি! বার বার বিয়ে ভেঙে যাওয়া, রিজেক্ট হওয়া মেয়েকে নিয়ে মজা করতে বেশ লাগছে তাই না!
অরিত্র একটু ঘাবড়ে গিয়ে বলল, এমা না না, আমি সেভাবে বলিনি। হার্ট করতে চাইনি। আমি তো ভাবছিলাম তুমিই হয়তো বিয়েটা ক্যানসেল করছো। আসলে এ পাড়ায় প্রথম আসার স্মৃতিটা আমার টাটকা কিনা, তাই।
যাইহোক, আমি আর বেশিদিন এখানে থাকবো না বুঝলে, কলেজের লেকচারার হয়েছি। মামার কাছ থেকেও হয়তো চলে যেতে হবে। ভাবছি দক্ষিণ কলকাতায় একটা ফ্ল্যাট নিয়ে থাকবো। তাতে আমার পড়াশোনারও সুবিধে, আর যাতায়াতেরও।
অরিত্রর সাথে কথা বলতে বলতেই রাস্তা দিয়ে হাঁটছিল চৈতালী। বেশ বুঝতে পারছিল পাড়ার অনেকের চোখ ওর দিকে স্থির। অরিত্রর অবশ্য সেদিকে খেয়াল নেই। বলছিলো, তুমি যেন কোথায় টিউশন নিতে যাও চৈতালী? আগে নিজে প্রতিষ্ঠিত হও, তারপর বিয়ে করবে বুঝলে! নাহলে সারাজীবন আমার মায়ের মত...কথাটা অর্ধসমাপ্ত রেখেই হনহন করে হেঁটে প্রায় পালালো অরিত্র। চৈতালী কথার ছন্দ কেটে যাওয়ায় পিছন ঘুরে দেখতেই দেখলো, বিশ্বনাথ বাবু বেশ কটমট করে ওর দিকে তাকাচ্ছেন।
বোধহয় ভাবলেন, ওনার ওই নিধি ভাগ্নেটিকে চৈতালী ফাঁসাতে চাইছে।
অসহ্য লাগে এই ভদ্রলোককে। নিজেকে কি ভাবে কে জানে ভদ্রলোক। চৈতালীও মুখ ঘুরিয়ে বাড়িতে ঢুকে গেলো। অরিত্র যে ওর মামাকে বেশ ভয় পায় সেটাও বুঝতে পারলো চৈতালী।
এমনিতেই কদিন ধরে বিরক্তিতে মনটা ভারাক্রান্ত ওর। বাড়িতে দিনরাত একই আলোচনা হচ্ছে, কেন পাত্রপক্ষ এখানে চৈতিকে পছন্দ করে গিয়েও বাড়ি ফিরে ক্যানসেল করে দিচ্ছে! বাবার মুখ গম্ভীর।
মায়ের ভ্রুর ভাঁজে চিন্তারা থাবা বসিয়েছে।
চৈতির মনে হচ্ছে ও বোধহয় এ বাড়ির মারাত্মক বোঝা হয়ে বসে আছে। তাই সবাই মিলে উঠে পড়ে লেগেছে ওকে তাড়াতে। এই দুঃসহ পরিস্থিতির মধ্যে ওই গোলাপি খামের টুকরো চিঠিগুলোই একমাত্র ভালোলাগার জায়গা। চিঠির প্রেরককে চৈতি চেনে না। কিন্তু জানে প্রতি মঙ্গলবার আসবে এই চিঠি। কে যে দিয়ে যায় কে জানে! বাড়ির পোস্ট বক্সে আর কোনো চিঠিই আসে না।এখন তো ফোন, হোয়াটসআপ , মেলের যুগ। এখন কে কষ্ট করে লিখবে এই চিঠি! প্রতিটা চিঠির ওপরে লেখা থাকে -
চৈতি হাওয়া....
আর ইতির পরে শুধুই কতগুলো ডট।
কোনো চিঠিতেই ভালোবাসার কথা লেখা নেই, নেই কোনো প্রপোজাল অথচ কি মিষ্টি ভাষায় লেখা এই চিঠিগুলো।
এতদিন পর্যন্ত রাস্তার গোল্লা চিঠি থেকে শুরু করে ফেসবুকের মেসেজ পর্যন্ত শেয়ার করেছিল প্রান্তিকার সাথে। এই প্রথম গোটা দশেক চিঠির কথা বলতে পারল না কাউকে। যেন এই এক টুকরো সুখের বারান্দায় কাউকে প্রবেশের অধিকার দিতে চাইলো না মন।
হঠাৎই খেয়াল হলো আজ তো মঙ্গলবার, ছুটে গিয়ে খুললো পোস্ট বক্স, ওদের বাড়ির গেটের বাইরেই পোস্টবক্সটা এতদিন পরেই ছিল অব্যবহৃত হয়ে। খুলতেই বেরিয়ে এলো গোলাপি খামের চিঠিটা।
চৈতি হাওয়া,
বলতো আমি কে? যাও দক্ষিণের জানালা দিয়ে সোজা তাকাও, যাকে দেখবে প্রথমে, আমিই সে।
ইতিহাসের অতীত ঘাঁটা, রোমান্টিকতার লেশমাত্র নেই যার চোখে। প্রোপোজ করার ক্ষমতা নেই বুকে, সাহস নেই গলার স্বরে ,আমিই সে।
প্রথম দিন পাত্রপক্ষকে আমাকে দেখিয়েই বিয়ে ভেঙেছিলে না! বলেছিলে না, পাশের বাড়ির ওই ছেলেটিকেই তুমি ভালোবাসো! বাইরের লোককে বলতে পারছ মনের কথা, আর আমার কাছেই যত সঙ্কোচ!
লজ্জায় লাল হয়ে যাচ্ছিল চৈতি। তারমানে অরিত্রই ওকে এতদিন ধরে চিঠি লিখছিলো!
ছুটে গেল দক্ষিণের জানালায়, বারান্দায় দাঁড়িয়ে অরিত্র বললো, এতদিন বলো নি কেন চৈতালী?
চৈতি মিষ্টি হেসে বললো, তুমিও তো বলোনি কিছু।
ওদের কথা এগোনোর আগেই বাবার চিৎকার শুনতে পেল চৈতালী....
লজ্জা করে না আপনার! প্রতিবেশী হয়ে প্রতিবেশীর মেয়ের ক্ষতি চাইতে!
তাইতো ভাবি, আমার মেয়ের বিয়েগুলো কে ভাঙচি দিচ্ছে। আজকে জানতে পারলাম, পাত্রপক্ষ আমার বাড়ি থেকে বেরোলেই আপনি বা আপনার ভাগ্না আপনার খাস চাকরকে পাঠাতেন তাদের পিছন পিছন, আর সে গিয়ে পাত্রপক্ষকে বলে আসতো চৈতালী পাশের বাড়ির ছেলের সাথে প্রেম করে। সেই জন্যই পাত্রপক্ষ সম্বন্ধগুলো নাকচ করে দিচ্ছিল।
বিশ্বনাথবাবুও জোর গলায় বললেন, আপনার মেয়ে কি ধোয়া তুলসী পাতা নাকি মশাই। প্রথম যেদিন পাত্র এলো আপনার বাড়িতে, সেদিন আপনার মেয়ে আমার ভাগ্নাকে দেখিয়ে বলেছিল, যে সে তাকে ভালোবাসে!
ডাকুন আপনার মেয়েকে, বলুক সে আমি মিথ্যে বলছি কিনা! পাত্রপক্ষ নিজে আমার বাড়িতে এসে জিজ্ঞেস করে গিয়েছিল এই কথার সত্যতা।
চৈতালীর ডাক পড়লো। মাথা নিচু করে চৈতালী স্বীকার করল, হ্যাঁ সে বলেছিল।
বিশ্বনাথবাবু আরো জোর গলায় বললেন, জিজ্ঞেস করুন আপনার মেয়েকে, আমার ভাগ্নার সাথে চিঠি চালাচালি করে কিনা!
চৈতালী আবার সম্মতি জানাতেই চৈতির বাবা বলে উঠলো, ওহ, ভিতরে ভিতরে এতদূর!
বিশ্বনাথবাবু লাফিয়ে উঠে বললেন, বলি, আমার ভাগ্না অরিত্র কম কিসে শুনি!
সে পি এইচ ডি, কলেজের লেকচারার। আমার এত বড় সম্পত্তির একমাত্র ওয়ারিশ, আপনার মেয়েটি তো ভুল কোনো পাত্র সিলেকশন করেনি মশাই!
চৈতালীর বাবা মেয়ের হাত ধরে ঘরে ঢুকে গেলো।
ঘরে গিয়েই চৈতালীকে জিজ্ঞেস করলো, অরিত্রকে তোর পছন্দ? পাত্র হিসাবে অরিত্র হাজারে একটা, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই, কিন্তু মামা শ্বশুরটি কিন্তু জঘন্য লোক, এটা মনে রেখো।
চৈতালীর মা বললো, দেখো, অরিত্রর ওপরে এ পাড়ার অনেক বাবা, মায়েরই নজর আছে। এই তো সেদিন নূপুরের মা খোঁজ নিচ্ছিলো অরিত্রর। আমি বলি কি, ওদের দুজনের যদি পছন্দ হয়েই থাকে দুজনকে তাহলে ....
চৈতালীর বাবা গটগট করে বাইরে বেরিয়ে গিয়ে বলল, শুনুন বিশ্বনাথবাবু, আপনার মত প্রতিবেশীকে আমি পছন্দ করি না, তারপর আপনিই আমার মেয়ের বিয়ে ভেঙে চলেছেন দায়িত্ব নিয়ে! তাই আমি বাধ্য হচ্ছি আপনাকে বেয়াই বানাতে।
বিশ্বনাথবাবুর মুখে এই প্রথম হাসি দেখলো চৌতালী।
ইদানিং অরিত্র ওর দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে। হোয়াটসআপে মেসেজ পাঠায়, একবার সূর্য ডোবার সময় ছাদে আসবে, কনে দেখা আলোয় তোমায় দেখবো।
চৈতালীও ছাদের আলসেতে দাঁড়িয়ে আলগোছে দেখে সামনের বাড়ির ছেলেটাকে।
সামনের মাসেই ওদের বিয়ে। অরিত্রর মা, বাবা এসে দেখে গেছে চৈতালীকে। অরিত্রর মা বলেছে, ওর মামাই ওর গার্জেন, সে যা বলবে তাই হবে। অরিত্র জন্মানোর পর থেকে তার পড়াশোনার সব দায়িত্বই নাকি পালন করেছেন বিশ্বনাথবাবু। অরিত্রকে নামি স্কুলে হোস্টেলে রেখে পড়ানোর সব খরচ তিনিই দিয়েছেন।
দুই বাড়িতেই প্যান্ডেল হচ্ছে। প্রান্তিকা এসে চুপি চুপি বলেছে, তুই সব কিছু লুকিয়ে গেলি আমার কাছ থেকে!
চৈতালী নিজেও জানে না, কিভাবে ওদের সম্পর্কটা তৈরি হলো, কেনই বা অরিত্র ওর বিয়েগুলো ভেঙে দিচ্ছিল। কেনই বা এত চিঠি দিলো ওকে। অনেকগুলো প্রশ্ন আছে চৈতালীর মনে। বিয়ের রাতে সব প্রশ্নগুলো গুছিয়ে করবে ও।
মুচকি হেসে বললো, অরিত্র যে আমায় ভালোবাসতো সেটাই তো জানলাম দুই বাড়ির ঝগড়ার ফলে।
দুই বাড়িতেই বিয়ের প্যান্ডেল বাধা হয়ে গেছে। বিশ্বনাথবাবুর বাড়ির গেটে বসেছে নহবত।
পাড়ার লোক বলছে, যাক এতদিনে কিপ্টে লোকটার হাত খুললো।
বিয়ের দিনে হোয়াটসআপে মেসেজ ঢুকলো, লাল বেনারসীটা পরে আগে দক্ষিণের জানালায় আসবে, আমি দেখবো সবার প্রথম।
চৈতালীর গালে একমুঠো আবিরের খেলা।
বাসর রাতে চৈতালী অরিত্রর হাতটা ধরে বলেছিল, আগে প্রমিস করো, ঐরকম চিঠি আমায় প্রতি মঙ্গলবার গিফ্ট করবে!
অরিত্র হেসে বলেছিল, তুমিও দেবে তো বুধবার ঐরকম চিঠি।
চৈতালী প্রায় লাফিয়ে উঠে বলেছিল, চিঠি? আমি তো তোমায় কোনো চিঠি লিখিনি অরিত্র!
অরিত্র ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া গলায় বলল, তাহলে ওগুলো কে পাঠাতো আমায়! শেষ চিঠিতে তো তুমি স্বীকারও করেছো, রোজ জানালা দিয়ে দেখো আমায়।
চৈতালী বলল, দাঁড়াও...নিজের ডায়রির মধ্যে থেকে বের করলো অরিত্রর লেখা চিঠি।
অরিত্র আঁতকে উঠে বললো, এটা তো আমার হাতের লেখাই নয়। এই একই হাতের লেখা চিঠি তো আমার কাছেও আছে।
ফুলশয্যার রাতে দরজা বন্ধ করার আগেই ঘরের সামনে হাজির হলেন বিশ্বনাথবাবু। চৈতালীর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, বুঝলি মা, অরিত্রর মাও খুব ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট ছিল। সায়েন্স নিয়ে পড়তো। আমার মেজকাকার মেয়ে। আমরা যৌথ পরিবারে মানুষ। ও যখন কলেজের সেকেন্ড ইয়ারে তখন মেজকাকা ওর থেকে বয়েসে অনেকটা বড়, ব্যবসাদার পাত্র নিয়ে এসে হাজির ওর জন্য।
অরিত্রর মা মানে বুলটির মনে হয়েছিল, আমি যেহেতু ক্লাসে ফার্স্ট হই, পড়াশোনায় খুব ভালো তাই ওই বিপদ থেকে আমিই ওকে বাঁচাতে পারবো।
তাই গভীর রাতে আমি যখন টেবিলে বসে পড়ছি তখন আমার পা দুটো নিজের বুকের মধ্যে চেপে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, দাদাভাই আমায় পড়তে দে, আমি পড়তে চাই, বিয়ে করবো না এখন।
আমিও তখন বাড়ির আর পাঁচটা মানুষের মতই ভেবেছিলাম, বাড়ির ছেলেরা অনেকদূর পর্যন্ত পড়ে, আর মেয়েদের বিয়ে দিয়ে পাঠিয়ে দিতে হয় অনেক দূরে।
বুলটিও তোর মত করে ভেঙে দিতে চেয়েছিল ওর সম্বন্ধগুলো। কিন্তু তাতেও রেহাই পায়নি বুলটি। কলেজের পড়া শেষ না করেই বিয়ে হয়ে গিয়েছিল ওর।
তোর গোঁয়ার বাবা যখন তোর বিয়ে দেবে বলে পাগল হয়ে যাচ্ছিল, আর তুই যখন অরিত্রকে দেখিয়ে তোর বিয়ে ভেঙেছিলিস তখনই ভেবেছিলাম, তোকে আমি এ বাড়ির বউ করে আনব। তারপর সবাইকে দেখিয়ে দেব, মেয়েরাও পারে। তোকে আমি অনেকদূর পড়াবো, অরিত্রর থেকেও বেশি।
ও হারামজাদা নাকি ফ্ল্যাট কিনে দক্ষিণ কলকাতায় থাকবে বলছিলো। সে যায় যাক, বুঝলি মা। আমরা বাপ বেটিতে থাকবো। তোকে আমি অনেক দূর পড়াবো। তুইও কলেজে পড়াবি।
অরিত্র ভয়ে ভয়ে বললো, মামা, চিঠিগুলো কি তুমি লিখেছিলে!
বিশ্বনাথ বাবু বিরক্ত হয়ে বললেন, হ্যাঁ রে হতচ্ছাড়া আমিই লিখেছিলাম। কি করবো, তোদের দুজনকে একই জানালায় দেখা করার সুযোগ দিয়েও যদি তোরা প্রেম করতে না পারিস তখন আমার মত বুড়োকেই নামতে হয় মাঠে!
চৈতালী বিশ্বনাথবাবুর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতেই উনি বললেন, আমার ছেড়ে যাবি না তো মা!
ওই হতভাগা নাকি আমায় ছেড়ে চলে যাবে বলছিলো। চৈতালী বললো, সে ও গেলে যাবে, আমি তোমার কাছেই থাকবো।
অরিত্র ফিসফিস করে বললো, আপাতত আমি এ বাড়িতেই থাকবো মামা। ফ্ল্যাট কিনছি না এখুনি। নিজেদের এত বড় বাড়ি থাকতে....
বিশ্বনাথবাবু নিজের বুদ্ধির তারিফ করতে করতে লাইব্রেরি রুমে ঢুকলেন।
চৈতি তাকিয়ে দেখল বয়স্ক মানুষটার দিকে। বাহ্যিক মুখোশের আড়ালে একটা নরম শিশুর মত মন আছে মানুষটার। যেটা ওরা কেউ দেখতেই পায়নি এতদিন।
অরিত্র বারান্দায় দাঁড়িয়ে চৈতির বাড়ির বাগানের দিকে তাকিয়ে বলল, চৈতি... ওই যে তোমাদের বাগানের থান ইটগুলো....যেগুলো দিয়ে তুমি আমার মাথা ঠুকে ঠুকে ভাঙবে ভেবেছিলে!
চৈতি লজ্জা পেয়ে বললো, আর তুমি কী ভেবেছিলে?
অরিত্র মুচকি হেসে বললো, আমি ভেবেছিলাম, এমন ডাকাত বউ কার হবে কে জানে!
পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় দুই বাড়ির ছাদ প্লাবিত হচ্ছে।
রাকেশ ঘোষাল
Comments
Post a Comment