অমূল্য বাক্স


কিছুতেই একটা চাকরি জোগাড় করতে পারলো না সুদীপ্ত। বাবার চোখে হতাশা আর মায়ের দৃষ্টিতে করুণা ...এই নিয়েই চলছে গত তিন তিনটে বছর।

আগে চাকরির ইন্টারভিউ থাকলে বাবা বাজার থেকে মাছ আর দই নিয়ে আসতো। দুটোর যাত্রাই নাকি ভীষণ শুভ। 

মা গরম গরম মাছ ভেজে দিতো, বাবা সুদীপ্তর জামা প্যান্ট আয়রন করে দিতো।

বেরোনোর সময় মা কপালে দইয়ের ফোঁটা পরিয়ে দিতো।

সব শুভদের একত্রিত করেও সুদীপ্তর কপালের অশুভ গ্রহটাকে তাড়াতে পারলো না সুদীপ্ত।

একটা প্রাইভেট ফার্মে জয়েন করেছিল কিন্তু মাত্র পাঁচ হাজার টাকায় আটঘন্টা খাটনি পোষাচ্ছিলো না।

প্রথম প্রথম যখন ব্যর্থ হত, তখন বাবা বলতো ...লড়াই করো, ঠিক পারবে।

দেবাঙ্গী বলতো, আমি পাশে আছি। বেকার ছেলের প্রেমিকাদেরও বেশ অনিশ্চয়তার ভয়ে ভুগতে হয়। 

একদিকে বাড়িতে বিয়ের চাপ, অন্যদিকে প্রেমিকের অসহায়ত্ব। 'বিয়ের পর কি খাওয়াব?' গোছের হালছাড়া উত্তর। তবুও দেবাঙ্গী সঙ্গে আছে। ও চেষ্টা করছে একটা ছোটখাটো চাকরীর। যদি সুদীপ্তকে হেল্প করা যায়!

আগে আগে পার্কে বসে ভবিষ্যতের নরম সোনালী জীবনের স্বপ্ন গড়তো ওরা।

এখন তো সুদীপ্ত বলে, দেবাঙ্গী তুমি অন্য কাউকে বিয়ে করে নাও ...

দেবাঙ্গী শুধুই চোখের জল ফেলে।  

ভরসার হাত রেখে বলে, সুদীপ্ত তুমি পারবে ...

অস্তগামী সূর্য আভাস দেয় একটা নতুন দিনের কিন্তু কোনো নতুন আশার সঞ্চার করতে পারে না ওদের জীবনে।

আজও সুদীপ্তর একটা ইন্টারভিউ আছে। বাবা মাঝে মাঝেই বলে, ঘোষবাবুর ছেলে চাকরি পেয়ে গেল। মিত্রদার ছেলেটা রেলে পেলো।

সুদীপ্ত বাবার চোখে হতাশা দেখে। আর নিজের আত্মবিশ্বাসটা যে তলানিতে ঠেকেছে সেটাও বুঝতে পারে আজকাল।

সুদীপ্ত খুব ভালো করে জানে, এসব মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে আগেই নিয়োগ হয়ে গেছে এই ইন্টারভিউটা একটা আই ওয়াশ মাত্র।

তবুও নিজের পোশাক আয়রন করছিল সকালবেলা। আজকাল কোচিং সেন্টারের দৌরাত্ম্যে টিউশনিগুলোও চলে গেছে। না, সুদীপ্ত কোনোদিনই সাজেশনে বিশ্বাসী ছিল না। পুরো কোর্স পড়াতে চাইতো স্টুডেন্টদের। তাই হয়তো ওদের বাড়ির বাইরের ঘরটায় যেখানে ও আগে টিউশনি পড়াতো সেটা এখন প্রায় ফাঁকা। 

দেবাঙ্গীর ফোন ...হয়তো বেস্ট অফ লাক বলবে বলেই।

আর কত অপেক্ষা করবে দেবাঙ্গী? কলেজ, ইউনিভার্সিটি আরো চার চারটে বছর ...

ফোনটা আর ধরতে ইচ্ছে করলো না সুদীপ্তর।

দেবাঙ্গীর গলাটা শুনলেই বুকের ভিতর হু হু করে ওঠে।

যথারীতি আরেকটা একঘেয়ে ইন্টারভিউয়ের নাটক সেরে ক্লান্ত সুদীপ্ত বাড়ি ফিরলো। মা ভাতের থালা আগলে ঢুলছিলো। সুদীপ্তর বড্ড কষ্ট হচ্ছে মায়ের সংসারের জোয়াল টানতে টানতে বিদ্ধস্ত মুখটা দেখে।

ওর পায়ের শব্দ শুনেই মা বললো, খোকা এলি ...

খেয়ে নে। মা আর জিজ্ঞেস করে না, কি রে ইন্টারভিউ কেমন হলো? মাও হয়তো সুদীপ্তর মতোই মেনে নিয়েছে, এগুলো শুধুই যাওয়া আসা। 

কষ্ট আর ব্যর্থতা জমাট বাঁধতে বাঁধতে যখন মনের আনাচে কানাচের সমস্ত গলিগুলোর সূক্ষ্ম অনুভূতিরা মৃত প্রায় হয়ে যায় তখন বোধহয় বাঁচার ইচ্ছে, লড়াইয়ের ইচ্ছেরাও নিঃশেষ হয়ে যায়।

আজ যেমন সুদীপ্তর মনে হচ্ছে,ওর বাঁচার অধিকার নেই। শুধু মা বাবার ঘাড়ে বসে খাওয়া ছাড়া আর কোনো স্বপ্ন নেই ওর সামনে। দেবাঙ্গীর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা গ্রহণের অধিকারও সুদীপ্তর নেই।

নিজের ঘরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করলো সুদীপ্ত।

আত্মহত্যা একমাত্র পথ ....

একবার বেশ কিছু ঘুমের ওষুধ জোগাড় করেছিল সুদীপ্ত। যদি এক্সপায়ারি ডেট পার না হয়ে যায় তাহলে,ওগুলোই একমাত্র শান্তির উপায়।

তন্নতন্ন করে খুঁজছে নিজের আলমারিটা।

হঠাৎ একটা অ্যালুমনিয়ামের টিনের বাক্স পড়ে গেল ওপরের তাক থেকে।

বাক্সটা দেখেই মনে পড়ে গেলো সুদীপ্তর। এটা ওকে ছোটপিসির ছেলে দিয়েছিলো। দাদা নাকি এই বাক্স নিয়েই স্কুলে যেত। সুদীপ্তর বড্ড পছন্দ ছিল ওটা। তখন ওর বছর ছয়েক বয়েস হবে। 

বাক্সটা খুলতেই হুড়মুড়িয়ে বেড়িয়ে এলো সুদীপ্তর ছোটবেলা। কত রঙিন কাগজ,রঙিন রুমাল, কিছু ম্যাজিক তাস, মায়ের দুটো ছোট্ট তালা চাবি, জং ধরা কাচি আর কিছু মূর্তি।

সুদীপ্ত নিজেই চমকে উঠলো, এই মূর্তিগুলো ও যখন তৈরি করেছিল তখন ওর বয়েস মাত্র দশ কি বারো। 

চোখের সামনে বিভিন্ন ক্যালেন্ডারের ছবি বা অন্য ছবি দেখে ও বানিয়েছিল এই মূর্তিগুলো।

কখনো খেয়াল করেনি ঐ কাঁচা হাতেই এই মূর্তিগুলো এতটা নিখুঁত বানিয়েছিলো।

আজ শ্রীরামকৃষ্ণেদেবের মূর্তিটা হাতে নিয়ে সুদীপ্ত দেখলো, ঠাকুরের গায়ের কাপড়ের প্রতিটা ভাঁজ নিখুঁত। 

একটি ছোট্ট খরগোশ বানিয়েছিল ও যার কানদুটো এতটাই অরিজিনাল লাগছে যে ও নিজেই বিশ্বাস করতে পারছে না এটা ওর তৈরি! তারপর পড়াশোনার চাপে আর এদিকে মন দেওয়া হয়নি কখনো। 

দেবাঙ্গীর ফোন ...ফোনটা বাজছে ..

সুদীপ্ত ফোনটা ধরেই চিৎকার করে বলে উঠলো,আমি পারবো দেবাঙ্গী। আমি সব পারবো। 

হঠাৎ পাওয়া পুরোনো বাক্সের মধ্যের অতীতটাই বাঁচিয়ে দিলো সুদীপ্তকে।

মায়ের গলার হার আর দেবাঙ্গীর হাতের সোনার চুড়ি বিক্রির টাকাটা যখন হাত পেতে সুদীপ্ত নিয়েছিল তখনই প্রতিজ্ঞা করেছিল ও, এগুলো ফিরিয়ে দিতেই হবে।

দিনরাত এক করে কাজ করে চলেছে সুদীপ্ত।আপাতত ওর ওয়ার্কশপে বেশ কিছু শিল্পীও কাজ করছে।

বহুদিন পরে বাবা আর মায়ের চোখে নিরাশার কালো মেঘটা সরে গিয়ে আশার বিন্দু বিন্দু স্বপ্নগুলো সোনালী রঙে সাজতে শুরু করেছে।


বছর তিনেক পর ...শহরে বেশ বড় একটা হোর্ডিং পড়েছে ..

সুদীপ্ত দেবনাথের শো পিসের এক্সিবিশন চলছে ..

সুদীপ্তর শো পিসের শোরুমটা আপাতত সুদীপ্তর স্ত্রী দেবাঙ্গীই চালাচ্ছে। সুদীপ্ত বিভিন্ন শহরে এক্সিবিশন নিয়েই ব্যস্ত থাকে। সাধারণত ইন্টিরিয়ার ডেকোরেটররা বেশ চড়া দামে কিনে নিয়ে যায় ওর তৈরি ইউনিক শোপিসগুলো।

হেরে যাওয়া মানুষের মেরুদন্ড দিয়েও কখনো কখনো ঠান্ডা রক্তস্রোত প্রবাহিত না হয়ে আত্মবিশ্বাসের উদ্দীপনাও জেগে ওঠে। ঠিক সেই মুহূর্তটাকে চিহ্নিত করাটাই প্রয়োজন। 

সেই স্লিপিং পিলগুলো আপাতত এক্সপায়ার্ড হয়ে গেছে। কিন্তু গত একমাস ধরে সুদীপ্তর রাতে ঘুম নেই।

সুদীপ্তর একমাসের মেয়েটা গোটা সন্ধ্যাটা ঘুমিয়ে ঠিক বারোটার থেকে কাঁদতে শুরু করছে। সুদীপ্ত আর দেবাঙ্গীর মাঝে শুয়ে পুচকেটা বড্ড দুষ্টুমি শুরু করছে।

সুদীপ্ত মাঝে মাঝে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে গত তিনবছর আগের ইন্টারভিউয়ে সিলেক্ট না হওয়া, চাকরি না পাওয়া, জীবনসংগ্রামে হেরে যাওয়া ছেলেটাকে খোঁজার চেষ্টা করে ..কিন্তু আয়নার সামনে এখন যে দাঁড়িয়ে আছে তার মুখের প্রতিটি রেখায় শুধু এগিয়ে চলার হাতছানি ......

রাকেশ ঘোষাল

Comments

Popular posts from this blog

গ্রীষ্মের_ছুটিতে ছাত্রের লেখা খোলা চিঠি