অনামিকা



আসলে কি জানো শুভময়, অহংকার আর আত্মসম্মানের মধ্যে একটা সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে, যেটা তুমি হয় বোঝো না, নয় বুঝতে চাও না। কথাগুলো সেদিন নির্লিপ্ত গলায় বলেছিল অনামিকা। অনামিকা ঐবাড়ির উত্তরের জানালার দিকে তাকিয়েই বলেছিলো, কি অদ্ভুত দেখো, যখন বিয়ের আগে তুমি দেখতে গিয়েছিলে তখন তুমি শুনেছিলে আমি চাকরি করি, মারাত্মক স্বাধীনচেতা। অপ্রিয় সত্যি বলতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। পাত্রী হিসাবে তখন কিন্তু তুমি আমায় বাতিল করে দাওনি। বরং বন্ধুদের কাছে এসে বেশ বড়াই করে বলেছিলে, আমার হবু বউ চাকরি করে, উচ্চশিক্ষিতা, সুন্দরী। 
অদ্ভুতভাবে বিয়ের দিন দশেক পর থেকেই তোমাদের গোটা বাড়ির ব্যবহার বদলে যেতে শুরু করলো। আমি রোজই দেখতাম, তুমি যখন বেরোতে তোমার মা গেট অবধি এগিয়ে যেতো, টিফিন খেয়ে নিস বলতো, আর আধঘন্টা পরে আমি যখন বেরতাম তখন ভদ্রমহিলা বিরক্তিসূচক বাক্যে বলতেন, ফিরতে ফিরতে নিশ্চয়ই সন্ধে? যাক, ভালোই বউ জুটিয়েছি বটে। 
বুঝতে শুরু করলাম, আমি মা ডাকলেও উনি মেয়ে ভাবতে পারতেন না। ইচ্ছে করেই দূরত্বটা মেটাতে চাননি। আমি বরাবরই আত্মসম্মানকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে এসেছি। সেটাই আমার বাবার শিক্ষা। অকারণে তবলার মত সব দিকে তাল দিয়ে কথা বলা আমার স্বভাববিরুদ্ধ। তোমাদের বাড়িতে একটা অদ্ভুত জিনিস লক্ষ্য করলাম, তোমরা সকলের কাছে ভালো থাকার একটা আপ্রাণ প্রচেষ্টা করে যাও। তাই তাদের দোষ দেখলেও মিষ্টি করে হেসে পাশ কাটিয়ে যাও। বাড়ি ফিরে সকলের অগোচরে চলে তোমাদের সমালোচনা। বড় বিরক্তিকর লাগতো আমার। আমি স্পষ্ট কথার মানুষ, যা বলবো সামনে বলবো। সত্যি কথা বলতে শুরু করার পরেই শুনলাম, অনামিকা নাকি মারাত্মক মুখরা। মুখরা? বাংলা অভিধানে তো এর অর্থ ঝগড়াটে, অনামিকা তো ঝগড়া করে না, শুধু স্পষ্ট কথা বলে। আড়ালে নয়, সামনে বলে। পাড়া প্রতিবেশী সকলের কাছেই শুনি অনামিকা নাকি বহু তপস্যা করে শুভময়ের মত স্বামী পেয়েছে। মনে মনে হাসতাম আমি। মেরুদন্ডহীন, প্রতিবাদবিমুখ, সবার মন রাখার মিথ্যে ছলনা করা মানুষটাকে ভালোবাসা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছিল না। কারণ সমাজ আসল শুভময়কে চেনেই না। 
সম্পর্কের সংজ্ঞাটা তৈরিই হলো একটা বোঝাপড়া দিয়ে। ধীরে ধীরে তুমি আর তোমার পরিবার আমার ওপরে বাধা-নিষেধ দিতে শুরু করলে। 
চুড়িদার, জিন্স পরা যাবে না, চাকরি ছেড়ে দাও, এত সত্যি কথা বলার দরকার নেই। আমিও ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম এত বাধা নিষেধের চাপে। 
রোজ অফিস থেকে ফিরেই শুনতাম তোমাদের বাড়ির লোকের অসন্তোষ। 
তোমার সঙ্গে আমার বড্ড ফারাক - বুঝেছিলাম ধীরে ধীরে। তুমি অফিস থেকে ফিরলে তোমার মা, শ্যামলীপিসি যত্ন করে খাবার সাজিয়ে রাখতো। আমি যখন জিজ্ঞেস করতাম, আমি কি খাবো? তোমার মা ব্যঙ্গের হাসি হেসে বলতেন, ঢং দেখে বাঁচি না। বাড়ির বউ কি খাবে সেটা অন্য কেউ ঠিক করে দেবে? নিজে বানিয়ে খেয়ে নাও। তোমার ঠোঁটের কোণেও বিরক্তি দেখতাম তখন। 
জানো শুভময়, বাস জার্নি আমারও হতো, ক্লান্ত আমিও হতাম। তুমি মায়ের গুড বয়, তাই জীবনে কোনোদিন আমার পক্ষে একটা বাক্যও ব্যবহার করনি। অনেকেই শুনে বলেছিল, অমন শান্ত-ভদ্র ছেলে নাকি লাখে একটা হয় না। অনেক তপস্যা করে অনামিকা নাকি পেয়েছে শুভময়কে! হ্যাঁ, অনামিকা চিরকালই মুডি। নিজের ইচ্ছের জিনে লাগাম পড়াতে সে শেখেনি কোনোদিন। সন্ধেবেলা ফাঁকা ছাদে দাঁড়িয়ে খোলা গলায় গান গায় সে, কখনো রান্নার ফাঁকে সঞ্চয়িতা থেকে আউরে নেয় তার প্রিয় 'বলাকার' লাইন। অনামিকা প্রাণখোলা, উচ্ছল ঝর্ণা। শুভময় গভীর খাদ। সেই খাদের গভীরতা মাপা মানুষের সাধ্য নয়। বড্ড স্থির, বিনয়ী, লোকচক্ষুতে আদ্যোপান্ত ভদ্রলোক। 
অনামিকা তো অহংকারী, অপরিচিত মানুষের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখতে পছন্দ করে। অকারণ তৈলমর্দন তার একান্ত নাপসন্দ। কিন্তু বন্ধু বা কাছের মানুষরা সবাই জানে অনামিকা আসলে দিলখোলা মানুষ। মুখোশ না পরা একেবারে আদিম। মাঝে মাঝে অনামিকার ইচ্ছে করতো, শুভময়ও একটু পাগলামি করুক। অবিশ্রান্ত বৃষ্টিতে ভিজুক ওর হাত ধরে। আচমকা একটা কেক নিয়ে এসে বলুক, চলো আজ বিনা কারণে সেলিব্রেট করি। শুভময় ভীষণ মাপা মানুষ, তাই তো অনামিকার জন্মদিনটা মনে রাখেনি কোনোদিন। জানো শুভময়, তোমার জন্মদিনে আমার উত্তেজনা থাকতো, নিজের হাতে রান্না করে দিতাম, লুকিয়ে রাখতাম তোমায় দেবার গিফ্টটা। কিন্তু ওই যে ঢিল ছুঁড়লেও যে পুকুরের জল নড়ে না, তেমনি গিফ্ট পেয়েও তোমার ঠোঁটের কোণের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হতো না। ধীরে ধীরে আগ্রহ হারালাম আমি। আমরা কিন্তু সুখী স্বামী-স্ত্রী। আমার অভিনয়ে খামতি থাকলেও তুমি বরাবরই লোকসমাজে নিখুঁত। 
একটার পর একটা প্রমোশন হতে শুরু করলো আমার চাকরিতে। আমার প্রতিটা উন্নতি আমি শেয়ার করতাম তোমার সঙ্গে। শুভময়, তোমার মুখের রেখায় ফুটে উঠতো হিংসের প্রতিচ্ছবি। অথচ তোমার বন্ধুরা এসে বলতো, শুভময় নাকি তাদের রীতিমত মিষ্টি খাইয়েছে বউয়ের উন্নতিতে। আমি চেষ্টা করতাম, আপ্রাণ চেষ্টা করতাম তোমায় বোঝার! খুঁজতাম তোমার মুখের রেখার ওই নিরুদ্বিগ্ন ভঙ্গিমায়, ঠিক কি চাও তুমি?
নিজের সব থেকে পছন্দের পোশাক জিন্স-টপ ছেড়ে তাঁতের শাড়ি পরেই যেতাম তোমার সঙ্গে। তবুও কখনো তোমার মুখে একটুকরো হাসি দেখিনি। এই তোমাকেই অনুষ্ঠান বাড়িতে নিমন্ত্রিত আত্মীয়দের সঙ্গে হাসি গল্পে মশগুল হতে দেখেছি। হিংসা হতো জানো, মনে হতো আমি কেন বাইরের লোক হলাম না? 
ট্যুর এজেন্সির সঙ্গে মানালি বেড়াতে গেলাম আমরা। ওখানে গিয়েও অন্য পরিবারের সঙ্গে জমলো তোমার আলাপ, আমি হোটেলের ঘরে একা। অনামিকা অহংকারী, অনামিকা মিশতে পারে না, অনামিকা আনসোশ্যাল। এই খেতাব নিয়েই কাটলো আমার মানালি ভ্রমণ। জানো শুভময়, অহংকার আর আত্মসম্মানের মধ্যে একটা সূক্ষ্ম লাইন আছে। যেটা খালি চোখে দেখা যায় না। বাইরের লোকের কাছে নিজেকে অমায়িক প্রতিপন্ন করতে গিয়ে নিজের আত্মসম্মান বিকিয়ে দিতে অনামিকা শেখেনি। 
চলছিল আমাদের সংসারের হাল ভাঙা পাল ছেঁড়া নৌকাটা। যে সমাজের মানুষের সামনে এলে পালে হাওয়া লাগিয়ে তরতর করে চলার অভিনয় করতো, বাকি সময় দুটো হাল বেয়েও এগোতো না। 
বন্ধুরা বলতো, অনামিকার কথায় শুভময় ওঠবস করে, বড্ড বাধ্য স্বামী। রাগ নেই, অভিমান নেই, ভীষণ শান্ত। অনামিকা বুকের ভিতরের রক্তক্ষরণ কিছুতেই যেন বাইরে না আসে সেই চেষ্টায় আপ্রাণ হাসতো। মুখে বলতো, ও এমনই রে। 
বাধ্য সে তার মায়ের ছিল, মায়ের কথায় স্ত্রীকে সবরকম অপমান করতে তার মুখে বাঁধতো না কখনো। অবশ্য সে অপমান বন্ধ দরজার ভিতরেই সীমাবদ্ধ থাকতো। বাইরে সে পত্নীনিষ্ঠ। জানো শুভময়, মাঝে মাঝেই আমার মধ্যে সেই বিয়ের আগের অনামিকাটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠতো। মনে হতো টেনে খুলে দিই তোমাদের মুখোশগুলো। উলঙ্গ করে দিই তোমাদের। পরক্ষণেই মনে হতো, লোকে তো জানে অনামিকা মুডি, মুখরা, ভীষণ রকমের অহংকারী, তাই আদৌ কি বিশ্বাস করবে কেউ অনামিকাকে? শুভময়ের এতদিনের সাধের গড়া অমায়িক আবরণ ছিঁড়বে কি কখনো?

ক্রমাগত অভিনয়ে বিধস্ত আমি, বিশ্রাম চাই আমার। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখতাম পাল্টে গেছি আমি। অনেক খুঁজতাম ইতিউতি, নিজের চোখের দৃষ্টিতে, ঠোঁটের হাসিতে, গলার স্বরে...না কোথাও খুঁজে পেতাম না আর সেই অনামিকাকে। যাকে আমি ভালোবাসতাম, লালন করতাম যার প্রতিবাদী রূপটাকে! বদলে যাচ্ছিলাম আমি। আপ্রাণ চেষ্টা করতাম ওই অনামিকাটাকে ফিরে পেতে কিন্তু তোমাদের মত শান্ত বুদ্ধির মানুষের কাছে অনামিকা হেরে যেত। রেগে যেত, কাঁদতো....কিন্তু ওই যে শুভময় নামক গভীর খাদের গভীরতা মাপতে অপারগ ছিল অনামিকা। 
অনামিকার গুনগুন গান বন্ধ হলো, বন্ধ হলো উদাত্ত গলার কবিতা। ম্রিয়মাণ শুভময়ের স্ত্রী ক্রমশ হারিয়ে ফেললো তার চিরকালীন প্রতিবাদী সত্ত্বাটাকে। চিরতরে হারিয়ে ফেলেছিলাম অনামিকা নামক তেজি মেয়েটাকে। ধীরে ধীরে একটা অবসাদ ঘিরে ফেলছিল অনামিকার আপাদমস্তক। 
আচমকা অনামিকা অনুভব করলো একটা ভ্রূণ ধীরে ধীরে বাড়ছে তার গর্ভে। চমকে উঠলো অনামিকা। বুঝতে পারলো, শুভময়ের সঙ্গে মনের টান না থাকলেও সে তার সন্তানের মা হতে চলেছে। মা হবার আনন্দে কিছুদিনের জন্য সম্পূর্ণ ভুলে গেল নিজের অবস্থান। একটা ফুটফুটে সন্তানের জন্ম হলো আমার। তখন আমি ধীর, স্থির, দায়িত্ব নেওয়া একজন মা। অদ্ভুত ভেবে একদিন আবিষ্কার করলাম, ছেলেটা শুধু আমার। তোমাদের গোটা বাড়ি ওকে অনামিকার ছেলে ভাবে। ছেলের সব দায় আমার। শুভময় মনে আছে তোমার, বারবার বলেছিলাম, ছেলেটাকে একটু সময় দাও, ওর বড় হওয়া দেখো খুব কাছ থেকে। সেদিন তুমি অবহেলা ভরে বলেছিলে, আর পাঁচটা বাচ্চা যেভাবে বড় হয় সেভাবেই হবে, ন্যাকামি করার কি আছে? এমন ভাব করছো ছেলে যেন শুধু তোমারই হয়েছে?
চমকে উঠেছিলাম আমি। চমকে উঠেছিল আমার মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা অনামিকা। এ সন্তান তোমার নয়? এর দায়িত্ব তোমার নয়? পুপুন কি শুধুই আমার? বাবার কাছ থেকে ক্রমাগত অবহেলা পেতে পেতে পুপুনের গোটা পৃথিবী জুড়ে একটাই শব্দ মা। 
তোমাদের বাড়িতে নিজের অবেহেলা সহ্য করতে পারলেও অনামিকা কিছুতেই পুপুনের অবহেলা সহ্য করতে পারলো না। তাই বছর পাঁচেকের পুপুনকে নিয়ে ফিরে এলো বাপের বাড়ি। বাবা, মা, আত্মীয়রা সবাই বলেছিল মানিয়ে নিতে। অনামিকা রাজি হয়নি। তারপরেই সবাই বললো, শুভময়ের মত শান্ত ছেলের সঙ্গে যে মানিয়ে নিতে পারে না, সে যে সংসার করতে পারবে না সেটাই স্বাভাবিক। অনামিকার গোটাটা জুড়ে তখন শুধুই পুপুন। 

অফিস, কাজ আর পুপুন নিয়ে বেশ কাটছিল দিনগুলো। না শুভময় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে আসেনি তার সন্তানকে। বরং নিস্পৃহ থেকেছে। আত্মীয়রা বলেছে দারুন আঘাতে শুভময় নাকি বিধস্ত। মনে মনে খুব হেসেছে অনামিকা। যার মনের তলই পাইনি এত বছরে, সেও নাকি কষ্ট পাচ্ছে, বড্ড কঠিন কল্পনা ছিল আমার পক্ষে। আমি জানতাম জানো শুভময়, তুমি বন্ধুদের আড্ডায় হয়তো দুফোঁটা চোখের জলও ফেলেছো আমাদের জন্য। আবার বাড়ি ফিরে টিভিতে গানের প্রোগ্রাম দেখেছো তুমি আর তোমার মা একসংগে। 
অদ্ভুত তোমার মুখোশ। কোনো ফাঁক নেই সেখানে। কোনোভাবেই সেই মুখোশ খুলবে না এটা আমার থেকে আর বেশি কে জানে। 
ডিভোর্সটা হয়নি আমাদের। তাগিদ অনুভব করিনি ওই মৃত সম্পর্ককে কাগজে কলমে মৃত প্রমান করার। তাই রয়েই গিয়েছিল। 
বেশ কয়েকটা বছর পরে আবার অনামিকার কাছে ফোন এলো, শুভময়ের মা নাকি খুব অসুস্থ, ওর সাহায্য প্রয়োজন। অনামিকার ইচ্ছে না থাকলেও কর্তব্যের খাতিরেই আবার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। গলব্লাডার স্টোন অপারেশন হলো ওর মায়ের। একা হাতে সবটা সামলে ছিল অনামিকা। ভেবেছিল এরপর হয়তো মহিলা অনামিকাকে মেয়ের মত মেনে নেবে! ভাবনায় ছেদ পড়েছিল আবারও। শুভময় আর ওর মায়ের একান্তের আলোচনাটা সেদিন আবারও কানে এসেছিল ওর।
মা বলেছিল, হ্যাঁ রে শুভ, কদিন থাকবে রে আর? এখন তো আমি সুস্থ হয়ে গেছি। যদি বাপের বাড়ি যেতে চায় তো যাক। শুভময় নির্বিবাদে বলেছিল, আমিও তো যেতেই বলছি, বলছে কয়েকটা দিন থেকে যাই। কে জানে ঠিক কি করবে!
অনামিকা আবারও সজোরে ধাক্কা খেয়েছিল মুখোশ পরা মানুষগুলোর ব্যবহারে। 
ঠিক পাঁচমিনিট আগেই শুভময় বলেছিল, আর কি ফিরে আসা যায় না অনামিকা? শুভময়ের গলা শুনে ক্ষনিকের জন্যও বিশ্বাস করে বসেছিল ওকে। তবে কি পাল্টে গেছে ও, তবে কি মিস করেছে অনামিকাকে! ছোট্ট খড়কুটোটাকে আগলে ধরার চেষ্টা করবে কিনা সেই নিয়েই ভাবছিল। তারপরেই আচমকা শুনেছিলো ওদের গোপন কথা। মুহূর্তে ভেঙেছিল ওর ভুল ভাবনার সূত্ররা। না, পাল্টায়নি শুভময়, শুধু অভিনয়টা আরেকটু ভালো শিখেছে ও। 
আমি পরের দিনই ফিরে এসেছিলাম পুপুনকে নিয়ে। আসার আগে তোমার মা বলেছিল, নাতিটার জন্য নাকি তার মন খারাপ করবে। ভিতরে ভিতরে একটা কষ্ট আর ঘৃণা একসঙ্গে দানা বেঁধেছিল। আমি এতদিন তার সেবা করার পরেও আমার কথা তার মনে পড়ার কোনো কারণ ছিল না, তাই না শুভময়? ইচ্ছে করেনি কিছু বলতে, মনে হয়েছিল এড়িয়ে যাই এদের। তুমি অবশ্য চিরকালই খুব মার্জিত, ঔদ্ধত্য তোমার স্বভাববিরুদ্ধ। তাই শান্ত স্বরে বলেছিলে, যদি দরকার হয় এসো। 
লজ্জা করেছিল তোমায় স্বামী হিসাবে ভাবতে। শুধু প্রয়োজনে এসো কথাটা শোনার পর মনে হয়েছিল, স্বার্থান্বেষীরা হয়তো এমনই হয়। 
আজ এত বছর পরে স্মৃতির পাতায় কেন চোখ বোলাচ্ছি জানো শুভময়, কারণ আবারও তোমার ফোন এসেছে। তোমার নাকি টাকার প্রয়োজন! তাই স্ত্রী হিসাবে পাশে দাঁড়ানোটা আমার নাকি কর্তব্য! 
শুভময়, কর্তব্য কি শুধু একতরফা? পাঠিয়ে দিয়েছিলাম টাকা। না, আর ওই বাড়িতে যেতে ইচ্ছে করেনি আমার। অদ্ভুত একটা ব্যাপার লক্ষ্য করছিলাম। পুপুনকে বাবার সঙ্গে কথা বলতে বললে, ছবি দেখালেও পুপুন কিছুতেই বাবার কথা শুনতে চাইতো না। বিরক্ত হতো। আমি অনেক বলতাম, তোর বাবা তোকে খুব ভালোবাসতো জানিস তো! তোর ঠাম্মাও বাসতো। 
পুপুন বিরক্ত হয়ে চলে যেত। মুখে বলতো, মা ছাড়া আর কেউ নেই আমার। তখন দেখতাম মাত্র ক্লাস সিক্সের পুপুনের চোখে একটা তীব্র জেদ, বাবার পরিচয়টা অস্বীকার করার জেদ। পুপুন যে অনেকটা বড় হয়ে গেছে বেশ বুঝতে পারতাম। সেই ছোট্ট পুপুন আর নেই, যে বাবার বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় বসে থাকার পরে, বাবার মুখে শুনতো, আঃ পুপুন বিরক্ত করো না, ঠাম্মার সঙ্গে ইম্পর্টেন্ট কথা আছে। সেই পুপুন আর নেই, যে নিজেই চকলেটের অর্ধেকটা লোভ সামলে রেখে দিতো, বাবাকে খাওয়াবে বলে। বাবার মুখে দিতে গেলেই শুনতে হতো, তোমায় একদিন বলেছি না পুপুন, আমি চকলেট খাই না! দু চোখে টলমলে জল নিয়ে চকলেটটা মাকে খাইয়ে দিতো ও। সেই ছোট্ট পুপুনটা আর সত্যিই নেই। এখন দাঁত চেপে বলে, মা প্লিজ, তুমি ওই বাড়ি, বাবা, ঠাম্মা এদের কথা আর বলো না আমায়। 

সেই পুপুনকেই দিন পাঁচেক ধরে কোথাও পাচ্ছি না আমি। থানা, পুলিশ, পরিচিত সকলের বাড়িতে খুঁজেছি, কোথাও নেই পুপুন। শুভময়কে ফোন করেছিলাম এতগুলো বছর পরে। তীব্র ভর্ৎসনা করেছে সে। নিজের সন্তানকে যে আগলে রাখতে জানে না সে নাকি মা! আমার একমাত্র বাঁচার অবলম্বন পুপুন, তাকেও হারিয়ে ফেললাম আমি! শুভময় চিৎকার করে বলেছিল, তুমি পুপুনের অযোগ্য মা, ছেলেকে ফিরে পেলে আমি রেখে দেব তাকে। আমি মনে মনে ভেবেছিলাম, তাই হোক। পুপুনকে ফিরে পাক শুভময়। প্রায় দিন সাতেক কেটে গিয়েছিল, পুপুন নেই। খোঁজ চলছে চারিদিকে। শুভময় রোজই একবার করে ফোন করে জিজ্ঞেস করে, পুপুনকে পাওয়া গেল কিনা! আমার বাড়ির সকলে বলেছে, যতই হোক বাবা তো! আমিও বুঝতে পেরেছি ভুল করেছি, ওবাড়ি থেকে পুপুনকে নিয়ে এসে। আমি যদি আরও একটু মানিয়ে নিতাম তাহলে হয়তো...
আর কি মানিয়ে নেওয়া যায়! যায় হয়তো, সমাজ তো মানিয়ে নিতেই বলে, পরিচিতরাও তাই বলে। তাহলে হয়তো আমিই ভুল। পুপুনকে ফিরে পেলে শুভময়ের কাছে ফিরে যাব সিদ্ধান্ত নিয়েই নিলাম। 
কিন্তু কোথায় পুপুন! গোটা ঘরে ওর খেলনা ছড়ানো, ওর বই খাতা, টেবিল চেয়ার ফাঁকা পড়ে আছে। স্কুল বাসে কেন সেদিন ও ওঠেনি সেটাই রহস্য রয়ে গেছে। বাসের দায়িত্বে যিনি আছেন তিনি বলেছেন, সুগতকে তো স্কুলে আসার সময় দেখেছিলাম, ফেরার সময় দেখি সে নেই। তখনই আমি স্কুলে যাই, শুনলাম ও নাকি গেটে দাঁড়িয়েছিল, একটা গাড়ি আসতেই উঠে পড়েছে। আর তো কিছুই বলতে পারল না সিকিউরিটি। আসলে স্কুল ছুটির সময় এত ভিড় হয় যে খেয়াল রাখা সম্ভব হয় না। হেল্পলেস লাগছিলো আমার। বুঝতে পারছিলাম আমার ভিতরের অনামিকাটা হেরে যাচ্ছে, ফুরিয়ে যাচ্ছে। 
বুঝতে পারছিলাম, আগের অনামিকার সঙ্গে এখনকার অনামিকার একটা বড় পার্থক্য ঘটে গেছে। মাতৃত্বই হয়তো দায়ী এই পরিবর্তনের জন্য। 
এই অনামিকার আসল শক্তি পুপুন। আগের অনামিকার শক্তি ছিল সপাটে সত্যি বলা। 
আমি তখন হাতরাচ্ছিলাম, আগেকার অনামিকাকে খুঁজছিলাম নিজের মধ্যে। কিছু সত্যি চিৎকার করে বলা দরকার সকলের কাছে। পুপুন যদি হারিয়ে যায় সেটা শুধু আমার দোষে নয়। আমি ঐ বাড়ি ছেড়েছিলাম পুপুনকে ওরা অবহেলা করছিল বলে। শুভময় আর ওর পরিবারের ওই ভালোমানুষের মুখোশের আড়ালে আছে একটা অন্য মুখ। যেটা কেউ চেনে না। অদ্ভুত রকমের অবহেলার শিকার হচ্ছিল পুপুন। তাই ওকে প্রাণ খুলে বাঁচতে শেখাবো বলেই নিয়ে এসেছিলাম। আত্মীয়স্বজন, সমাজের আঙুল উঠছিল আমার দিকে। অহংকারী, স্বার্থপর মহিলা, সন্তানের জন্য কত কি স্বীকার করে নিতে হয় মায়েদের, আর অনামিকা কিনা শুভময়ের মত নির্বিবাদী ভালোমানুষটার সঙ্গে সংসার করতে পারলো না! নিজের বাবা-মা অব্দি আমাকেই দোষী করলো। ভালোমানুষ, নির্বিবাদী মানুষ এই শব্দগুলোতে অস্বাভাবিক রকমের ঘৃণা তৈরি হয়েছিল আমার। মনে হচ্ছিলো, সব থেকে সেরা মুখোশ এগুলো। একবার এঁটে নিতে পারলে নিশ্চিন্তে মিথ্যে বলে যাওয়া যায়। 

অঝোরে বৃষ্টি পড়ছিল বাইরে। পুপুন বৃষ্টি দেখলেই খিচুড়ি খাওয়ার বায়না ধরে। আনমনে তাকিয়ে ছিলাম বৃষ্টির দিকে। ফোনটা বেজে উঠলো। তোমাদের বাড়ির ল্যান্ড নম্বর থেকে। রিসিভ করতেই তোমার মা বললেন, কেস করবো আমরা তোমার বিরুদ্ধে। তুমি আমাদের একমাত্র নাতিকে বিক্রি করে দিয়েছো। অহংকারী, স্বার্থপর মেয়েমানুষ! 
কঁকিয়ে উঠেছিলাম আমি। আমি বিক্রি করবো আমার সন্তানকে! যার জন্য সূর্য ওঠে আমার আকাশে সেই পুপুনকে....
ফোনটা কেটে দিয়েছিল তোমার মা। তারই মধ্যে আমি শুনতে পেয়েছিলাম একটা খুব পরিচিত গলার স্বর। কেউ বিশ্বাস করেনি সেদিন অনামিকাকে। বলেছিল, রাগে উন্মাদ হয়ে গেছি আমি। কারণ তোমরা ভালোমানুষ। আর আমি অহংকারী, মুখরা, সত্যি কথা বলা প্রতিবাদী মেয়েটা। ভালোমানুষের মুখোশ আঁটা ব্যক্তিগুলোর সঙ্গে লড়াই করা বড্ড কঠিন, সেটা আমার থেকে আর ভালো কে জানে! তবুও বাড়ির সকলের কথা অমান্য করে দুজন বান্ধবী আর থানার সাহায্যে পৌঁছালাম তোমার বিশাল বাড়ির সদর দরজায়। এই বাড়িতেই একদিন দুধে আলতায় পা চুবিয়ে ঢুকেছিলাম আমি। সেদিন একটা পরিবার পাবার আশায় এসেছিলাম, আজ এসেছি সত্যিটা জানতে। 
বাড়িতে ঢোকার পথেই বাঁধা দিলো তোমার মা। ভিতরে ঢোকা যাবে না। আমি গেটে দাঁড়িয়েই জোরে ডেকেছিলাম পুপুন....
আমার পুপুন ছুটে বারান্দায় এসে বলেছিল, মা এরা আমায় তোমার কাছে যেতে দেবে না বলেছে। 
সঙ্গে সেদিন পুলিশ ছিল, তাই পুপুনকে উদ্ধার করে আনতে পেরেছিলাম। পুলিশ জিজ্ঞাসা করেছিল পুপুনকে। পুপুন বলেছিল, তোমরা ওকে মারোনি, বকুনিও দাওনি শুধু বলেছিলে, মাকে ভুলে যেতে হবে। কোনোরকম যোগাযোগ থাকবে না আমার সঙ্গে। সেই পুরোনো পদ্ধতি। আমায় যেমন দৈহিক অত্যাচার করোনি তোমরা, শুধু বলেছিলে, অনামিকার অস্তিত্বটাকে ভুলে যেতে হবে। বিবাহিত বলে আমার জীবনটা আর আমার থাকবে না। সবটাই বদলে ফেলতে হবে। বদলাবে না তোমরা। শুভময় বিয়ের পরে তোমার জীবনে কোনখানে পরিবর্তন হয়েছিলো বলবে? বেলা করে ঘুম থেকে ওঠা, রাত পর্যন্ত মুভি দেখা বা আলো জ্বালিয়ে বই পড়া, রাতে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে ফেরা, ঠিক কোনটা ছেড়েছিলে তুমি বিয়ের পর। বিবাহ কি শুধু মেয়েরাই করে শুভময়? নাকি বিবাহিত বলে আমার গোটা সত্ত্বাটাকেই বদলে ফেলতে হবে আমাকে। আমার আমিটাকে গলা টিপে মেরে দিয়ে বেঁচে থাকার নাম বুঝি দাম্পত্য সুখ? 
আর রিস্ক নিইনি আমি। ডিভোর্স ফাইল করলাম অবশেষে। সেখানেও সমস্যা তোমার! এতদিনের খারাপ অনামিকাকে ছেড়ে দিতে সমস্যা। সমাজের চোখে ছোট হয়ে যাওয়ার ভয়। অনেক যুদ্ধ করে অবেশেষে আমি ডিভোর্স পেলাম, পেলাম পুপুনের দায়িত্ব। 
এসব কতদিন আগেকার কথা, ভাবনার সিঁড়ি বেয়ে আজ এত বছর পরে কেন ফিরে গিয়েছিলাম জানো? কারণ আজ পুপুন তোমার দেওয়া এক্সপেন্সিভ গিফ্ট ফিরিয়ে দিয়েছে নির্দ্বিধায়।  
ও আজ আঠেরোর পূর্ণ যুবক। তোমরা বলেছিলে, পুপুন নাকি একদিন আমাকে সহ্য করতে পারবে না। পুপুন তার মাকে অহংকারী বলবে। আঠেরোতেই আমার পুপুন যেন একটু বেশিই প্রাপ্তবয়স্ক। আজ টিচার্সডেতে একটা দারুন কার্ড দিয়েছে ও আমাকে। ভিতরে একটা সুন্দর বাংলায় লেখা চিঠি। 
মা, 
     প্লিজ মা, দোহাই তোমার, মাতৃত্বকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে অনামিকাকে হত্যা করো না তুমি। আমি আমার মাকে দেখতে চাই একজন প্রতিবাদী, সফল মহিলা হিসাবে। যে মুখোশবিহীন মুখে সত্যিটা বলার সাহস রাখবে। বহুবার তুমি আমায় বুঝিয়েছো, আমার বাবা নাকি ভীষণ ভালো মানুষ, বড্ড নির্বিবাদী। তোমার এত বোঝানো ব্যর্থ হয়ে গেছে মা। আমি আজ একটা জিনিস বুঝেছি, ভালোমানুষ সেজে থাকাটাও একধরনের নেশা। আমার বাবা সেই নেশাগ্রস্ত। অন্যায়ের প্রতিবাদ যে করতে পারে না তাকে আমি মানুষ ভাবি না, তাই ভালো কি খারাপ বিচার্য নয়। 
আমি সেই অনামিকাকেই দেখতে চাই, যে লোকাল ট্রেনে বাচ্চার সামনে দাঁড়িয়ে স্মোক করা ভদ্রলোককে নির্মম ভাষায় বলে, মনুষ্যত্ব বলেও তো একটা কথা আছে, নাকি সেটা বিসর্জন দিয়েছেন?
আমি সেই অনামিকাকে দেখতে চাই, যে তিনজন ছেলে মিলে একটা মেয়ে টিজ করছে দেখে কোমরে ওড়না জড়িয়ে এগিয়ে গিয়ে দৃঢ় গলায় বলেছে, এই মেয়ে, হাত পা দেননি ভগবান? মার ওকে। আমি সেই অনামিকাকে দেখতে চাই, যে কারোর নামে নিন্দে না করেও নিজে স্বতন্ত্র থাকতে পারে।
জানো মা, ছোট থেকে চোখের সামনে এসবগুলো দেখতে দেখতে একটা জিনিস বুঝেছি, সব দেখেও না দেখার ভান করে থাকা মানুষগুলো বড্ড স্বার্থপর হয়, নির্বিবাদী নাম নিয়ে বেঁচে থাকে। 
প্লিজ মা, দোহাই তোমার, সো কল্ড ভালো মা হতে গিয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলো না। মা, তুমি আমার বেস্ট টিচার, তোমার কাছ থেকেই শিখলাম জেতার মন্ত্র। তাই টিচার্সডের ফার্স্ট কার্ডটা তোমায় দিলাম। 

                             তোমার পুপুন, শুধু তোমার।

চিঠিটা পড়ার পরে আজ একটা কথাই বলতে ইচ্ছে করছে শুভময়, তুমি হেরে গেলে, ভীষণভাবে হেরে গেলে। পুরুষ হতে পারলে না, স্বামী হতে পারলে না, বাবাও নয়। পরাজিত ভালোমানুষ হয়েই থেকে গেলে। অনামিকাকে জিতিয়ে দিলো পুপুন। হ্যাঁ, অনামিকা অহংকারী, প্রতিবাদী, মুখরা, কারণ অনামিকার জীবনটা শুধুই ওর। 
মাঝে মাঝে স্মৃতিচারণ মন্দ নয়, নিজের আত্মবিশ্বাসটা আরেকটু বাড়ে। জমা-খরচের হিসেবটা হয়ে যায় নিখুঁত। বুঝতে পারি, সব হারানোর পরেও পাওয়ার থাকে। শেষের পরেও শুরু করা যায়। অহংকারী, মুখরা নাম নিয়েও দিনের শেষে নিজের মাথায় হাত বুলিয়ে বলা যায়, আমি এমনই। নিজের মুখোশবিহীন মুখটা আয়নায় দেখে বলতে পারি, অনামিকাকে হারিয়ে যেতে দিইনি আমি।

রাকেশ ঘোষাল

Comments

Popular posts from this blog

গ্রীষ্মের_ছুটিতে ছাত্রের লেখা খোলা চিঠি